16/08/2020
তাঁর শখ ছিল গীটারের। পছন্দমত গীটার দেখলেই হয়েছে। জাপানে এক গীটারের দোকানে ঢুকে তেমনই এক পছন্দের গীটার পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। দোকানদার ব্যস্ত, পাত্তা দিলেন না বেশি একটা। অত্যন্ত বিনয়ের সাথে জিজ্ঞেস করলেন- “May I play this guitar?” দোকানদার নিমরাজি।কিছুক্ষণ পর আপনমনেই বাজানো শুরু করে দিলেন। একে একে Santana, Knopfler brothers, Clapton যেন নেমে এল রাস্তার ধারে এই গীটারের সুর ধরে। ওহ, সুর কী আয়েশী ভংগিতেই না তাঁর আংগুলে খেলছে! চারপাশে ততক্ষণে উৎসুক জনতার ভিড় জমে গেছে; দোকানদার বেচারা ঠেলাঠেলি করেও বিশেষ সুবিধা করতে পারছেন না!
গীটার থামিয়ে একবার শুধু মাথা তুললেন । দেখলেন ভিড়-বাট্টা ভালই জমেছে। এরপর কী এক সুর বাজালেন নিপ্পন দেশের অচেনা, অদেখা সেই দোকানে। সব চুপ। একদম চুপ। শুধু কেমন এক মোহলাগা ধ্বনি ধাক্কা খাচ্ছে দোকানের কাগজের দেয়ালে দেয়ালে। কিছুক্ষণ পর যখন গীটার দোকানদারের হাতে ফেরত দিলেন, রেশ কাটেনি তখনও। কিছুক্ষণ পর হাততালিতে দোকানে কান পাতা দায়, দোকানদার টানাটানি করছেন একটা গীটার তাকে নিতেই হবে, ছবিও তুলতেই হবে...
তো, কী এমন বাজিয়েছিলেন আইয়ুব বাচ্চু?
বাজিয়েছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত!
***
“এই ঢাকা শহরে ১৯৮৩ সালের শেষের দিকে মাত্র ৬০০ টাকা নিয়ে এসেছিলাম। উঠেছিলাম এলিফ্যান্ট রোডের একটি হোটেলে। আমি কারও কাছেই যাইনি। নিজেকে গড়ে তুলেছি। কাজে হাত দিয়েছি। কাজের পর কাজ করেছি। এখনো করে যাচ্ছি। দিনরাত্রি কাজ করে একটা অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছি।"
এই সাধনাকে সম্বল করেই ১৯৮৬ সালে সোলসে থাকা অবস্থায় নিজের প্রথম একক অ্যালবাম, “রক্তগোলাপ” প্রকাশ করেন। অ্যালবাম কাভারে সাদার ওপরে গোলাপি ডিজাইন করা কোঁকড়া চুলের এক তরুণ। কাভারে শিল্পীর নাম লেখা মোহাং আইয়ুব বাচ্চু। গায়কি ধরণটা একটু কাঁচা। আঙুলগুলো তখনও সেভাবে বশ মানেনি। প্রথম শোনায় হারমোনিয়াম, তবলার দাপটে রকের আগে আধুনিকই মাথায় আসে। কিন্তু এই অনভ্যস্ত হাতই একদিন অনুশীলনের কড়ে ঋদ্ধ হয়ে ঝংকার তুলবে রূপালী গীটারে। আর কিছু বছর পরেই সাদা-গোলাপী বুটিক শার্টের খোলস ভেঙে আপাদমস্তক কালো পোশাকে আবির্ভাব ঘটবে এক আত্মবিশ্বাসী তরুণের। দুঃসাহস আর স্পর্ধায় তিনি নিজ হাতে লিখবেন বাংলা রকের ইতিহাস। আর কয়েক বছর পরেই মোহাং আইয়ুব বাচ্চু বের করবেন "কষ্ট" নামের এক অদ্ভুত সুন্দর অ্যালবাম। পিংক ফ্লয়ডের "দ্যা ওয়াল"-এর অনুপ্রেরণায় বাংলায় আনবেন সুখ নামের সাইকাডেলিক রকের ছোঁয়া। শত বঞ্চনা-গঞ্জনা সত্ত্বেও ভালোবাসার অনুরণন ছড়িয়ে যাবেন ৫৬ হাজার বর্গ মাইল জুড়ে।
