30/06/2019
জম জম চিংড়ী প্রকল্পের একজন প্রবীণ কর্মকর্তা যিনি সৎ, নিষ্ঠাবান, ও মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেয়া একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবেও পুরষ্কৃত হয়েছেন। যিনি প্রায় বহু বছর যাবৎ এই হ্যাচাড়ীতে কর্মরত আছেন, তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব মোঃইউসুফ উজ্জামান, গ্ৰামের বাড়ি বিক্রমপুর, মুন্সীগঞ্জ। বর্তমানে কর্মরত আছেন সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলায়। সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলায় ২০১২ সালে এক অন্চলে চিংড়ী পোনা সর্বরাহ করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। কাজের ফাঁকে রাতে বসে বসে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা তার সেই সরাসরি অংশ নেয়া কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা লিখেছিলেন। কর্মব্যস্ততা আর বার্ধক্য জনিত নানান জটিলতার কারণে যা আজও অসমাপ্ত রয়ে গেছে। সেই অসমাপ্ত লেখনীর নাম দিয়ে ছিলেন
"যে কথা হয়নি বলা"
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের সবার মাঝেই আছে। যারা মুক্তিযুদ্ধের বই পড়েছেন, পড়তে ভালোবাসেন আশা করি তাদের কাছে অবশ্যই ভালো লাগবে।
ধন্যবাদ সবাইকে।
"যে কথা হয়নি বলা"
লেখক : মোঃ ইউসুফ উজ্জামান
স্থান : কালীগঞ্জ, সাতক্ষীরা।
তারিখ :০৩/০৩/২০১২ ইং
========================
১৯৭১ সালে মে মাসের মাঝামাঝির দিকে একদিন বিকাল বেলা কাজির পাগলা হাই স্কুলের একটি শ্রেনী কক্ষে হোসেন খাঁন (মৃত), কাশেম দা, জশলদিয়ার মোশারফ ভাই, মৌছামান্দ্রার কালাম দা, কেয়টচিড়ার মোয়াজ্জেম দা, সাতঘড়িয়ার মাহবুব ভাই সহ আরো অনেকে ছিলেন। এই মুহুর্তে সবার নাম মনে পরছে না সবাই মিলে আলোচনা হলো কিভাবে আমরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করতে পারি। সিদ্ধান্ত হলো আগামীকাল হতে আমরা জলধর ডাঃ এর বাড়ীর (বর্তমানে কাজির পাগলা প্রাথমিক বিদ্যালয়) ছাদে-মিলিত হবো এবং সবাইকে বলা হলো যারা মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে উৎসাহি তাদের নিয়ে আসার জন্য। পরের দিন আমি ও আমার চাচাতো ভাই সামাদকে (সামাদ হাজী) নিয়ে ওখানে গেলাম। ওখানে গিয়ে জানতে পারলাম যে কিছুদিন পূর্বে নাকি শ্রীনগর থানার অস্ত্রাগার মুক্তিবাহিনী লুট করেছে। সেখান থেকে ৫টি রাইফেল আমাদেরকে দেয়া হয়েছে। পরবর্তীতে আরো অস্ত্রশস্ত্র দেয়া হবে এবং এও জানতে পারলাম যে, আমাদের মুন্সিগঞ্জ সাবডিভিশনের (বর্তমানে জেলা) দায়িত্বে আছেন তার নাম ‘‘বড় ভাই’’ তার নির্দেশ মোতাবেক মুন্সীগঞ্জের সব কিছু পরিচালিত হয়। তখন পর্যন্ত আমরা লেঃ ওমরের নাম জানতাম না। অবশ্য অনেক পরে জেনেছি। আস্তে আস্তে যতই দিন যাচ্ছে ততই লোকের সংখ্যা বাড়তে লাগলো। যদিও সবার নাম আমি মনে করতে পারছি না। যতদুর মনে পড়ে পরবর্তীতে যারা যোগদান করেছিলেন তখন পর্যন্ত তাদের কেউই অংশগ্রহন করেন নাই। কাজির পাগলা ক্যাম্পে যোগদানের এক সপ্তাহের মাথায় আমার বড় ভাই রউফ মাষ্টার ও বাসাঢ় মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নেওয়ার জন্য ভারতে চলে গিয়েছে। ভূঁইয়া বাড়ীর মোশারফ ও গিয়েছিল কিছুদিন পর চলে এসেছে। আমি আর আমার মিতা বর্তমান চেয়ারম্যান হাজী ইউসুফ একদিন কাজির পাগলা বাজারে করিম ডাঃ এর ডিসপেনসারীর পাশে আলাপ করলাম আমরাও ভারতে চলে যাব এরই মধ্যে উত্তর কাজির পাগলার আওলাদ স্বারের (টুকু) ভাই হুমায়ুনের সাথে কথা হলো জামাল হোসেন খানও আমাদের সাথে যাবে। ভারতে যেতে হলেতো টাকা লাগবে। টাকা কোথায় পাব। আমি ও চেয়ারম্যান পরামর্শ করলাম রহিমা আপার জামাই ইউনুস দুলাভাই তখন ঢাকা স্টেডিয়াম মার্কেটের দোতালায় ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের হেড ক্যাশিয়ার ছিলেন। আর আমার মেজ ভাই মতিন দা (মৃত) থাকতেন আজিমপুরে। দুজনে মিলে একটা দুষ্টমির আশ্রয় নিলাম। আবুল দা এর (মৃত) স্বাক্ষর আমি হুবাহু নকল করতে পারতাম। সে মোতাবেক ইউনুস (মৃত) এর কাছে একটি চিঠি লিখলাম আবুল দা (মৃত) এর নাম দিয়ে চিঠিটা হুবহু এরকম: ইউনুস সাহেব শুভেচ্ছা নিবেন, ২ ইউসুফকে পাঠালাম। রাইচ মিলের পিস্টন নষ্ট হয়ে গেছে নতুন পিস্টন কেনার জন্য ওদেরকে ১,০০০/- (এক হাজার) টাকা দিবেন। ইতি আবু নাসের আবুল চিঠি নিয়ে দুজনে গোয়ালিমান্দা গিয়ে তিব্বত লঞ্চ যোগে ঢাকায় চলে গেলাম। সকাল ৯.