19/07/2017
search...
Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.
Full premium theme for CMS Email Print
বাংলাদেশের কাব্যনাটক : বিষয়-বৈচিত্র্য ও প্রকরণশৈলী [তৃতীয় ও শেষ কিস্তি]
লেখক- অনুপম হাসান.
Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..
বাংলাদেশের সাহিত্য : কাব্যনাট্য-ধারার উন্মেষ-পর্ব (১৯৪৭-’৭১)
ক.
বাংলা সাহিত্যে মূলত ষাটের দশকে আধুনিক কাব্যনাটকের বিকাশ ঘটে; এ সময় পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যিকগণ ‘কাব্যনাট্য চর্চা’কে একটি আন্দোলন হিসেবে গ্রহণ করেছিল। দুঃখজনক হলেও সত্য বাংলা কাব্যনাট্য চর্চার এই আন্দোলনে পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যিকগণ যতখানি সাফল্য অর্জন করেছিলেন তা বাংলাদেশের সাহিত্যিকগণের ক্ষেত্রে ঘটে নি। বাংলাদেশের সাহিত্যিকগণের মনেও পশ্চিমবঙ্গের ‘কাব্যনাট্য চর্চা’ আন্দোলনের ঢেউ লেগেছিল। তাঁরাও সাহিত্যের এই অভিনব আঙ্গিক-কৌশল আয়ত্ত করতে সচেষ্ট হয়েছেন। এঁদের মধ্যে শাহাদাৎ হোসেন (১৮৯৩-১৯৫৩), গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭-১৯৬৪), জসীম উদদীন (১৯০৩-’৭৬), বন্দে আলী মিয়া (১৯০৮-’৭৯), নূরুল মোমেন (১৯০৮-’৮৯), আ.ন.ম. বজলুর রশীদ (১৯১১-’৮৬), ফররুখ আহমদ (১৯১৮-’৭৪), শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬) এবং আলাউদ্দিন আল আজাদ (জ.১৯৩২)-এর নাম উল্লেখযোগ্য।
খ.
বাংলা নাট্যসাহিত্যে নূরুল মোমেন (১৯০৮-’৮৯) বিশিষ্ট চিন্তাধারা ও আঙ্গিকগত বৈশিষ্ট্যে অনন্য। তিনি বাংলা নাট্যসাহিত্যের সংলাপে চরিত্রের সংঘাত সৃষ্টিতে অনন্য পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। নূরুল মোমেন নাটক ছাড়াও প্রবন্ধ ও রস-রচনায় যথেষ্ট পারদর্শী ছিলেন। তবে নাট্যকার হিসেবেই তিনি অধিকতর খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৪৪ সালে ‘আনন্দ বাজার’ পত্রিকায় তাঁর রচিত রূপান্তর নাটিকা প্রকাশের মাধ্যমে তিনি বাংলা নাট্যজগতে প্রবেশ করেন। নেমেসিস (১৯৪৮) রচনার মধ্যদিয়ে তিনি বাংলা নাট্যসাহিত্যে অভিনব আঙ্গিকের ব্যবহার করে খ্যাতি ও প্রশংসা লাভ করেন। নূরুল মোমেন নেমেসিস ছাড়াও যদি এমন হোত (১৯৬০), নয়া খান্দান (১৯৬২), আলোছায়া (১৯৬২), আইনের অন্তরালে (১৯৬৭), শতকরা আশি (১৯৬৯), যেমন ইচ্ছা তেমন (১৯৭০), হিংটিং ছট (১৯৭১) প্রভৃতি নাটক রচনা করে বাংলা নাট্যসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। নূরুল মোমেন নাটকে আধুনিক সমাজের নানামুখি সমস্যা উপস্থাপনে সচেষ্ট হয়েছেন। তিনি নাট্যরচনায় মূলত উদ্দেশ্যবাদী। তিনি পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রিক সমস্যাকে নাটকের বিষয়-উপাদান হিসেবে গ্রহণ করেছেন। নাট্য-রচনার মাধ্যমে তিনি এসব সমস্যা-সংকট থেকে উত্তরণে প্রয়াস চালিয়েছেন।
নূরুল মোমেনের প্রায় সব নাটকই উদ্দেশ্যমূলক। এই প্রতিভাধর নাট্যকার পরিশীলিত ও মার্জিত রুচিসম্পন্ন। তাঁর রচিত প্রায় সব নাটকে আদর্শবাদী ব্যক্তিত্বের স্পষ্ট ছাপ পাওয়া যায়। তাঁর নাটকের মূল বিষয় সামাজিক জীবন এবং সেই যাপিত জীবনের সমস্যা, সংকট, সংঘাত। এধরনের সামাজিক সমস্যা নাটকে উপস্থাপন করতে গিয়ে তাঁর আদর্শবাদী ব্যক্তিত্বের স্বাভাবিকভাবেই সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে, ফলে অনেক সময়ই তাঁর নাটকের বক্তব্যবিষয় কৃত্রিম হয়ে পড়েছে; কিংবা কখনো কখনো তা অশৈল্পিকও মনে হতে পারে।
শিল্প বিচারের মানদণ্ডে নূরুল মোমেনের নাটকের ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে, এ কথা সত্য। তবে তাঁর নেমেসিস নিঃসন্দেহে বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে অভিনব সংযোজন। কেননা নূরুল মোমেনের পূর্বে বাংলা নাট্যসাহিত্যে একক চরিত্রের নাটক রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কেউ-ই রচনা করেন নি। এছাড়া বিশ্বসাহিত্যে আরো চারজন বিখ্যাত নাট্যকার একক চরিত্রের নাটক লিখেছেন। এগুলো হচ্ছে ক্রিস্টোফার মার্লো (১৫৬৪-’৯৩)-এর দ্যা ট্র্যাজিক্যাল হিস্টরি অফ ডক্টর ফস্টাস (১৬০৪), অগাস্ট স্ট্রীণ্ডবার্গের (১৮৪৯-১৯১২) দ্যা স্ট্রংগার (১৮৮৯), ইউজিন ও’নীল (১৮৮৮-১৯৫৩)-এর বাউণ্ড ইস্ট ফর কারডিফ (১৯১৮), জ্যা কক্তু (১৮৮৯-১৯৬৩)-এর দ্যা হিউম্যান ভয়েস (১৯৬০)। তবে একক চরিত্রবিশিষ্ট এ নাটকগুলো সংক্ষিপ্ত; কোনোটিই পূর্ণাঙ্গ হয়ে ওঠে নি। এই অর্থে নূরুল মোমেন-ই প্রথম একক চরিত্রের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ নাট্য রচনায় প্রয়াসী হয়েছেন। নেমেসিস সম্পর্কে নাট্যকারের নিজের বক্তব্য হচ্ছে-
