13/09/2026
পাত্রী দেখার শরয়ি নিয়ম—বিয়ে হোক লজ্জা, শালীনতা ও সুন্নাহর পথে
পাত্রী দেখা কোনো প্রদর্শনী নয়—জীবনসঙ্গী নির্বাচনের আগে দ্বীন, চরিত্র, সামঞ্জস্য ও শরয়ি সীমারেখা যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ
ভূমিকা
বিয়ে ইসলামে নিছক সামাজিক অনুষ্ঠান নয়; এটি একটি পবিত্র অঙ্গীকার, যার মাধ্যমে একজন পুরুষ ও একজন নারী বৈধ দাম্পত্য জীবনে প্রবেশ করে। তাই জীবনসঙ্গী নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তে যেমন আবেগ থাকবে, তেমনি থাকবে বিবেক; যেমন পছন্দ থাকবে, তেমনি থাকবে দ্বীন, চরিত্র ও বাস্তবতার বিচার।
ইসলাম বিয়ের উদ্দেশ্যে সম্ভাব্য পাত্র-পাত্রীর একে অপরকে দেখার সুযোগ দিয়েছে। তবে সেই দেখার সঙ্গে রয়েছে পর্দা, শালীনতা, নির্জনতা থেকে বেঁচে থাকা এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত দৃষ্টিপাত না করার বিধান।
আমাদের সমাজে এ বিষয়ে দুই ধরনের চরমতা দেখা যায়। একদিকে কোনো কোনো পরিবার বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর দেখা-সাক্ষরকেই অনুচিত মনে করে; অন্যদিকে কোথাও পাত্রী দেখাকে এমন এক সামাজিক প্রক্রিয়ায় পরিণত করা হয়েছে, যেখানে একের পর এক পাত্রপক্ষ এসে মেয়েকে দেখে, পরিবারের একাধিক পুরুষ তাকে দেখে, ছবি আদান-প্রদান হয় এবং কখনো কখনো বিয়ে ঠিক হওয়ার আগেই ছেলে-মেয়ের মধ্যে অবাধ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
ইসলামের সৌন্দর্য হলো—এখানে না আছে অতি কঠোরতা, না আছে অবাধ্যতা; আছে মধ্যপন্থা, শালীনতা ও বাস্তবসম্মত নির্দেশনা।
১. আগে পাত্র সম্পর্কে জানুন, তারপর পাত্রী দেখুন
বিয়ে পারস্পরিক সিদ্ধান্ত। শুধু পাত্রপক্ষ পাত্রীকে দেখবে—এমন নয়; পাত্রীপক্ষেরও অধিকার রয়েছে পাত্রের দ্বীন, চরিত্র, পেশা, উপার্জন, পারিবারিক পরিবেশ ও দায়িত্বশীলতা সম্পর্কে জানার।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
إِذَا جَاءَكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ
“তোমাদের কাছে এমন কোনো ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলে যার দ্বীনদারি ও চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট, তাহলে তার সঙ্গে বিয়ে দাও।”
—জামে‘ আত-তিরমিজি, ১০৮৪
তাই অকারণে একের পর এক পাত্রী দেখানো, কাউকে আশা দিয়ে পরে কোনো কারণ ছাড়াই প্রত্যাখ্যান করা কিংবা পাত্রী দেখাকে বিনোদনে পরিণত করা উচিত নয়।
তবে প্রয়োজনবশত একাধিক প্রস্তাব বিবেচনা করা শরিয়তে নিষিদ্ধ—এমন কথাও বলা যাবে না। মূল বিষয় হলো মানুষের সম্মান ও শরয়ি আদব রক্ষা করা।
২. পাত্রী দেখার আগে পরিবারের নারীরা খোঁজ নিতে পারেন
পাত্রের মা, বোন, খালা, ফুফু বা বিশ্বস্ত কোনো নারী পাত্রী সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নিতে পারেন। এতে পাত্রীর স্বভাব, আচরণ ও পারিবারিক পরিবেশ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়।
