02/10/2024
'পূজোকালে কেন লাগে বেশ্যাদ্বারের মাটি?'
শুদ্ধ আর অশুদ্ধের যে চিরাচরিত ধারণা সেই ধারণার বুকে একটা ত্রিশূল গেঁথে দিতেই দুর্গাপূজাকালে মহাস্নানের সময় লাগে বেশ্যাদ্বারের মাটি, সেই মাটি আবার চেয়ে আনতে হয় ভিক্ষে করে। সমাজ যাদের দূরে ঠেলে রেখেছে, আদিশক্তি তাদেরই কাছে টেনে নেয়। মায়ের ত্রিনয়নে সবাই সমান।
আপনারা অনেকেই জানেন মহাস্নানের সময় নয়টি জায়গা থেকে মাটি আনার দরকার পড়ে। মাটি লাগে নাপিতের বাড়ির, মালীর বাড়ির, নর্তকী বাড়ির। রাস্তার চৌমাথার মাটি প্রয়োজন হয়, প্রয়োজন হয় গঙ্গা পাড়ের মাটি। আরও লাগে রাজবাড়ির মাটি, গোবর, ধানের শীষ ইত্যাদি অনেক কিছুই লাগে।
এসবের সাথে প্রয়োজন হয় পতিতালয়ের মাটির। আজকে আমরা জানবো সেই মাটির দর্শন!
এই যে একেবারে নিচের শ্রেণীর, সমাজের অনাহুত মানুষের কন্ট্রিবিউশন লাগে একটা পূজোয়। যেই নয় জায়গার কথা বলছি সেটা আসলে ডিটেলে জানা দরকার। শাক্ত সম্প্রদায়ের তন্ত্রশাস্ত্রের ‘গুপ্তসাধনা’ তন্ত্রে নবকন্যার বিবরণ পাওয়া যায়। নবকন্যা বলতে ভিন্ন ভিন্ন ৯ শ্রেণীর নারীকে বোঝায়। তারা হলেন:
১) নর্তকী
২) কাপালিক
৩) পতিতা
৪) ধোপানী
৫) নাপিতানী
৬) ব্রাহ্মণী
৭) শুদ্রাণী
৮) গোয়ালিনী
৯) মালিনী।
দূর্গা মূলত শাক্তসম্প্রদায়ের আরাধ্য দেবী। এখানে ‘শক্তিবাদের’ আধারে পরম একমেবাদ্বিতীয়ম ঈশ্বরকেই ‘নারীশক্তি’ রূপে বোঝা হয় করা হয়েছে। অর্থাৎ পরম ঈশ্বর মূলত নারীশক্তি ‘দুর্গা’। দূর্গার পূজা পদ্ধতি যেহেতু শাক্তদর্শন থেকে সৃষ্টি হয়েছে তাই শাক্তসম্প্রদায় কর্তৃক চিহ্নিত নবকন্যার প্রতীকস্বরূপ ওই ৯ শ্রেণীর নারীর দ্বারের মাটি নেওয়া হয় প্রতিমা গড়তে। মনে রাখতে হবে শুধু পতিতার দ্বারের মাটি নয় বাকি আরও অষ্টকন্যার দ্বারের মাটিও সমান অপরিহার্য। এছাড়াও সাত নদী, ৫১ শক্তীপিঠ (বাংলাদেশে তিনটা এমন পিঠ আছে) এবং পঞ্চ প্রাণীর দেহবশেষও প্রতিমা গড়ার কাজে ব্যাবহৃত হয়।
দেখেন, দুর্গা পুজোর মূল উদ্দেশ্য সমস্ত নারীজাতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। মাতৃরুপে দেবীর বিরাজ করার একটা গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক ভিত্তির প্রায়োগিক ইঙ্কলুশনই হচ্ছে এই নোশন খুব গাঢ়ভাবে বুঝে নেয়া যে, সব সম্প্রদায়েরই মা তিনি। সেই সমতাকে প্রতিষ্ঠা করতে সমাজের চিহ্নিত পিছিয়ে পড়া মানুষদের সম্পর্কে গুডউইল নির্মাণের একটা প্রচেষ্টা থেকেই এই মাটি সংগ্রহের বিষয়টি এসেছে। আবার এই মাটি আপনি কিন্তু চাইলেই পতিতার কিংবা নর্তকীর বাড়ি থেকে মাস্তানি করে, জোর করে, চুরি করে কিংবা ছিনিয়ে আনতে পারবেন না, অত্যন্ত সম্মানের সাথে তাদের কাছে মাটি ভিক্ষা চাইতে হবে। তারা স্বেচ্ছায় দিলেই পরে আপনি নিতে পারবেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে একদিকে পবিত্রতা, শুভ্রতার প্রতিমূর্তি দুর্গা, অন্যদিকে তার মূর্তি তৈরিতেই দরকার হয় সমাজের ‘অশুচি’, ‘অপবিত্র’ এলাকার মাটির। এটার আসল কারণটা কি?