আইয়ুব বাচ্চু ওরফে রবিন।
শুরুটা হয়েছিল টিভিতে পপ-সম্রাট আজম খান আর কিংবদন্তী গীটারিস্ট “নয়ন মুন্সি”কে দেখে। বোতাম খোলা শার্ট, হাওয়ায় চুল উড়ছে। সেখান থেকেই মুগ্ধতা, আস্তে আস্তে গীটারের সাথে সখ্যতা। এরপর একে একে ফিলিংস, সোলস ঘুরে অডিও ইন্ডাস্ট্রিতে সবেমাত্র পা পড়েছে। এর মাঝেই দুঃসাহস করে চলে এলেন ঢাকায়। সেখানে আগে থেকেই ছিলেন পুরোনো বন্ধু কুমার বিশ্বজিৎ। তার এর সাথে উঠলেন এলিফ্যান্ট রোডের এক হোটেলে। কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে আসেননি; সম্বল ছিল ঐ ৬০০ টাকা আর এক বুক স্বপ্ন- যেমনটা থাকে আর কি। তাই মোহ ভাঙতেও খুব বেশি সময় লাগল না। তবু স্রেফ ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রমের জোরে টিকে গেলেন। এদিকে তখন সোলসও পায়ের তলায় মাটি খুঁজে পাচ্ছে। সোলসের “সুপার সোলস” ও “কলেজের করিডর” নামের দুটি অ্যালবাম বেশ হিট করল। সময় এই ফিরল বলে…
কিন্তু ৯০ এর শুরুতেই সোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। নিজের একটা ব্যান্ড গড়বেন। LRB- Little River Band. একজন প্রবাসী বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারলেন এই নামে অস্ট্রেলিয়ান এক ব্যান্ড আছে৷ তাই Little River Band হয়ে গেল Love Runs Blind. ব্যান্ড নাম শুনলেই যেখানে মানুষ তেড়ে আসে, সেখানে কেমন করবে এই নতুন ব্যান্ড?
বিটিভিতে প্রথম সম্প্রচারে LRB এর ‘হকার’ গানটি দেখবার অনুভূতি ব্যাখা দেওয়া সম্ভব কি? এই বিশ্বে কয়টা ব্যান্ড পাওয়া যাবে যাদের ডেব্যু রিলিজ একটা ডাবল এলবাম ! Pink Floyd এর The Wall শুনে ঠিক করেছিলেন এমন একটা অ্যালবাম করবেন যেখানে গানগুলি দিয়ে একটি গল্প তুলে ধরবেন। এরপর বের করলেন "সুখ”। অ্যালবামের একেকটি গানে আইয়ুব বাচ্চু ভোকাল দিলেন একেক রকম! এরপর একে একে সোলো অ্যালবাম বের করেছেন আরও দশটি। LRB ব্যান্ডের হয়ে অ্যালবাম সর্বমোট এগারটি। দেশ-বিদেশ মিলিয়ে ২৫টিরও বেশি দেশে কনসার্ট করেছেন দেড় হাজারেরও বেশি। সময়ের প্রয়োজনে প্লেব্যাক করেছেন বহু জনপ্রিয় সিনেমায়, বিজ্ঞাপনে। প্রতিটি অ্যালবাম, প্রতিটি সিংগেল, প্রতিটি কনসার্টে চেষ্টা করে গেছেন নতুন কিছু উপহার দিতে। ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে এসেও প্রতিটি কনসার্টের আগে অন্তত একবার পুরো ব্যান্ডকে নিয়ে ফুল সেট রিহার্সেল করার। ক্যারিয়ারের প্রতিটি বাঁকে চেয়েছেন যেকোনো মূল্যে উঠতি শিল্পীদের সাহায্য করতে। “ডি-রকস্টার” থেকে শুরু করে “গেট, সেট, রক”, “সা টু সা”- উঠতি শিল্পীদের নিয়ে যেকোনো উদ্যোগে তাঁর উৎসাহ ছিল দেখবার মত। ট্রেডমার্ক কালো টুপি আর কালো সানগ্লাসে গীটার নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছেন কত আনকোরা, অচেনা ব্যান্ডের সাথে। তরুণ শিল্পীদের সাথে মিক্সড অ্যালবামে গান দিতেও কুণ্ঠা বোধ করেননি।