এই নাটকটিতে গ্রীক ট্রাজেডির চিরাচরিত সময়, স্থান ও ক্রিয়া- এই ঐক্যত্রয়ের আঙ্গিক ঠিক রেখে চতুর্থ ঐক্য অর্থাৎ চারিত্রের একত্ব (unity of person) সংযোগ করে একটা পরীক্ষা করা হয়েছে। এবং এই এক অংকের নাটকটিতে এক-চরিত্র সর্বস্ব করা সত্ত্বেও ক্লাসিক্যাল নাটকের পাঁচ অংকের ক্রমপরিণতির ছকে ফেলে লেখার আঙ্গিক এটাতে হয়তো কঠিন হবে না।
নাট্যকার নূরুল মোমেন নাটক রচনায় সবসময়ই নিরীক্ষাধর্মী। নিঃসন্দেহে নেমেসিস-ও তাঁর সেই নিরীক্ষা প্রবণতার ধারাবাহিকতার ফসল। তাছাড়া আরো একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হয় যে, নূরুল মোমেন উদ্দেশ্যমূলক নাটক রচনা করেন। এই নিরিখে নেমেসিস নাটকেও নূরুল মোমেনের সুনির্দিষ্ট একটি লক্ষ্য নির্ধারিত ছিল; যার ফলশ্রুতিতে নেমেসিস দেবী সুরজিত নন্দীর অসততার ওপর প্রতিশোধ গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে সুরজিত নন্দী সাধারণ মানুষের জীবনে যে দুঃখ-দুর্দশা বয়ে এনেছে- তার প্রতিশোধ হিসেবে নায়ক সুরজিত নন্দীকে আত্মাহুতি দিতে হয়েছে। স্পষ্টতই নাট্যকার তাঁর নায়ককে দিয়ে নীতি-বিগর্হিত কর্মের শাস্তি প্রতিবিধান করেছেন।
নূরুল মোমেনের নেমেসিস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত। নাট্যকাহিনী মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়কালে চোরাকারবারীদের নিয়ে গড়ে উঠেছে। এখানে চিত্রিত হয়েছে- এক সময়ের দরিদ্র সুরজিত নন্দী যুদ্ধকালীন সময়ে কালোবাজারী (অবৈধভাবে অর্থোপার্জন) করে অল্প-সময়ের মধ্যে কীভাবে হাজার হাজার টাকার মালিক হয়েছে; দরিদ্র সুরজিত নন্দী যা কোনোদিন কল্পনাও করে নি। দরিদ্র স্কুল মাস্টার সুরজিত নন্দী বিত্তবান হওয়ার চুক্তি করে হবু শ্বশুর নৃপেন বোসের কাছে, শুধুমাত্র প্রিয়তমা সুলতাকে পাওয়ার জন্য। স্বার্থবুদ্ধি সম্পন্ন নৃপেন বোসের শর্ত ছিল- তাকে (সুরজিত নন্দীকে) যুদ্ধের সময় কালোবাজারীর মাধ্যমে অঢেল টাকা-পয়সা রোজগার করতে হবে। এই শর্তের অধীনে সুলতা এবং সুরজিতের গোপনে বিয়ে হয়। তবে এই শর্তে নৃপেন বোস অমানবিক যে বিষয়টি যোগ করে তা হলো- সুরজিত যদি শর্তানুযায়ী অর্থ রোজগারে ব্যর্থ হয়, সেক্ষেত্রে এই বিয়েরও কোনো মূল্য নেই। নৃপেন বোস এক চিঠিতে মেয়ে-জামাইকে লিখেছে-
সুলতার সঙ্গে তোমার গোপনে বিবাহ দিয়েছি বিশেষ কোনরূপ অনুষ্ঠান না করেই। কারণ যদি তুমি তিন মাসের মধ্যে লক্ষ টাকা না করতে পারে তবে তোমার এ-বিবাহ অস্বীকৃত হবে। আমাদের সমাজে এরূপ ব্যাপার চালু। এবং সুলতাতে যখন আমারই রক্ত বইছে তখন তারও অমত হবে না জেনো। অল্পদিন সংসার করেছ বলে মনে করো না তার মনের উপর তুমি অধিকার বিস্তার করেছ। তোমার মত তাকে দিয়েও প্রতিজ্ঞা করিয়েছি, তিন মাস তোমার সঙ্গে তার সংশ্রব না রাখতে। ঝুনরমল ও অসীমের সাহায্য পেলে এই সময়ের মধ্যে পাঁচ লক্ষ টাকা করা কোন অসম্ভব প্রস্তাব নয়। বিবেকটাকে সাপের খোলসের মত ত্যাগ করে নতুন হয়ে বেরিয়ে এসো। সময়ে আবার খোলস পড়বে। এ বর্ণচোরা দেশে মহারথীদের সামিল হওয়ার ঐ একই পন্থা।
ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া অর্থাৎ প্রিয়তমা সুলতাকে পাওয়ার জন্যই মূলত দরিদ্র মাস্টার সুরজিত নন্দী দেশজাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতায় লিপ্ত হয়। অবৈধপথে অর্থোপার্জনের জন্য সুরজিতকে সহায়তা করে তারই সহপাঠী অসীম। সুলতাকে পাওয়ার প্রবল ইচ্ছায় সুরজিত এগিয়ে গেছে- নৃপেন-অসীমের দেখানো অন্ধকার পথে গমন অনেকটা যান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হয়েছে। দ্রুতগতির কোনো অশ্বের খুড়ের সাথে সুরজিত তার ভাগ্যের রথ জুড়ে দিয়ে ছুটে চলেছে- নৃপেন বোসের শর্তপূরণের জন্য নির্ধারিত টাকার অংকের আর মাত্র এক লক্ষ টাকা বাকি আছে সুরজিতের। এমতবস্থায় সুরজিতের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়-
