05/03/2026
রমাদান মাস ক্ষণস্থায়ী; মাত্র ত্রিশ দিনে সংক্ষিপ্ত, কিন্তু আত্মশুদ্ধি, ক্ষমা ও জান্নাতের পথে নিজেকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য বিশেষ সময়। রমাদানের দিনগুলো অতি দ্রুত ফুরিয়ে যায়। তাই এ মাসে জিহ্বাকে যিকিরে, অন্তরকে তাওবায় এবং দুআগুলোকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাতের প্রত্যাশায় ব্যস্ত রাখা প্রয়োজন।
তাই কালিমা, ইস্তিগফার, জান্নাতের দুআও জাহান্নাম থেকে মুক্তির প্রার্থনা- এই চারটি আমল রমাদানে বান্দার আত্মাকে জীবন্ত রাখে। এ মাসে কোন আমলগুলো বেশি করা উচিত, সে বিষয়ে রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উম্মতকে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন।
তিনি তাঁর উম্মতকে রমাদানে চারটি আমল বেশি বেশি করার কথা বলেছেন। এর মধ্যে দুটি হচ্ছে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া আলার সন্তুষ্টির জন্য, আর দুটি এমন আমল যা করা ছাড়া বান্দার কোনো উপায় নেই।
(সহিহ ইবনে খুযাইমাহ, হাদিস: ১৮৮৭)
* আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার দুটি আমল
১. কালিমা তাওহিদ বেশি বেশি পড়া:
'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' হচ্ছে কালিমা তাওহিদের মূল বাক্য এবং সর্বশ্রেষ্ঠ যিকির। বান্দা যখন আন্তরিকতার সঙ্গে এ কালিমা পড়ে, তখন সে তার রবের একত্ব স্বীকার করে এবং শিরক থেকে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করে। আর এটি শুধু মুখে স্বীকার নয়, অন্তর থেকে মানাও জরুরি। রমাদানে এই যিকির হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে এবং আমলকে দৃঢ় করে। রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
“সর্বোত্তম যিকির হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।”
(তিরমিজি, হাসান সহীহ)।
তাওহিদের এই বাক্যের মর্যাদা কত মহান, তা আরেকটি সহীহ হাদিসে স্পষ্ট হয়েছে। হযরত নূহ আলাইহিস সালাম মৃত্যুর সময় তাঁর পুত্রকে উপদেশ দিয়ে বলেন,
"আমি তোমাকে দুটি বিষয়ের আদেশ দিচ্ছি এবং দুটি বিষয়ে নিষেধ করছি। তিনি বলেন, আমি তোমাকে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর নির্দেশ দিচ্ছি। কেননা সাত আসমান ও সাত যমীন যদি এক পাল্লায় রাখা হয় এবং অপর পাল্লায় ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ রাখা হয়, তবে এ তাওহীদের পাল্লাই ভারী হবে।"
(মুসনাদ আহমাদ; সহীহ)
এ থেকেই বোঝা যায়, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' কিয়ামতের দিনে আমলের পাল্লায় সবচেয়ে ভারী বাক্যগুলোর একটি। রমাদানে এ কালিমা বেশি বেশি পড়া ঈমানকে নবায়ন করে এবং অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে।
কালিমা তাওহীদ -
لآ اِلَهَ اِلّا اللّهُ
উচ্চারণ: লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ।
অর্থ: আল্লাহ এক। আর কোন মা'বুদ নেই।
অতি সহজেই এ আমল করা যায়। আর এর বিনিময়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বান্দার ওপর সন্তুষ্ট হন।
২. ইস্তিগফার করা:
রমাদান মাস আল্লাহর ক্ষমার মাস। মানুষ প্রতিনিয়ত ভুল করে, গুনাহে জড়িয়ে পড়ে। রমাদান বান্দার বেশি বেশি ক্ষমা প্রার্থনার মাসও। কারণ এ মাসে বেশি বেশি আন্তরিক ইস্তিগফার বান্দার অন্তরকে নরম করে এবং
বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছে দেয়। এখানে কয়েকটি ইস্তিগফার দিচ্ছি -
১. সংক্ষিপ্ত ইস্তিগফার:
أَللّٰهُمَّ اغْفِرْلِيْ.
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফিরলী।
অর্থ: হে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন।
(সহিহ মুসলিম: ২৬৯৭)
২. পূর্ণাঙ্গ ইস্তিগফার:
أَسْتَغْفِرُ اللهَ الَّذِيْ لآ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّوْمُ وَأَتُوْبُ إِلَيْهِ
উচ্চারণ: আস্তাগফিরুল্লা-হাল্লাযী লা- ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়ুল ক্বাইয়ূমু ওয়া আতূবু ইলাইহি।
অর্থ: আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। যিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। যিনি চিরঞ্জীব ও বিশ্বচরাচরের ধারক এবং আমি তাঁর দিকেই ফিরে যাচ্ছি (বা তওবা করছি)।
(তিরমিযী, আবুদাঊদ)
৩. পূর্ণাঙ্গ ইস্তিগফার:
رَبِّ اغْفِرْ لِيْ وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيْمُ
উচ্চারণ: রব্বিগফিরলী ওয়া তুব ‘আলাইয়্যা, ইন্নাকা আনতাত তাউওয়্যা-বুর রহীম।
অর্থ : হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা করুন ও আমার তওবা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি তওবা কবুলকারী ও দয়াবান।
(আবুদাঊদ, ইবনু মাজাহ)
৪. সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার:
اَللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّىْ لآ إِلهَ إلاَّ أَنْتَ خَلَقْتَنِىْ ......
