27/02/2023
লাউডস্পিকারের নৃশংস প্রয়োগ
জুলুম কেবল কারো সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া বা তাকে শারীরিক কষ্ট দেওয়ার জন্য তার উপর হাত তোলার নাম নয়, বরং আরবী ভাষায় "জুলুম" হলো, "কোনো বস্তুকে অপাত্রে রাখার নাম জুলুম"। কোনো বস্তু অপাত্রে রাখার দরুন অবশ্যই কারো না কারো ক্ষতির কারণ হয়। এই ধরণের প্রতিটি ব্যবহারই "জুলুম" সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। আর যদি এটা কোনো মানুষের ক্ষতি করে থাকে, তাহলে এটা শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকেও এটা একটি বড় গুনাহ।
কিন্তু এ ধরণের অনেক পাপ আমাদের সমাজে এতটাই প্রবল হয়ে উঠেছে যে, সেগুলোকে আর সাধারণভাবে পাপ হিসেবে গণ্য করা হয়না। "হয়রানির" সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি হলো, লাউডস্পিকারের নিষ্ঠুর ব্যবহার। মাত্র কয়েকদিন আগে একটি ইংরেজী পত্রিকায় এক ব্যক্তি অভিযোগ করেছিলেন যে, কিছু কিছু বিবাহের হলে রাত তিনটা পর্যন্ত লাউডস্পিকার বাজানো হয়। আর আশপাশের বাসিন্দারা অস্থিরতা বোধ করে বিছানায় গড়াগড়ি করতে থাকে। এসব কিন্তু বিয়ের মঞ্চে শুধু সীমাবদ্ধ নয়।
সর্বত্র দেখা যায় যে, যখন একজন ব্যক্তি কোথাও একটি লাউডস্পিকার স্থাপন করে, তখন তিনি প্রয়োজনের পরিমাণে ভলিউম সীমিত করতে এবং আশেপাশের দুর্বল এবং অসুস্থ লোকদেরকে কষ্ট দিতে পরওয়া করে না। যারা এই আওয়াজ শুনতে চান না। গান বাজানোর ব্যাপারটা ভিন্ন। উঁচু আওয়াজে গান বাজানো তো দ্বিগুণ খারাপ কাজ। যদি কোনো খাঁটি দ্বীনী ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়, তাহলে লাউডস্পিকারের মাধ্যমে মানুষকে তাতে অংশ নিতে বাধ্য করা শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে জায়েয নয়।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের সমাজে যারা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে তারাও শরীয়তের এই গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশকে গুরুত্ব দেয় না। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সমাবেশের লাউডস্পিকারও দূর-দূরান্ত পর্যন্ত বাজানো হয় এবং তাদের এসবের কারণে একজন ব্যক্তি তার ঘরে আরামে ঘুমাতে পারে না বা একাগ্রচিত্তে কোনো কাজও করতে পারে না। লাউডস্পিকারের মাধ্যমে আযানের ধ্বনি দূর-দূরান্তে পৌঁছে দেওয়া এটা ঠিক। কিন্তু মসজিদে ওয়াজ ও বক্তৃতা বা যিকর পাঠের আওয়াজ দূর-দূরান্তে পৌঁছে দেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
প্রায়ই দেখা যায় মসজিদে ওয়াজ বা বক্তৃতা শোনার জন্য খুব কম লোকই বসে থাকে, যাদের শব্দ শোনানোর জন্য লাউডস্পিকারের প্রয়োজন হয় না। অথবা শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ হর্ন সহজেই কাজ করতে পারে। কিন্তু বাহিরের লাউডস্পিকার হাই ভলিউম অন থাকে। যার দরুন আওয়াজ আশেপাশের প্রতিটি বাড়িতে এমনভাবে পৌঁছে যায় যে, কেউ এর দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে বেঁচে থাকতে পারে না।
আমার মনে আছে আমি একবার লাহোরে গিয়েছিলাম। আমি যে বাড়িতে থাকতাম তার তিন দিকে অল্প দূরত্বে তিনটি মসজিদ ছিল। সেদিন শুক্রবার ছিল। ফজরের নামাযের পরপরই তিনটি মসজিদের লাউডস্পিকারের আওয়াজ জোরে চালু করা হয় এবং প্রথমে তিলাওয়াত শুরু হয়, তারপর শিশুরা আবৃত্তি শুরু করে। অতঃপর কবিতা ও না'ত পাঠ শুরু হয়। এমনকি ফজর থেকে জুমার সময় পর্যন্ত এসব ‘ধর্মীয় অনুষ্ঠান’ এমনভাবে চলতে থাকে যে, ঘরে কেউ কোনো শব্দ শুনতে না পায়।
আল্লাহর শুকরিয়া, সেই সময় ঐ বাড়িতে কেউ অসুস্থ ছিল না। কিন্তু আমি ভাবছিলাম, আল্লাহ না করুক কেউ অসুস্থ হলে এই পরিবেশে তাকে শান্তভাবে শুইয়ে আরাম করার উপায় নেই। কোনো কোনো মসজিদ সম্পর্কে শোনা যায়, খালি মসজিদে লাউডস্পিকারে টেপ বাজানো হয়। মসজিদে শোনার মতো কেউ নেই তবুও পুরো পাড়া এই টেপ শুনতে বাধ্য।
দ্বীন সম্পর্কে সঠিক ধারণা আছে এমন জ্ঞানীরা হোক না কেন তারা যে কোনো মাযহাবেরই, তারা কখন-ই এটা করতে পারে না। কিন্তু এটা ঘটে সেইসব মসজিদে যেখানে ম্যানেজমেন্ট দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ লোকদের হাতে। কখনও কখনও এই লোকেরা এই কাজটি ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে করে। তারা এটিকে দ্বীন প্রচারের মাধ্যম মনে করে এবং এটিকে দ্বীনের খেদমত বলে।
কিন্তু আমাদের সমাজে এই নীতিটাও খুব ভুলভাবে প্রচলিত যে, নিয়ত ভালো থাকলে একটি ভুলও বৈধ ও সঠিক হয়ে যায়। বাস্তবতা হলো, কোনো কাজকে সঠিক হওয়ার জন্য শুধুমাত্র ভালো উদ্দেশ্য-ই যথেষ্ট নয়, বরং তার পদ্ধতি সঠিক হওয়া আবশ্যক। লাউডস্পিকারের এই ধরণের নিষ্ঠুর ব্যবহার শুধু দাওয়াত ও তাবলীগের মূল নীতির পরিপন্থী নয়, এর বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
সূত্র: যিকর ও ফিকর উর্দূ পৃষ্ঠা: ২৪-২৬,