19/07/2025
”ছায়া হয়ে থাকা কিছু আলাপের গল্প”
সব কথা শব্দ চায় না, আবার সব শব্দের বুকেই বাসা বাঁধে না কথা। মানুষের অন্তরালয়ে কিছু বেদনা থাকে, যেগুলো শুধুই অনুভব হয়, বলা যায় না। সেই অনুভবেরা যেন মুখবিহীন আত্মা—ভাসে মনের অন্তঃসলিলে, অথচ কণ্ঠের কিনারায় এসে হারিয়ে যায়। কারণ প্রতিটি হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকে এক অনুচ্চারিত ভূমিকা, যা সমাজের চোখরাঙানি আর পরিবারের দৃষ্টি এড়িয়ে প্রকাশিত হতে চায়—ছদ্মবেশে, ছায়ার মতো।
কত না কথা বুকের ঘরে লুকিয়ে রাখে মানুষ—কিছু আশা, কিছু অপমান, কিছু অশ্রু, কিছু ভালোবাসা। মুখে বলা চলে না, চোখে বলা চলে না, তাই হয়তো কলম হয়ে ওঠে সেই নীরব মুখপাত্র। গল্পের ছায়ায় মানুষ নিজের রূপ হারিয়ে অন্য চরিত্র হয়ে ওঠে, আর কবিতার ছন্দে নিজের হাহাকারকে ঢেকে দেয় রূপকের আঁচলে। যেভাবে শীতল শিশিরবিন্দু গ্রীষ্মের বিকেলের তপ্ত মাটি ছুঁয়ে মিলিয়ে যায়—ঠিক তেমনি, কিছু না বলা কথা গল্পে মিলিয়ে যায়, নিজেকে গোপন করে।
নিজের যন্ত্রণাকে ঢেকে ফেলে কেউ রূপকথার রাজকুমারীতে, কেউ বা হারিয়ে যাওয়া যাত্রীতে। ছন্দের মধ্যে হারিয়ে যায় জীবনের চিত্র। শব্দগুলো তখন আর শুধুই শব্দ নয়, তারা হয়ে ওঠে অশ্রুপাতের অনুনাদ, হৃদয়ের আর্তনাদ। কবিতা তখন হয়ে ওঠে মনখোলা আকাশ—যেখানে মেঘের ভেতরে লুকিয়ে থাকে মনের কান্না, আর গল্প হয় তপ্ত রোদ্দুরে গড়া ছায়া—যেখানে নিজের দহন কেউ টের পায় না।
এই ছদ্মবেশী আত্মপ্রকাশ এক শিল্প—এ যেন নিজেকে নিজের হাতেই রক্ষা করা। এ পথে নেই কোনো প্রশ্নের কামান, নেই সমাজের বিষাক্ত দৃষ্টি, নেই আত্মমর্যাদার ঝুঁকি। বরং এখানে রয়েছে নিজেকে বুঝে নেওয়ার এক প্রশান্ত সুযোগ—যেখানে যন্ত্রণাও সৌন্দর্য হয়ে ওঠে, আর নীরবতাও এক ভাষার রূপ নেয়।
যে ব্যক্তি নিজের কষ্টকে লুকিয়ে রেখে কল্পনার জালে বুনে চলে গল্প, অথবা ছন্দের নদীতে ভাসিয়ে দেয় হৃদয়ের ব্যথা—সে দুর্বল নয়, বরং এক সাহসী শিল্পী। তার আত্মপ্রকাশ হয় মৌন, কিন্তু গভীর। সমাজের গণ্ডির ভেতরে দাঁড়িয়ে সে একান্ত নিজের জগৎ নির্মাণ করে, যেখানে সে পাঠকও, লেখকও—আলোও, আর ছায়াও।
তাই কেউ যদি কোনো গল্পে নিজেকে খুঁজে পান, কোনো কবিতায় হৃদয়টা ধ্বনিত হতে শোনেন—জেনে নিও, কেউ একজন তার না-বলা কথাগুলোকে ছায়া দিয়ে বলেছে। তার মুখ নেই, নাম নেই, তবু সে আছে—প্রত্যেক কবিতার পেছনে, প্রতিটি গল্পের ছায়ায়।
—জুবাইর