৩০ মিঃ এর সময় ইউনুস ভাইয়ের অফিসে উপস্থিত হলাম। তখনো ব্যাংকের সব ষ্টাফরা এসে পৌঁছায় নাই। আমাদেরকে কিছুক্ষন পর আসতে বললেন। কোথায় যাব চারিদিকে পাক সেনাদের ভয়। বায়তুল মসজিদের ভিতরে ২য় তলায় শুয়ে রইলাম আর দুই বন্ধু আল্লাহর নাম নিতে লাগলাম দুইজনে এও বললাম যদি চিঠির স্বাক্ষর ধরা না পরে ইউনুস ভাই যদি টাকাটা ঠিকমত দিয়ে দেয় তাহলে ওখান থেকে ৫টি টাকা গরীব মিসকিনকে দান করে দিব। ঠিক মনে আছে সকাল ১০.২৫ মিঃ এর সময় ব্যাংকে যাওয়ার সাথেই এক হাজার টাকা ইউসুফ ভাই আমাদের দিয়ে বললেন একটি অটো বেবি নিয়ে নওয়াবপুর যেয়ে পিষ্টন কিনে সোজা সদরঘাট গিয়ে লঞ্চে উঠে দেশে চলে যাও। আমরা সালাম দিয়ে তার অফিস থেকে বের হয়ে বেবি ঠিকই নিলাম। নওয়াবপুররের জন্য নয়, আজিমপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। তখন আজিমপুর যেতে হলে নিউমার্কেটের সামনে দিয়ে যেতে হতো। সারা শহর ফাঁকা মাঝে মাঝে পাক সেনাদের গাড়ী নিয়ে টহল দিতে দেখলাম। আজিমপুর মতি দার সাথে দেখা হতেই সে আমাদের দুই জনকে এই বলে রাগ করলেন যে, এ অবস্থায় ঢাকা আসা মোটেও উচিৎ হয় নাই। তা কি জন্য এসেছি জানতে চাইলেন। বললাম মা সংসারের জন্য কিছু টাকা দিতে বলেছেন তিনি দেরী না করে আমাকে ৩০০/- (তিনশত) টাকা দিয়ে তাড়াতাড়ি চলে যাওয়ার কথা বললেন। সাথে সাথে সেই বেবি নিয়েই সদরঘাটে এসে লঞ্চে উঠলাম। আবার সেই তিব্বত লঞ্চ যে লঞ্চের কেরানী আমার বাবার খুবই প্রিয় ছাত্র তার নাম আকমল খাঁন বাড়ী ডঃ কাজির পাগলা। আমার বন্ধু জাকিরের বড় ভাই, যথা সময়ে লঞ্চ ছেড়ে ছিল। শেখর নগর আসার পর জানতে পেলাম শ্রী নগর পাকিস্তানী সেনা এসেছে। লঞ্চের সব লোকদেরকে নামিয়ে তারা সার্চ করে। আকমলদার (মৃত) রুমে গিয়ে তার সাথে আলাপ করলাম। আকমলদা অভয় দিয়ে বললেন সবার ভাগ্যে যা হবে তোমাদেরও তাই হবে চিন্তা করে কোন লাভ নেই আল্লাহকে ডাকো। কারন তখন এ রকম সময় ছিল যে শ্রীনগরের আগে কোথাও নামলে যাওয়ার কোনই ব্যবস্থা নাই। তখন শ্রীনগর থানা ছিল পশ্চিম পার্শ্বে এবং থানার সামনেই লঞ্চ ঘাট ছিল। যথারিতি লঞ্চ এসে ঘাটে ভিড়ল নিচ থেকে খাঁন সেনাদের নির্দেশ "এক এক কারকে নিচে আঁকে লাইন সে খারাহো........যাও।" তাদের নির্দেশ মোতাবেক নিচে নেমে লঞ্চের সব লোক মিলে ৪টি লাইনে দাড়িয়ে গেলাম আমি ছিলাম ৪নং লাইনে অর্থাৎ একেবারে শেষের লাইনে। লাইনগুলি ছিল উত্তর দক্ষিনে। আবার লাইনের সর্ব দক্ষিনে কিছু কাঁদা ছিল সেখানে সুট পরিহিত এক ভদ্র লোককে দাঁড়াতে বলা হলো। ভদ্রলোক একটু ইতস্ত করাতে এক খাঁন সেনা এসে তাঁকে পিছনে এক লাথি মারলো লাথি খেয়ে ভদ্রলোক পরিচয় দিল সে ফায়ার সার্ভিসে চাকুরী করে এবং তার পরিচয়পত্র দেখালো। পরিচয়পত্র দেখে খাঁন সেনাটি একটু নমনীয় হয়ে তাঁকে অন্য জায়গায় দাঁড় করালো। এখানে একটু বলেনেই, ইউনুস ভাইয়ের কাছ থেকে পাওয়া ১,০০০/- (এক হাজার) টাকা এবং মতিনদার কাছ থেকে পাওয়া ৩০০/- (তিনশত) টাকা মোট ১,৩০০/- (এক হাজার তিনশত) টাকা দুইজনে সমান সমান ভাগাভাগি করে ১০০ টাকা বেশি ছিল সেখান থেকে কিছু কেনাকাটা করেছি ৫টাকা ভিক্ষুককে দেওয়ার জন্য আলাদা রেখেছিলাম তা পুরাটা লঞ্চে দিতে পারি নাই। আমার কাছে ৬০০ টাকা ছিল। ঐ সময় সার্টের কলারে একধরনের পকেট ছিল। আমার দুকলারে তিনশত করে ৬০০ টাকা ছিল। লাইনে দাঁড়ানো অবস্থায় তল্লাশী করার সময় এক সিপাহী আমার টাকাগুলো নিয়ে গেল আমি কিছু বলতে সাহস পেলাম না। প্রায় ২ থেকে আড়াই ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর একজন ক্যাপ্টেন এসে লাইন ধরে লঞ্চে উঠার জন্য আদেশ দিলেন। আমরা লঞ্চে উঠে গেলাম। আকমলদা আমাদের কাছ থেকে লঞ্চের ভাড়া নেন নাই এবং আমাদেরকে 1st Class এ বসার সিট দিয়েছিলেন। কিছুক্ষন পর সেই ক্যাপ্টেন এসে সবার উদ্দেশ্যে বললো আপনাদের কোন কিছু খোয়ানো গিয়ে থাকলে আমাকে নির্ভয়ে বলুন আমি আপনার কেটের ক্ষতি পূরন করে দিব। আমার পাশেই