21/02/2022
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত :
ভাষা আন্দোলনের পথিকৃৎ
---------------
ভাষা আন্দোলন এবং ভাষা শহিদদের সম্বন্ধে সবারই কম-বেশি ধারণা আছে। অথচ যে লোকটি ভাষা আন্দোলনের বীজ বুনে ছিলেন, তাঁকে আমরা ভুলতে বসেছি!
১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি। পাকিস্তানের বয়স তখন মাত্র ছয় মাস। করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে সিদ্ধান্ত হলো, উর্দু এবং ইংলিশই হবে গণপরিষদের ভাষা। ২৫শে ফেব্রুয়ারি বাবু ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত অধিবেশনে সংশোধনী আনলেন। জোড়ালো যুক্তি দিয়ে বললেন, যেহেতু পাকিস্তানের ছয় কোটি নব্বই লক্ষ লোকের মধ্যে চার কোটি চল্লিশ লক্ষ লোকই বাংলায় কথা বলে, সেহেতু বাংলাকেও গণপরিষদের ভাষা হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। বাংলা শুধু আঞ্চলিক ভাষা নয়, বরং উর্দুর সাথে বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা করতে হবে।
লজ্জাজনক হলো, পূর্ব বাংলা হতে সাধারণ আসনে নির্বাচিত সদস্য প্রেমহরি বর্মন ছাড়া কেউ তাঁকে সেদিন সমর্থন করেনি। প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ও ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্য খাজা নাজিমুদ্দিন তাঁকে তিরষ্কার করলেন। বাঙালী স্পিকার তমিজ উদ্দিন খান’ও বাধ্য হয়ে তাঁর প্রস্তাব নাকচ করে দিলেন। এমনকি, তাঁর নামের সাথে বিচ্ছিন্নতাবাদী তকমাও লাগিয়ে দেয়া হলো!
ব্যথিত হয়ে ধীরেন বাবু দেশে ফিরে এলেন। তেজগাঁও এয়ারপোর্টে নেমে দেখেন, ৪০-৫০ জন যুবক দাঁড়িয়ে আছে। সবাই চাদরে ঢাকা। ভাবলেন, তাঁর প্রস্তাবে রূষ্ট হয়ে এরা বোধহয় তাঁকে অপমান করতে এসেছে, চাদরের নিচে অস্ত্রও থাকতে পারে! তিনি কাছে আসতেই যুবকেরা অবাক করে দিয়ে চাদরের ভেতরে রাখা রাশি রাশি ফুল দিয়ে তাঁকে বরণ করে নিলো, তাঁর উপর ফুল বর্ষণ শুরু হলো...
এরা সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব বাতিল হলে ২৬শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। ১১ই মার্চ সমগ্র বাংলায় ধর্মঘট ডাকা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তখন ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত। ১১ মার্চের ছাত্র ধর্মঘটে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মত শিক্ষকেরাও সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন, গ্রেফতার হন শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, রণেশ দাশগুপ্তসহ অসংখ্য ছাত্রনেতা।
এরপর ১৯৫২ এর ঘটনা সবার জানা। চার বছর আগে, ১৯৪৮-এর ফেব্রুয়ারিতে “রাষ্ট্রভাষা বাংলা”র একমাত্র কণ্ঠ ছিল ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, চার বছর পরে ১৯৫২-এর সেই ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবী সমগ্র বাঙ্গালী জাতির! ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি করাচি গণপরিষদে রাষ্ট্রভাষা বাংলার যে বাষ্প ছড়িয়েছিলেন, তা ঝড় হয়ে এলো। সে ঝড়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলা তো হলোই, সাথে সাথে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজও রোপিত হলো।
ধীরেন বাবু বরাবর পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠির নিশানায় ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করার তিন দিন পর ২৯শে মার্চে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাঁকে এবং তাঁর ছেলে দিলীপ দত্তকে ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টে তুলে নিয়ে যায়। তাঁরা আর ফেরেনি! শোনা যায়, পাকি বাহিনী তাঁর দু'চোখ উপড়ে ফেলে, দেহের সমস্ত জয়েন্টগুলি গুঁড়িয়ে দেয় এবং এভাবে একদিন ফেলে রাখার পর গুলি করে মেরে ফেলে।
৮৫ বছরের এক বয়ষ্ক নেতার উপর কেন এতো নির্মম অত্যাচার? কারণ তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবী তুলেছিলেন, বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ নিয়ে কথা বলেছিলেন। অথচ ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তাঁকে কলকাতা চলে যাবার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল, বলা হয়েছিল তাঁকে পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হবার। কিন্তু তিনি যাননি। এদেশকে ভালোবেসে রয়ে গেলেন এখানকার মা, মাটি, মানুষের সাথে।
আজকের এই দিনে “রাষ্ট্রভাষা বাংলা”র দাবী উত্থাপনকারী, ভাষা আন্দোলনের বীজ বপনকারী মহান নেতা শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
কালেক্টেড,,