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বাংলাদেশ আজ নিরন্ন! বিশ্বের দোষ দেব না। আমাদের নালিশ আজ বাংলাদেশের লোকের বিরুদ্ধে, যারা দেশবাসীর উদ্যত-হাঁ’র সুমুখ থেকে অন্ন সরিয়ে নিচ্ছে চারগুণ লাভের আশায়। অনাহার ও ক্ষুধা দেশটাকে পিষ্ট করছে। মা’র স্তনে দুগ্ধ নাই। চুষে চুষে দুধ না পেয়ে সন্তানগুলি কুকুরছানার মত কেঁই কেঁই করছে মার বুকে। সরীসৃপের মত, কেন্নোর মত, শহরের রাস্তা ঘাটে কিলবিল করছে নরনারী, খাদ্যের অন্বেষণে। অসূর্য্যস্পশ্যা যুবতী দেহ বিকিয়ে দিচ্ছে অবহেলায়, একমুঠো অন্নের জন্যে।
দেশ-জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে করতে সুরজিতের মনে ভয়ানক ক্লান্তি নেমেছে; সে বিবেকের দংশনে পর্যুদস্তু। সমাজে ভদ্রতার মুখোশ পড়ে কালোবাজারী করে অর্থ রোজগারে তার ঘৃণা জন্মেছে- এই ঘৃণা তার জীবনকে বিপন্ন করে তুলেছে। অথচ অর্থপিশাচ নৃপেন বোস অর্থোপার্জনের এই পদ্ধতিকে ‘যুগধর্ম’ হিসেবে আখ্যায়িত করে চূড়ান্তভাবে নীচতার পরিচয় দেয়। বিশেষত সে সুরজিতকে প্রতিনিয়তই প্ররোচিত করতে থাকে। সুলতাকে পাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে সত্ত্বেও এই অমানবিক তথা অনৈতিক কাজে সুরজিতের মন আর সায় দেয় না। সে কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনায় ভুগতে শুরু করে; এই অনুশোচনা থেকেই সুরজিত নন্দী তার মৃত্যুর পর অবৈধভাবে উপার্জিত তার সকল সম্পত্তির মালিক দরিদ্র মানুষ হতে পারে এই লক্ষ্যে সে উইল করে-
আমি শ্রীসুরজিত নন্দী, পিতা ইন্দ্রজিত নন্দী, বাড়ী ১০১০ বালিগঞ্জ প্লেস, কলিকাতা, এই মর্মে উইল করিতেছি যে আমার মৃত্যুর পর আমার স্থাবর অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি ও ব্যাঙ্কের যাবতীয় টাকা দরিদ্র সেবায় ব্যয় করিবার নিমিত্ত নিম্নোক্ত ব্যক্তিগণ লইয়া একটি ট্রাস্ট গঠন করিয়া তাঁহাদের হস্তে এতদ্বারা সমুদয় ন্যস্ত করিলাম। আমার মৃত্যু-অন্তে তাঁহারা ইচ্ছামত উহার সদ্ব্যয় করিতে পারিবেন। আমি সুস্থ শরীরে সজ্ঞানে এবং দুইজন সাক্ষীর সম্মুখে ইহা সহি করিলাম।
অর্থাৎ দরিদ্র স্কুল মাস্টার নিজের বিবেকের কাছে পরাজিত হয়েই এই উইল করেছে। সুরজিত মৃত্যুর ঠিক আগ-মুহূর্তে উইলে স্বাক্ষর করে যায়- যাতে করে তার উত্তরসূরী এই অভিশাপের অর্থ ভোগ না করে। আর আত্মদহনে বিপর্যস্ত সুরজিত নন্দী নিজের সন্তানকে অভিশাপগ্রস্ত অর্থের রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত করতে পেরেছে- এই শেষ ভরসায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। তবে তার এই পরাজয়ে প্রকৃতপক্ষে মানবতার জয় ঘোষিত হয়েছে। যে গরীবদেরকে বঞ্চিত করে সুরজিত অর্থ সঞ্চয় করেছিল; বিবেকের দংশনে সুরজিত নন্দী শেষ-পর্যন্ত সেই সম্পত্তি তাদের কল্যাণে খরচের জন্য উইল করে পুনর্জন্ম লাভ করেছে। এরপরই নাট্যঘটনায় নতুন টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়, সুরজিতকে টেলিফোনে মৃত্যুর হুমকি দেওয়ার মাধ্যমে। কিন্তু বিবেকের দংশনাহত টেলিফোনে মৃত্যুর হুমকি পাওয়া সত্ত্বেও সুরজিত তার সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটে নি। বরং নৃপেন বোসের লোকজনের কাছে থেকে টেলিফোনে মৃত্যুর হুমকি পাওয়ার পর সুরজিতের বিবেক তাকে বলে-
মানুষের উপর রকমারি অত্যাচার করেছো। মৃত্যুদূতের দু’হাত কাজে ভরে দিয়েছো। তাকে সব্যসাচী করে তুলেছো- তুমি! অন্ন থেকে বঞ্চিত করে, মরার পথে মানুষকে শুধু বসিয়ে দাও নাই, ঔষধ থেকে বঞ্চিত করে বেঁচে ওঠার লড়াইয়ের হাতিয়ার সরিয়ে নিয়েছো- এই তুমি! ঘৃণিত উপায়ে সরিয়ে নিয়েছ লঙ্গরখানা থেকে চাল! তোমার দেয়া ভুঁয়ো ঔষধের উপর নির্ভর করে কত বিধবার একমাত্র পুত্র সামান্য অসুখ নিয়ে মারা গেছে। শতাব্দি থেকে যে প্রতিনিধিত্ব রক্তে রক্তে অব্যাহত হয়ে আসছিল, তার ঘটিয়েছ পূর্ণচ্ছেদ। চালের বস্তা ছেঁড়া জুতো দিয়ে, আটার বস্তা রাবিশ দিয়ে ভারী করেছো। নুনে মিশিয়েছো বালু। তেলে নানা জিনিষের কলতানি- মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছো। মানুষের রক্তে তিন পুরুষ পর্যন্ত বিষিয়ে মরার সামগ্রী মিশিয়ে দিয়েছো! আরও শুনবে?