ইচ্ছা ছিল নিজের পর্বতসমান গীটার কালেকশানের সাথে আরও অনেক কিছু যোগ করে গড়ে তুলবেন এদেশের প্রথম মিউজিকাল মিউজিয়াম। বাইরের জগতের কোলাহল থেকে ছোট্ট একটা আশ্রয় ছিল তাঁর নিজের “এবি কিচেন”। রাত, গভীর রাত পর্যন্ত গীটারে ছন্দের জাল বুনে গেছেন আপন মনে। ইউটিউব ঘাটলে এখনও দেখা যাবে বিদেশের কত কনসার্টে ভাষার তোয়াক্কা না করে স্রেফ গীটারের ছয় তারে বশ করে ফেলেছেন হাজার হাজার দর্শক। কিন্তু যেখানেই যান নিজের শেকড়টাকে ভুলেননি।
২০১৪ টি-২০ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। নিজের দেশে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শো-স্টপার হিসেবে আনা হলো নামজাদা এক বিদেশী শিল্পীকে। আর্টিস্ট হিসেবে তাঁর সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্নই ওঠে না। আর স্টেজ ওয়ার্মার হিসেবে তখন পারফর্ম করছেন আইয়ুব বাচ্চু। ভিনদেশী, জগদ্বিখ্যাত সেই আর্টিস্টকে দেখতে হয়ত তর সইছিল না উপস্থিত দর্শকদের। হাততালি স্তিমিত, কণ্ঠ নির্লিপ্ত। তখনই মাইক কাছে টেনে আইয়ুব বাচ্চু বললেন-
"আপনারা যারা বাংলা গান শুনছেন তাদের অনেক ধন্যবাদ। আপনাদের হাত না চলুক, চোখ আর কান তো খোলা আছে? এতেই চলবে, হাততালি এখন খরচ করে লাভ নেই, এটা পরের জন্য রেখে দিন, চোখ কান খোলা আছে এটাই যথেষ্ট, আপনারা ধৈর্য ধরে বাংলা গান শুনছেন, তার জন্য অনেক ধন্যবাদ, আর একটি গান গাইবো কেবল..."
কতটা দুঃখ, কতটা ক্ষোভ জমা হলে একজন শিল্পীর বুক চিরে কথাগুলো বের হয়?
***
এমন অবহেলা সয়ে যেতে হয়েছে পুরো ক্যারিয়ার জুড়েই। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে ব্যান্ড সংগীত মানেই তো ছিল “অপসংস্কৃতির বাহক” , “বখাটেদের গান”। ইন্টারভিউতে বলেছেন শুরুর দিকে লাইভ পারফর্মেন্সে দর্শক ডিম, টমেটো মেরেছেন এমন নজিরও আছে। হোটেল, বারে গান গাওয়ার জন্যে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছে কত। এরপর প্রতিষ্ঠিত হলেও, স্বীকৃতি পেলেন আর কই? কখনই স্বীকৃতি, পুরষ্কারের ধার ধারতেন না। সেই তিনিই রাগে-দুঃখে সিনেমায় প্লেব্যাক করা ছেড়ে দিলেন। অনেক নির্মাতার তখন অরিজিনাল স্কোর লাগে না, ফুটপাত থেকে বেওয়ারিশ সিডি কিনে আনলেই কাজ সেরে যায়। অডিও পাইরেসির দৌরাত্মে অতিষ্ঠ হয়ে শেষ দিকে অ্যালবাম বের করার ইচ্ছাই হারিয়ে