07/07/2026
১৯৭০-এর পরে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জিততে লাগছিল ২৪ বছর। ২০০২-এর পরে এখন আবার ২৪ বছর পার। এইটার মানে এই না যে আগামীবারই ব্রাজিলের টার্ন। তখনের ব্রাজিল আর এখনের ব্রাজিল—ওরফে শেখ রাসেল অনূর্ধ্ব-১৭ একাদশ—এক জিনিস না।
১৯৯৪ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত ব্রাজিলের টিমে তারকায় ঠাসাঠাসি ছিল। অন্য দলে যেখানে ১-২টা তারকা ফুটবলার থাকত, ব্রাজিলে যেইটা সাইড বেঞ্চে বইসা থাকত, ওইটাও তারকা। রোমারিও, রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনহো, রবিনহো, রোবার্তো কার্লোস, কাকা, দুঙ্গা, দিদা, কাফু, ব্যাবেতো, লুসিও—কয়ডার নাম কমু! এক বিশ্বকাপে দুইজন অবসরে গেলে পরের বিশ্বকাপে আবার চারজন নতুন তারকা আইসা হাজির। রোনালদিনহোর কিছু রিলস হয়তো অনেকেই দেখছেন। কিন্তু পুরো খেলা যারা দেখছে, তারা জানে জিনিসটা কী ছিল। আর রোবার্তো কার্লোসের ফ্রি-কিক আর মিসাইলের মধ্যে পার্থক্য ছিল না। খেলা ছিল চোখের শান্তি। বাইড়া-বাইড়া পিডাপিডি করলেও ব্রাজিলের পা থেকে বল নেওয়া যাইত না।
এই যে আমাদের দেশে এত ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সাপোর্টার, এদের বেশিরভাগই আসলে পৈতৃক সূত্রে। আমার বাপ ব্রাজিল করত, আমিও ব্রাজিল। আমার যত আর্জেন্টিনা ফ্যান ফ্রেন্ড আছে, ওদের বাপও আর্জেন্টিনা করত, তাই ওরাও আর্জেন্টিনা।
তবে পৈতৃক সূত্রে ব্রাজিল করলেও মজা করার বয়সে ভালোই মজা করতে পারছি। জন্মের পর থেকেই দেখছি ব্রাজিল মানেই উইনার। অঘটন না ঘটলে হারেই না। ১৯৯৪ চ্যাম্পিয়ন, ১৯৯৮ রানার্স-আপ, এরপর ২০০২-এ আবার চ্যাম্পিয়ন। ইতিহাসের অন্যতম সেরা দল নিয়া নামছিল। ওই বছর আর্জেন্টিনা গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায়। ঐ বয়সে এইটা ডাবল ওয়ার্ল্ডকাপের মত।
আর ২০০৬-এ তো মনে হইছিল, ব্রাজিল হাসতে হাসতেই হারছে। এত জিততে জিততে বোর হইয়া গেছে, তাই ভাবছে—"চল, এবার একটু আগে বাড়ি যাইগা।" ওই বিশ্বকাপেই প্রথমবার মেসির ঝলক দেখলাম। অল্প সময় খেলেও যেটা দেখাইল, তখনই মনে হইছিল—এই পোলারে থামানো কঠিন হবে। সামনে যত বিশ্বকাপ খেলবে, সবই মনে হয় আর্জেন্টিনা জিতবে! যদিও বাস্তবে আর্জেন্টিনা সেই হিসেবে অনেক কমই পাইছে।
যাই হোক, এগুলা সবই ইতিহাস। এবার আসি মূল কথায়।
কর্মা কাউরে ছাড়ে না। শুধু খেলাধুলায় না, জীবনের সব ক্ষেত্রেই।
আপনি যেই আকামই করেন, যেই পাপই করেন, যেই অন্যায়ই করেন—সেটা ঘুইরা আপনার কাছেই আসবে। হোক ২৪ ঘণ্টা পরে, ২৪ বছর পরে, বা ৪৪ বছর পরে। আমি এই জিনিসটা বারবার দেখছি। কেউ স্বীকার করুক বা না করুক, সময় আসলে মানুষ ঠিকই মনে করে—"এত বছর আগে অন্যের সাথে যা করছিলাম, সেটা আজ আমার উপরেই ফিরে আসল!"