বষা ছিল সেই ফায়ার সার্ভিসে চাকুরী করা লোকটি। আমাকে আমার টাকা নেওয়া কথা ক্যাপ্টেনকে জানাতে বললো আমি তাকে বললাম যে আমিতো উর্দু বলতে পারি না কিভাবে জানাবো। ভদ্রলোক আমাকে বললেন যে, তুমি যে ভাবে পার শুরু কর পরে আমি তোমাকে সাহায্য করবো। তার কথা মত মনে একটু সাহস সঞ্চয় করে বলতে আরম্ভ করলাম। আমার বলাটা ছিল এরকম 'স্বার আমার পকেটে যে টাকা ছিল চেক করার টাইম এক আদাম লে গিয়া।" ক্যাপ্টেন মনে হয় আমার কথা কিছুই বুঝে নাই। সে হাতের ইশারায় অন্যদেরকে জিজ্ঞেস করছে আমি কি বলতে চাই। তখন সেই ভদ্রলোক উর্দুতে সুন্দর করে আমার টাকা নেওয়ার কাহিনী ক্যাপ্টেনকে বুঝালেন। ক্যাপ্টেন সাথে সাথে আমাদেরকে লাইনে থাকা অবস্থায় যারা চেক করেছিলেন তাদের সবাইকে আমার সামনে হাজির করলেন এবং আমাকে বললেন "বাতাও কোন"। আমি ভয়ে বলতে সাহস পাচ্ছিলাম না তখন ক্যাপ্টেন আমার মাথায় বুলিয়ে যা বললো তাতে আমি বুঝলাম যে তোমার কোন ভয় নাই, তুমি কোন অন্যায় করো নাই। তুমি সত্য কথাই বলছো। ক্যাপ্টেনের অভয়বানি শুনে আমি আমার বাম পার্শ্বে দাড়ানো লোকটির দিকে ইশারা করে দেখিয়ে দিলাম। স্যার এই লোক, সাথে সাথে ঐ লোকটিকে পাছার মধ্যে লাথি মেরে ক্যাপ্টেন বললো "বাহিন চোত নিকালো রুপাইয়া।" লাথি খেয়ে সিপাহীটি তার পেন্টের পকেট থেকে ছয়শত টাকা বের করে দিলো। টাকাগুলো আমার হাত দিয়ে ক্যাপ্টেন আমার মাথায় হাত বুলিয়ে যা বললেন তার অর্থ এরকম "দুনিয়ার সব মানুষ সমান না, খারাপ ভালো সব ধরনের মানুষ সব জায়গায়ই আছে। তুমি মনে কিছু নিওনা, বিচার পেয়ে খুশিতো?" আমি মাথা নেরে সায় জানালাম। কিছুক্ষণ পর লঞ্চ গোয়ালিআন্দ্রা আসলে আমরা নেমে পরলাম এবং নৌকা নিয়ে উঠলাম মোশারফদের বাড়ী, মোশারফ কিছুদিন আগে ভারতের ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে ওর মায়ের উদ্দেশ্যে একটি চিঠি পাঠিয়েছিল কোন একজনের মারফৎ চিঠিখানা সদরঘাট মাযা কাটার দোকান থেকে আমার কাছে দেয়া হয়েছিল ওর মাকে দেওয়ার জন্য সে চিঠিখানা ওর মাকে দিলাম সাথে কাপড় চোপড় যা ছিল সব মোশারফদের বাড়ীতে রেখে দুই বন্ধু বাড়ী চলে আসলাম। নৌকার মাঝি ছিল সিবু চাচা ওরফে সিবু বাদ্যকর বর্তমানে মৃত। তাকে বলে রাখলাম ভোর রাতে মোশারফদের বাড়ী থেকে আমাদের দুজনকে যমলদিয়া লঞ্চ ঘাটে নামিয়ে দিয়ে আসবে। একথা কাউকে যেন না বলে। যথা সময়ে সিবু চাচা এলো আমাদের দুজনকে নিয়ে যমলদিয়া ঘাটে পৌঁছে দিল। সেখানে আমাদের অপেক্ষায় হুমায়ুন ও জামাল হোসেন খাঁন অপেক্ষা করছিল। যথা সময়ে লঞ্চযোগে আমরা গোমাল দং পৌঁছলাম। এর আগে অবশ্য বিকাল বেলা বাড়ী হতে যাওয়ার সময় গতিবিধি লক্ষ করে মা মনে অনেক আবেগ নিয়ে বলেছিল "বাবারে না বলে কোথাও যাস না। মরলে সবাই একসাথে মরব।" যদিও প্রতি রাত্রে আমি মোশরাফদের বাড়ী থাকতাম। মা কিভাবে মনের কথা জানলেন তখন বুঝতে না পারলেও যখন বিয়ে করে সন্তানের বাপ হয়েছি তখন ঠিকই বুঝতে পেরেছি মা-বাবা সন্তানের গতিবিধি দেখে তাদের মনের কথা আচ করতে পারেন। জানলে যেতে বাধা দিবে বলেই সেদিন মাকে না বলে গিয়েছিলাম। পরে অবশ্য ফিরে এসে না বলে যাওয়ার জন্য মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছি। আজ আমার মা বেঁচে নেই মায়ের জন্য মনটা বড় কাঁদে। যারা আমার এ লেখা পড়বেন সবার প্রতি আমার বিশেষ অনুরোধ রইল আপনারা আমার মায়ের জন্য একটু দোয়া করবেন খোদা যেন আমার মাকে বেহেস্ত নসিব করেন। ফিরে আসি পুর্বের কথায় গোয়ালন্দ থেকে ফরিদপুর। ফরিদপুর থেকে বাসে তার পর ট্রাকে করে ঝিনাইদহ পৌঁছলাম। যতদুর মনে পরে ঝিনাইদহ থেকে একটি নদী পাড় হওয়ার সময় পাক সেনাদের হাতে ধরা পরলাম। ওরা আমাদেরকে প্রায় ২ ঘন্টা ক্যাম্পে আটকিয়ে রেখে বিভিন্ন প্রশ্ন করল। ঠিকঠাক মত প্রশ্নের উত্তর দেওয়াতে ওরা আমাদেরকে ছেড়ে দিল। আমাদের সাথে আরো লোকজন ছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে ওরা ছাড়লো না। তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছিল তা জানার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি। সন্ধ্যার পর আমরা নদী পাড়ি দেওয়ার জন্য নৌকায় উঠলাম। ওপারে মাগুরা পৌঁছলাম রাত্র তখন ৭-৪৫ মিঃ। ওখানে নাকি রাত্র ৮ হতে কারফিউ, মাগুরা ব্রিজের উপর দিয়ে যখন হেটে যাচ্ছিলাম পিছন থেকে রাইফেলের বাট দিয়ে খোঁচা দিয়ে ছোট ছোট রাজাকারের বাচ্চারা গালি দিয়ে বলতেছে 'শালারা জাননা রাত ৮ টা হইতে কারফিউ, রাত ৮টা বাজলে তোমার বাবারা চলে আসবে তখন যাইতে পারবানা। তাড়াতাড়ি করে চলে যাও।" সেদিন সে রাজারের বাচ্চাদের স্যার বলতে হয়েছিল। যা আজও মনে হলে কষ্ট পাই।