তবে এটি শরিয়তের বাধ্যতামূলক বিধান নয়; বরং পারিবারিকভাবে গ্রহণযোগ্য একটি পদ্ধতি। নারী আত্মীয়দেরও অবশ্যই পর্দা ও শালীনতার সীমা মানতে হবে। পাত্রীর ব্যক্তিগত বা গোপন বিষয় অপ্রয়োজনীয়ভাবে অনুসন্ধান করা কিংবা শরীরের অনুচিত অংশ দেখার চেষ্টা করা যাবে না।
৩. পাত্র ছাড়া অন্য গায়রে মাহরাম পুরুষেরা পাত্রীকে দেখবে না
বিয়ের প্রস্তাব এসেছে বলে পাত্রের বাবা, ভাই, দুলাভাই, মামা, চাচা বা অন্য কোনো গায়রে মাহরাম পুরুষের পাত্রীকে দেখার অধিকার তৈরি হয় না।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ
“মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে।”
—সূরা আন-নূর, ২৪:৩০
অতএব, সম্ভাব্য বর ছাড়া অন্য গায়রে মাহরাম পুরুষদের জন্য পাত্রী দেখা বৈধ নয়।
৪. পাত্র-পাত্রীর একে অপরকে দেখা বৈধ
বিয়ের আগে সম্ভাব্য জীবনসঙ্গীকে দেখা শরিয়তসম্মত। রাসুলুল্লাহ ﷺ একজন সাহাবিকে বিয়ের আগে পাত্রীকে দেখে নিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।
انْظُرْ إِلَيْهَا، فَإِنَّهُ أَحْرَى أَنْ يُؤْدَمَ بَيْنَكُمَا
“তুমি তাকে দেখে নাও; কারণ এতে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও বন্ধন স্থাপনের সম্ভাবনা বেশি।”
—জামে‘ আত-তিরমিজি, ১০৮৭
তাই অতিরিক্ত লজ্জার কারণে বিয়ের আগে পাত্র বা পাত্রী একে অপরকে না দেখে বিয়ে করে ফেলা সব ক্ষেত্রে উত্তম—এমন ধারণা ঠিক নয়। জীবনসঙ্গী নির্বাচনের আগে পরস্পরকে দেখার সুযোগ থাকা বাস্তবসম্মত।
৫. পাত্রীও পাত্রকে দেখবে
ইসলামে নারীরও বিয়ের ক্ষেত্রে মতামত ও সম্মতির অধিকার রয়েছে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
لَا تُنْكَحُ الأَيِّمُ حَتَّى تُسْتَأْمَرَ، وَلَا تُنْكَحُ الْبِكْرُ حَتَّى تُسْتَأْذَنَ
“পূর্বে বিবাহিত নারীকে তার পরামর্শ ছাড়া এবং কুমারী নারীকে তার অনুমতি ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না।”
—সহিহ মুসলিম, ১৪১৯
অতএব, পাত্রীকে পাত্র সম্পর্কে জানার এবং তাকে দেখার সুযোগ দেওয়া উচিত। লজ্জা যেন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারকে গ্রাস না করে।
৬. নির্জনে দেখা বা কথা বলা যাবে না
পাত্র-পাত্রী একে অপরকে দেখবে—এর অর্থ এই নয় যে তারা নির্জনে বসে দীর্ঘ সময় কথা বলবে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ
“কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে অবস্থান না করে, তার সঙ্গে মাহরাম না থাকা অবস্থায়।”
—সহিহ আল-বুখারি, ৫২৩৩
প্রয়োজনীয় আলোচনা হলে পাত্রীর মাহরাম বা পরিবারের বিশ্বস্ত সদস্যের উপস্থিতিতে তা করা যেতে পারে।
৭. বাগদান বিয়ে নয়
আমাদের সমাজে বাগদান বা কথা পাকাপাকি হওয়ার পর অনেকেই মনে করেন ছেলে-মেয়ের মধ্যে আর পর্দা নেই। এটি ভুল।
নিকাহ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তারা পরস্পরের জন্য গায়রে মাহরাম।