অতএব যুদ্ধের বাজারে কীভাবে সুরজিত নন্দী লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করেছে তা উপরের বক্তব্যে স্পষ্ট বোঝা যায়। যে এরকম অবৈধভাবে অর্থ আয় করেছে, তাকে একদিন অবৈধ উপায়েই পৃথিবী ছেড়ে যেতে হবে- এটাই যেন স্বাভাবিক নিয়ম। এজন্যই নিজের অজান্তেই সুরজিতের বিবেক তাকে শোনায়- ‘তোমার উপায় নেই। প্রতিহিংসা নেবে যে দেবী, সেই নেমেসিস তার হিসাব খতাচ্ছে।’
অবৈধভাবে অর্থোপার্জন করে সুরজিত নন্দীর আত্মদহন ঘটে এবং মনুষ্যত্ববোধের উন্মেষে যে নতুন সুরজিতের জন্ম হয় তার বিবেকবোধ তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। এই সুরজিত অনেকটাই যেন স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে বরণ করে নিতে চায়। সুরজিত যখন নিজের মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত এমতবস্থায় তার স্ত্রী সুলতার চিঠি পেয়ে সে জানতে পারে, তার গর্ভে সন্তান এসেছে। এ সময় নাট্যকার নূরুল মোমেন অত্যন্ত সার্থকতার সাথে সুরজিত নন্দীর মানসিক দ্বন্দ্ব ও টানাপোড়েন তুলে ধরেছেন। সুরজিতের একদিকে নিজের ওপর নিজের বিতৃষ্ণা, ঘৃণা এবং প্রতারণাজাত আত্মগ্লানির দহন, অন্যদিকে পিতৃত্বের আনন্দে তার হৃদয় রক্তাক্ত-ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। এই যন্ত্রণায় কাতর সুরজিতের জন্য বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। সম্ভবত এজন্যই নাট্যকার এ সময় সুরজিতকে মুক্তি দিতেই- টেলিফোনের হুমকিকে বাস্তবতা দিয়েছেন। এক সময়কার বন্ধু অসীম, যে তাকে হাত ধরে অন্ধকার পথে নামিয়েছিল সে-ই তার বুকে ছুরি বসিয়ে দিয়ে হত্যা করে। এই হত্যার মাধ্যমে নিঃসন্দেহে অসীম অপরাধ করে তবে তার কৃত অপরাধের চেয়ে নাট্যঘটনায় সুরজিতের মৃত্যুই যেন অধিকতর জরুরি ছিল। কেননা তার মৃত্যুর মধ্য দিয়েই নাট্যঘটনায় মুক্তির সুবাতাস প্রবাহিত হয়।
সুরজিত নন্দী তার অনৈতিকতা, অমানবিকতার এবং মনসিক বৈকল্যের পরিচয় দিতে গিয়ে- এক সময়ের প্রেমিকা স্নেহলতার একটি পত্র পাঠ করে। এই চিঠির সূত্রে নাট্যকার সুরজিতে চূড়ান্ত সামাজিক অবক্ষয়ের মর্মান্তিক দৃশ্য নাট্যঘটনায় উপস্থাপন করেছেন। স্নেহলতা ভালোবেসেছিল সুরজিতকে; কিন্তু সেই ভালোবাসার মূল্য সেদিন সুরজিত দেয় নি। অবশ্য সেজন্য পরবর্তী সময়ে আত্মদহনে পুড়েছে সুরজিত। স্নেহলতা তার পত্রে অভিযোগ করে লিখেছিল- জানতাম আমার মত প্রথম শ্রেণীর প্রতিভার সংস্পর্শে তৈরি করলেন যে মন, তাই দিয়ে জয় করলেন বুর্জোয়া ছাত্রী সুলতাকে। বেয়ে উঠে মইটাকে লাথি দিয়ে ফেলে দিলেন।
সুরজিত কর্তৃক প্রেমিকা স্নেহলতার প্রেমের মূল্য দেওয়া না-দেওয়া নাট্যঘটনায় বড় কোনো বিষয় নয়। কিন্তু এর মাধ্যমে যে কাহিনীর সূচনা হয়েছে, তা করুণ। সুরজিতের কাছে প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে স্নেহলাতার ‘কুমারীত্ব সরকারীভাবে অক্ষুণ্ন রইল।’ এ কথার মধ্য দিয়ে নাট্যঘটনা ভিন্ন এক প্রচ্ছদপট চিত্রিত হয়েছে। সুরজিতের প্রেম-প্রত্যাখ্যাতা স্নেহলতার জীবনের মর্মন্তুদ কাহিনীবৃত্তে যুদ্ধের বাজারের নিষ্ঠুরতা, ভয়াবহতা উঠে এসেছে। স্নেহলতার এই কুমারীত্বের ধরন কতটা নির্মম, তা ভাবা যায় না। সুরজিত তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, এটা হয়তো মামুলি ঘটনা হিসেবে দেখা যেত; কিন্তু সেই প্রেমিক সুরজিতেরই কালোবাজারির ফলে দেশ জুড়ে যে মহামারি আর দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে- তার ফলাফল গিয়ে পড়েছে, তারই প্রাক্তন প্রেমিকা স্নেহলতার ওপর। স্নেহলতার চিঠিতে তার প্রমাণ মেলে। সে সুরজিতকে লিখেছিল- ‘আমি হলাম দাসীর মেয়ে; সুতরাং লালসার লিকলিকে জিহ্বার অবলেহন দুর্ব্বার হয়ে উঠল চারদিক থেকে। রোধ করতে গিয়ে মার চাকুরী গেল কয়েক জায়গায়। শেষ পর্যন্ত বিষে বিষক্ষয় করতে হলো। জান্তব ক্ষুুধা, পেটেরটা মেটাতে গিয়ে দেহেরটাও মেটাতে হলো। গালভরা যে নোশনটা প্রাণপণে রক্ষা করতে চেয়েছিলাম, প্রাণ রক্ষার জন্যে সেটাকেই পণ দিলাম।’