কিছুদুর হেটে যাওয়ার পর মাগুরা হুমায়ুনদের বাড়ী উঠলাম রাত তখন ৯টা কি সাড়ে ৯টা হবে। হুমায়ুনের মা আমাদের পরিচয় পেয়ে হুমায়ুনকে অনেক রাগ করলো এই বলে যে 'তুই গ্রামের নামী দামী লোকদের ছেলেদেরকে নিয়ে আসছিস। এদিকে তোর বন্ধু বান্ধব বেশির ভাগ রাজাকারে চলে গিয়েছে। তারা যদি জানতে পারে যে তুই এদেরকে মুক্তি বাহিনী ট্রেনিং এর জন্য ভারতে নিয়ে যাচ্ছিস তাহলে ওদেরকে বাঁচানো আমার পক্ষে সম্ভব হবেনা"
কোন রকমে কষ্ট করে রাতটা কাটালাম। হুমায়ুনের মা অনেক কষ্ট করে রান্না করে রাতে আমাদেরকে খাওয়ালেন। রাতে একটা কাসিও কেউ দিতে পারি নাই। ঘরের ভিতরে প্রসাব করেছি, হুমায়ুনের মা পাতিলের উপরে এমনভাবে গামছা বেঁধে দিয়েছিলেন যাতে কোন রকম আওয়াজ না হয় কারন পাশের ঘরেই ছিল রাজাকার। কোন রকমে রাতটা শেষ করে ফজরের আযানের সাথে সাথে আমাদেরকে উঠিয়ে সাথে কিছু চিড়া ও কাউনের নাড়ু দিয়ে হুমায়ুনকে বললেন "সুর্য্য উঠার আগেই এদেরকে নিয়ে অন্য কোন নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যা। পরে আমাকে সংবাদ জানাস" বুঝতে পারলাম এই বৃদ্ধ মহিলাও আমাদের জন্য চিন্তায় আছেন। আমরা রওনা হয়ে গেলাম প্রায় ৩০/৩৫ মিনিট হাটার পর বাসে চড়লাম। প্রায় ২ ঘন্টা বাস ভ্রমনের পর এক জায়গায় নেমে গ্রামের ভিতর দিয়ে পায়ে হাটা শুরু করলাম। হাঁটতে হাঁটতে দুপুর গড়িয়ে আসলো, গ্রামের ভিতর দিয়ে বহুলোক যাচ্ছে মনে হচ্ছে যেন লোকগুলি কোন নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে যাচ্ছে। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে ভিষন খুদাও লেগেছে এক জায়গায় দেখতে পেলাম একটা বাজারের মত মিলেছে। সেখানে গিয়ে খাওয়ার হোটেলও পেলাম। ডিম ভূনা দিয়ে ভাত খাচ্ছি এরই মধ্যে পরিচয় হলো মরহুম কোরবান আলীর ভাতিজা এনায়তুল্লাহ ওরফে খোকা ও জসলদিয়া বেলদার বাড়ীর সোহরাব নামে ২ যুবকের সাথে। খাওয়া শেষ পর্যায়ে আরো ২ যুবক বললো তাদের বাড়ী ফরিদপুর ভাঙ্গা থানায় তারা বাড়ী থেকে রওনা দিয়েছেন ভারতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পথে রাজাকাররা তাদের সহায় সম্বল সব নিয়ে গেছে। এখন তারা না পারছেন ভারতে যেতে, না পারছেন বাড়ী যেতে আমরা যেন তাদেরকে দয়া করে আমাদের সাথে ভারত পর্যন্ত নিয়ে যাই। ওদের প্রতি মায়া হলো। ওদেরকেও হোটেলে খাওয়ালাম। তারপর আমাদের সাথে নিয়ে রওনা হলাম। হাঁটতে হাঁটতে বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। খাওয়ার পর্ব তো কোন রকমে ডিম ভুনা দিয়ে সেরে নিলাম রাতে থাকবো কোথায়? সবাই বলবে ওদের ৪ জনকে বসিয়ে আমি ইউসুফ চেয়ারম্যান রাত ৮/৯ টা পর্যন্ত হাঁটতে হাঁটতে থাকি তারপর দেখা যাবে। রাত্র ৯ টার দিকে একটা মাঠের মধ্যে সবাই বসলাম। জামাল ও হুমায়ুন আমরা ৪জন চলে গেলাম রাতে থাকার ব্যবস্থা করার সন্ধানে। এক বাড়ীতে থাকার ব্যবস্থা করে ২জন এসে বাকি ৪ জনকে নিয়ে গেলাম। রাত্র প্রায় ১১ টার দিকে সেই বাড়ীর মালিক আমাদেরকে খেতে দিয়ে তিনি কোথায় যেন চলে গেলেন।
আমরা সারাদিনের ক্লান্ত নিয়ে ডিম ভাজি ও ডাল দিয়ে পরম তৃপ্তি সহকারে ভাত খাচ্ছি। এমন সময় এক মহিলার গলার আওয়াজে আমাদের খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। মহিলা নিজকে বাড়ীওয়ালার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর পরিচয় দিয়ে বললো, "আপনারা তাড়াতাড়ি খেয়ে এখান থেকে চলে যান। আপনাদেরকে খেতে দিয়ে আমার স্বামী পাক সেনাদের ক্যাম্পে গেছে আপনাগো ধরিয়ে দেওয়ার জন্য।" আমরা তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে ওখান থেকে ২/৩ গ্রাম পাড় হয়ে দুরে কোথাও চলে গেলাম। যানিনা সেদিন ঐ মহিলা সত্যিই বলেছিল? নাকি আমাদের তাড়ানোর জন্যে?
