12/09/2026
https://www.facebook.com/story.php?story_fbid=1660707795623001&id=100050513888287&post_id=100050513888287_1660707795623001&mibextid=Nif5oz
রাশিয়ার কোলোমনা শহরের মাটির নিচে প্রায় ছয়শো বছর ধরে চাপা ছিল একটি ছোট সিরামিক জাগ। ২০২৬ সালে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা সেই জাগ উদ্ধার করে ভিতরে পান ২,৬০০-রও বেশি রুপোর মুদ্রা। কিন্তু আবিষ্কারের আসল বিস্ময় শুধু মুদ্রার সংখ্যা নয়। এর মধ্যে ৩৫০টিরও বেশি মুদ্রার ধরন আগে গবেষকদের কাছে অজানা ছিল। অধিকাংশ মুদ্রা তৈরি হয়েছিল চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতকের সন্ধিক্ষণে, ভাসিলি প্রথম ও ভাসিলি দ্বিতীয়ের শাসনকালে।
এত বিপুল সম্পদের মালিক যে সাধারণ মানুষ ছিলেন না, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। সম্ভবত তিনি ছিলেন ধনী বণিক অথবা প্রশাসনের উচ্চপদস্থ ব্যক্তি। কিন্তু কেন তিনি সম্পদ মাটির নিচে লুকিয়ে রেখে আর ফিরে এলেন না? মুদ্রাগুলির শেষ তারিখ এবং ১৪২৪ থেকে ১৪২৭ সালের মহামারির ইতিহাস মিলিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা মনে করছেন, সেই মানুষটি হয়তো মহামারির শিকার হয়েছিলেন। সত্যিই কি তাই হয়েছিল? প্রায় ছয়শো বছর পরেও সেই প্রশ্নের উত্তর মাটির নিচেই লুকিয়ে আছে।
----
প্রায় ছয়শো বছর আগে মাটির নিচে একটি ছোট মাটির জাগ লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। বাইরে থেকে দেখলে সেটি ছিল সাধারণ একটি পাত্র। কিন্তু তার ভিতরে ছিল এমন এক সম্পদ, যার পরিমাণ দেখে আজও প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বিস্মিত। রাশিয়ার কোলোমনা শহরের ঐতিহাসিক কেন্দ্রে খনন করতে গিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা সেই জাগের ভিতর থেকে উদ্ধার করেছেন ২,৬০০-রও বেশি রুপোর মুদ্রা। মুদ্রাগুলি পঞ্চদশ শতকের প্রথম দিকের। আরও আশ্চর্যের বিষয়, এর মধ্যে ৩৫০টিরও বেশি মুদ্রার ধরন আগে গবেষকদের কাছে অজানা ছিল।
কোলোমনা আজ মস্কোর দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক শহর। মস্কো থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১১৪ কিলোমিটার। কিন্তু চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতকে এই শহরের গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। তখন মস্কোর পর এটি ছিল অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগরকেন্দ্র। শহরের ঐতিহাসিক কেন্দ্র, প্রাচীন দুর্গের কাছাকাছি এলাকায় প্রত্নতাত্ত্বিকেরা উদ্ধারকাজ চালানোর সময় একটি অগভীর গর্তের সন্ধান পান। সেই গর্তের মধ্যেই ছিল ছোট, সুন্দরভাবে তৈরি সিরামিক জাগটি। জাগটি প্রায় ছয়শো বছর ধরে মাটির নিচে চাপা ছিল।
জাগের ভিতরের মুদ্রাগুলির অধিকাংশই ছিল দেঙ্গা নামে পরিচিত রুপোর মুদ্রা। মস্কোর গ্র্যান্ড প্রিন্সিপ্যালিটিতে চতুর্দশ শতকের শেষভাগ থেকে এই মুদ্রা তৈরি হত। একটি দেঙ্গার মূল্য ছিল অর্ধেক কোপেক এবং ১০০ কোপেক মিলে এক রুবল। উদ্ধার হওয়া মুদ্রাগুলির অধিকাংশ তৈরি হয়েছিল মস্কোর গ্র্যান্ড প্রিন্স ভাসিলি প্রথম এবং তাঁর পুত্র ভাসিলি দ্বিতীয়ের শাসনকালে। ভাসিলি প্রথম শাসন করেছিলেন ১৩৮৯ থেকে ১৪২৫ সাল পর্যন্ত এবং ভাসিলি দ্বিতীয়ের শাসনকাল ছিল ১৪২৫ থেকে ১৪৬২ সাল।