ফেলেছিলেন। লাভ দূরে থাকুক, খরচের টাকাটাও উঠে আসে না। ইন্টারনেট আসার পর থেকে তো কত গানের সাথে নামও হারিয়ে ফেললেন। পুরষ্কারের কথা তুললে একবার বলেছিলেন “আমার সবগুলা গীটার আগুন দিয়ে পুড়ায় ফেলতে ইচ্ছে করে”। আবার সমাজের কুলীন শ্রেণির কাছে তাঁর গান ভারে টেকে না। হাতে গোনা কিছু গান শুনেই বলে ফেলেন “বাচ্চুর গান তো বাজারি গান”। হায়, ইউরোপ ঘুরে Dire Straits, Clapton, Hendrix, Satriani বাজিয়ে যিনি কনসার্ট মাত করে দেন, তাঁর গায়ে দেশে জোটে বাজারি তকমা। ইন্সট্রুমেন্টালের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে ২০০৭ সালে বের করেছিলেন আগাগোড়া ইন্সট্রুমেন্টাল অ্যালবাম “Sound Of Silence”. বাংলা রক মিউজিকে এত পরিবর্তন, ভাঙাগড়ার মধ্যে দিয়ে গেলেও, এই অ্যালবাম অদ্বিতীয়। Western pop, rock খেলার ছলে যাই কাভার করেছেন, তাক লাগিয়ে দেবার মত। বাংলাদেশে মিউজিক যেখানে অনেকের কাছেই কৈশোরের দু’-চারটা খুচরো প্রেমের মত, সেখানে আইয়ুব বাচ্চুর সাধনা ছিল নিরলস। “রক্তগোলাপ”-এর সেই আধাখেঁচড়া পপ-মর্ডানের বিভ্রান্ত তরুণ ক্রমেই হয়ে উঠেছেন এপার-ওপার বাংলা মিলিয়ে সর্বকালের সেরা গীটারিস্টদের একজন। তাঁর সমসাময়িক অনেকেই অকপটে স্বীকার করে গেছেন ৮০-এর দশকে সবচেয়ে সিরিয়াস মিউজিসিয়ান ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। কি সোলস, কি LRB- ব্যান্ডের সবাই ফিরে গেলেও নিজ মনে প্র্যাকটিস করে গেছেন আইয়ুব বাচ্চু। আর দিনশেষে তাঁকেই শুনতে হত তিনি বাজারি গায়ক!
আইয়ুব বাচ্চুর লিরিকাল ধ্যান-ধারণা সোজা-সাপটা। কাব্যের হাওয়াই মিঠাই না পেঁচিয়ে অনেকটাই সহজ সুরে মনের কথাগুলো গীটারের নোটে তুলে দিতেন। তাই তো, আজ এত বছর পরেও “সেই তুমি”র আবেদন কমেনি এতটুকু। ল্যাণ্ডফোনের যুগে রুল করা চিঠির ভাঁজেই হোক আর হিম-শীতল কফিশপের চামচের ঘূর্ণিতেই হোক- প্রথম প্রেমের অধ্যায় বিচ্ছেদে শেষ হয় না। সেই বিচ্ছেদ পরিপূর্ণতা পায় গভীর রাতে “সেই তুমি”-র সুরে। বয়সের সাথে পুরোনো কথা মনে হলে হাসি পেলেও, গানের আমেজটা রয়ে যায় ঠিকই। এই শহরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম আসবে; বুড়িগঙ্গার তীরের মত ভাঙবে-গড়বে তাদের মন। ভাঙাগড়ার খেলায় তাঁদের পরিচয় হবে এই ৫৬ হাজার বর্গ মাইলে রূপালী গীটারের স্বপ্ন বয়ে আনা এক জাদুকরের কথা। শুধু এটুকুই আশা, জীবনকালে সেই জাদুকরকে প্রাপ্য সম্মান না দিতে পারলেও তাঁর মর্ম যাতে বুঝতে পারি। এতটুকু তো করতেই পারি, নাকি ?
🎂 শুভ জন্মদিন লিজেন্ড 🎂
হাসতে দেখো গাইতে দেখো
অনেক কথায় মুখোর আমায় দেখো
দেখো না কেউ হাসির শেষে নীরবতা।