যা হউক পরে এক বাড়ীতে আশ্রয় পেলাম। বেচারী লোক খুবই ভাল আমাদের মত আরো অনেক লোককে তিনি জায়গা দিয়েছেন। তখনকার অনেক লোকের কাছে জানতে পেলাম। তিনি লোকজনকে শুধু থাকা খাওয়ার ব্যবস্থাই করেন নাই, অনকেকে টাকা পয়সা খরচ করে সীমান্তের ওপারে পৌঁছে দিয়েছেন। পরের দিন খুব ভোরে আমরা চলে যেতে চাইলাম, ভদ্রলোক আমাদেরকে একটু বেলা হলে নাস্তা খেতে বললেন তার কথামত সকাল ৮ টার দিকে নাস্তা করে আমরা আবার সীমান্তের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। হাটতে হাটতে পথিমধ্যে এক দম্পত্তির সাথে দেখা হলো বাড়ী মুন্সিগঞ্জ আমাদের সাথে তাদেরকে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করল মুন্সীগঞ্জের কথা শুনে আর না করতে পারলাম না তারা সংখ্যায় ছিল ৪জন বাবা, মা ও দুই মেয়ে ছোট মেয়টির বয়স আনুমানিক ১০/১১ বৎসর হাফপ্যান্ট ও ফ্রগ পড়া, বড়টির বয়স ২০ এর উপরে হবে সেলোয়ার কামিজ পড়া কিন্তু খুবই মোটা তার উপরে হাটতে হাটতে পা-দুটু ফুলে একেবারে গাছের মতো হয়ে গিয়েছে। একেতো যশোহরের মাটি লাল ও এঁটেলযুক্ত তার আবার ফোটা ফোটা বৃষ্টি হচ্ছিল। সেন্ডেল পা-দিয়ে হাটাই যায় না। সেন্ডেলের মধ্যে এক গাদা মাটি লেগে থাকে। বড় মেয়েটা এননিতেই ভিষন মোটা এবং খুবই ক্লান্ত, হাটতে পারছিল না, মেয়েটির মা, বাবা আমাদের খুবই অনুনয় বিনয় করে বলেছিলেন ওদেরকে যেন সাথে নিয়ে যাই। বাগদা বর্ডার পাড় হলে ওপারেই নাকি ওদের আপন চাচার বাড়ী। ওদের বাবা বৃদ্ধ ভদ্রলোক আমাদের বললেন আপনারা আমার ভাইয়ের বাড়ীতে দু’একদিন বিশ্রাম নিয়ে তারপর কোলকাতা যাবেন।
আমরা যেখান থেকে রওনা দিয়েছি বড়জোড় বেলা ১২ টা ১ টার মধ্যে আমরা বর্ডারে পৌঁছে যাওয়ার কথা, কিন্তু মেয়েটার জন্য আমরা বিকাল ৪.৩০ মিঃ এর সময় বর্ডারে পৌঁছলাম। রাস্তায় অনেক সময় মেয়েটিকে ২জনে ধরে-’ ধরে নিতে হয়েছে। যাহা হউক সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ওদের চাচার বাড়ীতে উঠলাম। চাচা মোটামোটি অবস্থাপন্নই মনে হলো বাড়ীর পরিবেশ দেখে। যাওয়ার পর আমাদেরকে ভাত খেতে দিল, ওরা সবাই খেল। আমি কখনো হিন্দু বাড়ী খাই নাই, তাই আমি খেলাম না, আমি পাশে বাজার আছে সেখানে যেয়ে খোঁজ করতে লাগলাম কোন মোসলমান হোটেল আছে কিনা! এর আগে বর্ডার থেকে টাকা বদল করে নিলাম। পাকিস্তানী ১০০ টাকার বদলে ভারতীয় ১৪০ রুপি পেলাম। হোটেল খুঁজতে খুঁজতে ২ এক জায়গায় দেখলাম জয়বাংলা হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট ভিতরে ঢুকে দেখলাম এটাও হিন্দু হোটেল আমার আর খাওয়া হলো না। এরই মধ্যে বাকিরা আমার খোঁজে সবাই চলে এসেছে। ওখানে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষি বাহিনীর অফিস আছে। কেহ বর্ডার পার হলে তাকে সেই অফিসে গিয়ে নাম এন্ট্রি করতে হয় আমরাও সবাই গেলাম নাম এন্ট্রি করার পর আমাদের ৮ জনকে ১৬ কেজি চিড়া ও ৪ কেজি গুর দেওয়া হলো। রাস্তায় ফরিদপুরের যে ২টি ছেলেকে নিয়ে এসেছি ওদের লুঙ্গি দিয়ে পোটলা বেঁধে ওদের ২ জনের মাথায় দিলাম। সেখান থেকে ২ মুঠি চিড়া ও একটু খানি গুর খেয়ে রাস্তার পার্শ্বের টিউবওয়েল থেকে পানি পান করে। কোন রকমে খুদা নিবারন করে নিলাম। সন্ধ্যার পর ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা ৮ জন বনগাঁয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলাম। বনগ্রাম থেকে ট্রেনে করে কোলকাতা যেতে হবে। গাড়ী পেলাম না। হাটতে শুরু করলাম গাড়ী বন্ধ কারন ঐ দিন ঢাকায় রওশানারা নামে একটি মেয়ে শরীরে মাইন্ড বেঁধে পাকিস্তানী সেনাদের ট্যাংকের নিচে পরে আত্মহত্যা করেছিল তার আত্মত্যাগকে সম্মান যানাতে সারা পশ্চিমবঙ্গে পালন করা হচ্ছে রওশনারা ‘দিবস’ তারই আলোকে সারা পশ্চিম বঙ্গে বন্ধ অর্থাৎ ধর্মঘট পালিত হচ্ছে। হাটতে হাটতে রাত্র ১০ টার দিকে পাড়াপোতা নামক জায়গায় পৌঁছলাম, এতোই ক্লান্ত হয়ে পরেছি যে, শরীরে হাটার আর কোন শক্তি নাই। সীমান্ত অতিক্রম করে যারা ভারতে আসেন তাদেরকে বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা করার জন্য