18/04/2025
এক আলোক বর্তিকা:
ড. অধ্যাপিকা হোসনে আরা বেগম ও টিএমএসএস-এর পথচলা
বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে তৃণমূল পর্যায় থেকে যারা নীরবে নিভৃতে বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম এক নাম ড. অধ্যাপিকা হোসনে আরা বেগম। তিনি শুধু একজন শিক্ষাবিদ বা সমাজসেবী নন, তিনি একজন দূরদর্শী নেতা এবং লক্ষ লক্ষ নারীর অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত ও বিকশিত হয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘ (টিএমএসএস)। এই প্রতিবেদনে আমরা তাঁর কর্মময় জীবন ও টিএমএসএস-এর মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনে তাঁর অসামান্য ভূমিকার উপর আলোকপাত করব।
অধ্যাপিকা হোসনে আরা বেগমের জন্ম ও বেড়ে ওঠা বগুড়া জেলায়। সমাজের পিছিয়ে পড়া, অবহেলিত ও নির্যাতিত নারীদের দুঃখ-দুর্দশা তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করত। বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দৃঢ় সংকল্প থেকেই ১৯৮০ সালে তিনি মাত্র কয়েকজন সংগ্রামী নারীকে সাথে নিয়ে বগুড়ার ঠেঙ্গামারায় প্রতিষ্ঠা করেন "ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘ"। একটি ছাতা, একটি চেয়ার আর দু'রুমের একটি ঘর নিয়ে যাত্রা শুরু করা সংগঠনটিই আজ ড. হোসনে আরা বেগমের অদম্য ইচ্ছা, কঠোর পরিশ্রম আর নিখুঁত পরিকল্পনায় মহীরুহে পরিণত হয়েছে।
ড. হোসনে আরা বেগম টিএমএসএস-এর প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক হিসেবে শুরু থেকেই এর হাল ধরে আছেন। তাঁর নেতৃত্ব কেবল প্রশাসনিক নয়, বরং তা ছিল মমতাময়ী ও অনুপ্রেরণাদায়ী। তিনি বিশ্বাস করেন, নারীকে যথার্থ সম্মান, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিতে পারলেই একটি সমাজ প্রকৃত অর্থে উন্নত হতে পারে। তাঁর দর্শন হলো – তৃণমূলের মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং তাদের নিজেদের ভাগ্য নিজেদেরই গড়ার সুযোগ করে দেওয়া। তিনি সবসময় (field-oriented) পদ্ধতিতে বিশ্বাসী এবং কর্মীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
ড. হোসনে আরা বেগমের সুদক্ষ নেতৃত্বে টিএমএসএস আজ কেবল বগুড়া বা উত্তরাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নয়, এর কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে প্রায় সারাদেশে। সংস্থাটি বহুবিধ ক্ষেত্রে তার কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম: গ্রামীণ ও শহরের দরিদ্র নারীদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রদান টিএমএসএস-এর অন্যতম প্রধান কার্যক্রম। এর মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ নারী অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন।
শিক্ষা: টিএমএসএস অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে – যার মধ্যে রয়েছে স্কুল, কলেজ, মেডিকেল কলেজ, নার্সিং কলেজ, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ইত্যাদি। মানসম্মত ও কর্মমুখী শিক্ষা প্রসারে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
স্বাস্থ্যসেবা: টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ ও রফাতুল্লাহ কমিউনিটি হাসপাতাল সহ বিভিন্ন হাসপাতাল, ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে বা বিনামূল্যে তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিচ্ছে।
নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, নেতৃত্ব বিকাশ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে টিএমএসএস নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
কৃষি ও সামাজিক বনায়ন: পরিবেশ রক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টিএমএসএস কৃষি উন্নয়ন ও সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি পরিচালনা করে।
আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে সদস্য ও কর্মীদের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা ও ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
এছাড়াও প্রতিবন্ধী উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, মানবাধিকার রক্ষা সহ নানা সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে টিএমএসএস সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
ড. অধ্যাপিকা হোসনে আরা বেগমের এই অসামান্য কর্মকাণ্ড জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত ও স্বীকৃত হয়েছে। তিনি তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বহু সম্মাননা ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন, যার মধ্যে অন্যতম হলো রাষ্ট্রীয় সম্মাননা "বেগম রোকেয়া পদক"। টিএমএসএস-ও তার সফল কার্যক্রমের জন্য বিভিন্ন সময়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে।
ড. অধ্যাপিকা হোসনে আরা বেগম এক জীবন্ত কিংবদন্তী। শূন্য থেকে শুরু করে তিনি একটি ক্ষুদ্র সংগঠনকে দেশের অন্যতম বৃহৎ ও কার্যকর উন্নয়ন সংস্থায় পরিণত করেছেন। তাঁর জীবন ও কর্ম বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ নারীর কাছে সংগ্রাম, স্বাবলম্বন ও সাফল্যের প্রতীক। তিনি প্রমাণ করেছেন, সততা, নিষ্ঠা, দূরদর্শিতা আর কঠোর পরিশ্রম থাকলে যেকোনো প্রতিকূলতাকেই জয় করা সম্ভব। টিএমএসএস-এর মাধ্যমে তিনি যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করেছেন, তা আগামী প্রজন্মের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে। তিনি কেবল টিএমএসএস-এর নির্বাহী পরিচালকই নন, তিনি বাংলাদেশের নারী জাগরণ ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের এক অগ্রগণ্য সেনানী।
কপি রাইট