Kingdom of Ghost

Kingdom of Ghost Most Horrible page in Bangladesh

09/01/2022
‘ভেজাল এফএম’ রেডিওতে আপনাদের স্বাগতম। আমরা এখন শুনব আবুল মিয়ার জীবনে ঘটে যাওয়া ভয়ংকর একটি ভূতের গল্প। দুর্বল চিত্তের শ্র...
12/07/2020

‘ভেজাল এফএম’ রেডিওতে আপনাদের স্বাগতম। আমরা এখন শুনব আবুল মিয়ার জীবনে ঘটে যাওয়া ভয়ংকর একটি ভূতের গল্প। দুর্বল চিত্তের শ্রোতাদের অনুরোধ জানাচ্ছি রেডিও বন্ধ করে কোলবালিশ নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ার জন্য। পরে কোনো সমস্যা হলে কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। আসুন তাহলে, আমরা শুনি আবুল মিয়ার ভূতের গল্প।

সেদিন ছিল আষাঢ় মাস। আমি বাজার কইরা বাড়ি ফিরতাছি। অমাবইস্যার রাইত। ঘুটঘুটা আইন্ধাইর। একহাত দূরের জিনিসও দেখা যায় না। তখন আবার ম্যালা রাইত। গ্রামের রাস্তা তো, একটা কাকপক্ষীও নাই। আমি তো ভয়ে অস্থির। আমার হাতে ছিল দুইখান ইলিশ মাছ। সাড়ে ৬০০ টাকা দিয়া কিনা। দাম চাইছিল দুই হাজার। আমি কইছি থাপ্পড় দিয়া তোর দাঁত ফালায়া দিমু হারামজাদা! চিনোস আমারে!

আমরা মূল গল্পে ফিরে আসি।

যা-ই হউক, ইলিশ মাছ নিয়া বাড়ি ফিরতাছি। ইলিশ মাছ আবার ‘তেনাগো’ বিশেষ পছন্দের জিনিস। সেই কারণে আমার ডর আরো বাইড়া গেল। অবশ্য এখনকার ইলিশে আগের সেই গন্ধ আর সুয়াদ (স্বাদ) নাই। ইলিশ আনতেন আমার নানাজান! আহা রে, কী গন্ধ! কী টেস্ট! আইনা নানিরে কইতেন, ‘ও করিমের মা...’

আমরা সে গল্প না হয় আরেক দিন শুনব।

যা-ই হউক। কিছু দূর হাঁটার পর হালকা চান্দের আলোতে দেখি, সামনে মিয়াবাড়ির বটগাছ দেখা যায়।

কিন্তু আপনি তো বললেন অমাবস্যার রাত!

ইশ! ভাইজান, আপ্নে বড়ই সমস্যা করেন। কইলাম না এইটা ভূতের গল্প। এইখানে চান্দ মিনিটের মধ্যে উঠব, মিনিটের মইধ্যে নামব। এত প্রশ্ন করলে কইলাম আমি নাই, ডাইক্কা আইন্না বেইজ্জতি।

আচ্ছা, আচ্ছা। আমরা ঘটনায় ফিরে আসি। আপনি বটগাছ দেখলেন...তারপর?

এই বটগাছের আবার বিরাট কাহিনি। এই গাছের ডালে ফাঁস দিয়া কুলসুমা মরছিল। আহারে কুলসুমা! দেখতে বড়ই সুন্দর ছিল। স্কুলে আইতে-যাইতে কুলসুমের সঙ্গে রং-তামাশা করতাম। ‘টুনির মা’ কইয়া ডাক দিতাম। কুলসুম কিছু কইত না। ডরে তার মুখ দিয়া কথাই বাইর হইত না। খিক খিক খিক।

কুলসুমার কথা বাদ দেন, গল্পে আসেন।

যা-ই হউক, পূর্ণিমার রাইত, সব কিছু পষ্ট দেহা যাইতাছে। আতকা দেখি, আমার সামনে একটা কালা বিলাই। আমি বুঝলাম, এইটা কুলসুমা ছাড়া আর কেউ না। আমারে শাস্তি দিতে আইছে। আমি মাথা ঠাণ্ডা রাইখা কইলাম, ‘তুমি আমারে মাফ কইরা দ্যাও।’ বিলাইয়ে কয়, ‘ম্যাও’। বড়ই আজিব ব্যাপার! এই দিকে ‘ভাদ্র’ মাসের গরমে আমি ঘামে ভিইজা জুবজুবা। কুলসুমারে (বিলাই) কইলাম, ‘আমি আর জিন্দেগিতে কোনো মাইয়ার দিকে চউখ তুইলা তাকামু না, কেউরে মিসকল দিমু না, বাড়ি যাইতে দ্যাও।’ কুলসুমা কয়, ‘ম্যাও’। এমন সময় শুনি, পেছনে বেটা মাইনষের গলার আওয়াজ। আমি আপনাদের অনুষ্ঠানের মতো কইরা ডাক দিলাম, ‘কেডা? কেডা ওনে?’ আওয়াজ আইল—‘জি, আমি রহিম। ভালা আছেননি, ভাই?’ রহিমরে দেইখা আমার জানে শান্তি আইল। আবার লগে ডরও লাগল। এত রাইতে রহিম এইহানে কী করে? সামনে তাকায়া দেখি, কুলসুমা (কালা বিলাই) নাই! তহন আমার মনের সন্দেহ আরো বাইড়া গেল। তাইলে কি বিলাইটা রহিমের রূপ ধইরা আইল? আমি তাকায়া দেহি, আমাগো রহিমের মতো এই রহিমের শইল্যের রং ধলা না, কালা! বিলাইয়ের রংও কালা আছিল। কুলসুমার গায়ের রংও কালা আছিল। দুইয়ে দুইয়ে চাইর হইতে সময় লাগল না।

তারপর?

তয় আমি যে ভয় পাইছি, সেইটা রহিমরে (না কুলসুমার আত্মা?) মোটেও বুজবার দিলাম না। একবার যদি ব্যাটা টের পায় আমি ভয় পাইছি, আমার ঘাড় মটকাইয়া খাইব। আমি জোরে জোরে হাঁটতে থাকলাম। বাড়ি আমার আরো মিনিটদশেকের পথ। কেমতে যে যাই! এই দিকে রহিম আমার পিছ পিছ হাঁটতাছে।

খুবই ডেয়ারিং স্টোরি। তারপর?

রহিমের সঙ্গে হালকা গপসপও করা শুরু করলাম। এর মধ্যে দুইবার রহিম জিগাইল, আমার ব্যাগের মধ্যে কী? আমি কিছু কইলাম না। ও যদি একবার টের পায় ইলিশ মাছ, তাইলে আমার আর বাঁইচা থাহনের কোনো আশা নাই। কিছু সময় পর আমি রহিমরে কইলাম, চইত্র মাসের গরম টের পাইতেছ রহিম? কেমুন গা জ্বলতাছে? কিন্তু পেছনে কোনো উত্তর নাই! আমি কইলাম, ‘ও রহিম, রহিম!’ উত্তর নাই। পেছনে তাকায়া দেহি, রহিম নাই। আমার ধারণাই সত্যি হইলো। আমি জানের ডরে উইঠা দিলাম দৌড়! কুলসুমার ভূত আবার কোন সময় চইলা আসে ঠিক নাই।

সত্যি সত্যিই দৌড় দিলেন?

সত্যি না তো কি মিথ্যা? আজিব প্রশ্ন! তারপর শুনেন। এমন সময় পেছন থাইকা শুনি, রহিমের গলা—‘ও মিয়া ভাই, ও মিয়া ভাই।’ কুলসুমার ভূত আবার চইলা আইছে। আমি দৌড় থামাইলাম না। জানের শক্তি দিয়া দৌড়াইতে থাকলাম। কুলসুমার ভূত ‘রহিম’ও আমার লগে দৌড়াইতে থাকল। আর কইতে থাকল—‘ও মিয়া ভাই, আমারে লইয়া যান, আমারে লইয়া যান।’ আরে আমি কি আর এতই বোকা যে ওরে লইয়া যামু? শেষে দৌড়াইতে দৌড়াইতে বাড়ি আইসা পৌঁছাইলাম। এখন আর আমার কোনো ডর নাই! এমন সময় কুলসুমার ভূত রহিমও আইসা উপস্থিত। আমি কইলাম—‘কুলসুমা’, তুই এইহান থাইকা যা। নইলে কিন্তু আমি গেন্দা ওঝারে ডাকমু।

ভূত কী কইল?

ভূত রহিম কইল, ‘ও ভাইজান, আপনের কী হইছে, আমারে কুলসুমা কন ক্যান?’ আমি ভালো কইরা খেয়াল কইরা দেখলাম, রহিমের শরীরের ছায়া মাটিতে পড়তেছে। তার মানে এইটা ভূত না, ভূতের শরীরের কোনো ছায়া থাকে না। এইটা আসলেই রহিম। আমি রহিমরে কইলাম, ‘আমার পেছন থাইকা আতকা তুই গেসিলি কই?’