এখানে মূল দর্শনটা হচ্ছে, একটা পুরুষ যখন পতিতার বাড়িতে যায় তখন পতিতার গৃহে প্রবেশের আগেই তার বাড়ির আঙ্গিনার মাটিতে ঐ পুরুষের জীবনের সমস্ত পূণ্য পতিত হয়। পতিতা গমনের ফলে পতিতা কোন পাপ ধারণ করেন না, কারণ তিনি এখানে একজন নিমিত্তমাত্র। তার বিপরীতে ঐ পুরুষ পতিতার ঘর থেকে নিয়ে আসে অহংকার, কামনা, বাসনা, লালসা আর পাপ। এবারে হাজার হাজার পুরুষের পুণ্যে বেশ্যাদ্বারের মাটি হয়ে ওঠে পবিত্র। আর সেই কারণেই এই মাটি দিয়ে গড়তে হয় দেবী মূর্তি ৷ এই আচার থেকে বোঝানো হয় যে, নারীর মধ্যেই পুরুষের জন্ম। নারীকে পতিতা বানায় পুরুষই। তাই পুরুষরাই অপবিত্র। মায়ের প্রতিমা তৈরীতে পতিতালয়ের মাটি দিতে হয়, অর্থাৎ যারা এই পুরুষতান্ত্রিক পরিস্থিতির শিকার তাঁদের সন্মান করতে হবে।
দেবীমূর্তি গড়বার সময় পতিতার ঘরের পূণ্যবান মাটি আর দেবীর মহাগুণ মিলেমিশে ভক্তকে পুণ্যবান করে তোলে। অর্থাৎ পুণ্য একটা কালেক্টিভ চেহারা পায় যেখানে পতিতার একটা সলিড কন্ট্রিবিউশন থাকে। সোজা কোথায় নারী যে কখনোই অপবিত্র হতে পারে না এই ধারণাটিই লুকিয়ে আছে এই রীতির আড়ালে। দেবী দুর্গার নয়টি রূপের আলাপ আমরা আগেই করেছি। এই নয়টি রূপকে মায়ের নবকন্যার রূপ বলে হয়।
আমাদের দেখতে হবে দুর্গা প্রতিমা নির্মাণে বিভিন্ন ক্লাসের নারীদের একনলেজমেন্টের বিষয়ই না শুধু না, বরং যেখানে সমস্ত পুরুষতান্ত্রিক ডক্ট্রিন হাল্কা স্বরে বলে "মা-ও গুরুত্বপূর্ণ" সেখানে শাক্ত সম্প্রদায় দেখায় "মা-ই মূলত গুরুত্বপূর্ণ"। এখানে নারী শুধু সেন্টারে 'লেবেল সর্বস্বভাবে' থাকেন না, সর্বত প্রায়গিক অর্থে কেন্দ্রে থাকেন।
দেবীপুরাণে একটি গল্পের উল্লেখ পাওয়া যায়, এক কিশোরী পতিতা ছিলো দেবী দুর্গার ভক্ত। কিন্তু পতিতা হওয়ায় সে পূজোয় যেতে পারতো না। মেয়েটি জানতো না কেমন করে সে পতিতালয়ে এলো। সেই মেয়েটি খুব কাঁদতো। একদিন স্বপ্নে দেবী তাকে দেখা দিয়ে বলে, 'মা কাঁদিস না, আমার পূজোতে তোর আঙ্গিনার মাটি লাগবেই'।
আরেক গল্পে উল্লেখ পাওয়া যায়, এক মুনি ছিলেন বেশ অহংকারী। তিনি দুর্গার প্রতিমা গড়ে তার নাম জপ করে দেবীদর্শন প্রত্যাশা করেন। দেবী তাঁকে স্বপ্নে বলেন, 'তোমার এই অহংকারের মূর্তিতে আমাকে পাবে না। অহং ত্যাগ করতে চাইলে বেশ্যাপল্লীর মাটি নিয়ে এসে আবারও মূর্তি গড়।'
