01/01/2020
পাঁচ-ছ’বছর আগে এক বিদেশী কবি আমার সঙ্গে দেখা করতে নুহাশ পল্লীতে এসেছিলেন। স্কটল্যান্ডের মহিলা কবি, নাম এলেন কিংবা ইলিন। ভদ্রমহিলা হাসিখুশি স্বভাবের। বাংলাদেশ নিয়ে তার কৌতূহল অনেক।
আমাকে বললেন, আজ কি তোমাদের বিশেষ কোন উৎসব? রাস্তায় শত শত মানুষ। বাচ্চাদের হাতে বেলুন।
আমি বললাম, আজ আমাদের নববর্ষ উৎসব। আমরা নতুন বছর বরণ করছি।
তিনি বললেন, নববর্ষ হবে পহেলা জানুয়ারি। আজ তো পহেলা জানুয়ারি না।
আমি বললাম, জাতি হিসেবে আমাদের মধ্যে কিছু অদ্ভুত ব্যাপার আছে। আমরা বৎসরে তিনবার নববর্ষ পালন করি।
কী বলো তুমি! বৎসরে তিনবার নববর্ষ উৎসব?
আমি বললাম, হ্যাঁ। একটি কর্ম নববর্ষ। একটি মর্ম নববর্ষ। আরেকটি ধর্ম নববর্ষ। জানুয়ারির প্রথম তারিখ কর্ম নববর্ষ। অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ ইংরেজি তারিখে চলে। এক তারিখে বেতন দেওয়া হয়। ছুটির দিনও ইংরেজি তারিখে উল্লেখ করা হয়। কাজেই কর্ম নববর্ষ যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এরপর আসে মর্ম নববর্ষ। বাংলা বছর শুরুর উৎসব। আবেগের উচ্ছ্বাসের উৎসব। এই উৎসব আগে গ্রামভিত্তিক ছিল। এখন আমরা শহুরে মানুষরাও তাতে যোগ দিচ্ছি। বাকি রইল ধর্ম নববর্ষ। হিজরি সনের নববর্ষ। যা নির্ধারিত হয় চান্দ্রমাসের হিসেবে। এই উৎসব বিশ্বাসনির্ভর। ধর্মপ্রাণ মুসলমান বর্ষ শুরুর দিনটিতে রোজা রাখেন। বিনম্র ভক্তিতে শুরু হয় নতুন একটি বছর।
কবি বললেন, ধর্ম নববর্ষ বুঝতে পারছি, কিন্তু কর্ম নববর্ষ এবং মর্ম নববর্ষের মৌলিক তফাৎটা কী?
আমি বললাম, দুটি উৎসবেই আমরা আনন্দ করি। এই অর্থে কোন তফাৎ নেই। কর্ম উৎসবে সাহেবি ধরনের আনন্দ করতে ইচ্ছা করে। যেমন পার্টি, বল নৃত্য, ডিসকো নৃত্য এবং গোপনে মদ্যপান। কারণ সাহেবরা এটা করেন। মর্ম নববর্ষে বাঙালি ধরনের আনন্দ করা হয়, ইলিশ মাছ, পান্তাভাত খাওয়া হয়। রবিঠাকুরের গান শোনা হয়। মর্ম নববর্ষে আমরা কোন প্রতিজ্ঞা করি না। কিন্তু কর্ম নববর্ষে প্রতিজ্ঞা করি। যেমন, সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দেব, আর জুয়া খেলব না ইত্যাদি।
মহিলা কবি ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে বললেন, যে জাতি বৎসরে তিনবার নববর্ষ পালন করে সেই জাতি সবার চেয়ে আলাদা।
আমি বললাম, এই তথ্য আমরা জানি। বাঙালি জাতির মতো জাতি তোমরা কোথাও খুঁজে পাবে না। এই দেশের মতো দেশও কোথাও খুঁজে পাবে না। তোমার অবগতির জন্য জানাচ্ছি, আমাদের দেশকে আমরা বলি ‘পৃথিবীর সকল দেশের রানী।’
২০১০ সালের শুরুর দিনটিতে পুরনো একটি গল্প বলে ভালো লাগছে। নতুন কর্ম বৎসর আমাদের সবার জন্য মঙ্গল নিয়ে আসুক, এই শুভ কামনা।
------------------------ হুমায়ূন আহমেদ (বর্ষবরণ)