07/03/2024
"আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বোঝেন, আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ ঢাকা চট্রগ্রাম,খুলনা,রাজশাহী,রংপুর,আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়,বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়,বাংলার মানুষ তাঁর অধিকার চায়।
কি অন্যায় করেছিলাম? নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে আমাকে ও আওয়ামী লীগকে ভোট দেন। আমাদের ন্যাশনাল এসেম্বলি বসবে, আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈরি করবো এবং এদেশের ইতিহাসকে গড়ে তুলবো। এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক,রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবেন। কিন্তু দু;খের বিষয় আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, ২৩ বছরের করুণ ইতিহাস, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস। এই রক্তের ইতিহাস মুমূর্ষু মানুষের করুণ আর্তনাদ- এদেশের ইতিহাস,এদেশের মানুষের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস।
১৯৫২ সালে আমরা রক্ত দিয়েছি। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারি নাই। ১৯৫৮ সালে আয়ুব খাঁন, মার্শাল ল’ জারি করে ১০ বছর পর্যন্ত আমাদের গোলাম করে রেখেছে।
১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলনে ৭ ই জুনে আমার ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৬৯ সালে আন্দোলনে আয়ুব খানের পতনের পর যখন ইয়াহিয়া এলেন। ইয়াহিয়া খান বললেন দেশে শাসনতন্ত্র,গণতন্ত্র দেবেন- আমরা মেনে নিলাম। তারপর অনেক ইতিহাস হয়ে গেল, নির্বাচন হলো। আমি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাথে দেখা করেছি। আমি শুধু বাংলার নয়, পাকিস্থানের মেজরিটি পার্টির নেতা হিসেবে আমি তাঁকে অনুরোধ করেছিলাম, ১৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে আমাদের জাতীয় পরিষোদের অধিবেশন দেন। তিনি আমার কথা রাখলেন না। তিনি রাখলেন ভুট্রো সাহেবের কথা। তিনি বললেন প্রথম সপ্তাহে মার্চমাসে হবে। আমি বললাম ঠিক আছে আমরা এসেম্বলিতে বসবো।
আমি বললাম, এসেম্বলির মধ্যে আলোচনা করবো- এমনকি এও পর্যন্ত বললাম, যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশী হলেও একজন যদিও সে হয় তা হয়, আমরা মেনে নেবো।
ভুট্রো সাহেব এখানে এসেছিলেন আলোচনা করলেন। বলে গেলেন, আলোচনার দরজা বন্ধ নয়, আরো আলোচনা হবে। তারপর অন্যান্য নেতাগনের সঙ্গে আলাপ করলাম- আলাপ করে শাসন তন্ত্র তৈরি করবো। সবাই আসুন, বসুন। আমরা আলাপ করে শাসনতন্ত্র তৈরি করবো। তিনি বললেন, পশ্চিম পাকিস্থানের মেম্বাররা যদি এখানে আসে তাহলে কসাইখানা হবে এসেম্বলি। তিনি বললেন, যারা যাবে, তাদের মেরে ফেলে দেওয়া হবে। আর যদি কেউ এসেম্বলিতে আসে পেশোয়ার থেকে করাচি পর্যন্ত সব জোড় করে বন্ধ করা হবে। আমি বললাম, এসেম্বলি চলবে। তারপরে হঠাৎকরে মার্চের ১লা তারিখে এসেম্বলি বন্ধ করে দেওয়া হলো।
ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট হিসেবে এসেম্বলি ডেকেছিলেন। আমি বললাম, যাবো। ভুট্রো বললেন যাবেন না। ৩৫ জন সদস্য পশ্চিম পাকিস্থান থেকে এখানে এলেন। তারপর হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া, দোষ দেওয়া হলো বাংলার মানুষকে , দোষ দেওয়া হলো আমাকে। দেশের মানুষ প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠলো।
আমি বললাম, শান্তিপূর্ণ ভাবে আপনারা হরতাল পালন করুন। আমি বললাম আপনারা কলকারখানা সব কিছু বন্ধ করে দেন। জনগণ সারা দিলো। আপন ইচ্ছায় জনগন রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো। তারা শান্তিপূর্ণভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাবার জন্য স্থির প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো। কী পেলাম আমরা ? জামা পয়সা দিয়ে অস্ত্র কিনেছি, বহিঃশত্রুর আক্রমন থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য। আজ সেই অস্ত্র আমার দেশের গরিব-দু;খী মানুষের বিরুদ্ধে-তার বুকের ওপর হচ্ছে গুলি। আমরা পাকিস্থান সংখ্যাগুরু-আমরা বাঙ্গালিরা যখনই ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি, তখনই তারা আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছেন।
