02/07/2025
🥰❤️
গাধা ও বাঙালি: একটি আত্মিক মিলের ব্যাখ্যা
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, "বাঙালি" শব্দটি নয়, বরং "গাধা" শব্দটি দিয়েই আমাদের জাতিগত স্বভাব বোঝানো যেত অনেক বেশি সুচারুভাবে। কারণ যতবার গাধার কথা মনে হয়, আমি বিস্ময়ে কাঁপতে থাকি—এই প্রাণীটি তো আমাদের আত্মীয়! শুধু আত্মীয় নয়, আত্মীয়ের আদর্শ প্রতিমূর্তি!
গাধা, যেমন নীরব; আমরাও তেমন। যতই অন্যায় হোক, গাধার মতো ঘাড় নিচু করে নিঃশব্দে মেনে নিই। প্রতিবাদের চিৎকার কেবল ফেসবুকেই সীমাবদ্ধ, বাস্তবে আমরা ঠোঁট চেপে থাকি। কেউ যেন শুনে না ফেলে, আমাদের মধ্যে এখনও সামান্য আত্মসম্মান অবশিষ্ট আছে।
গাধা কাজ করে, আর আমরা করি কর্মনাট্য। গাধা টেনে টেনে মালবাহী গাড়ি চালায়, আর আমরা টেনে টেনে দেশের উন্নয়ন কাহিনী সাজাই। গাধার শরীরে ঘাম ঝরে শ্রমের ফসল ফলাতে, আর আমাদের শরীরে ঘাম ঝরে লাইনে দাঁড়িয়ে ভাতা নিতে কিংবা সরকারি প্রজেক্টের টেন্ডার ধরতে।
গাধা তার মালিকের লাঠির শব্দ শুনলেই সামনে ছুটে চলে, যেমন আমরাও রাজনীতিক নেতার মাইক্রোফোন শুনলেই নেচে উঠি। সে জানে না কোথায় যাচ্ছে, আমরা জানি না কেন যাচ্ছি—তবু চলছি, হাঁটছি, ছুটছি, স্লোগান দিচ্ছি। কারণ মালিক বলেছে—যাও।
গাধার কোনো ধর্ম নেই, যেমন আমাদের ধর্ম আছে—কিন্তু আচরণে নেই। গাধা কখনো হিন্দু বা মুসলমান হয় না, ওর মাথায় টুপি বা তিলক পড়ে না। অথচ আমরা টুপি, পাঞ্জাবি, তিলক আর শঙ্খে বিভক্ত হয়ে থাকি—কিন্তু কাজে সবাই গাধা। গাধার একমাত্র ধর্ম হলো—কাজ করে যাও, মাথা নিচু করো। আমাদের ধর্ম হলো—কাজ না করে মাথা উঁচু করে ঝগড়া করা।
গাধার কান বড়ো, কারণ সে সব শোনে, কিছুই বলে না। আমরা সেসব মানুষের উত্তরসূরি, যারা হাজার হাজার বছর ধরে রাজা, জমিদার, ব্রিটিশ, পাকিস্তানি, রাজনৈতিক নেতা—সবার গালি শুনেছে, কিন্তু চিৎকার করেনি। ইতিহাসের সবচেয়ে ধৈর্যশীল জাতি, আমাদেরই হওয়া উচিত ছিলো গাধা জাতীয় উৎসবের জনক।
গাধার মতোই আমাদের স্মৃতি দুর্বল। গাধাকে এক জায়গায় একবার মারলে সে আবার সেখানেই ফিরে যায়। আমরাও একবার যে রাজনীতিক আমাদের ঠকিয়েছে, পরের নির্বাচনে তাকেই ভোট দিয়ে আবার ঠকি। গাধার মস্তিষ্ক ছোটো, আমরা সেই ছোটো মস্তিষ্ককেই জাতীয় সম্পদ মনে করি।
গাধা জ্ঞানচর্চা করে না। বই পড়ে না। আমরা অনেকেই তাই করি। যে জাতি “পাস” করাকে শিক্ষা মনে করে, তাদের জন্য বইয়ের তুলনায় ফেসবুক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, টিকটক বেশি শিক্ষনীয়। গাধা কাদায় পড়ে থাকলেও, নিজেকে রাজহাঁস ভাবে না। কিন্তু আমরা কাদায় গড়াগড়ি দিয়ে চিৎকার করি—“এই তো উন্নয়ন”।
গাধা পাহাড়ে ওঠে না, তার গন্তব্য ধানক্ষেত বা ইটভাটা। আমরাও উন্নয়নের পাহাড় দেখি না, দেখি হাওলাদারের বাড়ি, দেখি সরকারি চাকরির ঘুষের তালিকা। উচ্চাভিলাষে আমরা ধ্বংস হই না, কারণ উচ্চতা শব্দটাই আমাদের অভিধানে নেই।
গাধা মাঝে মাঝে ডাকে, কিন্তু তা নিয়মিত নয়। আমরাও মাঝে মাঝে গর্জে উঠি, বিশেষ করে স্ট্যাটাসে। বাস্তবে গলা তুলি না। কারণ আমরা জানি, গলার দাম নেই। যাদের গলা আছে, তাদের পেছনে র্যাব, পুলিশের লাঠি, আদালতের নোটিশ।