রহিম শরমের হাসি দিয়া কইল, ‘পিশাব পাইছিল ভাই।’ আমি কইলাম, ‘শালা কইয়া যাবি না?’ রহিম কইল, ‘ক্যাম্নে কমু ভাই? এই সব কতা কইতে শরম লাগে; কিন্তু আপ্নে দৌড় দিলেন ক্যান? কী হইছিল?’ আমি সত্য ঘটনা না কইয়া কইলাম, ‘কিছু না, মনে হয় কুলসুমারে দেখছিলাম, তাই দৌড় দিলাম।’

ও অবাক হইলো না?

না, উল্টা রাগ কইরা কইল, ‘তাই বইলা আমারে রাইখা দৌড় দিবেন? যে ভয়ডা পাইছিলাম। যা-ই হউক, একখান লুঙ্গি দেন।’ আমি জিগাইলাম, ‘লুঙ্গি চাস কেন?’ রহিম আবারও শরমের হাসি দিয়া কইল, ‘অর্ধেক কামের মধ্যে আপনে উইঠা দিলেন দৌড়। আমিও দিলাম দৌড়। বাকি অর্ধেক দৌড়াইতে দৌড়াইতেই...’

আমি কইলাম, ‘ছি, রহিম! তুই এত ডরাস? তোরে আমার ছুটো ভাই পরিচয় দিতেই লজ্জা করব। যাউক গা, লুঙ্গি বদলাইয়া বাড়িত যা, কাইলকা ফেরত দিছ।’ রহিম লুঙ্গি লইয়া বাড়িত চইলা গেল। আমিও খেতা মুড়ি দিয়া আরামসে ঘুমাইতে গেলাম। আর ভাইবা দেখলাম, রহিম যদি সময়মতো না আইত, তাইলে ওই কুলসুমার ভূত ‘কালা বিলাইটা’ আমারে জানে মাইরা ফেলত। কার দোয়ায় বাঁইচা আইছি কে জানে?

কালের কণ্ঠ-আদিত্য রহিম

আমি তখন ঢাকা কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি, হোস্টেলে থাকি। বাবা কুমিল্লার ডিএসপি, ঠাকুরপাড়ায় বিশাল দোতলা বাসা। বাসার সামনে মা...
10/07/2020

আমি তখন ঢাকা কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি, হোস্টেলে থাকি। বাবা কুমিল্লার ডিএসপি, ঠাকুরপাড়ায় বিশাল দোতলা বাসা। বাসার সামনে মাঠ, পাশে পুকুর। হোস্টেলে থাকতে থাকতে যদি মন কেমন কেমন করে, তাহলে বিআরটিসির বাসে করে কুমিল্লায় বাসায় চলে আসি। এক-দুই দিন থেকে আবার ফিরে যাই।
সেরকমভাবে আমি হুট করে কুমিল্লা এসেছি, আমি একা নই, আমার সঙ্গে আমার কলেজের বেশ কয়েকজন বন্ধু আছে। আমার বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, বাসায় এসে দেখি সেও আছে। বাসায় অনেক মানুষ থাকলে যা হয় তাই হলো, সারা দিন গল্পগুজবে কেটে গেল। আমাদের বাসায় গল্পগুজব হলে ঘুরেফিরে সেটা ভূতের গল্পে গিয়ে জায়গা নেয়। আমার বাবার এসব ব্যাপারে খুব কৌতূহল, তাই বাসাভর্তি ভূত-প্রেত, জ্যোতিষচর্চা এসবের বই। আমরা সব ভাইবোন জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে হাত দেখেছি, প্ল্যানচেট করে চক্রে বসে ভূত নামিয়েছি। কাজেই এবারও গল্পগুজব ভূতের গল্পে আটকা পড়ে গেল। তখন আমার কলেজের বন্ধুরা বড় ভাই হুমায়ূন ভাইকে ধরে বসল, তাদের ভূত এনে দেখাতে হবে। হুমায়ূন আহমেদ রাজি হলো—ঠিক হলো রাত ১২টায় চক্রে বসা হবে।
সময় কাটানোর জন্য আমি আর আমার বন্ধুবান্ধব সেকেন্ড শো সিনেমা দেখতে গিয়েছি। আমরা যে খুব সিনেমার পোকা তা নয়, কিন্তু বড় ভাইয়ের উৎসাহে গিয়েছি, ভালো ছবি নাকি দেখাচ্ছে।
রাতে বাসায় ফেরার পর ভূত নামানোর জন্য আমরা চক্রে বসেছি। দোতলা বাসার নিচের তলায় কেউ থাকে না, সেখানে একটা বড় ঘর পরিষ্কার করা হয়েছে। মেঝেতে পরিষ্কার চাদর বিছানো হয়েছে, আমরা সবাই হাত-মুখ ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে গোল হয়ে বসেছি। বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ ঘরের চারকোনায় চারটা মোমবাতি জ্বালিয়ে দিল, মোমবাতির মৃদু আলোতে একটা ভৌতিক পরিবেশ চলে এসেছে। আমরা কেউ জোরে কথা বলছি না। হুমায়ূন আহমেদ আমাদের ফিসফিস করে নিয়মকানুন বলে দিল, ‘তোমরা কেউ ভয় পাবে না। প্রেতাত্মা যদি চলে আসে, আমাদের কারও ওপর সেটা ভর করবে। তার সঙ্গে শান্তভাবে কথা বলবে।’
আমার এক বন্ধু জিজ্ঞেস করল, ‘এসেছে কি না কেমন করে বুঝব?’
‘অনেকভাবে বোঝা যায়। হয়তো মোমবাতিগুলো নিভে যাবে। হয়তো ঘরে একটা তীব্র গন্ধ পাবে, ঘরটা শীতল হয়ে যাবে। হয়তো কেউ একজন থরথর করে কাঁপতে থাকবে।’
তার থমথমে গলার স্বর শুনেই আমাদের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়।
হুমায়ূন আহমেদ বলল, ‘তোমরা সবাই এখন পরকাল নিয়ে চিন্তা করো, মৃত কোনো মানুষের আত্মাকে আহ্বান করো।’
আমরা গোল হয়ে বসে অন্যের হাত ধরে মৃত মানুষের আত্মাকে আহ্বান করতে থাকি, ঘরের ভেতরে আমাদের নিঃশ্বাস ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। হঠাৎ একটা বিচিত্র ব্যাপার ঘটতে থাকে, মোমবাতিগুলো হঠাৎ করে নিভু নিভু হয়ে যায় আর একসঙ্গে সব মোমবাতি নিভে গেল।
বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ ফিসফিস করে বলল, ‘এসেছে! কেউ একজন এসেছে! কিছু একটা এসেছে। কেউ ভয় পাবে না।’
তখন ভয়ে হাত-পা আমাদের শরীরের ভেতর সেঁধিয়ে যাচ্ছে। আর কী আশ্চর্য, ঠিক তখন শুনতে পেলাম বাসার পাশে যে গাছ, সেই গাছের ডাল নড়তে শুরু করেছে, জানালার মাঝে গাছের ডালগুলো জীবন্ত প্রাণীর মতো হুটোপুটি খাচ্ছে। আমরা ভয় পেয়ে আর্তচিৎকার করে উঠি, ‘কী হচ্ছে? কিসের শব্দ?’
হুমায়ূন আহমেদ বলল, ‘চলো। বাইরে গিয়ে দেখি।’
আমাদের কারও বাইরে যাওয়ার সাহস নেই, তার পরেও হুমায়ূন আহমেদের পিছু পিছু বাইরে এলাম। আবছা অন্ধকার, কোথাও বাতাস নেই, তার মাঝে শুধু একটা গাছের ডাল জীবন্ত প্রাণীর মতো নড়ছে, হুটোপুটি খাচ্ছে। ভয়ে আতঙ্কে অস্থির হয়ে আমরা একজন আরেকজনকে ধরে কাঁপছি। বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ বলল, ‘ভয় পাবে না। কেউ ভয় পাবে না—হক ভাইকে ডেকে তুলে আনি।’
হক ভাইয়ের পুরো নাম আবদুল হক, বাবার অফিসের অর্ডারলি, বাসার সামনে ছোট একটা আলাদা টিনের ঘরে থাকেন। ধর্মভীরু মানুষ, কারও সাতেপাঁচে নেই। আমাদেরও মনে হলো, এই আতঙ্কময় মুহূর্তে তাঁকে ডেকে আনলে মন্দ হয় না, আমরা তাঁর ঘরের কাছে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দিলাম আর সঙ্গে সঙ্গে একটা বিচিত্র ব্যাপার ঘটল। হক ভাই দরজা খুলে গুলির মতো বের হয়ে এলেন, গোঙাতে গোঙাতে এগিয়ে এলেন। আমরা ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হয়েছে হক ভাই, কী হয়েছে?’
হক ভাই কথা বলতে পারেন না, ভয়ে থরথর করে কাঁপছেন, অনেক কষ্ট করে বললেন, ‘আ আ আমার ঘরে...’
‘আপনার ঘরে কী?’
‘আমার ঘরে একটা মানুষ। ঘরের ছাদের সমান লম্বা। নিচু হয়ে তাকিয়ে আছে। হায় আল্লাহ!’
ঠিক তখন হঠাৎ করে গাছের ডাল ভয়ংকরভাবে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল, তারপর হঠাৎ চারদিক নীরব হয়ে গেল। হুমায়ূন আহমেদ কাঁপা গলায় বলল, ‘আমার মনে হয় একটা খারাপ প্রেতাত্মা চলে এসেছে, আমরা আর কিছু না করে এখানেই শেষ করে দিই।’
আমরা মাথা নাড়লাম, ‘হ্যাঁ। আর কিছু করার দরকার নেই।’
‘যার যার মতো গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। কাউকে কিছু বলার দরকার নেই।’
আমি ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে ওপরে গেলাম, গরমের দিন। ফ্যান চালিয়ে ভাইবোনেরা মেঝেতে শুয়ে ঘুমিয়ে আছে। আমি গুটিসুটি মেরে তাদের দুই দিকে ঠেলে একটু জায়গা করে শুয়ে পড়লাম।
ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখি আমাদের কাউকে চেনা যায় না। ভয়ে আতঙ্কে একেকজনের উদ্ভ্রান্ত চেহারা, উষ্কখুষ্ক চুল, চোখ গর্তে ঢুকে গেছে, রক্তশূন্য ফ্যাকাশে মুখ।
আমরা ঢাকায় ফিরে এলাম। আমার অন্য বন্ধুদের কথা জানি না, কিন্তু আমি পাকাপাকিভাবে ভীতু হয়ে গেলাম। রাতে ঘুমাতে পারি না, চোখ বন্ধ করলেই মনে হয় মাথার কাছে ছাদের সমান লম্বা একটা মানুষ তীব্র চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, চোখ দুটো ধকধক করে জ্বলছে।
যারা ভূতের গল্প শুনতে পছন্দ করে, তাদের জন্য বলছি, গল্পের বাকি অংশটুকু পড়ার প্রয়োজন নেই। এখন পর্যন্ত যেটুকু বলা হয়েছে, তার প্রতিটি অক্ষর সত্যি—অবিশ্বাস্য হতে পারে, কিন্তু সত্যি।