“আল্লাহুম্মা আন্তা রব্বী, লা ইলাহা ইল্লা আন্তা…”
(সহীহ বুখারি: ৬৩০৬)
অর্থ: হে আল্লাহ, আপনিই আমার প্রতিপালক, আপনি ছাড়া কোনো মাবুদ নাই।...
এই ইস্তিগফারকে বলে সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার বা ক্ষমাপ্রার্থনার শ্রেষ্ঠ দুআ। ক্ষমা প্রার্থনা ও জান্নাত লাভের জন্য প্রতিদিন সকাল, সন্ধ্যায় দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে এ দুআটি পড়তে ভুলবেন না।
ইস্তিগফার বান্দাকে গুনাহ থেকে মুক্ত করে এবং আল্লাহর রহমত ও রিযিকের দরজা খুলে দেয়। তাই বান্দার নিজের প্রয়োজনেই বেশি বেশি ইস্তিগফার করা জরুরি। ইস্তিগফার এত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল যে, শুধু রমাদানেই নয়; সারা বছরই এর চর্চা থাকা উচিত।
* যে দুটি আমল ছাড়া বান্দার কোনো উপায় নেই
১. জান্নাত প্রার্থনা করা:
জান্নাত কোনো অবাস্তব কল্পনা নয়; এটি একজন মুমিনের চূড়ান্ত গন্তব্য। তাই রমাদানে বারবার জান্নাত চেয়ে দুআ করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আমরা সবচেয়ে উত্তম জান্নাতই দয়াময় রবের কাছে চাইবো। তাঁর সামর্থ্য তো আমাদের সামর্থ্য বা ধারণা অনুযায়ী নয়। তিনি তো অসীম দয়ালু, দুআ কবুলকারী। রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদেরকে শিখিয়েছেন,
"তোমরা যখন আল্লাহর কাছে কিছু চাইবে, তখন জান্নাতুল ফিরদাউস চাইবে। কারণ তা জান্নাতের সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম স্থান। তার উপরে রয়েছে রহমানের আরশ এবং সেখান থেকেই জান্নাতের নহরসমূহ প্রবাহিত হয়েছে।
(সহীহ বুখারী : ২৭৯০)
তাই আমরা দুআ করবো এভাবে -
اللهُمَّ اِنِّى أسْئَلُكَ جَنَّةَ الْفِرْدَوْسِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা জান্নাতাল ফিরদাউস।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে জান্নাতুল ফেরদাউস প্রার্থনা করছি।
এটি জান্নাত লাভের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংক্ষিপ্ত দুআ, যা নবী (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বারবার পড়ার নির্দেশ দিয়ে গেছেন।
তাই প্রতি ওয়াক্ত নামাজের সিজদায়, সালাম ফিরানোর আগে বা নামাজ শেষে, দুআ কবুলের সময়, সকাল-সন্ধ্যায় আর যখনই মনে পড়বে তখনই জান্নাত চেয়ে নিন দয়াময় রবের কাছ থেকে। দুআ কবুলের মাসে গুনাহগার আমরা তো দুআ কবুল হওয়ার আশা করতেই পারি।
২. জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা:
জাহান্নামের আগুন ও অন্যান্য আযাবের শাস্তি ভয়াবহ ও কল্পনাতীত। যে বান্দা তা থেকে মুক্তি চায়, সে তার আখিরাতের ব্যাপারে সচেতন। রমাদান মাসে দয়ালু রব সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন যা অন্য কোন মাসে দেন না। তাই জান্নাত চেয়ে দুআ করার সময় জাহান্নাম থেকে বাঁচার দুআ করাও আমাদের জন্য একান্ত জরুরি।
জাহান্নাম থেকে মুক্তির দুআ -
اللَّهُمَّ أَجِرْنِي مِنَ النَّارِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আজিরনি মিনান নার।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দিন।
প্রতিদিন দিনে বা রাতের যে কোন সময় অন্তত তিন বার অথবা সাত বার করে জান্নাত চাওয়া এবং জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাওয়া আমাদের একান্ত প্রয়োজন। এর বেশি চাইলে তো আরও ভালো।
এ আমলগুলো শুধু রমাদানের জন্য নয়, জীবনের প্রতিটি দিন আমাদের জন্য আবশ্যক করে নেওয়া জরুরি। তবে রমাদানে অন্যান্য আমল করার পাশাপাশি আমরা যেন গুরুত্বপূর্ণ এ আমলগুলো করতে ভুলে না যাই।
আল- গফুর, আল- গফফার আমাদের গুনাহগুলো ক্ষমা করে দিন। মহামহিম রব তাঁর অপরিসীম দয়ায় আমাদের সবাইকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করে জান্নাতুল ফিরদৌসের অধিবাসী হিসেবে কবুল করে নিন।
______________________
|| রমাদানে চারটি আমল ||
ইসমত আরা