03/06/2022
আমার ফাউন্ডার জীবনের গল্প - মহসিন হলের দুই বিপক্ষ নেতাকে এক রুমে বসিয়ে সিগারেট ফোঁকার কাহিনী।
২০০২ এর নভেম্বরের কোন এক বিকেল। বসে আছি মহসিন হলের এক ছাত্রনেতার রুমে। পুরো রুম সিগারেটের ধোয়ায় আচ্ছন্ন, কোনায় ছোট একটা ফ্রিজের মতন কিছু খুলে একজন দুটো বিয়ারের ক্যান বের করে একটি আমার হাতে দিলেন, আরেকটি খুলে নিজে মুখ দিলেন।
আমি পকেট থেকে সিগারেট বের করে একরাশ ধোয়া ছেড়ে তাকে বললাম, উনি কোথায়?
“ভাই একটু বিজি, আপনারে ওয়েট করতে বলছে।” আমি পকেট থেকে ফোন বের করে সেই “ভাই” কে ডায়াল করে বললাম, “১৫ মিনিট ধরে বসে আছি, আপনি আর ৫ মিনিটের ভেতর না আসলে আমি চলে যাচ্ছি”। উনি স্যরি বলে বললেন, বসেন, আসতেছি। একটা ঝামেলা আসছে, মিটমাট করেই আসতেছি। সময় লাগবেনা আর।
স্রেফ ২ মিনিটের মধ্যে দেখি আরেকজন হন্তদন্ত হয়ে রুমে ঢুকলেন, সোজা আমার সামনে যিনি বসেছিলেন, মানে আমাকে যিনি বিয়ার সেধেছিলেন, তাকে বললেন, মিটিং হইলে দুই পক্ষের সামনে হইতে হবে। খালি রুলিং পার্টি বইলা আপনারা একা ডিসিশন নেবেন, সেইটা হবে না। আমার “ভাই”-ও মিটিঙে থাকবেন।
সোজা কথায় বলি, ছাত্রদলের নেতা “তার” অনুমতি ছাড়া হলে ইন্টারনেটের সংযোগ দিচ্ছি বলে ক্ষেপে গিয়ে আমাকে “সমন” পাঠিয়েছিলেন। আমি যাই, এই খবর পেয়ে ছাত্রলীগের নেতা সাহেব “ইচ্ছে” প্রকাশ করেন সিধ্যান্ত নেয়ার সময় তিনিও থাকবেন।
আমি তখন “বিয়ার“ দিয়ে যিনি আপ্যায়ন করেছিলেন তাকে বলি, আপনার ভাইকে ফোন করে বলেন আমি দু’জনের সাথেই বসবো। একা উনার সাথে না। তিনি ফোন করে এই কথা জানাতেই চিৎকার শুনতে পাই ফোনের অপর পাশ থেকে। দলের নেতা ভাই চিৎকার করে বলেন, হল আমি চালাই, অন্য কোন **** *ত না। আমি কারো লগে বইসা সিধ্যান্ত নেই না, কল্লোল সাহেব আর ঐ **** পোলারে জানায়া দে।
ফোনটা স্রেফ কেড়ে নিয়ে বলি, আপনি হয় আমাদের সবার সাথে বসবেন, না হলে আমি গেলাম। উত্তরে উনি বলেন, যান গিয়া, সাথে নেটের সবকিছু খুলে নিয়ে যেয়েন। উত্তরে জানাই, “আমি গেলাম, নেট খোলার দায়িত্ব আপনি-ই নেন। খোলা শেষ হলে আমাকে জানিয়েন ফোন করে।”
আমি চলে আসি।
ঘণ্টা দেড়েক পর উনি আবার ফোন করেন, কারণ?
কারণ হলো আমি জানতাম এই ঝামেলা হতে পারে, তাই আগে থেকে কিছু পোস্টার লিখে রেখেছিলাম।
“আমরা খুব কম খরচে হলের ছাত্রদের জন্যে ইন্টারনেটের ব্যবস্থা করেছিলাম, কিন্তু ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলিও নেতাদের বিরুদ্ধতার কারনে হয়তো এটা আর চালাতে সক্ষম হবনা। হল আপনাদের সবার, সিধ্যান্ত-ও আপনাদের সবার-ই হওয়া উচিৎ!”
আমি রুম থেকে বেড়িয়েই অফিসে ফোন করে ৫০ টি পোস্টার ১৫ মিনিটের ভেতর নোটিশ বোর্ডের আশপাশ সহ যেখানে যেখানে ছাত্রদের সমাগম বেশি, সেখানে লাগিয়ে ফেলতে বলি।
জানতাম ফোন আসবে, আসলো-ও, ঘণ্টা দেড়েক পর।
স্রেফ জানিয়ে দিলাম, দল, লীগ, আমি, সাথে সাধারণ ছাত্রদের কোন প্রতিনিধি ছাড়া কারো সাথে একা বসছি না। বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে উনি বললেন, “ভাই, আসেন, কিন্তু মনে রাইখেন, কাজটা ভালো হলো না”।
সন্ধ্যের কিছু পরে আবার যাই। এবার আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় অন্য একটি রুমে। ছোট্ট একটা রুমে ১০/১২ জন উপস্থিত। দলের নেতা’কে এর আগে দেখেছিলাম, কিন্তু লীগের নেতার সাথে পরিচয় ছিলনা। ঢুকেই উনার পরিচয় জানতে চাইলাম। চিকন পাতলা গড়নের এক ছেলে উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন। হ্যান্ডশেক করতে করতে বললাম, উনি (দলের নেতা), আপনাকে একটা গিফট দিতে চাইছেন, কিন্তু লজ্জার কারণে সেটা আমাকে দিতে বলেছেন। এই বলে পকেট থেকে আগে পাওয়া বিয়ারের ক্যানটি উনার দিকে ছুড়ে দেই।
পিন-ড্রপ সাইলেন্স কাকে বলে সেদিন সেটা বুঝতে পেরেছিলাম!
বিয়ারের ক্যান খুলতে খুলতে উনি “দলের” নেতাকে বলেন, থ্যাংকস ভাই। তারপর বলেন, “আপনি বিয়ার দেবেন জানলে আমিও কিছু নিয়ে আসতাম, আপাতত ভাই, সিগারেট নেন।”
এক বনে, মানে এক রুমে দুই বাঘকে বসিয়ে আমিও সিগারেটে টান দিচ্ছি। হাসতে হাসতে ভাবি, সিচুয়েশন আমার কন্ট্রোলে।
এর পর? এর পর আর কি? মহসিন হলে নির্বিঘ্নে কাজ চালিয়ে গেলাম।