ওখানে কিছু স্বেচ্ছাসেবী দল আছে। ঐ রকম একটা দলের সাথে আমাদের পরিচয় হলো। তারা আমাদেরকে রাত্রে থাকার ব্যবস্থা করবেন এই কথা বলে তাদের ক্লাবে নিয়ে গেলেন। প্রায় ২ ঘন্টা বসে থাকার পর অবশেষে থাকার ব্যবস্থা হলো পাশের একটি গালর্স স্কুলে। রাতে চেষ্টা করেও স্বেচ্ছাসেবী দলটি আমাদের জন্য কোন খাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারলেন না। সাথে চিড়াগুর ছিল তা খেয়েই স্কুলের বেঞ্চের মধ্যে শুয়ে পরলাম। সকাল ৭ টায় স্কুলের দাড়োয়ান এসে আমাদের ডেকে তুললেন। সামনে টিউবওয়েল থেকে হাতমুখ ধুয়ে বাথরুম সেরে সাথের চিড়াগুর দিয়ে সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। তারপর ৯ টার দিকে আবার বনগ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। ঐ একই অবস্থা গাড়ী নাই। গতকাল বন্ধের কারনে বনগ্রাম থেকে সব গাড়ী আসে খালী। মাঝখানে কোথাও থামে না সরাসরি চলে যায় বাগদা বর্ডারে আমরা আছি বাগদা ও বনগাঁয়ের মাঝামাঝি স্থানে। শত কষ্টের মধ্যেও হাটতে হাটতে বিকাল ৩ ঘটিকায় বনগাঁ রেল ষ্টেশনে পৌঁছে গেলাম।
বনগাঁ থেকে কোলকাতাগামী ট্রেনে চেপে বসলাম। ওখানে ফরিদপুরের রাজ বাড়ী ও শরিয়তপুরের আরো ৪ জনের সাথে পরিচয় হলো তাদেরকেও সাথে নিয়ে নিলাম। ট্রেন ছেড়ে দিল, কিছুদুর যাওয়ার পর টি, টি আসলো টিকেট চাইলো বললাম আমরা জয় বাংলার লোক ২/১ দিন পূর্বেই আমরা এসেছি। টিটি বাবু বললেন আজকে আপনারা নতুন এজন্য ছেড়ে দিলাম। পরবর্তীতে যার যার এলাকার এম,পির পরিচয়পত্র সাথে রাখবেন, তা না হলে কিন্তু জরিমানা শাস্তি দুটোই ভোগ করতে হবে। যথা সময়ে শিয়ালদহ ষ্টেশনে পৌঁছে গেলাম ওখান থেকে ট্টেনে চড়ে কোলকাতার প্রিন্সেপ ষ্টিটে পৌঁছলাম ঐ সময় প্রবাসী সরকারের খাদ্য ও ত্রান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের উপর। তার অফিস ছিল প্রিন্সিপস্ট্রীট। তার অফিসে গিয়ে দেখা হলো তারই পি.এস সুলতান ভাইয়ের সাথে। সুলতান ভাইয়ের বাড়ী আমাদের বিক্রমপুরেই কোন এক জায়গায়। ৭০ সালে নির্বাচনের সময় তার সাথে পরিচয় হয়। তার কাছে জানতে পেলাম মোয়াজ্জেম সাহেব দিল্লিতে আছেন। আগামীকাল সকাল ১০/১১ দিকে আসবেন।
সুলতান ভাই আমাদেরকে অফিসে থাকার ব্যবস্থা করলেন এবং কিছু টাকা দিয়ে বললেন তোরা হোটেল থেকে খাওয়া দাওয়া সেরে আয় তারপর তোদের সাথে আলাপ করবো। সুলতান ভাইয়ের দেওয়া টাকা ছিল হুমায়ুনের কাছে অনেক বাঙালী হোটেল থাকার পরও আমাদেরকে নিয়ে গেল একটি মারওয়ারী হোটেলে গরুর মাংস ভূনা দিয়ে সবাই তৃপ্তি সহকারে খেলাম হুমায়ুন সবাইকে বলল তোরা সবাই চলে যা, আমি বিল দিয়ে আসবো, ওর কথামত আমরা সবাই হোটেল থেকে বের হয়ে আসলাম।
কিছুক্ষন পর হুমায়ুন এসে আমাদের জানালো সে কোন বিল না দিয়েই চলে এসেছে। 😲জিজ্ঞাসা করাতে সে জানালো মারওয়ারী বলে বিল দেয় নাই।😊 যাহা হউক সবাই মিলে মোয়াজ্জেম সাহেবের অফিসে চলে গেলাম সুলতান ভাই আমাদেরকে কম্বলের গাইট দেখিয়ে বলল "এখান থেকে যা লাগে ব্যবহার করিস সকালে আবার সবগুলি একসাথে রেখে দিস।" তার কথা মত প্রত্যেকে দুটু করে বিছালাম, একটিকে ভাজ করে বালিশ বানিয়ে সিতান দিলাম। একেতো ক্লান্ত শরীর তার উপরে নরম বিছানা পেয়ে ঘুমটা ভালই হলো।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই খবর পেলাম শাহ মোয়াজ্জেম সাহেব চলে এসেছেন সুলতান ভাইয়ের কাছে তিনি আমাদের আগমনের খবর আগেই পেয়েছেন। আমাদেরকে অফিসে ডাকলেন যদিও আমাদের সাথে তার তেমন পরিচয় নাই নির্বাচনের সময় তার সাথে অনেক বারই দেখা হয়েছে। চেয়ারম্যান ইউসুফ পরিচয় দেওয়াতে সহজেই তাকে চিনল এবং একে একে সবার পরিচয় জেনে নিল। দেশের খবরাখবর জানতে চাইলো কথার এক ফাকে তিনি বললেন যে আমার বাড়ী নাকি পাকসেনারা জ্বালিয়ে দিল তোরা কিছুই করতে পারলি না? আমাদের বললার ট্রেনিং নাই অস্ত্র নাই আমরা কি করতে পারি? এখন ট্রেনিং নিতে এসেছি আমাদেরকে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করে দিন।