অনেক দিন পর বাসার সবার সঙ্গে কথা হচ্ছে, আমি কী একটা প্রসঙ্গে সহজ-সরল হক ভাইকে নিয়ে একটা কথা বলেছি। আমার মা মুখ টিপে হাসলেন, বললেন, ‘হক ভাইকে বেশি সহজ-সরল মনে হচ্ছে? অ্যাকটিং দেখে তো সেটা বলিসনি!’
‘অ্যাকটিং!’ আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কিসের অ্যাকটিং?’
তখন সবাই হি হি করে হাসতে শুরু করে। সেই ভয়ংকর ভৌতিক রাতটি ছিল হুমায়ূন আহমেদের নেতৃত্বে বাসার সবার সম্মিলিত একটা ষড়যন্ত্রের ঘটনা। আমাদের জোর করে সেকেন্ড শো সিনেমা দেখতে পাঠিয়ে বাসায় ব্যবস্থা করা হয়েছে। গাছের ডালের সঙ্গে দড়ি বেঁধে দোতলায় ভাইবোনেরা সেটা ধরে টেনে গাছ নড়িয়েছে। হুমায়ূন আহমেদের পরিচালনায় হক ভাই অনবদ্য অভিনয় করেছেন।
আমি আমতা আমতা করে বললাম, ‘মোমবাতি? মোমবাতি কেমন করে নিভে গেল?’
হুমায়ূন আহমেদ হাসল, ‘খুবই সোজা। মোমবাতির সুতাটা কেটে রাখা হয়েছে। ঠিক সময়মতো নিভে গেছে।’
আমি হতবাক হয়ে হুমায়ূন আহমেদ আর তার বিশাল ষড়যন্ত্রীর দল আমার বাবা-মা ভাইবোনের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
হুমায়ূন আহমেদের এ রকম গল্প একটি-দুটি নয়, শত শত! জীবনটা একঘেয়ে হলে সেটা মেনে নিতে হবে কে বলেছে? জীবনটাকে চোখের পলকে রঙিন করা যায়, চমকপ্রদ করা যায়—তার মতো সেটা কে পারত?
কেউ না।

সেদিন ক্লাস শেষে‌ ফিরতে একটু দেরি হয়েছিল।তার ওপর কিছু টা পথ আসতেই হঠাৎ প্রচন্ড ঝড় শুরু হল ।আমার স্কুল‌ যাওয়ার পথে একটা ফ...
09/03/2020

সেদিন ক্লাস শেষে‌ ফিরতে একটু দেরি হয়েছিল।তার ওপর কিছু টা পথ আসতেই হঠাৎ প্রচন্ড ঝড় শুরু হল ।আমার স্কুল‌ যাওয়ার পথে একটা ফরেস্ট পরে,আমি ঝড়ের সময় ওই ফরেস্টের পথ ধরেই হাঁটছিলাম।ঝড়ের বেগ এতটাই ছিল যে চোখের সামনে দুটো বড়ো আকারের গাছ ভেঙে পড়ল।এক ভদ্রলোক আমার পেছনে বাইকে চেপে আসছিলেন,উনি আমায় দেখে বললেন,আমার যদি আপত্তি না থাকে তবে উনার কোয়াটারে যেতে,উনি নাকি এই ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে চাকরিরত।আমিও আর কোন অপশন না দেখে রাজি হয়েগেলাম। পাশেই ছিল উনার কোয়াটার।



দেখলাম বেশ পুরনো বিল্ডিংটি,একজন ভদ্রমহিলা দরজা খুলে আমাদের দেখে এক গাল হাসি নিয়ে ঘরে বসতে দিলেন,বুঝলাম ইনি ওই ভদ্রলোকের স্ত্রী।উনি চটজলদি দুই কাপ গরম-গরম চা এনে আমাদের দিলেন, আমার এখন এটারই খুব দরকার ছিল।যাইহোক এবার ওই ভদ্রলোক নিজের পরিচয় জানালেন উনার নাম রাজেন্দ্র নাথ সরকার স্বপরিবারে উনারা এখানে থাকেন। আমার দিকে কাপ টা এগিয়ে দিয়ে, তা মাস্টামশাই আপনি এখানে কতদিন,শহুরে মানুষ হয়ে এই গ্রাম্য এলাকায় মানিয়ে নিতে আপনার অসুবিধে হচ্ছে না!উনি আমার দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন,আমি একটু অবাক হয়েই বললাম,আপনি আমায় চেনেন নাকি! সে তো একটু খোঁজ খবর রাখতে হয় আর কি,উনি বললেন ।এরই মাঝে মিসেস সরকার বছর চারের একটি বাচ্চা মেয়ে কে কোলে নিয়ে আমাদের সাথে চায়ের টেবিলে যোগ দিয়েছেন । আমার মাস সাতেক হলো এই চাকরির ,তো আপনারা কতোদিন এখানে…? রাজেন্দ্র বাবু,আমরা সেই নব্বই সাল থেকে এখানে। এখন এ জায়গাটার উপর একটা মায়া পড়ে গেছে।

সে তো অনেক বছর হয়েগেছে এখানে,এই ফরেস্ট এলাকায় একা ফ্যামিলি নিয়ে থাকেন আসে-পাশে আর তো কেউ থাকে না মনে হচ্ছে,ভয় করে না আপনাদের? মিসেস সরকার,কি করব আর বলুন ইচ্ছে তো ছিলো অনেক কিছুই; এই যে আমাদের মেয়ে টিয়া, ওকে শহরে একটা ভালো স্কুলে ভর্তি করবো,মনের মত করে ওকে বড়ো করবো কিন্তু… রাজেন্দ্র বাবু,জানেন তো আমার বদলির চিঠি এসেছিল কিন্তু আর কোথায়…. যাওয়াই হল না, মৃত্যুর পরেও হয়তো আমাদের আর ঠিকানা বদল হবে না। হাহাহা….
আমি দেখলাম ঝড় থেমেছে,এবার আমায় ফিরতে হবে।উনারা আমায় বিদায় জানাতে জানাতে বললেন আবার কখনো পথ ভুলে আসবেন আমাদের ঘরে,এ পথে তো কেউ আর আসেনা,আপনি এলেন আমাদের খুব ভালো লাগল… আবার এলে বেশ জমিয়ে গল্প হবে আর সেদিন রাতের খাবার খেয়ে যেতে হবে কিন্তু….।উনি আমায় উনার বাইকে ওই ফরেস্টের পথ পার করিয়ে বড়ো রাস্তা অবধি এগিয়ে দোয়েছিলেন। আমি উনাদের আপ্যায়নে মুগ্ধ কি অমায়িক র্ব্যবহার।

