22/01/2019
একদা এক জঙ্গলে একটা শিয়াল ও একটা কচ্ছপের অনেক গভীর বন্ধুত্ব ছিল। তাদের বন্ধুত্বের কথা বনের সবাই জানত। জানত বলেই বনের পশু-পাখিরা তাদের হিংসে করত। শেয়াল সেদিকে কান দিতে চায়ত না। চারপাশের কানাঘুষা শুনে কচ্ছপের মনে ভয় বাড়তে থাকে, যদি বন্ধুত্ব ভেঙে যায়, ভুল বুঝে শেয়াল দূরে সরে যায়! শেয়াল কোনো গুজবেই কান দিতে চায়ত না। নিজেরা ঠিক থাকলে ভুল বোঝাবুঝি হবে না। শেয়াল বিশ্বাস করে, বনে এমন বন্ধুত্ব আরো থাকা দরকার। তাহলে সবার মাঝে শান্তি ফিরবে। কারণে-অকারণে কেউ কাউকে মারবে না। দুর্বলের উপর ঝাপিয়ে পড়বে না। সবার মাঝে ফিরে আসবে শান্তি-শৃঙ্খলা।
একদিন শেয়াল আর কচ্ছপ গল্প করতেছিল। দূর থেকে এক বাঘ এটা দেখছিল। বাঘ ছিল খুবই ক্ষুধার্ত। সারাদিন কিছু খেতে পায় নি। বাঘ ভাবছে এবার অন্তত ক্ষুধা মিটবে। বাঘ নিঃশব্দে সামনের দিকে এগিয়ে আসছিল। তা দেখতে পায় শেয়াল। এমন বিপদের কথা কচ্ছপকে না জানিয়ে কেটে পড়ে, দূরে গিয়ে সামান্য আড়ালে বসে থাকে।
বাঘ এসে কচ্ছপ্টাকে ধরে ফেলে। আজ কচ্ছপ খেয়েই ক্ষুধা মিটাবো সে। কচ্ছপের মাংস খেতে বেশ মজা। কিন্তু খেতে গিয়ে কোনভাবেই সুবিধা করতে পারল না বাঘ। কচ্ছপের শরীরের উপরের অংশ যে খুব শক্ত! বুড়ো বাঘের দাঁতে কুলোয় না। একবার মুখে নেয় আরেকবার বের করে। কচ্ছপের চোখজোড়া কোটরের ভেতর। মাঝে মধ্যে চোখ খোলে। মিটমিট করে দেখে। দেখতে দেখতে ভয় পায়, ভয়ে আরো জড়ো হয়ে আসে, ভেতরের দিকে যায়। বন্ধুকে খোঁজে। বিপদের দিনে বন্ধুর সহযোগীতা দরকার। বুদ্ধিমান শেয়ালের সহযোগিতা দরকার, অথচ সে আগেই পালিয়েছে।
বাঘ চেষ্টা করে যাচ্ছে। কচ্ছপের মাংস খাবেই খাবে। কষ্ট হলেও খাবে। চাইলেই যখন-তখন কচ্ছপ মেলে না। কচ্ছপের মাংস খেতে হলে ভাগ্য লাগে। এই মাংসে শক্তি দুই-তিন গুণ বাড়ে। এমন সুযোগ কোন আহাম্মক হাতছাড়া করবে? অন্তত বাঘ হাতছাড়া করতে চায় না। বাঘের মেজাজ খুব খারাপ। সহযোগিতার জন্য এদিক-সেদিক তাকায়। আশপাশে কেউ নেই।
এমন সময় বাঘের কানে ‘মামা’ শব্দটি আসে। কে আমাকে ডাকছে?
বাঘ আবারও সেই মধুর ডাকটি শুনতে পায়, ‘মামা!’। বাঘের নজর আড়ালে থাকা শেয়ালের দিকে।
বাঘ: ভাগিনা, তুমি ওখানে কেনো?
শেয়াল: মামা যেখানে ভাগিনাও সেখানে।
বাঘ: হুম। মামা-ভাগিনা যেখানে বিপদ নাই সেখানে।
শেয়াল: মামা, তুমি এখানে কী করছ?