তাই বাগদানের পর অবাধ ফোনালাপ, প্রেমের ভাষায় কথাবার্তা, একান্তে দেখা করা কিংবা গোপনে ঘোরাফেরা শরিয়তসম্মত নয়। প্রয়োজনীয় কথা হলে তা সংক্ষিপ্ত, শালীন ও উদ্দেশ্যপূর্ণ হওয়া উচিত।
৮. সৌন্দর্যের পাশাপাশি দ্বীন ও চরিত্রকে অগ্রাধিকার দিন
পাত্র-পাত্রীর বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখা বৈধ হলেও এটিই যেন প্রধান মানদণ্ড না হয়।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ: لِمَالِهَا، وَلِحَسَبِهَا، وَلِجَمَالِهَا، وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ
“নারীকে চারটি বিষয়ের কারণে বিয়ে করা হয়—তার সম্পদ, বংশমর্যাদা, সৌন্দর্য ও দ্বীনদারির কারণে। তুমি দ্বীনদার নারীকে অগ্রাধিকার দাও।”
—সহিহ আল-বুখারি, ৫০৯০
অতএব সৌন্দর্য দেখা যাবে, কিন্তু দ্বীন ও চরিত্রকে বাদ দিয়ে শুধু সৌন্দর্যকে ভিত্তি করা যাবে না।
৯. পাত্রের উপার্জন ও দায়িত্বশীলতা যাচাই করুন
পাত্র কী করেন, তার উপার্জন হালাল কি না, ঋণ আছে কি না, সংসারের দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা কেমন—এসব জানা গুরুত্বপূর্ণ।
একইভাবে পাত্রীর শিক্ষা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, পারিবারিক প্রত্যাশা ও দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে ধারণাও জানা যেতে পারে।
বিয়ের আগে বাস্তব তথ্য জানা পরবর্তীকালের অনেক ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে পারে।
১০. গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গোপন করা যাবে না
গুরুতর রোগ, পূর্বের বিবাহ, সন্তান, আসক্তি, গুরুত্বপূর্ণ ঋণ কিংবা এমন কোনো বিষয় যা বিবাহিত জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলবে—তা ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করে বিয়ে করা উচিত নয়।
বিয়ে হলো আমানত। প্রতারণার ওপর গড়ে ওঠা সংসারে বরকত আসা কঠিন।
১১. ছবি নিয়ে সতর্কতা
বিয়ের প্রস্তাবের অজুহাতে পাত্রীর ছবি নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গ্রুপে ছড়িয়ে দেওয়া অত্যন্ত অনুচিত।
প্রয়োজনের অতিরিক্ত ছবি আদান-প্রদান, সংরক্ষণ কিংবা অন্যকে দেখানো থেকে বিরত থাকা উচিত। যে সম্পর্ক বিয়ে পর্যন্ত পৌঁছায়নি, তার জন্য একজন নারীর ব্যক্তিগত ছবি বহু মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
১২. পাত্রীকে প্রদর্শনীর বস্তু বানানো নয়
পাত্রীকে এমনভাবে সাজিয়ে বসানো, যেন তাকে কোনো পণ্য হিসেবে যাচাই করা হচ্ছে—এটি ইসলামী আদবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
স্বাভাবিক, শালীন ও সম্মানজনক পরিবেশে দেখা উচিত। তার সৌন্দর্য নিয়ে পরে অন্যদের কাছে আলোচনা করাও অনুচিত।
১৩. পছন্দ না হলে সম্মান রক্ষা করুন
কোনো প্রস্তাব পছন্দ না হলে প্রত্যাখ্যান করা বৈধ। কিন্তু কাউকে অপমান করা যাবে না।
“মেয়ে দেখতে ভালো নয়”, “ছেলে যোগ্য নয়”—এভাবে মানুষের সামনে মন্তব্য না করে ভদ্রভাবে বলা উচিত, “আমাদের পারিবারিক বিবেচনায় এ প্রস্তাবে এগোনো সম্ভব হচ্ছে না।”