পর দিন স্কুলে আমার কলিগদের সাথে গতকালের ঘটনা আলোচনা করলে উনারা সকলে আমার কথা শুনে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি শুরু করে…একজন সিনিয়র সোমনাথ বাবু আমায় বললেন,সৌভিক তুমি আর ওই ফরেস্টের পথে যেওনা,আমি বিস্মিত ভাবে জানতে চাইলাম কিন্তু কেন??? সোমনাথ বাবু,”সৌভিক… তুমি যাদের কথা আমাদের বললে আজ থেকে দুবছর আগে উনাদের কোয়াটারে এক দুঃসাহসিক ডাকাতি হয়,,ডাকাত দল উনাদের সর্বস্ব লুট করে নিয়ে যায় আর যাওয়ার সময় রাজেন্দ্র নাথ বাবু ওনার স্ত্রী আর চার বছরের মেয়েকে নৃশংস ভাবে হত্যা করে”।বিশ্বাস না হলে এই দেখ..একটি পুরনো খবরের কাগজ আমার সামনে এগিয়ে দিলেন। ছবিসহ খবর টি কাগজে বেরিয়ে ছিল ।
আজও যখন ঝড় হয় আমার সেদিনের সমস্ত স্মৃতি জীবন্ত হয়ে ওঠে..।

সমাপ্ত

গুড লাক নার্সিং হোমের চতুর্থ তলায় ICU-র ৪১২ নম্বর বেডের ভেন্টিলেশনে থাকা রুগী ৬৫ বছরের আবিরকে দেখে নিজের ঘরে ফিরলেন ডঃ ...
08/03/2020

গুড লাক নার্সিং হোমের চতুর্থ তলায় ICU-র ৪১২ নম্বর বেডের ভেন্টিলেশনে থাকা রুগী ৬৫ বছরের আবিরকে দেখে নিজের ঘরে ফিরলেন ডঃ মিত্র। ঘরে একজন ভদ্রমহিলা বসে। ডঃ মিত্র কে দেখে হাত জোড় করে নমস্কার করে উঠে দাঁড়ালেন। নিজের চেম্বারে একজন অপরিচিত মহিলাকে দেখে একটু বিব্রত ও বিরক্ত বোধ করলেন ডঃ মিত্র। নিয়মরক্ষার প্রতিনমস্কার অত্যন্ত দায়সারা ভাবে সেরে জিগেস করলেন, “কি ব্যাপার? ঠিক চিনতে পারলাম না”।
ভদ্রমহিলা বললেন, “আমার নাম রুমা। আমার স্বামী অাবির আজ এক সপ্তাহ হলো ভেন্টিলেশনে। তার ব্যাপারেই জানতে এসেছি।”
ডঃ মিত্র বেশ একটু ঝাঁঝিয়ে উঠলেন,”তা এখানে কেন? আমার তো পেশেন্ট পার্টিকে মিট করার ডিফাইনড টাইম রয়েছে। ওই সময় আসুন। এটা আউটডোরের সময়। বাইরে রুগীর লম্বা লাইন”……
রুমা গলা নামিয়ে বললেন, “আমি দুঃখিত। কিন্তু আমার আর সময় হবে না। তাই এখনই জানতে চাই।”
ডঃ মিত্র দেখলেন কথায় কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। তাই স্পষ্ট বলে দিলেন, “খুব একটা আশা দেখছিনা। ব্রেনটা পার্শিয়ালি ডেড। সার্ভাইভ করার চান্স খুবই কম। তাও চেষ্টা চালাচ্ছি”
– “কিন্তু আর কতদিন?” জানতে চাইলেন রুমা
– “সেকি আর বলা যায়? যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষন আশ”
রুমা এবার একটা অদ্ভুত কথা বলে বসলেন। কিছুক্ষন ডঃ মিত্রের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিগেস করলেন,”শ্বাস কি আর আছে?”
এ প্রশ্নের জন্যে ডঃ মিত্র প্রস্তুত ছিলেন না। একটু রেগেই বললেন,” কি বলতে চাইছেন আপনি?”
রুমা সেই একই রকম নির্বিকার ভাবে বললেন, “ওকে মুক্তি দিন। আজ পাঁচদিন হলো ও চলে গেছে”
ডঃ মিত্র চোখের চশমাটা খুলে টেবিলে ছুঁড়ে ফেলে বললেন, “এতই যদি জানেন তো নিয়ে গিয়ে নিজে চিকিৎসা করলে পারতেন”
রুমা আবার বললেন “পারলে তাই করতাম। উপায় ছিলোনা। এখন বলুনতো কিভাবে ওকে নিয়ে যাওয়া যাবে?”
ডঃ মিত্র মেজাজ সপ্তমে চড়িয়ে বললেন “বন্ড সই করে দিন আর সব মিলিয়ে আজ অবধি ১২ লক্ষ বিল হয়েছে মিটিয়ে দিন” রুমা গণৎকারের মতো বললেন,”নার্সিং হোমে ভর্তির দুদিনের মধ্যে ও মারা যায়। তারপর থেকে আপনারা আরো পাঁচ দিন ভেন্টিলেটর লাগিয়ে রেখে টাকা লুটছেন। ওই দুদিনে সব শুদ্ধু ১ লক্ষ ২৫ হাজার বিল হয়েছে। সেটা আপনাকে দিয়ে দিচ্ছি”
ডঃ মিত্র বেশ রাগের সাথে বললেন,”আপনাকে আমি কোনোদিন দেখিনি। ওঁর ছেলে এসে ভর্তি করেছিল। আমি আপনার এই প্রলাপ শুনতে বাধ্য নই। সেরকম হলে………..”
কথা শেষ করতে পারলেন না ডঃ মিত্র। মোবাইল বাজছে।
-” হ্যালো। ডঃ মিত্র স্পিকিং ”
– “নমস্কার আমি ICU ৪১২ নম্বর বেডের পেশেন্ট আবির বাবুর ছেলে বলছি”
– “অরে মশাই আপনার মা এখানে কি উপদ্রব শুরু করেছেন। এভাবে কি চিকিৎসা করা যায়? উনি এমন ভাব দেখাচ্ছেন যে রুগীর সব তথ্য ওনার জানা। আমি পরিষ্কার বলে দিচ্ছি এভাবে নার্সিং হোমে ঝামেলা করলে আমি পুলিশ ডাকতে বাধ্য হব”
-“কি বলছেন ডাক্তারবাবু। মাকে পেলেন কোথায়? তিনি তো পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন!”
– “কি যাতা বলছেন। আমার সামনে এখনো দাঁড়িয়ে”
-“কোনো ফ্রড হবে। একদম ওঁর কোনো কথা শুনবেননা। আমি আসছি”
ফোন রেখে ভদ্রমহিলার দিকে এবার ব্যঙ্গ ভরা একটা হাসি দিলেন ডঃ মিত্র।
বললেন,” একটু বসুন। আপনার ছেলে আসছে। তারপরেই নয় ফয়সালা হোক!”
রুমা বললেন,” ডঃ মিত্র, আমার ছেলে আসার আগে আমি চলে যাবো। আমার জন্য আমার স্বামী বাইরে অপেক্ষা করছেন। ওঁর দেহটা আপনার দেয়া ভেন্টিলেটরে থাকলেও আজ গত পাঁচ দিন ধরে ও আবার আমার সাথেই থাকছে। দেখা করতে চান? ওই দেখুন”……………..
এক ঝটকায় ঘুরে তাকালেন ডঃ মিত্র। দেখলেন রুগী দেখার ছোট্ট বিছানাটায় বসে আছেন আবির। যার মৃত শরীরকে একটু আগেই ভেন্টিলেটরে দেখে এসেছেন তিনি। তার কপালে ততক্ষনে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। রুমাল দিয়ে মুছতে মুছতে বললেন,” এ সবের মানে কি?”
এবার আবির মুখ খুললেন। “কি লাভ হলো আপনার আমার ছেলেকে এভাবে সর্বসান্ত করে? সামান্য মাইনের চাকরি করে। কোথায় পাবে এতো টাকা? আপনি ডাক্তার না ডাকাত?”
রুমা বললেন, “তবে একেবারে নিরাশ করবোনা। হাতের এক গাছা চুড়ি দিয়ে যাচ্ছি। ওর পার্থিব শরীরটাকে এবার মুক্তি দিন।”
দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ডঃ মিত্র। মুখ বেঁকে গেছে। তারপর যে দৃশ্য দেখলেন তাতে তার হৃদস্পন্দন চতুর্গুণ হয়ে গেলো। শাড়ির নিচ থেকে বেরিয়ে এলো দুটি শীর্ণকায় হাত। সে হাতে চামড়া নেই। আছে কিছু হাড় আর তাতে পরা কয়েকগাছা সোনার চুড়ি।”
-“নানা চাইনা। চাইনা আমি!” চিৎকার করে উঠলেন ডঃ মিত্র।
আবির আর রুমা ততক্ষনে এগিয়ে এসেছেন। দুজনেই প্রায় একসাথে জিগেস করলেন, “কেন ডাক্তারবাবু, টাকা রোজগার করবেন না? এই তো সুযোগ। কই নিন। হাত থেকে চুড়ি খুলে নিন”
-“না আআআআআ।” বলে একটা তীব্র আর্তনাদ করে উঠলেন ডঃ মিত্র।
এর পরের দৃশ্যটা আরও সাংঘাতিক। ঘরের আনাচে কানাচে দাঁড়িয়ে রয়েছে আরও কয়েকজন। এদের ডঃ মিত্র চেনেন। এরা ওঁরই পেশেন্ট, যারা এখন মৃত। সবার সাথেই এভাবে ব্যবসা করেছেন ডঃ মিত্র। মৃত্যুর পরেও সে খবর বাড়ির কাউকে না জানিয়ে, ভেন্টিলেশনে রেখে প্রেস্ক্রাইব করে গেছেন দামি ওষুধ ও ইঞ্জেকশন। আজ তারা সবাই এসেছে কৈফিয়ত নিতে।
অনুভব করলেন দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে আসছে। পায়ের জোর হারাচ্ছেন। মাথা ঝিমঝিম করছে। জ্ঞান হারালেন ডঃ মিত্র।
ডঃ ঘোষ এসে নাড়ি দেখে বুঝলেন ডঃ মিত্র আর নেই। কিন্তু এই তো মওকা; মিত্র অনেক টাকার মালিক।নার্সকে বললেন “বাড়ির লোককে খবর দাও। কন্ডিশান খুব সিরিয়াস। ভেন্টিলেশনে দিচ্ছি।”
ডঃ মিত্রের মৃত শরীরটা ভেন্টিলেশনে ঢুকিয়ে ডঃ ঘোষ নিজের ঘরে ফিরলেন। দরজাটা খুলেই চমকে উঠলেন। টেবিলের উল্টোদিকে বসে এক দৃষ্টে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছেন সদ্য প্রয়াত ডঃ মিত্র।
ডঃ ঘোষ অনুভব করলেন তাঁর দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে আসছে। পায়ের জোর হারাচ্ছেন।