স্নেহলতার এই করুণ পরিণতির জন্য দায়ী কে? এককভাবে হয়তো শুধু সুরজিতকে দায়ী করা যায়। স্নেহলতার এই চিঠি পাঠ করে সুরজিত মূলত নিজের ভেতরের পশুত্বটাকে বাইরে বের করে এনেছে এবং সে উপলব্ধি করেছে, 'I shall turn you down, you idiotic spirit in man.' কিন্তু দেশশুদ্ধ এরকম হাজার হাজার স্নেহলতার জন্য দায়ী একা সুরজিত নয়। নৃপেন বোস, অসীমদের মতো কালোবাজারীরাই দায়ী। কেননা এই কালোবাজারীদের কারণে যুদ্ধের বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়; এর ফলে অসংখ্য মানুষ অনাহারে, অর্ধাহারে কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে যুবতীরা শরীর বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতে বাধ্য হয়। তবে এক স্নেহলতার মর্মান্তিক পরিণতির জন্য যে সুরজিত প্রত্যক্ষভাবে দায়ী- তা বলার অবকাশ থাকে না। স্নেহলাতার ‘কুমারীত্ব সরকারীভাবে অক্ষুণ্ন’। কিন্তু সামাজিক বিবেচনায় এই কুমারীত্ব কতটা নির্মম ও যন্ত্রণাদায়ক তা ভাষায় প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব। সুরজিত কর্তৃক স্নেহলতার প্রেম প্রত্যাখ্যান করার ঘটনা সাধারণ হয়েও অসাধারণ। কেননা ঘটনাটিই একটি মেয়েকে দেহ-ব্যবসায় নামতে বাধ্য করেছে। আর এর কারণ সুরজিতের অবৈধ অর্থোপার্জনের মধ্যে নিহিত। সুরজিতদের কালোবাজারির ফলে দেশ জুড়ে যে মহামারি আর দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে- তার অবশ্যম্ভাবী ফলাফল ভোগ করেছে স্নেহলতার মতো এদেশের অসংখ্য নারী। সুরজিতের অর্থোপার্জন এবং তার প্রাক্তন প্রেমিকা স্নেহলতার নারীত্ব বির্জন ওতোপ্রতোভাবে জড়িত।
নূরুল মোমেনের একক চরিত্র বিশিষ্ট নেমেসিস নাটকটি এতদিন সমালোচগণ সামাজিক নাটক হিসেবেই বিচার করেছেন। নাটকের প্রেক্ষাপট অবশ্যই সামাজিক, এজন্য এটিকে সামাজিক নাটক বলতে বাধা নেই। তবে একই সাথে নায়ক সুরজিত নন্দীর চরিত্র বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয় যে, এটি কাব্যনাটকও বটে। এ কারণেই নাটকে সুরজিতের অন্তর্রহস্য আবিষ্কারে নাট্যকারের প্রাণান্ত প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়। উপরন্তু এ নাটকের গদ্য সংলাপ প্রায়শই কাব্যময় হয়ে উঠেছে। যেমন-
‘স্নেহলতা, কী সোনালী ছিল মন তোমার! আর কি তীক্ষ্ন ছিল তোমার অনুভূতি! নিজে ছিলে দরিদ্র; মর্ম্মে মর্ম্মে অনুভব করেছিলে মনের হীনতাই গরীবদের ছোট করে রাখে। তাই এই ভাটিয়ালি গানটায় তাদের মনকে সমৃদ্ধ করার অপূর্ব্ব আবেদন জানিয়েছিলে। আর আমাকে দিয়ে কতবার গাওয়াতে এই গানটা।’
অথবা স্নেহলতার চিঠি থেকে সুরজিতের উদ্ধৃত সংলাপ- ‘আপনার আর দেখা পেলাম না, দেখা হল দুর্ভিক্ষ রাক্ষসীর সঙ্গে। ইনটেলেক্টের মূল্য তার কাছে কয়েক টুকরো হাড়ের বেষ্টনীতে ছটাক খানেক মগজ মাত্র। তার নড়বড়ে দাঁতের প্রথম কামড়েই বাবা প্রাণ দিলেন। ফোঁকলার মাঝে পড়ে অর্দ্ধ-চিবানো অবস্থায় মা আর আমি রইলাম বেঁচে। ঘটনার ঘূর্ণাবর্ত্তে দেখতে না দেখতে অতীত আমাদের তলিয়ে গেল। মা’র জীবিকা হয়ে দাঁড়াল দাসীবৃত্তি। আমি হলাম দাসীর মেয়ে।’- এ ধরনের অনেক সংলাপই আছে নেমেসিস-এ যা কাব্যগন্ধী সংলাপের তুল্য। তাছাড়া এর সংলাপে আছে বৌদ্ধিক দার্শনিক সংলাপ। কথায় কথায় সুরজিত অনেক কবির কবিতা এবং গান তার সংলাপে ব্যক্ত করেছে; যা নাট্যঘটনায় কবিতার সুর, ছন্দ এবং রূপক-চিত্রকল্পের আবহ সৃষ্টি করেছে।
নূরুল মোমেন নেমেসিস নাটকের নামকরণ করেছেন গ্রীক পুরাণের প্রতিশোধের দেবী নেমেসিসের নামানুসারে। এ নাটকের নায়ক সুরজিত যুদ্ধের বাজারে কালোবাজারী করে যেভাবে অবৈধ অর্থোপার্জন করে, অসংখ্য মানুষের অভিশাপ কুড়িয়েছে; তাতে তার শাস্তি অনিবার্য হয়ে পড়ে। উপরন্তু এই অন্যায় কৃতকর্মের জন্য সুরজিত নন্দী নিজেও অন্তর্দহনে পুড়তে থাকে। তার আত্মগত উপলব্ধিই তাকে মনে করিয়ে দেয়, তার কৃত অপরাধের শাস্তি অবশ্যই প্রতিশোধের দেবী গ্রহণ করবেন। এই আশঙ্কা থেকেই সে মৃত্যুর আগে, অবৈধভাবে উপার্জিত সকল সম্পত্তি সুরজিত গরীবদের উদ্দেশ্যে উইল করে দেয়- যাতে দেবী নেমেসিসের প্রতিশোধের আগুনে তার সন্তানকে পুড়তে না হয়। সুরজিতের উদ্দেশ্য নাট্যঘটনায় সার্থক হয়ে ওঠে যখন অসীম তাকে খুন করে। এই খুনের ঘটনা যদিও তার বন্ধু কর্তৃক সংঘটিত হয়েছে, তথাপি নাট্যকার সুরজিতের কৃত অপরাধের শাস্তিস্বরূপ দেবী নেমেসিসের প্রতিশোধ-ই প্রমাণ করেছেন নাট্যঘটনায়। অর্থাৎ নাট্যঘটনায় সুরজিতের মৃত্যুকে অনিবার্য করে তুলেছেন নাট্যকার। অতএব দেবী নেমেসিসের নামানুকরণে নাটকের নাম নেমেসিস সার্থক হয়েছে একথা সন্দেহাতীতভাবে প্রতীয়মান হয়, সুরজিতের মৃত্যুর মধ্য দিয়েই।
নূরুল মোমেনের নেমেসিস নাটকের সাথে ক্রিস্টোফার মার্লোর দ্যা ট্র্যাজিক্যাল হিস্টরি অফ ডক্টর ফস্টাস নাটকের সাদৃশ্য রয়েছে। এ নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র ফস্টাস তার আত্মা শয়তানের কাছে বিক্রি করেছিল; আর নূরুল মোমেনের নেমেসিস-এর সুরজিত নন্দী নিজেকে (সত্তা) কিংবা নিজের ব্যক্তিত্বকে বিকিয়ে দিয়েছিল, সুলতার বাবা নৃপেন বোসের কাছে। এ বিষয়ে সুরজিতের স্বীকারোক্তি- ‘Faustus তার আত্মা শয়তানকে বিক্রি করেছিল একইভারে আর আমি আমার আত্মাকে কিস্তিবন্দী করে নৃপেন বোস আর অসীমের কাছে বিক্রি করছি স্যার। এর যে কি দুঃখ।’