আমার আর্জেন্টিনা ফ্যান ফ্রেন্ডগুলারে ৩০-৩২ বছর যেই পচানি পচাইছি, তার হিসাব নাই। ওদের আসলে কিছু বলারও ছিল না। এত বছর কাপ নাই। একটা পুরো জেনারেশন জন্ম থেইকা আর্জেন্টিনারে শুধু হারতেই দেখছে। তাঁর উপর ব্রাজিলের ধারে কাছেও নাই, কই ৫টা আর কই ২টা। আর প্রায় সময় ব্রাজিল থাকত র্যাংকিং এ ১ নাম্বার দল।
এখন দিন ঘুইরা গেছে। হেক্সা করতে করতে ব্রাজিলেরও যে ২৪ বছর পার হইয়া গেছে, টেরই পাই নাই। সামনের বিশ্বকাপে ২৮ বছর হবে। একটা পুরো জেনারেশন ব্রাজিলরে বিশ্বকাপ জিততে দেখে নাই। থাকার মধ্যে ছিল এক বেচারা আনলাকি নেইমার, আগামীবার সেও নাই।
আর্জেন্টিনা অন্তত জান-প্রাণ দিয়া মেসির হাতে ২০২২ সালে বিশ্বকাপটা তুলে দিতে পারছে। আর নেইমার বেচারার জন্য এই আরামবাগ ক্রীড়াচক্রের মতো ব্রাজিল দলে তেমন কোনো ছ্যাদভ্যাদই দেখি না। খেলা দেখলে মনে হয়, বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের মতো নতুন কোনো দেশ ঘুরতে আইছে। কেনাকাটা শেষ হইলে তাড়াতাড়ি হাইরা বাড়ি যাইতে পারলেই বাঁচে।
এদিকে গত কয় ওয়ার্ল্ডকাপে আর্জেন্টিনা ধীরে ধীরে ঠিকই আগাইছে—সেমিফাইনাল, রানার্স-আপ, তারপর চ্যাম্পিয়ন। হয়তো এবারও ভালো করবে। দুই স্টার হইয়া যাবে চার—একদম ব্রাজিলের দম্ভের দরজায়।
ফাইজলামি কইরা যতই বলি—কমিটি টিম, মেসি মাফিয়া টাকা দিয়া ফিফা কিনছে, বা ম্যারাডোনা হাত দিয়া গোল কইরা কাপ নিছিল—দিন শেষে সার্টিফিকেটে কী লেখা আছে, সেটাই বিবেচ্য বিষয়।
২০০২ সালের SSC পরীক্ষা সবচেয়ে কঠিন হইছিল, আবার ২০২০-২১ সালে করোনার কারণে অটোপাশ হইছিল। ২০ বছর পরে চাকরির ইন্টারভিউতে কেউ জিজ্ঞেস করবে না কে কেমনে পাশ করছিল। সার্টিফিকেটে কি লেখা আছে ওইটাই দেখবে।
আমাদের জেনারেশনের আর্জেন্টিনা ফ্যানদের যেমন খারাপ সময় গেছে, এখন এই জেনারেশনের ব্রাজিল ফ্যানদের খারাপ সময় যাইতেছে। একসময় হয়তো দিন ঘুরবে। কিন্তু বয়সের কারনে বা কাজের চাপে সেই আগের এক্সাইটমেন্টটা আর থাকব না।
আগে ক্লাসের রুটিন মনে না থাকলেও কার কবে খেলা, কে কত গোল দিছে—সব মুখস্থ ছিল। আর এই বিশ্বকাপে আমি পুরো খেলা দেখছি মাত্র তিনটা। আগে কেউ ব্রাজিলরে কিছু বললে দাঁতের তলায় রাখতাম। এখন ব্রাজিলরে আমি নিজেই এত পঁচাই, অনেকেই ভাবে আমি মনে হয় আর্জেন্টিনার সাপোর্টার। এখন কে হারল কে জিতল এইসব নিয়া আগেরমত অত মাথা ব্যাথা নাই। খেলারে এখন একটা এন্টারটেইনমেন্ট হিসেবেই দেখি যেটা বাচ্চা বয়সে ছিল না।
গতবার আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আমিও বাইক নিয়া রাস্তায় বের হইছিলাম। কারণ ২০০২-এর পরে এমন উদযাপন আর হয় নাই। সামনে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা কেউ না জিতলে এমন আর হবেও না, তাই মিস করতে চাই নাই। ২০০২ বা ২০০৬ এ এটা ঘটলে হয়ত ১ মাস মন খারাপ কইরা বইসা থাকতাম।
বহুত কথা কইলাম। কিন্তু আসল কথাটা ফুটবল না।
জীবনে কখনো গরম টাইম আসবে, আবার কখনো চিপায় পইড়া ঠান্ডা টাইমও আসবে। গরম সময়ে বাষ্প হইয়া আকাশে উইড়া বেড়ানোর কিছু নাই। পাও মাটিতেই রাখা উচিত। আজকে আপনি জিততেছেন, কালকে অন্য কেউ জিতব। আজকে আপনি হাসতেছেন, কালকে আপনারেও কেউ নিয়া হাসব। এইটাই দুনিয়ার নিয়ম।
দুনিয়ায় যেই হালায় যত দম্ভ দেখাইছে, শেষ পর্যন্ত তার পতন হইছেই। খেলাধুলা, রাজনীতি, অর্থনীতি, ব্যবসা, চাকরি, পড়ালেখা, পরিবার—কোনো জায়গাই এর বাইরে না।
সময় সবারই বদলায়। তাই ভালো সময়ে বিনয়ী থাকেন, আর খারাপ সময়ে ধৈর্য ধরেন। এই দুইটাই শেষ পর্যন্ত মানুষকে টিকায় রাখে।
©