মাথা ঝিমঝিম করছে। এবার জ্ঞান হারালেন ………….

সমাপ্ত

গ্রামে বেড়াতে গিয়েছিলাম ফাল্গুন এর শেষ দিকটায়।তখনো গ্রামে খুব শীত।মামা বাড়িতে গিয়েছিলাম।মামা বাড়ি থেকে ২০মিনিট এর দূরত্ব...
13/02/2020

গ্রামে বেড়াতে গিয়েছিলাম ফাল্গুন এর শেষ দিকটায়।তখনো গ্রামে খুব শীত।মামা বাড়িতে গিয়েছিলাম।মামা বাড়ি থেকে ২০মিনিট এর দূরত্বেই আমার খালার বাসা।নানু আমায় তার বাসায় রেখে বললেন কাল এসে নিয়ে যাবে।রাত কিছুটা বাড়তেই লক্ষ করলাম আমার ফোনটা আমি মামা বাড়িতেই রেখে এসেছি।খালাকে বললেও বলবে কাল সকালে নিয়ে আসবে।আর এখন রাত মাত্র ৯:৩০।আমি গিয়ে চলে আসতে পারবো।খালাকে বললাম আমি একটু উঠনে ঘুরে ফিরে আসি।বাইরে জোসনা আছে আধা ঘন্টার মাঝেই চলে আসবো।খালা আমার সাথে তার ছোট ছেলেকে নিতে বললেন আমি বললাম আরে উঠনেই তো।শুধু তোমার ফোনটা দেও।হাতে থাক।

খালার ফোনটা নিয়ে নানু বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা হলাম।বাচ্চা থেকেই আমি বেশ সাহসী।আর এই সময় পথে লোক ও পেয়ে যাব।কিছুটা যেতেই আশাপাশে ঝি ঝি পোকার শব্দ।আর মনে হচ্ছে আমার পিছন পিছন কেউ হাটছে।পিছনে তাকাতেই কেউ নেই।মোবাইলের আলোয় সামনের পথ পরিস্কার।পথের পাশেই ছোট একটা নদী।নদীতে কাউকেই দেখা যাচ্ছেনা। আমি না চাইতেও আমার সব শরীর ঘেমে যাচ্ছে।বাইরে এতো বাতাস তবুও এমন গরম লাগার কারন আমি খুঁজে পাচ্ছিনা।কেউ নেই আশেপাশে।কোন আলো নেই।হঠাৎ করে ফোনের আলোটাও নিভে গেলো। এখন শুধু চাঁদের আলোয় পথ পাড়ি দেয়ার বাকি।আমি এমন জায়গায় এসে পরেছিলাম খালার বাসা আর মামার বাসা দুটোই সমান দূরত্ব।এখন ফিরে যেতেও পারছিনা।কেন যেন এই প্রথম খুব ভয় করছে।হঠাৎ ই খেয়াল করলাম আশেপাশের সবকিছু নিরব শুধু পাশের একটি গাছ নড়ছে খুব।বাতাস নেই ঝড় নেই তবুও বেশ নড়ছে।আমি ঠায় দাড়িয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে আছি।মনে হচ্ছে গাছটা আমার উপর ভেঙে পরবে।বার বার কি বিকট শব্দে উপর থেকে মাটিতে কিছু একটা পরছে বাগানের ভিতর।আমি শুধু শব্দ পাচ্ছি তবে তা দেখতে পাচ্ছিনা।তার মানে নানু বলতো ভুত অনেকসময় মানুষ কে আঘাত করে এটা কি সেটা!আমি এক পা ও আগাতে পারছিনা।হঠাৎ গাছ টা ৪৫ডিগ্রী বেকে আরেক গাছের সাথে মিশে গেল।আমার ক্রমাগত কাঁপুনি শুরু হয়ে গেল।আমি তবুও সরতে পারছিনা।এর মাঝেই কেউ একটা আমার কাছে দৌড়ে এসে আমায় ধাক্কা দিয়ে চলে গেল।আমি মাটিতে লুটিয়ে পরলাম।উঠে আমিও ভয়ে দৌড়াতে লাগলাম।আমি খেয়াল করলাম আমার পিছনেও কেউ দৌড়ে আসছে।আমি থামছিনা।মনে হচ্ছে আমি থামলেই আমায় মেরে ফেলবে।কিছুদূর যেতেই নদীর ঘাটে ছোট খাটো নৌকা রাখা।নৌকাতে সিগারেট হাতে কাউকে দেখতে পাচ্ছি।নিশ্চই মাঝি।আমি উঠে বসলাম উনি নৌকা বৈঠা দিয়ে চালানো শুরু করলো।আমি অনেকক্ষণ পর স্থির হয়ে বললাম ধন্যবাদ আমায় বাঁচালেন আসলে আমায় ভুত তাড়া করেছিল।আপনি না থাকলে আমি মরেই যেতাম। লোকটা কোন কথা বলছেনা।আমার আবার ভয় হতে শুরু করলো।আমি আবার বললাম আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন?উনি কোন উত্তর দিচ্ছেনা।নৌকায় ভাপসা গন্ধ আসছে।বুঝলাম আমার আর বুঝি বাচার পথ নেই।এই মনে হয় আমার শেষ যাত্রা। এর মাঝেই লোক টি ফেস ফেস করে বলে উঠলো কিরে কতগুলা মারছোত?নতুন গুলা আলাদা রাখ।পুরানগুলা পইচা গেছে।একসাথে রাখলে খাইতে পারুম না।আগে নতুন গুলা খামু তারপর পুরানগুলা শুকায়া খামু।ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে বার বার।তার মানে মানুষ মেরে ভুত ও শুটকি বানিয়ে খায়!এটা ভুতের নৌকা আর আমি এখানেই এসে পরলাম।

আমি সাহস করে বললাম ওই তুই নৌকা ঘাটে নিবি?তোর মতন কত শয়তান আমি দিন রাত চিবায়া খাই তুই জানিস?

লোকটা ওমাগো বলে চেঁচিয়ে পানিতে ঝাঁপ দিলো।ভুত…ভুত করে চিল্লাছে পানিতে নেমে।ভাবলাম উনি ভুত হলে চেঁচাবেনা।পায়ের কাছে একটা টর্চলাইট পেলাম।ওনার দিকে মারতে দেখি না উনি আমাদের মতন ই মানুষ। আমি চেঁচিয়ে বললাম ভাই ভয় নাই আমি মানুষ। উঠে আসেন।
উনি কোন ভাবেই উঠতে চাইছেনা।নদীর পাড়ে বসে কেউ ওস্তাদ বলে ডাকছে।আর পানিতে থাকা লোক বলে তুই দাড়া আমি আস্তাছি।আমারে ভুতে ধরছে রে।দোয়া পড় তাড়াতাড়ি। উনি সাঁতরেই পাড়ে গেলেন।আমি নৌকার বৈঠা দিয়ে নৌকা পাড় এ নিলাম।

দুজন পাড়ে দাড়িয়ে কাঁপছে। আমি লোকটাকে ঝাড়ি দিয়ে বললাম তার মানে আপনারা খুনি?ভুত নন?মানুষ মেরে নৌকায় রাখেন?