মোয়াজ্জেম সাহেব বললেন ট্রেনিং নিতে তোমাদের প্রথমে যেতে হবে হুগলি জেলার কল্যানী ক্যাম্পে সেখান থেকে কিছুদিন পর বিরভুম জেলার চাকুলিয়ায় চুড়ান্ত ট্রেনিংয়ে যেতে হবে। ওখানে হেলিকপ্টারের মত এক একটা মশা সে মশার কামর সহ্য করতে পারবে তো! আমরা জানালাম ইনশাআল্লাহ পারবো। এতোসব কথাবার্তার পর আমাদের জন্য সকালের নাস্তার ব্যবস্থা করতে বললেন অফিসে বসেই সকালের নাস্তার পর্ব সেরে নিলাম। তারপর তার নিজের প্যাডে আমাদের ৬ জনের জন্য পরিচয়পত্র লিখার জন্য সুলতান ভাইকে আদেশ দিলেন। বাকি ২ জনের জন্যও আলাদা ব্যবস্থা করে দিলেন। আমাদেরকে কিছু টাকা দিযে বললেন সব সময় সরকারী যান বাহনে চড়ার চেষ্টা করবে আর কোথাও কোন সমস্যা হলে এই পরিচয়পত্র দেখাবে। তখন কল্যানী ক্যাম্পের ইনচার্জ ছিলেন শরিয়তপুর থানার এম, এল, এ মোল্লা জালাল উদ্দিন (বর্তমানে প্রয়াত) সহকারী ইনচার্জ ছিল কে, এম, ওবায়দুর রহমান (প্রয়াত) মোল্লা জালাল উদ্দিন সাহেব সব সময় ক্যাম্পে থাকেন না। কে, এম ওবায়দুর রহমান সব সময় ক্যাম্পে থাকেন। এই জন্য মোয়াজ্জেম সাহেব ওবায়দুর রহমান সাহেবের উদ্দেশ্যে একখানা চিঠিও লিখে দিলেন যাতে আমাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। মোয়াজ্জেম সাহেবকে সালাম জানিয়ে আনুমানিক বেলা ১২ টার সময় আমরা প্রিন্সিপ স্ট্রীট থেকে রওনা হলাম। দুইবার ট্রাম বদল করে আমরা শিয়ালদহ পৌঁছে হুগলি এক্সপ্রেস ট্রেনে চেপে বসলাম। প্রায় ৫ ঘন্টা ট্রেন জার্নির পর কল্যানী পৌঁছলাম তখন বিকাল প্রায় সাড়ে ছয়টা সন্ধ্যা হয়-২য় অবস্থার উপর আবার ফোটা ফোটা বৃষ্টি পরছে। কল্যানী ষ্টেশন থেকে ক্যাম্পের দূরত্ব প্রায় ৮/১০ মাইলের মত হবে। যদিও সুলতান ভাই আমাদেরকে বার বার বলে দিয়েছিলেন সরকারী যানবাহনে চড়ার জন্য। কিন্তু কল্যানী ষ্টেশন থেকে ক্যাম্পে যাওয়ার জন্য আমরা পাবলিক বাসে চেপে বসেছি। পাবলিক বাসে অবশ্য ভাড়া মওকুফের সুযোগ নাই। কিন্তু বাসের কন্ট্রাকটরের বাড়ী নাকি এক সময় আমাদের বাংলাদেশে ছিল সে সুবাদে আমাদের কাছ থেকে ভাড়া নিলেননা। সন্ধ্যার কিছুপরে আমরা ক্যাম্পে পৌছলাম। ক্যাম্পের অফিসে গিয়ে ওবায়দুর রহমানের কাছে মোয়াজ্জেম সাহেবের দেওয়া চিঠিখানা দিলাম। উনি আমাদেরকে আজকের রাত অফিসের বারান্দায় থাকার নির্দেশ দিলেন এবং বললেন কাল দিনের বেলা তোমাদের তাবুর ব্যবস্থা করা হবে কারন আগেই বলেছি যে, ফোটা ফোটা বৃষ্টি পরতেছেলি। পাঁচ/ছয় ঘন্টার জার্নিতে রাস্তায় আর কিছুই খাওয়া হয় নাই; ক্ষুদার্ত এবং সবচেয়ে বেশী ক্লান্ত মনে হচ্ছে যেন বিছানা পত্রের দরকার নেই কোন রকমে একটু জায়গা পেলেই যেন ঘুমিয়ে পরব। রাত্র প্রায় ১১ টার দিকে ক্যাম্পে ঘন্টা বাজলো। জানতে পেলাম খাওয়ার ঘন্টা অফিসে নাম এন্ট্রি করার সময় প্রত্যেককে একটি প্লেট ও একটি মগ দেওয়া হয়েছিল তা নিয়ে সবার সাথে লাইনে দাঁড়ালাম এক প্লেট খিঁচুড়ি ছিল ওর মধ্যে চালও ডালের সম্পর্ক খুঁজে পেলাম না। টিউবওয়েল থেকে একমগ তাজা পানি নিয়ে থাকার জায়গায় চলে আসলাম।
প্রথম দিন, তাহা ছাড়া পকেটে টাকা আছে বিধায় ঐ খিঁচুড়ি পছন্দ হলো না তাই ক্যাম্পের গেইটের সাথে দোকান থেকে পাউরুটি কলা এনে চালিয়ে দিলাম। সবার দুটু করে লুঙ্গি ছিল একটা বিছালাম আর পরনেরটা কোমড় থেকে খুলে গায়ে জড়ালাম। বালিশের কাজ ব্যাগ দিয়ে চালিয়ে নিলাম। এমন ঘুম হলো যে সকালে জেগে দেখি রাতে কতলোক যে আমাদের উপড় দিয়ে পা-ফেলে গিয়েছে, শরীরের মধ্যে কাদামাটির ছাপ গায়ে গেলে আছে। এনায়েত ও সোহরাব তখনও ঘুমাচ্ছে। কিন্তু জামাল ও হুমায়ুনকে দেখছি না ভাবলাম ওরা হয়তো আমাদের আগে উঠে বাহিরে টিউবওয়েলে হাত মুখ ধোয়ার জন্য গিয়েছে। আমিও মিতা ইউসুফ টিউবওয়েলের পাশে গিয়ে ওদের দুজনকে পেলাম না। হঠাৎ মুখ ধোয়ার সময় দেখি আমার হাতের আংটিখানা নেই। এখানে একটু বলে রাখি বাড়ী হতে আসার সময় মিতা ইউসুফ ২টা আংটি যথাক্রমে ৫ আনা ও ৩ আনা। রাস্তায় রাজাকার রেখে দিবে এই ভয়ে ৩ আনার আংটিখানা আমার হাতে পড়িয়ে দিয়েছিল। আংটিখানা আমার পাঁচ নং আঙ্গুলে এতো টাইট ছিল যে কোথাও পরে যাওয়ার কোন সম্ভবনা নাই। রাতে যখন ঘুমিযে ছিলাম তখন হয়তো ঘুমের