এই মুদ্রাভাণ্ডারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির একটি হল এর বৈচিত্র্য। গবেষকেরা এখনও পর্যন্ত ৩৫০টির বেশি এমন মুদ্রার ধরন শনাক্ত করেছেন, যেগুলি আগে তাঁদের নথিতে ছিল না। পঞ্চদশ শতকে মুদ্রা তৈরি হত হাতে খোদাই করা ছাঁচ ব্যবহার করে। ফলে একই সময়ের মুদ্রাতেও নকশা, অক্ষর কিংবা প্রতীকে সামান্য পার্থক্য দেখা যেত। কোলোমনার এই ভাণ্ডারে এমন বহু ছাঁচের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে, যেগুলির অস্তিত্ব আগে জানা ছিল না। এর ফলে সেই সময় শহরে কীভাবে মুদ্রা তৈরি হত, কোন ধরনের মুদ্রা বাজারে চলত এবং স্থানীয় মুদ্রা তৈরির প্রযুক্তি কীভাবে বদলেছিল, তা বোঝার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মুদ্রাগুলির মধ্যে একটি বিশেষভাবে বিরল দেঙ্গায় রয়েছে উড়ে চলা পাখির প্রতীক। এই ধরনের মুদ্রা ভাসিলি প্রথমের শাসনের শেষদিকের বলে মনে করা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে তৈরি এমন মুদ্রার উপস্থিতি কোলোমনার নিজস্ব অর্থনৈতিক গুরুত্বেরও ইঙ্গিত দেয়। একই ভাণ্ডারে এত বিপুল সংখ্যক মুদ্রা একসঙ্গে পাওয়া যাওয়ায় গবেষকেরা সেই সময়কার বাজারে কোন মুদ্রাগুলি একই সঙ্গে প্রচলিত ছিল, তার আরও স্পষ্ট ছবি তৈরি করতে পারবেন।
এত বড় সম্পদ সাধারণ কোনও মানুষের হাতে থাকার সম্ভাবনা কম। গবেষকদের অনুমান, জাগটির মালিক সম্ভবত সমাজের উচ্চস্তরের একজন মানুষ ছিলেন। তিনি হয়তো মস্কোর গ্র্যান্ড প্রিন্সের প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত কোনও উচ্চপদস্থ কর্মচারী, অথবা অত্যন্ত সফল কোনও বণিক। অন্য একটি গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে, এই রুপোর সম্পদের মূল্য সেই সময় দুটি বাড়ি এবং এক পাল ঘোড়া কেনার মতো ছিল। অর্থাৎ এটি নিছক সঞ্চয় নয়, একজন অত্যন্ত সচ্ছল মানুষের দীর্ঘদিনের জমা সম্পদ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি অন্য জায়গায়। এত সম্পদ মাটির নিচে লুকিয়ে রাখার পরে মালিক ফিরে এসে তা নিয়ে গেলেন না কেন? মুদ্রাগুলির সময়কাল সেই রহস্যের একটি সম্ভাব্য সূত্র দিয়েছে। জাগের সবচেয়ে সাম্প্রতিক মুদ্রাগুলি তৈরি হয়েছিল ১৪২০-এর দশকের দ্বিতীয়ার্ধে। সেই সময়, প্রায় ১৪২৪ থেকে ১৪২৭ সালের মধ্যে, রুশ ভূখণ্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে মহামারির প্রকোপ দেখা দিয়েছিল।
সেখান থেকেই প্রত্নতাত্ত্বিকদের একটি চাঞ্চল্যকর অনুমান তৈরি হয়েছে। হয়তো সেই ধনী ব্যক্তি নিজের সম্পদ নিরাপদ রাখার জন্য মাটির নিচে জাগটি লুকিয়ে রেখেছিলেন। তারপর মহামারির সময় তিনি অসুস্থ হয়ে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে জাগটির অবস্থানের গোপন তথ্যও হারিয়ে যায়। ফলে রুপোর সেই বিপুল সম্পদ মাটির নিচেই থেকে যায়। প্রায় ছয়শো বছর পরে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা যখন জাগটি তুলে আনলেন, তখন তার ভিতরে শুধু রুপোর মুদ্রা ছিল না—ছিল পঞ্চদশ শতকের কোলোমনার অর্থনীতি, বাণিজ্য, মুদ্রা তৈরি এবং সেই সময়ের মানুষের জীবনের এক বিরল দলিল।