24/05/2026
মদিনার আদব
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
গত রাতে পবিত্র নগরী মদিনায় মসজিদে নববীর অদূরে এক মোবারক মজলিসে বসার সুযোগ হয়েছিল। যেখানে প্রায় পয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চাশজন হাজ্বী সাহেব অংশ নিয়েছিলেন। সেই মজলিসে বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন পরিচিত আলেম ব্যক্তিত্বও উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঢাকার মাওলানা হামিদ জহিরি ও মাওলানা কেফায়াতুল্লাহ কাশফী। ছিলেন ফেনী জামিয়া রশিদিয়ার এক সিনিয়র ওস্তাদও।
রাতের ভোজন শেষে মাওলানা হামিদ জহিরি সাহেবকে হাজ্বী সাহেবরা আবদার করলেন কিছু নসীহা পেশ করার জন্য। তিনি সংক্ষিপ্ত খুৎবা শেষে পবিত্র মদিনায় বসবাসের আদব সম্পর্কে আলোচনা শুরু করলেন। কয়েক মিনিটের সংক্ষিপ্ত আলোচনায় তিনি তিনটি ঘটনা বর্ণনা করলেন। উনার আবেগময় বর্ণনা ভঙ্গি আর ঘটনাগুলোর স্পর্শকাতরতা সবার হৃদয়কে ছুয়ে গেছে। কাউকে নিজের অনাকাঙ্ক্ষিত ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য লজ্জিত হতে দেখেছি। আবার কাউকে অশ্রুসজল হতেও দেখেছি।
ঘটনাগুলো.....
১,
এক বড় বুজুর্গ মদিনা শরীফ জিয়ারতে এসেছেন। তিনি মদিনায় অবস্থানকালীন সময়ে এখানকার দই খান। দইটা উনার কাছে একটু টক মনে হয়। উনি কথাপ্রসঙ্গে কেউ একজনকে মদিনার দই টক লাগার বিষয়টি শেয়ার করেন। বলেন, 'মদিনার দই টক'। ব্যস এটুকুই। উনি রাতে ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুমের মধ্যে প্রিয় নবীজি ﷺ স্বপ্নযোগে উনার সামনে উপস্থিত হলেন। এবং তাঁকে বললেন, 'মদিনার দই বুঝি টক'? আগামীকাল সূর্যোদয়ের পূর্বেই তুমি মদিনা ত্যাগ করবে। উনি স্বপ্ন দেখার পর ফজর হওয়ার পূর্বেই প্রিয় নবীজি ﷺ আদেশ অনুযায়ী পবিত্র মদিনা ত্যাগ করেন।
২,
পবিত্র মসজিদে নববীতে একদিন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু শুয়ে ছিলেন। হঠাৎ তিনি অনুভব করলেন তাঁর গায়ে এক ছোট্ট পাথরের টুকরো এসে পড়েছে। তিনি তড়িঘড়ি করে ওঠে বসতেই দেখলেন হযরত ওমর রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু তাঁকে ইশারা দিয়ে বলছেন, দূরে ওই জায়গায় দুজন যুবক বসে কথা বলছে। তাদের পরিচয় বের করুন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু সেই যুবক দুজনের কাছে গিয়ে পরিচয় এবং কোত্থেকে এসেছে জানতে চাইলেন। যুবক দুজন বললেন, 'তায়েফ থেকে '।
একথা শোনার পর হযরত ওমর রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু বললেন, আজ তোমরা দূরের মেহমান হওয়াতে বেঁচে গেছো। অন্যথায় পবিত্র মসজিদে নববীতে বসে উচ্চস্বরে কথা বলার অপরাধে তোমাদেরকে কঠিন শিক্ষা দিতাম। আল্লাহু আকবার! একেই বুঝি বলে নবীপ্রেম?!
৩,
তিন নাম্বারের ঘটনাটা যতটুকু মনে পড়ে এরকম। ঘটনাটা উনার সাথেই ঘটেছে।
দুই হাজার এগারো সালে সর্বপ্রথম মাওলানা হামিদ জহিরি সাহেব মক্কা মদিনা সফরে আসেন। তিনি মদিনা শরীফে বসে আছেন। দেখেন দুই মিশরীয় যুবক পবিত্র রওজা মোবারকের দিকে পা টেনে বসে আছে। তিনি দৃশ্যটি দেখে কষ্ট পান। কষ্ট থেকেই তিনি যুবকদ্বয়ের কাছে ছুটে যান। গিয়ে কথা বলা শুরু করলেন। পরিচয় পর্ব শেষে তিনি যুবকদের বললেন, 'ধরুণ আপনাদের সামনে আপনাদের জন্মদাত্রী মা বসে আছেন। তখন কি আপনারা মায়ের দিকে পা টেনে এভাবে বসতে পারবেন বা বসবেন'?
যুবকদ্বয় একথা শোনা মাত্র চিৎকার দিয়ে আসতাগফিরুল্লাহ পড়তে পড়তে বলল, 'অসম্ভব। প্রশ্নই আসে না'। তখন মাওলানা সাহেব তাদের বললেন, 'যেখানে আপনারা জন্মদাত্রী মায়ের সামনে এভাবে বসাটা অসম্মান মনে করেন, সেখানে দুজাহানের সরদারের রওজার দিকে পা টেনে বসে আছেন কীভাবে? যুবকদ্বয় অপরাধ বুঝতে পেরে লজ্জিত হয়ে তাওবা করতে লাগলেন, আর বললেন, আর কখনো এমনটা হবে না।
(উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ পবিত্র কা'বা বা রওজা মোবারকের দিকে পা টেনে বসাটা দোষের কিছু মনে করে না। যদিও এটা আদবের খেলাফ।)
মাওলানা হামিদ জহিরি সাহেবের এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা শোনার পর আমার শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেছে। পিনপতন নীরবতা নেমে এসেছিলো গোটা মজলিসজুড়ে। অতীতে নিজের অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল-ত্রুটির জন্য লজ্জায় আপাদমস্তক নত হয়ে গেছে। কর্মসূত্রে এই শহরে বসবাসের সুবাধে অজান্তে কত বেয়াদবিই না করে ফেলেছি পবিত্র রওজা মোবারক ও এই পবিত্র এই নগরীর সাথে!
আল্লাহ আমাকে মাফ করুন।
মাওলানা হামিদ জহিরি সাহেবের এই গুরুত্বপূর্ণ তিনটি ঘটনার বর্ণনা থেকে পবিত্র মদিনায় বসবাসকারী ও জিয়ারতকারীদের জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নসীহা রয়েছে।
১,
পবিত্র মদিনার যেকোনো বিষয় নিয়ে সমালোচনা করা থেকে বিরত থাকা। হোক তা খাবারদাবার, হোটেল ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি...
২,
মসজিদে নববীতে উচ্চবাচ্য বা অহেতুক কথাবার্তা বলা থেকে বিরত থাকা। চোখের হেফাজত করা ইত্যাদি..
৩,
আরবীয়দের দেখাদেখি আদবের খেলাফ সর্বপ্রকার কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা।
আল্লাহ পবিত্র মদিনায় বসবাসকারী ও জিয়ারতকারী সবাইকে এই নসীহাগুলো মেনে চলার তাওফিক দান করুন।
-সংগৃহীত
#ﷺ