বাঘ: ভাগিনা, কয়দিন ধরে খুবই ক্ষুধার্ত। সামনেই কচ্ছপটি পেয়ে গেলাম। তাছাড়া কচ্ছপের মাংসে খুবই শক্তি। খেতেও মজা। অল্পতেই ক্ষুধা মিটে। ভাগিনা, চাইলে তুমিও আসতে পারো।
শেয়াল: আমি এলে তোমার ভাগে যে কম পড়বে।
বাঘ: তুমি তো ছোট। পরিমাণে কম খাবে।
শেয়াল: মামা, আগে বলো, এটা খাবো কীভাবে?
বাঘ: চেষ্টা করে দেখি, উপায় একটা বের হবে।
শেয়াল: কষ্ট করার দরকার নেই। এটা খাওয়ার উপায় আমার জানা আছে।
বাঘ: ভাগিনা, জলদি বলো। ক্ষুধায় দুর্বল আমি। কোনো বুদ্ধি মাথায় কাজ করছে না।
শেয়াল: তুমি যে বোকা তা বনের সবাই জানে।
বাঘ: ভাগিনা, তুমিও বোকা বললে? খুব কষ্ট পেয়েছি। মামাকে কেউ বদনাম দিলে তোমার উচিত প্রতিবাদ করা।
শেয়াল: ওরা সংখ্যায় বেশি ছিল। তাই পারিনি।
বাঘ: ওসব পরে হবে। আগে বলো কীভাবে কচ্ছপ খাবো।
শেয়ালঃ মামা, কচ্ছপটি আগুনে ফেলো। তখন পুড়ে নরম হবে, খেতে কষ্ট হবে না। তাছাড়া পোড়া মাংসের মজাই অন্যরকম।
শেয়ালের পরামর্শ শুনে কচ্ছপের জিহ্বা শুকিয়ে আসে। চোখ লাল হয়। পানি জমে। শরীরের অর্ধেক শক্তি কমে আসে। কচ্ছপ ভাবে, শেয়াল আমার বন্ধু! বন্ধু হয়ে সর্বনাশী বুদ্ধি দিতে পারলো! বাস্তবে শেয়াল কারো বন্ধু হয় না। হতে পারে না। বুঝলাম, শেয়াল যার বন্ধু তার শত্রুর প্রয়োজন হবে না। এরা আজীবন ধূর্ত থাকে। হতে পারে শেয়ালই বাঘ ডেকে এনেছে। এতদিন সে আমার সঙ্গে বন্ধুত্বের ভান করেছে। বিপদের দিনে বন্ধু চেনা যায়।
বাঘ: ভাগিনা, বনে আগুন পাবো কোথায়?
শেয়াল: তাই তো... তাই তো! আরেকটি বুদ্ধি বের করি তাহলে?
বাঘ: খুবই ক্ষুধা পেয়েছে। তাড়াতাড়ি বুদ্ধি বের করো। আমার আর সহ্য হচ্ছে না।
শেয়াল: মামা, একে নদীতে ফেলে দাও। ভিজে নরম হবে। তখন খেতে ভালো লাগবে।
বাঘ: তোমার বুদ্ধির জবাব নেই। এই বনে তুমিই আমার একমাত্র ভাগিনা। বাকিরা শত্রু। না হয় এত ভালো বুদ্ধি কেউ দিলো না কেনো! উল্টো সবাই পালিয়েছে।
বাঘ নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়ায়। সামনে-ডানে-বামে একবার করে তাকায়। তাকানোর পর কচ্ছপটি নদীতে ছুঁড়ে মারে। কচ্ছপ তলিয়ে যায়। পাড়ে অপেক্ষা করে বাঘ। কচ্ছপ ভিজে নরম হয়ে এলেই খাবে। এরপর ক্ষুধা মিটাবে। বাঘের অপেক্ষা শুরু হয়। কচ্ছপ আর ফিরে আসে না।
চারপাশে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। সূর্যও ডুবে যাচ্ছে। পাখিরা ঘরে ফিরছে। বাঘ বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত। রাগে-ক্ষোভে ফিরে আসে শেয়ালের কাছে। এসে দেখে সেখানে শেয়াল নেই। বাঘের বুঝতে বাকি রইল না। মনে পড়ল শেয়াল আর কচ্ছপের বন্ধুত্বের কথা। বোকা বাঘ মনের দুঃখে আবার বনের দিকে হাঁটতে শুরু করে।