নূরুল মোমেন তার সৃষ্ট চরিত্র সুরজিত নন্দীর সংলাপেই ক্রিস্টোফার মার্লোর ‘ফস্টাস’ চরিত্রের তুলনা করা হয়েছে। সম্ভবত নাট্যকার নেমেসিস রচনার সময় দ্যা ট্র্যাজিক্যাল হিস্টরি অফ ডক্টর ফস্টাস দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। উপরন্তু তাঁর সৃষ্ট সুরজিতের মুখে ফস্টাসের সাথে সাদৃশ্যের কথা ব্যক্ত হওয়ায়, এই প্রভাব অনেকটাই স্বীকৃত ও বিশ্বাস্য হয়ে উঠেছে। তাছাড়া উভয় নাটকের তুলনামূলক আলোচনায় দেখা যায়, নেমেসিস-এ সুরজিত নন্দী যেভাবে আত্মগ্লানি, আত্মদহনে দগ্ধীভূত হয়েছে; একই রকম আত্মদহন-গ্লানি মার্লোর ফস্টাসের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। অসীমের ছুরির আঘাতে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে যন্ত্রণাকাতর সুরজিতের সংলাপের সাথে ফস্টাসের সংলাপের হুবহু মিলও পরিলক্ষিত হয়। সুরজিত বলে, ‘উহ্ আয়ু বোধ হয় শেষ হয়ে আসছে- নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।’ অনুরূপ আর্তনাদ ফস্টাসের মুখেও শোনা যায়-
Ah, Faustus
Now hast thou but one bare hour to live
And then thou must be damned perpetually!
সুরজিত নন্দীর মৃত্যুকালীন উচ্চারণের সাথে ফস্টাসের উচ্চারিত বাক্যের পার্থক্য নেই বললেই চলে। তবে এটাকে অনুবাদ বলা যায় না। এছাড়া ফস্টাসের স্বগতোক্তির সাথে সুরজিত নন্দীর বক্তব্যের মিল আছে। উভয় চরিত্রের উচ্চারিত সংলাপের সাদৃশ্য এবং তাদের উভয়ের অন্তরে ব্যক্তিগত ব্যথা-ব্যর্থতা, অনুশোচনা একই সুরে গ্রথিত। ব্যক্তি সুরজিত নন্দীর হৃদয়ের হাহাকার এবং আত্মদহন উন্মোচনে নাট্যকার নূরুল মোমেন সার্থকতার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছেন। ফলত এটাকে কাব্যনাটক বলতে বাধা থাকে না। গরীব স্কুল শিক্ষক সুরজিত নন্দী- অর্থ ও প্রিয়তমা স্ত্রীর জন্য শয়তানরূপী নৃপেন বোসের কাছে নিজেকে বিক্রি করে দেয়। এই পাপের অনুশোচনায় সুরজিত দেবী নেমেসিসের ক্রোধানলে ভস্মীভূত হবে; নাট্যকারের নিকট এটাই যেন স্বাভাবিক ঘটনা। এজন্যই নূরুল মোমেন নাটকের যবনিকাপতনে নেমেসিস দেবীর অভিশাপেই সুরজিতের মৃত্যু চিত্রিত করেছেন। তবে দেবীর কার্যক্রমকে বাস্তাবায়িত করতে তিনি সুরজিতের বন্ধু অসীমের সহায়তা গ্রহণ করেছেন। তবে অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থের রাহু থেকে সুরজিত নন্দী নিজের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পরবর্তী বংশধরকে দেবীর (নেমেসিস) অভিশাপ থেকে মুক্ত করার ব্যবস্থা করে গেছে- 'I paid the penalty with my life and saved my generations.' অর্থাৎ সুরজিত তার সমস্ত উইল করে দিয়েছে, গরবীদের কল্যাণে।
নূরুল মোমেন যে উদ্দেশ্য নিয়ে নেমেসিস রচনা করেছেন, তাঁর সেই উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে সুরজিতের অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ-সম্পত্তি গরীবদেরকে উইল করে দেওয়ার মাধ্যমে। উপরন্তু নাট্যঘটনার যবনিকা টানতেই তিনি সুরজিতের বন্ধুকে দিয়ে তাকে হত্যা করিয়ে তা নেমেসিস দেবীর প্রতিশোধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। নাটকের এই সমাপ্তিও সম্পূর্ণ নাট্যকাহিনীর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। একক চরিত্রের নাট্যকাহিনীর মধ্যে দর্শকদের প্রবেশ করানো ক্ষেত্রে বিশেষত নূরুল মোমেন অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। নেমেসিস-এর শুরু থেকে শেষপর্যন্ত দর্শক টানটান উত্তেজনার মধ্যে অবস্থান করে। অতএব নাট্য-ঘটনার বিকাশ এবং গতিময়তা যেমন নাট্যকার ধরে রেখেছেন; তেমনি নায়ক সুরজিত চরিত্রের মধ্যে নাটকীয় পরিবর্তন নিয়ে এসে তাকে হত্যার মধ্য দিয়ে এর সার্থক ট্র্যাজিক পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছেন।
নাট্যকার নূরুল মোমেনের নেমেসিস নাটকের সংলাপ, ভাষাশৈলী এবং নাট্য-কৌশল মননশীল-বুদ্ধিবৃত্তিক; তবে অভিনয়ের জন্য মঞ্চনাটক হিসেবে নেমেসিস সম্পূর্ণ সার্থক তা বলা যায় না। কেননা একক চরিত্রের মানস বিশ্লেষণের এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া দর্শকের কাছে একঘেয়ে মনে হতে পারে। তবে নাট্যকার চরিত্রের অন্তর্গত রহস্য উন্মোচনে সার্থকতার পরিচয় দিয়েছেন বলেই এটি সামাজিক প্রেক্ষাপটে রচিত হওয়া সত্ত্বেও সার্থক কাব্যনাটক হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
গ.