গাধা তার পিঠে অন্যের বোঝা বহন করে, আমরাও তাই করি। পুরো সমাজ, রাষ্ট্র, দুর্নীতি, পরিবারের চাপ, আত্মীয়ের অসুখ, বেকারত্বের যন্ত্রণা—সবই কাঁধে নিয়ে চলি। তবুও থামি না, বিদ্রোহ করি না। যেন আমরা জাতিগতভাবে গাধা হয়ে গেছি—ভালোবাসি বোঝা বইতে।
আমাদের শিল্পকলা, সাহিত্য, সংস্কৃতি—সব আজ এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছেছে, যেখানে গাধার হেঁটে চলা নান্দনিক মনে হয়। কবিতা এখন শুধু প্রেমের নয়, তেল মারারও মাধ্যম। নাটক এখন জীবন নয়, রাজনৈতিক নাচ। সিনেমা এখন শিল্প নয়, কন্টেন্ট। গাধা যেমন গাড়ি টানে, তেমনি শিল্পও আজ দালালের গাড়ি টানছে।
গাধা কখনো বিক্ষোভ করে না। তাই আমাদের ইতিহাসেও কোনও সফল বিদ্রোহ নেই। যতটুকু আছে, সেটুকু ইতিহাসের বইয়ে শুধু নামমাত্র লিখে রাখা। বাস্তব জীবনে গাধাদের জন্য কোনও মেমোরিয়াল হয় না। শুধু নেতা, সেলেব আর বুদ্ধিজীবীদের কৃতিত্বে ভরে থাকে রাষ্ট্রের মঞ্চ।
গাধা জীবনে বড় কিছু হতে চায় না। আমরাও চাই না। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী হতে চাই—তবে পড়াশোনা ছাড়াই। পদ্মা সেতু বানাতে চাই—তবে চাঁদা দিয়ে নয়, ফেসবুক পোস্টে। মহাকাশে যেতে চাই—তবে অঙ্ক না করে। উন্নয়নের স্বপ্ন দেখি, কাজের ঘোরে নয়, ঘুমের ঘোরে।
গাধার প্রেমজ জীবনও আমাদের মতোই জটিল। সে ঘাড় কাত করে একে অপরকে দেখে, তারপর প্রেমে পড়ে। আমরা মেসেঞ্জারে ১০০ মেসেজ পাঠিয়ে, ইনবক্সে “Seen” হয়ে প্রেমে পড়ি। গাধা প্রেমে ব্যর্থ হলে দুঃখ করে না, কিন্তু আমরা ব্যর্থ প্রেমের কষ্টে পোস্ট লিখি, কবিতা লিখি, মাঝে মাঝে গান গাই—“তুই না থাকলে জীবন থেমে যেতো।”
গাধার কোনো পাসপোর্ট নেই, তবুও সে সীমানা পেরোয় না। আমরাও পাসপোর্ট পেয়েও বিদেশ যেতে ভয় পাই। আবার যারা যায়, তারা আর ফেরে না। ফিরে এলেও গাধার মতো হাঁটা ভুলে যায়, তখন সে আর বাঙালি থাকে না, বিদেশফেরত ভদ্রলোক হয়ে যায়।
গাধা প্রযুক্তির প্রতি উদাসীন। আমরা প্রযুক্তি চাই, তবে সেটাও গাধার মতো ব্যবহার করি। ফোন হাতে পেলেই সেলফি, ভিডিও, রিলস; কেউ জানতে চায় না সেই প্রযুক্তি দিয়ে কীভাবে উন্নয়ন সম্ভব। আমাদের ছেলেমেয়েরা এখন ‘গুগল’ লেখে ভুল বানানে, কিন্তু ফিল্টার ঠিক ঠিক বেছে নেয়।
আমাদের গাধামি এখন এমন পর্যায়ে গেছে যে আমরা নিজের গাধামিকেই গৌরব মনে করি। একে বলে “ফিলোসফিক্যাল গাধামি”—অর্থাৎ, ভুল করেও ভুল মানি না। যারা আমাদের গাধামি ধরিয়ে দেয়, তাদের বলে ‘এন্টি-নেশনাল’, ‘গেলাম-গেলাম পার্টি’ অথবা ‘পদ্মাসেতু-বিরোধী’।
শেষ কথা হলো—গাধা তার গাধামি নিয়ে লজ্জিত নয়, আমরাও নই। বরং গর্ব করি। গাধা চুপচাপ থেকে কাজ করে, আর আমরা চুপচাপ থেকে গর্ব করি।
তবে একটা পার্থক্য থেকেই যায়। গাধা যতই কাজ করুক, সে কখনো মালিক হয় না। আর আমরা যতই গাধামি করি না কেন, সবশেষে একেকজন ছোটোখাটো মালিক হয়ে যাই—ভূমির, পদ-পদবির, বা দম্ভের মালিক।
তাই হয়তো গাধা এখন অবাক হয়ে ভাবে, “ওই যে বাঙালিরা, তারা কি আমার উন্নত সংস্করণ?”
না বন্ধু, আমরা গাধারও নিচে। কারণ গাধা জানে সে গাধা। আমরা জানি না।
___ শ্যামল নাথ
প্রবন্ধ, গাধার প্রতিভা।।
#ব্যঙ্গাত্মকরচনা #বাংলারগাধামি #সামাজিকব্যঙ্গ