16/08/2025
মানব সংগ্রাম
মানুষের জীবন ঘাতপ্রতিঘাতে ভরপুর।
ধৈর্য, সাধনা, সংগ্রাম, সহিষ্ণুতা এসবের মিশেলেই মানবজীবন পরিপূর্ণ।
জনৈক বলেছিলেন, "পা না ভিজিয়ে হয়তো সাগর পাড়ি
দেওয়া যায়, কিন্তু চোখ না ভিজিয়ে জীবন পাড়ি দেয়া অসম্ভ।"
মানুষের জীবনের প্রারম্ভিক কাল শৈশবকাল।
প্রতিটি মানুষ স্বভাবতই তার অতীতকে মিস করে।
মানবচরিত্রের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সে বর্তমানের যে সময়টাকে তিক্ত আর অসহনীয় ভেবে এই সময় থেকে বের হতে চাচ্ছে, এই সময়টাই অতীত হওয়ার পর সে মিস করে।
তবে শৈশবকালের প্রেক্ষাপট অনেকটাই ভিন্ন। অধিকাংশ মানুষের শৈশবকাল থাকে স্মৃতিমধুর। পৃথিবীতে এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে যে শৈশবকাল নিয়ে স্মৃতিকাতর হয় না।
তবে মানব জীবনের সংগ্রামের অধ্যায়টাও শুরু হয়ে যায় এই শৈশবকালেই।
আর এটা শুরু হয় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হাতেখড়ির মধ্য দিয়ে।
বর্তমানের অভিভাবকেরা বাচ্চাকাচ্চাদের সুন্দর ভবিষ্যত গড়ার ভাবনা থেকে শৈশবকালেই কোমলপ্রাণ বাচ্চাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দেন, বিশেষকরে বাংলাদেশে।
সেই যে শুরু এরপর আর থামার কোন উপায় নেই।
জীবনসায়াহ্নে এসে একটা মানুষ যখন তার ফেলে আসা দিনগুলোতে চরম প্রতিযোগিতার ধাপ পারি দিয়ে এসেছিল, তা ভেবে কতটুকু তৃপ্তি পায়?
আদৌ কী তৃপ্তি আসে?
আসলেও ঠিক কতো জনের?
প্রথম প্রতিযোগিতাটা শুরু হয় নামি-দামি স্কুলে ভর্তি যুদ্ধ নিয়ে।
সবাই কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্টানে ভর্তির সুযোগ পায় না।
এই প্রতিযোগিতায় কেউ সফল, কেউ আবার ব্যর্থ।
কিন্তু এটা মাত্র কয়েকবছরের জন্য ভর্তি হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য।
এরপর নতুনকরে আবার উচ্চবিদ্যালয়, কলেজ, ভার্সিটি, মেডিক্যাল সহ কতো কিছুতে প্রতিযোগিতা।
এরইমাঝে জীবনে আবার আরো কতোশতো চড়াই-উতরাই!
ওই যে, যে ছেলেটা শিশুকালে প্রতিযোগিতায় ব্যর্থ হয়েছিল, সে হয়তো পরবর্তীতে মেডিক্যালে চান্স পেয়ে গেছে।
আবার যে জীবনভর সকল পরীক্ষায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছিল, সে হয়তো শেষবেলায় এসে দুর্ভাগ্যবশতঃ কিংবা নিজের দোষেই হোটচ খেয়ে বসলো।
এতো গেলো স্টুডেন্ট লাইফের সফলতা ব্যর্থতার কথা।
এরপরের ধাপ তো আরো জটিল!
যে যতো ভাল স্টুডেন্ট-ই হয়ে থাকুক না কেন, চাকরির প্রতিযোগিতায় ব্যর্থ হলে সে দুনিয়ার সবচেয়ে বাজে স্টুডেন্ট এবং ব্যর্থ মানুষ হিসেবে বিবেচিত।
মামার জোরে কিংবা যেকোনোভাবে একটা জব-ই পারে একজন মানুষ তথা চাকরি প্রত্যাশীকে একজন সফল মানুষ এবং ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট হিসেবে পরিচিত করতে।
এরইমাঝে কি জীবনের গল্প শেষ?
সফলতার কিংবা ব্যর্থতার নিক্তিতে আপনি কি উৎরে গেছেন?
আজ্ঞে, না। একদম তা নয়।
এবার কর্মজীবন কিংবা বাস্তবিক জীবনের পালা।
এতোক্ষণ যা ছিল তা তো কেবল তথাকথিত নিজ পায়ে দাঁড়ানোর জন্য সকল আয়োজন।
এবার নিজ পায়ে দাঁড়ানোর পর তৎপরবর্তী আসল জীবনের শুরু।
একজন মানুষের সবকিছু আছে।
অর্থ বৈভব, গাড়ি বাড়ি, সব।
কিন্তু সে ঠিক সময়ে বিয়ে-ই করতে পারেনি।
তার সময় বয়সী অনেকের বাচ্চাকাচ্চাদের যখন স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিচ্ছে, সে সবেমাত্র বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে।
বাচ্চাকাচ্চা বড় হওয়ার আগেই বয়সের ভারে ন্যুব্জ।
বাচ্চাকাচ্চাদের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে তাদের অনাগত ভবিষ্যতের ভাবনায় দিনপাত করা ছাড়া কিছুই করার থাকে না।
অনেকে জীবনে বাচ্চাকাচ্চার মুখও দেখতে পারে না।
নিঃসন্তান হয়ে সারাটা জীবন কাটিয়ে দিতে হয়।
এরচেয়ে কষ্ট জীবনে কী আর হতে পারে!
পৃথিবীর সকল সাফল্যও কি এই কষ্ট লাঘব করতে পারে?
এইযে শৈশবকালে জীবনের প্রথম প্রতিযোগিতায় যে হেরেছিল, সে হয়তো শেষ জীবনে এসে বিভিন্ন হিসেব-নিকেশের পরিপ্রেক্ষিতে সফল।
আবার যে জীবনের সকল প্রতিযোগিতায় সফলভাবে উৎরেছিল, ভাল একটা জব পেয়েছিল, সে ব্যর্থ।
নিয়তি কখন কাকে কোথায় সফল কিংবা ব্যর্থ করে তা কেউ বলতে পারনে না।
এ-সব তো গেলো জাগতিক সাফল্য ও ব্যর্থতার পরিপ্রেক্ষিতে।
যাদের জীবনকে কখনো ব্যর্থতা স্পর্শ করতে পারেনি।
সকল ক্ষেত্রে যারা সফল, তাদের জীবনও ব্যর্থতায় পর্যবসিত যদি না পরকালে ( যারা আস্তিকতায় বিশ্বাসী) জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি না মেলে।
আহ্!
জীবনটা কতো জটিল।
জীবনের হিসেবটা কতোই না দুর্বোধ্য!
জীবন চলুক না আপন গতিতে।
সফলতা কিংবা ব্যর্থতার গল্প লেখার দায়িত্ব অন্যদের হাতেই থাকুক।
বিশেষকরে গল্পগুলো লেখা হোক মৃত্যুর পর।