ঘোরে খুলে নিয়েছে। সেই আংটিখানা নিয়ে জামাল ও হুমায়ুন নিখোঁজ। পরে যখন দেশে এসেছিলাম তখন তার সত্যতা পেয়েছিলাম। পরের দিন আমাদের জন্য আলাদা তাবুর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। জামাল ও হুমায়ুন চলে যাওয়াতে আমরা মুন্সিগঞ্জ সাব ডিবিশনের (বর্তমানে জেলা) মাত্র ৪ জন রইলাম। একটা তাবুর ভিতর ৮ জন থাকা যায়। বাকি ৪ জন ফরিদপুরের ভাঙ্গা থানার। তার মধ্যে একজনের নাম ছিল মোকশেদ, আমাদের থেকে সিনিয়র ছিল। আমরা তখন মাত্র নবম শ্রেনীতে পড়তাম আর মোরশেদ তখন ছিল ইন্টারমিডিয়েট পাশ। আমার তার সাথে তুই তামি ব্যবহারই করতাম। স্বাধীনতার পর অবশ্য লৌহজং থানার সেকেন্ড অফিসার হিসাবে মোকশেদ জয়েন্ট করেছিল। আমার সাথে এখানে এসে ওর নতুন করে পরিচয়ও হয়েছিল। আমাদের বাড়ী-২/১ একবার এসেছিল। আমরা কল্যানী ক্যাম্পে থাকাকালীন প্রায় ১৫ দিনের মধ্যে ঢাকা বা মুন্সিগঞ্জ এলাকার কোন লোকজন ওখানে ছিল না। এর পর কিছু কিছু লোক আসা শুরু করলো। মৌছামান্দ্রার ছোট কামাল, মাওয়ার ফজল, মহি ও জসলদিয়ার মজনু সহ বেশ কয়েকজন সবার নাম এই মুহুর্তে মনে নাই। মুন্সিগঞ্জ হরেগঙ্গা কলেজের ছাত্রদের ১০/১২ জনের একটা দল যাদের নেতৃত্বে ছিলেন পিয়ারু নামে এক বড় ভাই। আগেই বলেছি আমরা তখন নবম শ্রেণীর ছাত্র ছিলাম আর হরেগঙ্গা কলেজের ছাত্রদের দলটা ছিল ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র। ওরা আসার পর আমাদের সাহস অনেকগুন বেড়ে গেল। তখন কল্যানী ক্যাম্পে প্রায় ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজারের মত ছেলে ছিল পুরা ক্যাম্পে নেতৃত্ব ছিল আমাদের হাতে অর্থাৎ মুন্সিগঞ্জের দলটার হাতে ওরা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ক্যাম্প কর্তৃপক্ষের নিকট প্রতিবাদ শুরু করল বিশেষ করে থাকা খাওয়া আমাদেরকে সপ্তাহে দুইদিন মাছ, দুইদিন ডিম, দুইদিন মাংস ও একদিন শুধু ডাল ভাত দিত। ভাতগুলো ছিল সাদা এক ধরনের পাথরে ভরা, ভাতের সাথে মিশে থাকতো খুঁজলেও সহজে পাওয়া যেতনা। যে পরিমান ভাত দিত মনে হত যেন ভাতের চেয়ে পাথরের পরিমানই বেশী। সপ্তাহে দুইদিন যে মাংস দিত কেউ বলতো দুম্বা, কেউ বলতো ভেড়া, আবার কেউ বলতো শুকর। একথা শুনার পর থেকে আমরা প্রতিবাদ করা শুরু করলাম, এবং বললাম যার মাংসই দেওয়া হউক না কেন, ক্যাম্পে এনে আমাদের সামনে জবাই করতে হবে। আর আমাদের ঢাকার লোকদের জন্য আলাদা উন্নতমানের তাবুর ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা কোন সেন্ট্রির ডিউটি দিতে পারবো না ইত্যাদি।
এই সব ব্যাপার নিয়ে ওবায়দুর রহমানের সাথে মুন্সিগঞ্জের দলটার সাথে কথা কাটাকাটি হলো। একদিন ওদের দল থেকে তিন জনকে গেইটে সেন্টির ডিউটি দিতে বলা হলো। কিন্তু ওরা ডিউটি না দিয়ে ক্যাম্পে বসে তাস খেলছিল। এই অবস্থায় ওদেরকে অফিসে ডেকে নিয়ে ওবায়েদুর রহমান নিজে গালি গালাজ করেছেন। এমনকি চড় থাপ্পরও মেরেছেন। সেদিন থেকে আমাদের তাবু থেকে ফরিদপুরের লোকজন বের করে দিলাম। রাতে সবাই মিলে মিটিং করলাম মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হলো সকাল বেলা ওবায়েদুর রহমান যখন ক্যাম্পে আসবেন একযোগে আমরা তার উপর হামলা করবো এই অভিযানে নেতৃত্ব দিবেন পিয়ারু ভাই। আমাদের ২টি তাবুই ছিল গেইটের ২ পার্শ্বে মাঝখান দিয়ে রাস্তা পূর্ব পরিকল্পনা মত আমরা খুব ভোরেই ঘুম থেকে উঠেছি অন্য সব লোক এখনো উঠে নাই। কে, এম ওবায়েদুর রহমান প্রতিদিনকার মত রিকসা নিয়ে ক্যাম্পের গেইটের সামনে এসে নামলেন তার পরনে ছিল কোলকাতার নামকরা অরবিন্দ্র আর্দি কাপড়ের পায়জামা পাঞ্জবী কিছু বুঝার আগেই পিয়ারু ভাই তার উপরও ঝাঁপিয়ে পরে নিজের পায়ের সেন্ডেল দিয়ে ওবায়েদুর রহামনকে এলো পাথারী মারতে লাগলেন। তার গায়ের পাঞ্জাবী ছিড়ে ফাতা ফাতা হয়ে গেল। কিছুক্ষনের মধ্যেই পরিস্থিতি অন্য রকম হয়ে গেল। ফরিদপুরের লোকজন আমাদের উপর পাল্টা আক্রমন করতে শুরু করলো। অবস্থা বেগতিক দেখে আমরা নিজেদের প্রয়োজনীয় কাপড় চোপড় নিয়ে ক্যাম্প ছেড়ে পালাতে লাগলাম। ওরাও আমাদেরকে পিছন পিছন