পানিতে ভিজে যাওয়া লোকটি থরথর করে কাঁপছে। পাশের লোকটি বলে ওস্তাদ এই মনে হয় সেই লোক যে আমার সুপারির বোস্তা নিয়ে পালাইছে।ওস্তাদ আমার লুঙ্গীটাও মাটিতে পরে গেছিলো আর তাও নিয়া গেছে।তাড়াতাড়ি দিতে কন আর কতক্ষণ কচু পাতা পরে থাকবো!

ওই লোকটি কোন কথাই বলছেনা।খালি বলছে আমার ফোন আর হেডফোনটা নদীতেই পরে গেলরে।আমি এখন গান কি দিয়া শুনুমরে!এর মাঝেই নানুর ডাক দেয়ার শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায়। আমি উঠে নানুর দিকে তাকিয়ে আছি।অনেকক্ষণ পর বুঝতে পারলাম আমি এতোক্ষন স্বপ্নে দেখছিলাম।নানুরে সব বলার পর জিজ্ঞেস করলাম যে সব ই তো বুঝলাম,ওই গাছে ওই সুপারি চোর ছিল।সে সুপারি নিচে ফেলরে ছিল।এক গাছ থেকে আরেক গাছে ঝুকে গেল।আবার নৌকায় সুপারি পচে গন্ধ ও আসছিল।আমি মাঝিকে যখন জিজ্ঞেস করলামম সে উত্তর দেয়নি কারন তার কানে হেডফোন ছিল।তবে ওই লোকের সুপারি,লুঙ্গি কে নিতে যাবে?তাহলে কি ভুত ছিল?

নানু হেসে হেসে বলে ওটা চোরের উপর কেউ বাটপারি করছে।প্রথম যে তোমারে ধাক্কা মেরে ফেলে দিছিলো সেই আসলে নিছে।

পুতুলটা কিনে আনার দিনই টিয়ে পাখিটা মরে গেল। অ্যাকুয়ারিয়াম –এর তিন জোড়া গোল্ডফিশ, দু জোড়া এ্যাঞ্জেল আর এক ঝাঁক ব্ল্য...
24/01/2020

পুতুলটা কিনে আনার দিনই টিয়ে পাখিটা মরে গেল। অ্যাকুয়ারিয়াম –এর তিন জোড়া গোল্ডফিশ, দু জোড়া এ্যাঞ্জেল আর এক ঝাঁক ব্ল্যাক মলি মরে উলটো হয়ে ভাসতে লাগল। আর ঘোর জ্বরে পড়ল নাসিমা । এসবই হয়তো কোইন্সিডেন্স। তবু মোর্শেদ কেমন গম্ভীর হয়ে ওঠে। অদিতির ফরসা মুখেও মেঘ জমে উঠল। পুতুলটা অবশ্য ভারি সুন্দর । ছোট্ট, হলদে হলদে হাত-পা, লালচে চুল, বড় বড় চোখ, ঢেউ খেলানো বড় বড় পাঁপড়ি; মনির রং গাঢ় নীল। চোখের দৃষ্টি অবশ্য কেমন যেন শীতল, একটানা তাকিয়ে থাকলে শরীর কেমন হিম হয়ে যায় অদিতির ।

গুলশান- এর একটা শপিং মল থেকে পুতুলটা কিনেছিল মোর্শেদ। দিন কয়েক আগের কথা। বিকেলের দিকে অফিস থেকে বাড়ি ফিরছিল। কী মনে করে গাড়ি ঘুরিয়ে শপিংমলে ঢোকে। খেলনার দোকানটা দোতলায় । বাঁ দিকে । নাম: ‘ম্যারিল্যান্ড গিফটশপ।’ ভিতরে ছোটখাটো মঙ্গোলয়েড চেহারার এক টেকো লোক ছিল। পরনে চক্রাবক্রা শার্ট। চোখে কালো সানগ্লাস। পুতুলটা দেখাতেই গমগমে কন্ঠে সে বলল, ভেরি নাইস ডল স্যার। থাইল্যান্ডের লামিয়া কোম্পানীর মাল। দশটা এসেছে স্যার। সব বিক্রি হয়ে গেছে। একটাই পড়ে আছে। দাম বারো শ টাকা চাইল। পছন্দ হয়েছে বলে দরদাম করেনি মোর্শেদ। পুতুল দেখে মুনা খুশি হলেও কেমন যেন গুটিয়ে যায়। অদিতিও ব্যাপারটা লক্ষ করেছিল।
মোর্শেদ মেয়েকে বলেছিল, পুতুলের কী নাম দেবে মা?
তুমি দাও।
না, তুমি দাও। মোর্শেদ আদুরে কন্ঠে বলে।
লামিয়া। অদিতি ফস করে বলে। বলে স্তম্ভিত হয়ে যায়। নামটা ও বলতে চায়নি।
তাহলে কে বলল?
মোর্শেদ অবাক। অদিতি কীভাবে জানল পুতুলটা থাইল্যান্ডের লামিয়া কোম্পানীর?
পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল নাসিমা। ও বলে, মামী আমার জ্বর আসতেছে। যা, শুয়ে থাক।
মোর্শেদ একটা পলিথিনের ব্যাগে মরা টিয়া আর মরা মাছগুলি ভরে অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে ফেলে । তারপর হাঁটতে হাঁটতে কাছের একটা ফার্মেসিতে যায় অষুধ কিনতে । নাসিমা বেশি দিন জ্বরে পড়ে থাকলে সমস্যা। আদিতির ওপর চাপ পড়বে। এমনিতেই অদিতির মাইগ্রেনের সমস্যা আছে। নাসিমা মেয়েটা ভালোই, দু’বছর ধরে কাজ করছে।

রাত আটটায় একটা দুঃসংবাদ পেল মোর্শেদ। এহসান গ্রুপের এমডি ইঞ্জিনিয়ার সিরাজুল ইসলাম ফোন করে জানালেন মগবাজারের প্রজেক্টটা ক্যান্সেল হয়ে গেছে। ‘ইসমত টাওয়ার’ নামে একটি বহুতল হওয়ার কথা ছিল মগবাজারে। প্রায় একশ কোটি টাকার প্রোজেক্ট। মোর্শেদ হতাশ হয়ে পড়ে। এমনিতেই বাংলাদেশের রিয়েল এসটেট মার্কেট ছোট এবং কমপিটিটিভ ।
এভাবে প্রোজেক্ট হাতছাড়া হয়ে গেছে তো আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা !

রাত্রে মোর্শেদ এর ঘুম আসে না। পাশে অদিতি ল্যাপটপ নিয়ে খুটখুট করছিল। ওপাশে মুনা ঘুমিয়ে। ছটফট করতে করতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়েছিল মোর্শেদ। অনেক রাতে তার ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম চোখে বাথরুম যায়। মাথায় আবছা চিন্তা লামিয়া কি অশুভ? ওই পুতুলটা কেনার পরই টিয়ে পাখিটা মরে গেল, অ্যাকুয়ারিয়ামের মাছগুলিও মরে গেল;আর এত টাকার প্রোজেক্টটা প্রসপন হয়ে গেল? বাথরুম থেকে বেরিয়ে কী মনে করে বেডরুমের দরজা খুলে ড্রইংরুমে উঁকি দেয় মোর্শেদ । ওপাশের বারান্দায় আলো জ্বলে আছে। ওখানে কে যেন কথা বলছে। দ্রুত পায়ে ড্রইংরুম ক্রশ করে বারান্দায় চলে আসে মোর্শেদ। বারান্দার মেঝের ওপর মুনা বসে আছে। ওর সামনে লামিয়া। মুনা লামিয়াকে কি যেন বলছে।
এখানে কি করছ বাবা?
আমরা তো খেলছি ।
দেখছো না?
এখন?
হ্যাঁ। আমি তো আম্মুর পাশে ঘুমিয়ে ছিলাম।
লামিয়াই তো তখন আমাকে বলল- চল আমরা খেলি।
মোর্শেদ পিঠের ওপর শিরশিরে অনুভূতি টের পায়। ছ’তলার গ্রিলে দূরন্ত বাতাস আছড়ে পড়ে। বাতাসে পচা গন্ধ। কাছেই গুলশান লেইক। সে ঝুঁকে মুনাকে কোলে তুলে নিয়ে বলল, এখন খেলতে হবে না মা । চল,, এখন ঘুমাবে। চল।
রাতে ভালো ঘুম হল না। একবার মনে হল পুতুলটা গুলশান লেইক-এ ফেলে দিয়ে আসতে । এত রাতে কে দেখবে? একবার উঠে আলো জ্বালিয়ে পুতুলটা খুঁজল। পেল না। গেল কোথায়? তখন তো বারান্দায় ছিল। মোর্শেদের মনের মধ্যে কেমন এক আঠালো অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ে। তবে এসব কথা সে অদিতিকে জানাবে না ঠিক করে। সকালে গম্ভীর মুখে ব্রেকফাস্ট সারে মোর্শেদ ।
অদিতি বলে, শোন আজ কিন্তু টক দই এনো।
ওকে।
মোর্শেদ অফিসে বেরিয়ে যায়। অফিস কাছেই। গুলশান। অফিসে ফিসফিস। গুঞ্জন। ‘ইসমত টাওয়ার’ নিয়ে আলোচনা চলছে। এগারোটায় এমডির সঙ্গে মিটিং। মোর্শেদ যা বলার বলল। সে আশাবাদী। মগবাজারের কাজটা ক্যান্সেল হওয়ার ব্যাপারটা মোর্শেদ লাভ বা ক্ষতি হিসেবে দেখতে চায় না । লাঞ্চের পর অফিস থেকে বেড়িয়ে পড়ে। কিছু কেনাকাটা আছে। মোর্শেদ- এর বন্ধু আসবে রাতে । সাদী নিউজিল্যান্ডে থাকে । বউ-বাচ্চা নিয়ে মাসখানেকের জন্য দেশে এসেছিল। এ সপ্তাহেই আবার
নিউজিল্যান্ড ফিরে যাচ্ছে। সাদী মোর্শেদের ছোটবেলার বন্ধু। তবে দু’জনার সর্ম্পক মোটেও স্বচ্ছ না। দু’জনার
মধ্যে এক ধরনের রেষারেষি আছে। সাদী বেশিদূর পড়াশোনা করেনি। তবে মোটর পার্টস- এর ব্যবসা করে বেশ টাকা-
পয়সা করেছে। সেসব নিয়মিত ‘শো’ করে সাদী। মোর্শেদ আর্কিটেক্ট । তার মধ্যে রয়েছে শিক্ষাদীক্ষা আর পরিশীলিত মনের চাপা অহঙ্কার। নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটন শহরে সাদীর নিরিবিলি ছবির মতো বাড়ি। মুনা-অদিতি দের নিয়ে গত জুনে বেড়িয়ে এসেছিল মোর্শেদ । সাদ-এর বউ শায়লা। শায়লা দামী দামী গয়না দেখিয়ে চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল অদিতির। সেই থেকে শায়লার ওপর অদিতির ক্ষোভ।
অদিতি শায়লাকে বলে, যেন সর্দি লাগে, সেজন্য সুইমিংপুলে মুনাকে বেশিক্ষণ রেখেছিল শায়লা । এসব কারণে সাদী আর শায়লার মোর্শেদ- এর ক্ষোভও কম না। তবে মোর্শেদ চাপা স্বভাবের বলেই তা প্রকাশ করে না।
সাদী দেশে এলে ডিনারের ফর্মাল দাওয়াত দেয় ঠিকই, তবে মনে মনে প্রতিশোধের কথাও ভাবে। মোর্শেদের বিশ্বাস অদিতির সঙ্গে বিয়েটাও ভাঙতে চেয়েছিল সাদী ; সেই শপিং মলটা কাছেই। হেঁটেই যাওয়া যায়। মোর্শেদ কী মনে করে ঢুকে পড়ল। মঙ্গোলয়েড চেহারার সেই টেকো লোকটার সঙ্গে কথা বলা দরকার। লামিয়া সর্ম্পকে আরও তথ্য জানতে হবে। সে এক্সেলেটরে চড়ে দোতলায় উঠে এল। তারপর অবাক হয়ে যায়। দোতলায় ‘ম্যারিল্যান্ড গিফটশপ’ নামে কোনও দোকান নেই। কি ব্যাপার? আমার ভুল হয়নি তো? নাহ্, ভুল হবে কেন? দুপাশে সার সার মোবাইল, ঘড়ি আর জুয়েলারির দোকান। একটা দোকানে ঢুকে সেই গিফটশপের কথা জিগ্যেস করল। ওরা বলল, এই জিসান প্লাজায় তারা দু বছর ধরে আছে ।
‘ম্যারিল্যান্ড গিফটশপ’ নামে এখানে কোনও দোকান নেই। কখনও ছিলও না। আর এই শপিংমলে ছোটখাটো মঙ্গোলয়েড চেহারার টেকো লোকও নেই। তাহলে? হ্যালুসিনেশন? মোর্শেদ অবশ বোধ করে । ধীরেসুস্থে বেরিয়ে আসে শপিং মল থেকে। কথাটা অদিতিকে জানাবে না ঠিক করল মোর্শেদ। দুপুরে ল্যাপটপের সামনে বিছানার ওপর উপুর হয়ে শুয়েছিল অদিতি । একটা হিন্দি গানের ডাউনলোড লিঙ্ক খুঁজছিল। অনেক দিন আগে শুনেছিল। আজই হঠাৎ মনে পড়ল। সার্চ করতেই এমপিথ্রি ফাইলটা পেয়ে গেল। ডাউনলোড বাটনে ক্লিক করে অদিতি। ঠিক তখনই হঠাৎই কথাটা মনে পড়ে যায় ওর। মোবাইল তুলে নিয়ে একটা নাম্বারে ফোন করে।
হ্যালো।
ফৌজিয়া আপা?
আপনি কেমন আছেন?
এদিকে একেবারে আসেনই না। আমরা বড়লোক?
নাকি আপনি বড়লোক? আমাদের একদম ভুলে গেছেন। হ্যাঁ। মুনা কে এ বছরই স্কুল দিলাম। ওর একজন টিউটর লাগবে। তেমন কাউকে পেলে আমাকে একটু জানাবেন, প্লিজ।
ফৌজিয়া আপা বললেন, ইশরাত নামে একটা মেয়ে আছে। বিবিএ পড়ছে। ওকেই একদিন পাঠিয়ে দেব।
ঠিক আছে আপা। বলে আরও কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন অফ করে দেয় অদিতি।
ফৌজিয়া আপা মোর্শেদের কাজিন। মহিলা অ্যাডভোকেট। খুবই হেল্পফুল। বিয়েতে মোর্শেদের মা রাজি ছিলেন না।
কারা যেন ফোন করে অদিতির নামে যাতা বলেছিল। তখন ফৌজিয়া আপাই মোর্শেদের মা কে বুঝিয়ে- সুজিয়ে রাজি করিয়ে ছিলেন।
গানটা ডাউনলোড হয়ে গেছে। গানটা প্লে করতে যাবে- এমন সময় মোবাইল বেজে উঠল। মিস রিফাত। মুনার স্কুলের মিস।
অদিতির ভ্রু কুঁচকে যায়।
হ্যালো।
ওপ্রান্ত থেকে ভেসে আসে- মিসেস তানভীর?
হ্যাঁ। বলুন।
ম্যাডাম। আমরা তো স্কুলে স্টুডেন্টদের পার্সোনাল টয় এলাউ করি না। যদি হারিয়ে যায় ; সো?
আজ মুনার ব্যাগে একটা পুতুল ছিল।
ওহ!
প্লিজ, ফিউচারে এমন যেন আর না হয়।
ওকে আমি দেখব। থ্যাঙ্কস। বলে অদিতি ফোন অফ করে দেয়। ও রাগ টের পায়। মুনা কখন লামিয়াকে ব্যাগে ভরল? ব্যাগ তো আমি গুছিয়ে দিয়েছি। অদিতি বেডরুম থেকে ড্রইংরুমে আসে। নাসিমা কার্পেটের ওপর বসে চাদরমুড়ি দিয়ে সোফায় হেলান দিয়ে বসে ছিল। ওর জ্বর এখন কিছু কম। অদিতিই আজ মুনাকে স্কুলে নিয়ে গিয়েছিল। মুনা টিভি দেখছিল। অদিতি রিমোট তুলে টিভির ভলিউম কমিয়ে রাগ সামলে মেয়েকে জিগ্যেস করে,
তুমি স্কুলে লামিয়াকে নিয়ে গিয়েছিলে? সত্যি কথা বল।
মুনা মাথা নাড়ে। বলে, আমি তো, আমি তো লামিয়াকে ইশকুলে নিয়ে যাইইনি। ছত্তি। বলে অদ্ভূত ভঙ্গিতে দুহাত
তুলে নাড়ে মুনা। হাসে।