আমি বলেছিলাম, জেনারেল ইয়াহিয়া সাহেব, আপনি পাকিস্থানের প্রেসিডেন্ট। দেখে যান, কিভাবে ? আমার গরিবের ওপর, আমার বাংলার মানুষের বুকের ওপর গুলি করা হচ্ছে। কিভাবে আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে। কি করে মানুষ হত্যা করা হয়েছে। আপনি আসুন, আপনি দেখুন। বিচার করুন। তিনি বললেন আমি ১০ তারিখে রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স ডাকবো।
আমি বলেছি কিসের এসেম্বলি বসবে? কার সঙ্গে কথা বলবো? আপনারা যারা আমার মানুষের রক্ত নিয়েছেন,তাদের সঙ্গে কথা বলবো? পাঁচ ঘন্টা গোপন বৈঠকে সমস্ত দোষ তারা আমাদের বাংলার মানুষের অপর দিয়েছেন, বলেছেন, দায়ী আমরা।
২৫ তারিখে এসেম্বলি ডেকেছেন। রক্তের দাগ শুকায় নাই। ১০ তারিখে বলেছি, রক্তে পাড়া দিয়ে, শহীদের ওপর পাড়া দিয়ে, এসেম্বলি খোলা চলবে না। সামরিক আইন মার্শাল’ল ‘উইথড্র করতে হবে। সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ঢুকতে হবে। যে ভাইদের হত্যা করা করা হয়েছে, তার তদন্ত করতে হবে। আর জনগনের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তারপর বিবেচনা করে দেখবো আমরা এসেম্বলিতে বসবো কিনা। এর পূর্বে এসেম্বলিতে আমরা বসতে পারি না।
আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না । দেশের মানুষের অধিকার চাই। আমি পরিস্কার অক্ষরে বলে দিবার চাই যে, আজ থেকে এই বাংলাদেশের কোর্ট-কাচারি, আদালত, ফৌজদারি আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ থাকবে। গরিবদের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে,সেজন্য অন্যান্য যে জিনিসগুলি আছে, সেগুলির হরতাল কাল থেকে চলবে না। রিকশা, গরুরগাড়ী, রেল চলবে। শুধু সেক্রেটারিয়েট ও সুপ্রিম কোর্ট, হাই কোর্ট, জর্জ কোর্ট সেমি গভর্নমেন্ট দপ্তর,ওয়াপদা কিছুই চলবে না। ২৮ তারিখে কর্মচারিরা গিয়ে বেতন নিয়ে আসবেন। এরপর যদি বেতন দেওয়া না হয়,এরপর যদি একটি গুলি চলে, এরপর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়- তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু , আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে মারবো। সৈন্যরা, তোমরা আমার ভাই। তোমরা ব্যারাকে থাকো, তোমাদের কেউ কিছু বলবে না।কিন্তু আর তোমরা গুলি করবার জন্য চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবে না। আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না।
আর যে সমস্ত লোক শহিদ হয়েছে, আঘাত প্রাপ্ত হয়েছে, আমরা আওয়ামী লীগ থেকে যদ্দুর পারি সাহায্য করতে চেষ্টা করবো। যারা পারেন আওয়ামী লীগ অফিসে সামান্য টাকা পয়সা পৌঁছে দেবেন। আর সাতদিন হরতালে শ্রমিক ভাইয়েরা যোগদান করেছে, প্রত্যেক শিল্পের মালিক তাদের বেতন পৌঁছে দেবেন।সরকারি কর্মচারিদের বলি, আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মানুষ মুক্তি না পাচ্ছে ততদিন ওয়াপদার ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো- কেউ দেবে না।
শুনুন, মনে রাখুন। শত্রু পেছনে ঢুকেছে আমাদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। এই বাংলায় হিন্দু মুসলমান যারা আছে আমাদের ভাই ,বাঙালি অবাঙালি তাদের রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব আমাদের ওপর। আমাদের যেন বদনাম না হয়।
মনে রাখবেন, রেডিও যদি আমাদের কথা না শুনে, তাহলে কোন বাঙালি রেডিও ষ্টেশনে যাবেন না। যদি টেলিভিশনে আমাদের নিউজ না দেয়, তাহলে কর্মচারীরা টেলিভিশনে যাবেন না। দু’ঘন্টা ব্যাং খোলা থাকবে যাতে মানুষেরা তাদের মায়না পত্র নিতে পারে। পূর্ব বাংলা হতে পশ্চিম পাকিস্থানে এক পয়সাও চালান হতে পারবে না। টেলিফোন, টেলিগ্রাম আমাদেরত্র এই পূর্ববাংলায় চলবে এবং বাংলাদেশের নিউজ বাইরে পাঠানো চলবে।
এই দেশের মানুষোকে খতম করার চেষ্টা চলছে- বাঙ্গালিরা বুঝে শুনে কাজ করবে। প্রত্যেক গ্রামে প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষোদ গড়ে তুলুবন এবং আমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকুন। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাহআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। ‘জয় বাংলা’।