27/09/2026
গলার গোড়ায় থাকা থাইরয়েড গ্রন্থি হঠাৎ ফুলে উঠলে চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে Goiter বা গলগণ্ড বলা হয়। আমাদের দেশে গোয়েটারের সবচেয়ে পরিচিত ও প্রধান কারণ হলো খাদ্যাভ্যাসে আয়োডিনের ঘাটতি। থাইরয়েড গ্রন্থি কেবল রক্তের থাইরয়েড হরমোন (TSH, Free T3, Free T4) মেপে নিশ্চিত হওয়া যায় না যে গলার ফোলাভাবটি সরাসরি আয়োডিনের অভাবের কারণে হচ্ছে কি না।
এন্ডোক্রাইনোলজি, নিউট্রিশনাল বায়োকেমিস্ট্রি এবং ল্যাবরেটরি মেডিসিনের ডায়াগনস্টিক প্যাথলজি বলে, শরীরে আয়োডিনের নিখুঁত রিজার্ভ ও মাত্রা মাপার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জৈব মার্কার হলো প্রস্রাবের পরীক্ষা!
আয়োডিনের অভাবজনিত Goiter নির্ণয়ে প্রস্রাবে Urinary Iodine Excretion (UIE) টেস্টের গুরুত্ব কী, এর আণুবীক্ষণিক বায়োকেমিক্যাল মেকানিজম কী এবং ল্যাব রিপোর্টের আসল ব্যাখ্যা—চলুন সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক।
Urinary Iodine Excretion (UIE) টেস্টের বায়োকেমিক্যাল মেকানিজম
১. আয়োডিন শোষণ ও কিডনি নির্গমন:
আমরা খাবারে যে আয়োডিন গ্রহণ করি, তার প্রায় ৯০% এরও বেশি অংশ পাকস্থলী ও অন্ত্র থেকে শোষিত হয়ে রক্তে মেশে এবং কাজ শেষে কিডনি দিয়ে প্রস্রাবের সাথে বের হয়ে যায়। তাই রক্ত বা থাইরয়েড গ্রন্থির চেয়ে প্রস্রাবের নমুনা শরীরের তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদী আয়োডিন পরিমাণের নিখুঁত প্রতিফলন ঘটায়।
২. আয়োডিনের অভাবে Goiter তৈরির আণুবীক্ষণিক মেকানিজম:
রক্তে আয়োডিন কমে গেলে থাইরয়েড গ্রন্থি T3 ও T4 হরমোন তৈরি করতে পারে না।
হরমোন ঘাটতি দেখে মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্ল্যান্ড প্রচুর TSH তৈরি করে থাইরয়েডকে অনবরত চাপ দিতে থাকে।
টিএসএইচ-এর এই অতিরিক্ত উদ্দীপনায় থাইরয়েড কোষগুলোর আকার ও সংখ্যা অস্বাভাবিক বেড়ে যায় (Hyperplasia), যা গলায় Goiter হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
ল্যাবরেটরি মানদণ্ড ও UIE রিপোর্টের ব্যাখ্যা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ল্যাব মানদণ্ড অনুযায়ী প্রস্রাবে আয়োডিনের ঘনত্ব (Median Urinary Iodine Concentration - UIC):
স্বাভাবিক মান: ১০০ থেকে ১৯৯ mcg/L (শরীরে আয়োডিনের পর্যাপ্ত জোগান)।
মৃদু অভাব: ৫০ থেকে ৯৯ mcg/L (Goiter-এর ঝুঁকি শুরু)।
তীব্র আয়োডিন ঘাটতি: ২০ mcg/L-এর নিচে চলে যাওয়া (Severe Iodine Deficiency Goiter ও মেধা বিকাশের বড় ঝুঁকি)।
কেন রক্তের চেয়ে Urinary Iodine Test সেরা?
রক্তে আয়োডিন থাইরয়েড হরমোনের সাথে প্রোটিন-বাউন্ড অবস্থায় থাকে, তাই রক্ত মেপে কায়িক আয়োডিন স্ট্যাটাস সহজে বোঝা যায় না। কিন্তু প্রস্রাবের Urinary Iodine Excretion টেস্ট সম্পূর্ণ নন-ইনভেসিভ, নিখুঁত এবং ব্যক্তি ও জনস্বাস্থ্যের আয়োডিন ঘাটতি মূল্যায়নে সবচেয়ে সংবেদনশীল বায়োমার্কার।
বিশেষ প্রফেশনাল পরামর্শ:
গলা ফোলা বা Goiter-এর লক্ষণ দেখা দিলে কেবল সাধারণ থাইরয়েড হরমোন পরীক্ষা করে বসে থাকবেন না। চিকিৎসকের পরামর্শে ল্যাবরেটরি থেকে Urinary Iodine Excretion (UIE) পরীক্ষা করিয়ে নিন। শরীরে আয়োডিন ঘাটতি প্রমাণিত হলে আয়োডিনযুক্ত লবণ, সামুদ্রিক মাছ বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের মাধ্যমে প্রাথমিক গোয়েটার সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব।
আপনার কি গলা ফোলা বা আয়োডিন ঘাটতিজনিত কোনো অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে? কমেন্টে আপনার লক্ষণ বা ল্যাব রিপোর্টের তথ্য শেয়ার করতে পারেন; ল্যাবরেটরি মেডিসিনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে সঠিক বৈজ্ঞানিক তথ্য দিয়ে সাহায্য করার চেষ্টা করবো। জনস্বার্থে পোস্টটি শেয়ার করে রাখুন।