অদিতি পুতুলটা খুঁজতে থাকে। ওটা পেলে জানলা দিয়ে ফেলে দেবে। পেল না। মুনার ব্যাগে, ড্রইংরুমে। না, কোথাও নেই। অদিতি হতাশ বোধ করে।কি করবে বুঝতে পারে না। সন্ধ্যার পর গেস্ট আসবে। ও রান্নাঘরে ঢোকে । এখন রান্নার আয়োজন করলে মাথা ঠান্ডা হবে। সন্ধ্যার পর মোর্শেদ ফেরে। নাসিমা দরজা খুলে দেয়। মুনা সোফার ওপর ঘুমিয়ে ছিল। অদিতি কিচেনে ছিল। কলিংবেলের শব্দ শুনে ও কিচেন থেকে বেরিয়ে আসে। মোর্শেদের হাতে লামিয়াকে দেখে অবাক হয়।
অস্ফুটস্বরে বলে,ওমাঃ ওটা তুমি কই পেলে?
নীচে। গ্যারেজে। গাড়ি পার্ক করে লিফটে ওঠার সময় দেখলাম।
আর আমরা খুঁজে পাইনি।
ও। বলে পুতুলটা সোফায় রাখে মোর্শেদ ।
রাত আটটার মতো বাজে। অদিতি কিচেনে ফ্রাইপ্যানে কাবাব ভাজছিল । শশা আর টমাটো কাটছিল নাসিমা । বোরহানীটা মোর্শেদই বানাবে। এরই মধ্যে মসলা মিক্স করে ফেলেছে সে। মুনার ঘুম ভেঙেছে। ড্রইংরুমের সোফায় বসে পা দুলিয়ে দুলিয়ে চিপস খাচ্ছে। আর কার্টুন দেখছে। উলটো দিকে সোফার ওপর লামিয়া। মুনার দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়েছিল। রাত নটার দিকে সাদীরা এল। ওদের একটাই ছেলে। সিয়াম। সিয়াম মুনারই সমবয়েসি। ড্রইংরুমের সোফার ওপর লামিয়াকে দেখেই ‘আমি এটা নেব‘ ‘আমি এটা নেব’ বলে চেঁচাতে থাকে সিয়াম ।
ঠিক আছে সিয়াম। আমি এটা তোমায় গিফট করলাম। বলে মোর্শেদের দিকে তাকায় অদিতি । অদিতির চোখে চাপা কৌতূক।
শায়লা বলে, না, না অদিতি। ওটা তো মুনার।
ইটস ওকে। মুনার আরও আছে। এটা আমাদের সিয়াম সোনার। বলে মোর্শেদ
আড়চোখে অদিতির দিকে তাকায়। সমস্যার এত সহজ সমাধান ভাবতেও পারেনি সে। আজ যখন নীচের গ্যারেজে লামিয়াকে দেখল তখন একবার মনে হল ওটাকে গুলশান লেইক- এ ফেলে আসতে। তখন বড় টায়ার্ড লাগছিল বলে যায়নি। সিয়াম লামিয়াকে নিয়ে যাবে । এতে মুনা কে মোটেও ঈর্ষান্বিত মনে হল না। বরং মুনা হাসছিল। নাসিমাও খুশি বলে মনে হল। অদিতিও। পরদিনই মোর্শেদ নীলক্ষেত থেকে একটা টিয়া পাখি কিনে আনে। তার পরের দিন অ্যাকুয়ারিয়াম-এর জন্য মাছ কিনে আনে। গোল্ডফিশ, অ্যাঞ্জেল, ব্লু গোরামিন আর ব্ল্যাক মলি। মোর্শেদ আর অদিতির মুখ আনন্দে ঝলমল করে। ওদের একটা মেগা স্ক্রিনের প্লাজমা টিভি কেনার শখ ছিল। প্যানাসনিক-এর শোরুমে গিয়ে টাকা দিয়ে এল মোর্শেদ। মডেল অবশ্য অদিতিই পছন্দ করল । তারপর লোকজন এসে বিশাল জিনিসটা বেডরুমে ফিট করে দিয়ে গেল। ওদের আনন্দ দেখে কে! এহসান গ্রুপের এমডি ইঞ্জিনিয়ার সিরাজুল ইসলাম ফোন করে কক্সবাজারে দেড় শ কোটি টাকার একটা প্রোজেক্ট এর কথা জানালের। ইনানী বিচে হোটেল কমপ্লেক্স হবে। কথাটা অদিতিকে জানাতেই ও নেপালে ছোট্ট একটা ট্রিপের আবদার করে । অবশ্যই। ছোট্ট করে বলে মোর্শেদ। ফেসবুকে শায়লার সঙ্গে অনেক দিন ধরেই
চ্যাট করে আদিতি। গতকাল শায়লা লিখেছে ; আমার বাড়িতে ভূতের আছর হইছে জান। সকালে ফ্রিজ খুলে দেখি সারারাত কারেন্ট অফ ছিল। মাছ মাংস শাকসবজি সব পচে গেছে। এমন তো হওয়ার কথা না। শখ করে গত মাসে একটা ক্যানারি পাখি কিনছিলাম। পাখিটা মরে গেল। একুয়ারিয়ামের মাছগুলি মরে উলটে ভাসতে লাগল। সাদী ধুম জ্বরে পড়ল। চারিপাশে কি যে শুরু হইল অদিতি । সিয়াম আজকাল ঠিক মতো ঘুমায় না। খালি পুতুল নিয়ে খেলে।
অদিতি অবাক হলেও মুখ টিপে হাসে। এক ধরণের আনন্দ বোধ করে। শায়লার লেখা কপি করে মোর্শেদের মেইল এ পোস্ট করে ‘সেন্ড’ করে।সেদিন বিকেলে ল্যাপটপের সামনে বিছানার ওপর উপুর হয়ে শুয়েছিল অদিতি । একটা জাপানি হরর মুভির ডাউনলোড লিঙ্ক খুঁজছিল। অনেক দিন আগে দেখেছিল। আজ মনে পড়ল। টরেন্ট ফাইল পেল। এখনও টরেন্ট ফাইল ডাউনলোড করতে পারে না অদিতি। বুকমার্ক করে রাখল। রাতে মোর্শেদকে বলবে ডাউনলোড করে দিতে। নাসিমা লেবু চা নিয়ে ঘরে ঢুকল।
দে। অদিতি বলে।
নাসিমা বলে, মামী?
কি? দেশে ফোন করবি? কর।
না। তাহলে?
হেই পুতুলডা বাড়ি থেইকা যায় নাই মামী।
কি বলিস তুই। চায়ের কাপ রেখে ধড়মড় করে উঠে বসল অদিতি।
হ। যায় নাই।
যায় নাই মানে কী! ফাইজলামি করিস? যাঃ ভাগ। অদিতির ফরসা মুখটা গনগনে হয়ে উঠেছে। নাসিমা মুখ কালো করে চলে যায়। অদিতির শরীর শিরশির করতে থাকে। নাসিমা কি বলল? জ্বরের ঘোরে মাথা ঠিক নেই। হেই পুতুলডা বাড়ি থেইকা যায় নাই । এর মানে কি? আজকাল অবশ্য মুনার দিকে তাকালে শরীর কেমন হিম হয়ে যায়। মেয়েটার চোখের মনির রং বদলে যাচ্ছে। কথাবার্তাও কেমন কমে গেছে। তা বলে ; অদিতি কী করবে বুঝতে পারে না। অদিতির মোবাইল বেজে ওঠে। নকিয়াটা তুলে অদিতি বলে, হ্যালো।
হ্যালো। আমি ইশরাত ।
ফৌজিয়া আন্টি আমাকে আপনার সেলনম্বর দিয়েছেন।
ও হ্যাঁ।
আমি কখন আসব?
অদিতি বলে, কাল সকালে আসতে পারবে? কাল তো ফ্রাইডে। আমার হ্যাজব্যান্ড ঘরে থাকবে। ওই সব ফাইনাল করবে।
ওকে। আমি কাল সকাল নটার মধ্যেই চলে আসব।
ওকে। থ্যাঙ্কস।
ভালোই হল। ইশরাত মেয়েটা মুনাকে পড়াবে। মুনাকে নিয়ে পড়ানোর সময় হয় না অদিতির । টিভি, ফেসবুক আর রান্না নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তাছাড়া অদিতি ইদানীং একটা বাংলা ব্লগে ‘বিষন্ন অনাদৃতা’ নামে কবিতা লিখে প্রায়ই পোস্ট করে। এমন কিছু না, দূর্বল কবিতা, তবে মেয়ে বলেই সম্ভবত প্রচুর মন্তব্য পড়ে। মন্তব্য পড়ে শরীর আনন্দে শিরশির করে। যেমন জাপান প্রবাসী ব্লগার ‘পথহারা পথিক ২’ মন্তব্য করেছে: ‘আপনার কবিতা আমার এই ধূসর প্রবাসজীবনের আলোর দিশারী’। এসব কারণে ব্লগ এখন প্রায় নেশার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে অদিতির । পরদিন সকালে ইশরাত এল। অদিতিই দরজা খুলে দিল। সবুজ ওড়না আর সাদা রঙের সালোয়ার-কামিজ পরা শ্যামলা সুশ্রী মেয়ে। দেখলেই ভালো লাগে। চোখে ছোট চারকোণা চশমা ।
এসো বস। ইশরাত সোফায় বসে। উলটো দিকে সোফায় মোর্শেদ বসে ছিল। এতক্ষণ খবরের কাগজ পড়ছিল সে । অন্যদিন সময় পায় না। শুক্রবার সকালেই যা একটু খবরের কাগজ পড়া হয়। সে ইশরাতকে দেখে মাথা নাড়ে। মিষ্টি করে হাসে। মুনা ওর বাবার গায়ে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে ছিল।
মুনাকে দেখিয়ে অদিতি বলে, এই হল তোমার ছাত্রী ।
ইশরাত বলে, বাহ্। কী কিউট!
তারপর হেসে জিগ্যেস করে, কি নাম তোমার? মুনা চুপ করে থাকে।
বল, নাম বল। অদিতি বলে।
আমার নাম লামিয়া।
মুনার কথা শুনে মোর্শেদ সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে ।

Address

Dhanmondi 32
Dhaka
1207

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Kingdom of Ghost posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share