প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা যায়; মানুষের সম্মান প্রত্যাখ্যান করা যায় না।
১৪. ইস্তিখারা ও মাশওয়ারা করুন
তথ্য যাচাই, পরিবার ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের পরামর্শ এবং পাত্র-পাত্রীর পারস্পরিক গ্রহণযোগ্যতার পর আল্লাহর কাছে ইস্তিখারা করা উত্তম।
তবে ইস্তিখারার অর্থ শুধু স্বপ্ন দেখা নয়। বরং আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাওয়া এবং তাঁর ওপর ভরসা করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া।
১৫. অভিভাবকের পরামর্শ থাকবে, জোরজবরদস্তি নয়
বাবা-মা সন্তানের জন্য পরামর্শ দেবেন, অভিজ্ঞতা কাজে লাগাবেন এবং উপযুক্ত পরিবার নির্বাচন করতে সাহায্য করবেন। কিন্তু সন্তানের অনিচ্ছাকে উপেক্ষা করে জোর করে বিয়ে দেওয়া ইসলামের সুন্দর নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিশেষ করে মেয়ের মতামতকে “লজ্জা” বলে উপেক্ষা করা উচিত নয়।
১৬. বিয়ের গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো আগে পরিষ্কার করুন
দেনমোহর, বাসস্থান, চাকরি বা পড়াশোনা, বিদেশে যাওয়া, বাবা-মায়ের দেখাশোনা, পারিবারিক দায়িত্ব—এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিয়ের আগে পরিষ্কারভাবে আলোচনা করা ভালো।
পরিষ্কার বোঝাপড়া ভবিষ্যতের অনেক বিরোধ প্রতিরোধ করতে পারে।
উপসংহার
পাত্রী দেখা কোনো বিনোদন নয়, কোনো প্রদর্শনীও নয়। এটি একটি জীবনসঙ্গী নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
ইসলাম একদিকে সম্ভাব্য পাত্র-পাত্রীর পরস্পরকে দেখার অনুমতি দিয়েছে, অন্যদিকে দৃষ্টি সংযত রাখা, পর্দা রক্ষা করা, নির্জনতা থেকে বেঁচে থাকা এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পর্ক না করার নির্দেশ দিয়েছে।
তাই আমাদের বিয়ের সংস্কৃতিতে প্রয়োজন না অতি লজ্জার, না অবাধ স্বাধীনতার; বরং শরিয়তের ভারসাম্যপূর্ণ পথের।
পাত্রীর সম্মান থাকবে, পাত্রের মর্যাদাও থাকবে। পাত্রের দ্বীন ও চরিত্র যাচাই হবে, পাত্রীরও মতামত নেওয়া হবে। সৌন্দর্য দেখা হবে, কিন্তু দ্বীন ও চরিত্রকে বিসর্জন দিয়ে নয়। প্রয়োজনীয় কথা বলা হবে, কিন্তু প্রেমের সম্পর্ক তৈরি করা হবে না।
সবশেষে মনে রাখতে হবে—
“বিয়ে শুধু একজন সুন্দর মানুষ খোঁজার নাম নয়; বরং এমন একজন জীবনসঙ্গী খোঁজার নাম, যার সঙ্গে দুনিয়ার সংসার শান্তিময় হবে এবং আখিরাতের পথও সহজ হবে।”
আল্লাহ তাআলা আমাদের সন্তানদের জন্য দ্বীনদার, চরিত্রবান, উপযুক্ত ও কল্যাণময় জীবনসঙ্গী নির্বাচন করার তাওফিক দান করুন। আমাদের সমাজে বিয়ের ক্ষেত্রে অশালীনতা, অপব্যবহার ও প্রদর্শনীর সংস্কৃতি দূর করে সুন্নাহ, শালীনতা, সম্মান ও পারস্পরিক সম্মতির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করুন।
آمِين يَا رَبَّ الْعَالَمِينَ