আ.ন.ম. বজলুর রশীদ (১৯১১-’৮৬) কবি হিসেবে সমধিক পরিচিত হলেও কাব্য, নাটক, জীবনীগ্রন্থ, উপন্যাস ও ভ্রমণকাহিনী রচনা করেছেন তিনি। সাহিত্যের সব শাখায় বিচরণ করলেও নাট্যসাহিত্যে তাঁর নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। তাঁর নাটকে মানব জীবনের সমস্যা, সামাজিক বাস্তবতা ও জটিলতা রূপায়িত হয়েছে। কবি-নাট্যকার বজলুর রশীদের নাটকে আদর্শের সঙ্গে বাস্তবতার সংঘাত, মানসিকতার সাথে জীবনের চাওয়া-পাওয়ার ব্যবধান উপস্থাপিত হয়েছে। তিনি ঝড়ের পাখি (১৯৬৬), যা হতে পারে (১৯৬২), উত্তর ফাল্গুনী (১৯৭১), সংযুক্তা (১৯৭২), শিলা ও শৈলী (১৯৭৩), সুর ও ছন্দা (১৯৭৩), একে একে এক (১৯৭৬), ধানকমল (১৯৭৬) প্রভৃতি নাটক রচনা করেছেন। তাঁর নাটকগুলোর শিল্পসাফল্য নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও এগুলোর পরিমিতিবোধ এবং সংলাপের কাব্যমাধুর্য বিশেষত্বপূর্ণ। তবে এসব নাটকে শিক্ষণীয় বিষয় বা আদর্শ প্রচার করাই ছিল তাঁর মূল উদ্দেশ্য। তাঁর নাট্য-প্রতিভা সম্পর্কে আলোচনায় মিহর-উন-নিসা খোন্দকার বলেছেন-
পূর্ব পাকিস্তানী নাট্যকার ও পরিচালক হিসাবে আমরা যে কয়জনের নাম করতে পারি তাদের মধ্যে নূরুল মোমেন, মুনীর চৌধুরী, আসকার ইবনে শাইখ, আ.ন.ম বজলুর রশীদ প্রভৃতি। এঁদের মধ্যে রশীদ সাহেব- শুধু নাট্যকারই নন তিনি উঁচু দরের মঞ্চ পরিচালক এবং কলেজ রঙ্গমঞ্চকে কেন্দ্র করেই তাঁর নাট্যপ্রতিভার উন্মেষ, বিকাশ এবং পরিণতি।
বাংলা কাব্যনাট্য সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরে আর খুব বেশি নাট্যকারের সন্ধান পাওয়া যায় না যিনি রবীন্দ্রনাথের মতো সার্থক কাব্যনাট্য রচনা করতে সক্ষম হয়েছেন। তথাপি মুসলমান কবি-সাহিত্যিকগণের মধ্যে ফররূখ আহমদ এবং আ.ন.ম. বজলুর রশীদ কাব্যনাট্য রচনায় যথেষ্ট শক্তিমত্তার পরিচয় দেন। বিশেষত বজলুর রশীদের কবিত্বের সাথে নাট্যগুণের অপূর্ব মিলন ঘটেছে। তিনি ১৯৬৬ সালে ‘ত্রিমাত্রিক’ শীর্ষক একটি কাব্যনাট্য সংকলন প্রকাশ করেন। এই সংকলনে তাঁর ধনুয়া গাঙের তীরে, মেহের তোমার নাম ও কোন এক দীপক সন্ধ্যায় শীর্ষক তিনটি কাব্যনাট্য পর্যায়ের রচনা স্থান পেয়েছে। এ রচনাগুলোতে কাব্য-সুষমা রয়েছে। তাঁর কাব্যনাট্যধর্মী রচনায় মূলত লোকায়ত জীবনের উদ্ভাসন পরিলক্ষিত হয়। ময়মনসিংহ গীতিকার দেওয়ান-ই মদিনা পালার কাহিনী অবলম্বনে তাঁর ধনুয়া গাঙের তীরে কাব্যনাটক রচিত। তাঁর স্বকীয়তা, কাব্য-কল্পনা এবং উপস্থাপন রীতি এই লোকজ কাহিনীকে সম্পূর্ণ ভিন্নমাত্রা দান করেছে। ফলে ধনুয়া গাঙের তীরে অতিপরিচিত কাহিনী অবলম্বনে রচিত হলেও একটি আলাদা শিল্পমাধ্যম হিসেবে স্বয়ংসম্পূর্ণ।
নাট্যকার বজলুর রশীদ ত্রিমাত্রিক কাব্যনাট্য সংকলনে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের লোককাহিনীর সার্থক রূপায়ণে যত্নশীল হয়েছেন। কোনো কোনো সমালোচক ত্রিমাত্রিক সংকলনে গানের প্রাধান্য লক্ষ্য করে একে গীতিনাট্য হিসেবে আখ্যায়িত করতে চেয়েছেন। প্রকৃতার্থে এগুলো গীতিনাট্য নয়, সার্থক আধুনিক কাব্যনাটক না হলেও কাব্যনাট্য পর্যায়ের রচনা হিসেবেই বিবেচ্য। বজলুর রশীদের এই কাব্যনাট্য সংকলনে তাঁর কবি-মননের আবেগ-উচ্ছ্বাস, আনন্দ-বেদনা অপরূপ কাব্যসুষমামণ্ডিত হয়ে শিল্পিতরূপে প্রকাশ লাভ করেছে। সমালোচক বলেছেন-
এখানে লেখক একদিকে যেমন তাঁর কাব্যরীতির পরীক্ষা করেছেন, তেমনি নতুন রসের সংযোজন ও নতুন আঙ্গিক নাটকীয় সন্ধিসূত্রের মধ্যদিয়ে জ্ঞাত কাহিনীতে বৈচিত্র্য সৃষ্টির প্রয়াসী হয়েছেন। ক্ষেত্রবিশেষে মনস্তাত্ত্বিক সংবেদন সৃষ্টির উদ্দেশ্যে রসময় গানের আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। মূলত সংলাপাংশেই লেখকের কাব্যরীতির পরীক্ষা মুখ্য হয়েছে।