এই সমস্ত গল্প নিয়ে কিছু বিরোধও আছে। একটা গ্রুপ আবার এটাও বলেন বেশ্যার যেই অর্থ এখন করা হচ্ছে বৈদিক যুগে অর্থ তেমন ছিলো না। এইসব অক্ষরবাদী ব্যাখ্যা তো আমরা সব ধর্মেই দেখি।
প্রধানত গোটা বিষয়টা থেকে শিক্ষা লাভ করা যায় যে, মূলত নারী যখন সৃষ্টির 'কারণ শক্তি' হিসেবে প্রমাণিত, তখন নারীর পক্ষে কখনোই অপবিত্র হওয়া সম্ভব না। একদিকে নারীর ঔরসেই পুরুষের জন্ম বা উন্মেষ হয় অন্যদিকে পুরুষের পতন বা স্খলন হয়ে নারীর ভেতরেই। নারী যদি এখানে কোন ভূমিকা রেখে থাকে সেটা হচ্ছে পুরো বিষয়টা ধারণের ভূমিকা। এইটায় মাতৃত্ব। মাতা তাই অসুরকেও ধারণ করেন, যেমন করে নারী তার পাপী সন্তানকেও ধারণ করে।
বেশ্যালয়ের মাটির সামনে দুর্গা তার সন্তানদের দাঁড় করিয়ে সম্মান জানাতে বাধ্য করেন। দুর্গা বুঝিয়ে দেন, পুরুষকে নির্মাণ করে যেই নারী সেই সমস্ত নারীর উৎস যেই মহামায়া, তাঁকে নির্মাণ করতে লাগে বেশ্যালয়ের পতিতাদের কৃপা।
নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে এখন বাংলাদেশের বিভিন্ন ফোরামে অনেক আলাপ হয়, কিন্তু বাঙালির ঘরের দর্শন 'শাক্তদর্শন' নিয়ে আলাপে তার বড় অনীহা। উৎসব-উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি সৃষ্টির আদি কারণকে কেন শাক্তরা নারী হিসেবে শনাক্ত করছেন সেটা বোঝার জন্য আমাদের একটু নাড়াচাড়া দেয়ার প্রয়োজন বোধ করছি। আজকাল একটা শব্দ শোনা যায় 'ইতিহাসের বিনির্মাণ'। এই নতুন দিনের বিনির্মাণে বাংলা অঞ্চলে নারীর ক্ষমতায়নের মূলসূত্র বুঝতে শাক্তদর্শন আবারও গুরুত্বপূর্ণ পাঠ হতে পারে।
---
লেখাটি পড়ে ভালো লাগলে পাঠপ্রণামি দিতে পারেন বিকাশ বা নগদ (01884500002) নাম্বারে।
সংযুক্তি: কিছু কিছু সম্প্রদায় প্রতিমা নির্মাণকালেই বেশ্যাদ্বারের মাটি আনেন, কিছু কিছু সম্প্রদায় আনেন মহাস্নানের সময়, তবে পূজোকালে এ মাটি লাগে এই বিষয়ে সবাই মোটামুটি একমত। আমার এই লেখার উদ্দেশ্য এই শক্তিশালী দর্শনটি সামনে নিয়ে আসা। আসা করি আমার গুড-ইনটেনশন আপনারা একনলেজ করবেন।
লিখেছেন: আরিফ রহমান