আ.ন.ম. বজলুর রশীদ তাঁর কাব্যনাট্যধর্মী রচনায় কবিতার বহুল ব্যবহার করেছেন। বিশেষত তাঁর এসব রচনায় কাব্যভাষা সাংগীতিক মাধুর্যে পরিপূর্ণ। তবে তাঁর কাব্যভাষায় পুরনো বিষয়বস্তুতে নবতর প্রাণের উন্মেষ ঘটেছে সন্দেহাতীত। বজলুর রশীদ আধুনিক-অর্থে সার্থক কাব্যনাটক রচনা করতে না পারলেও তিনি কবিতা মাধ্যমে নাট্য-রচনার যে প্রয়াস গ্রহণ করেছিলেন, তার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের সাহিত্যে সার্থক কাব্যনাটক রচনার পথ সুগম হয়েছিল।
ত্রিমাত্রিক কাব্যনাট্য সংকলনের প্রথম রচনা ধনুয়া গাঙের তীরে। এটি ময়মনসিংহ গীতিকার পরিচিত পালা দিওয়ানা মদীনার অনুরচনাও বলা যেতে পারে। এর কাহিনীতে আমরা প্রত্যক্ষ করি, দেওয়ান সোনাফরের দুই ছেলে আলাল এবং দুলাল পিতার দ্বিতীয় স্ত্রীর অত্যাচার ও ষড়যন্ত্রে ঘর ছাড়া হয় এবং তারা পালিয়ে গিয়ে পার্শ্ববর্তী গ্রামের হীরাধর বণিকের গৃহে আশ্রয় নেয়। এখানেও তারা অনেক কষ্ট করে জীবন-যাপনের চেষ্টা চালায় কিন্তু শেষ পর্যন্ত আলাল ব্যর্থ হয়ে হীরাধরের বাড়িও ত্যাগ করে। আলাল পালিয়ে গেলেও দুলাল হীরাধরের বাড়িতে থেকে যায় এবং কাজল কান্দার হাওরের চারণ ভূমিতে বণিকের গরু চরায় আর মনের ব্যর্থতায় বেদনার সুর সাধে। তার গানে মদীনা সুন্দরীর মনে প্রেমবোধ জাগ্রত হয় এবং তাদের সাক্ষাত হয় হাওরের নির্জন তীরে। দুলাল প্রেম-বিহ্বলা সুন্দরী মদীনাকে তার পরিচয় জিজ্ঞেস করে কিন্তু লজ্জাশীলা নারী মদীনা দুলালের প্রশ্নের জবাব দিতে পারছে না দেখে দুলাল বলে-
তবু যেন মনে হয়, অনামিকা সোনার বরণ
অমরার কন্যা তুমি, কেন এই মর্ত্যের মাটিতে
এতরূপ সুষমায় পূর্ণপাত্রে ঝলোমলো
এলে দেখা দিতে
অজানা কুমারে ...
এবারে মদীনা তার লজ্জা ভুলে দুলালের কথার জবাবে বলে-
তুমি নও অজানা আমার
কতদিন সন্ধ্যা বেলা বার দুয়ারের ঘরে বাতায়নে শুধু বারবার
তোমাকে দেখেছি বসে বার বার অনিমেষ। রূপে মুগ্ধ আমি
কম্পিত কামনায় তুমি হবে জীবনের প্রিয়তমে স্বামী।
উপরে উল্লেখিত মদীনা এবং দুলালের কথপোকথনে তাদের প্রেম ও হৃদয় আদান-প্রদানের চমৎকার ছবি ভেসে উঠেছে। প্রেমিক-প্রেমিকার হৃদয়ে যত ধরনের আবেগ-অনুভূতির সঞ্চার হয় তা এই নব পরিচিত দু’জনের হৃদয়ে ঝড় তুলছে। তাদের আলাপচারিতায় বোঝা যায়, দুলালের হৃদয়ের অনেক দিনের বন্ধ দরজা হঠাৎ খুলে গিয়েছে এবং সেখানে মুক্ত আলোর উদ্ভাসন ঘটেছে। তার আনন্দের যেন অন্ত নেই; অনুরূপ অবস্থা মদীনারও। সে-ও অবচেতনে দুলালের প্রেমময় স্পর্শ লাভের জন্য শিহরণ অনুভব করেছে। তারপর মদীনা পিতা-মাতার অনুমতিক্রমে দুলালকে বিয়ে করে-
তোমার আমার মিল এই যোগ যুগান্তর হবে
তথাপি অক্ষয় রবে। কথা রাখ ডান হাতে
উপরে নাও
কবচ, করবে রক্ষা সর্বক্ষণ, হাতখানি দাও
ফকীর বাবার দান, তার দান যায় না বিফলে।
মদীনার এই আশঙ্কার মধ্যে গ্রামীণ নারীদের চিরায়ত আশংকার চিত্র বিদ্যমান। স্বামীরূপে দুলালকে পাওয়ার পরও মদীনার মনে আশংকা ছিল কেননা দুলাল বিদেশী। দুলাল তাকে ফেলে হয়তো হঠাৎ কোনোদিন পালিয়ে যাবে। মদীনা এ ধরনের অমূলক দুঃশ্চিন্তায় পড়ে স্বামীর হাতে সে ‘ফকীর বাবার’ দেয়া ‘কবচ’ বেঁধে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চায়। অবশ্য ফকীর বাবা মদীনাকে স্বামীর সেবা-যত্ন করার পাশাপাশি তাকে মনে-প্রাণে ভালোবেসে যাওয়ার জন্য উপদেশ দিয়েছে। মদীনা তার অন্যথা করে নি। এভাবে দিন-সপ্তাহ বছর গড়িয়ে মদীনার ঘরে চাঁদের মতো ফুটফুটে
One of the world's leading online gambling companies. The most comprehensive In-Play service. Deposit Bonus for New Customers. Bet on Premier League, Champions League and International Football, plus Grand Slam Tennis. Watch Live Sport. We stream over 100,000 events. Bet on Sports. Play Now on Casin...