15/07/2019
~ কম্পুকৌশল ৫ - কম্পিউটার ভাইরাস কীভাবে আক্রমণ করে? ~
© Ragib Hasan
আমি যখন প্রথম কম্পিউটারের সাথে পরিচিত হই, সেই নব্বই এর দশকের সময়টাতে দেশে খুব একটা কম্পিউটার ছিলো না। গুটি কয়েক অফিসে, অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে ছাড়া খুব অল্প জায়গাতেই কম্পিউটার ছিলো। এই সময়ে আমার পরিচিত একজন কম্পিউটার কিনলেন। মহা উৎসাহের সাথে আমরা সবাই গেলাম দেখতে।
কিন্তু একী!!
কম্পিউটার দেখার আগে বিশাল তোড়জোড়। রুম বন্ধ করে এসি চালিয়ে সেই রুমে কম্পিউটারটা আছে। রুমে ঢোকার আগে কাপড় চোপড় ঝেড়ে নিতে হবে, পায়ের স্যান্ডেল/জুতা সব বাইরে রেখে পা ধুয়ে, এবং হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে তবেই সেই রুমে ঢোকার অনুমতি পাচ্ছে কেউ। কম্পিউটারের গায়ে প্লাস্টিকের জামাকাপড় পরিয়ে রাখা আছে। আর ওদিকে আমার এক বন্ধুর সর্দিকাশি ছিলো, ব্যস, ঐ রুমে তার ঢোকা হলো নিষিদ্ধ।
কিন্তু কেন? প্রশ্ন করার পরে নব্য কম্পিউটারপতি সেই ব্যক্তি বিজ্ঞের স্বরে জবাব দিলেন, “ভাইরাস! বাইরের ধুলাবালি, সর্দিকাশি এসব থেকে কম্পিউটারে তো ভাইরাস লেগে যাবে। তাই তোরা ভুলেও ওটা ধরিস না রে। দুরে থাক, দুরে থাক!!”
আমরাও পেলাম ব্যাপক ভয়, না যদি কোনভাবে আমাদের গায়ে লেগে থাকা ভাইরাস লেগে যায়।
কিছুদিন পরে ঐ বিজ্ঞ কম্পিউটারপতির করুণ দশা — এতো সতর্কতা সত্ত্বেও কীভাবে যেন ভাইরাস ঢুকে গেছে। এবারে আমাদের সতর্কতার পালা, নাকে রুমাল চেপে দূর থেকে সেই ভাইরাসাক্রান্ত কম্পিউটারকে দেখতে গেলাম, পাছে আবার এই ভাইরাস ঢুকে পড়ে নাকের ভেতর!!
বলাই বাহুল্য, এই ভাইরাসের ভয়ে রুমাল চেপে থাকার দিন আরো অনেক সময় ধরেই ছিলো কেবল বাংলাদেশে না, বরং বিশ্বের সর্বত্র!
কিন্তু কী এই ভাইরাস? এরা কি জ্যান্ত? সর্দির ভাইরাসের সাথে এর সম্পর্কটাই কী?
শুরুতেই বলে দেই, কম্পিউটার ভাইরাস আসলে কোনো জ্যান্ত বা মৃত ভাইরাস জাতীয় জিনিষ না, বরং এটা হলো এক রকমের সফটওয়ার প্রোগ্রাম। বিরক্তিকর এই সব প্রোগ্রামের সাথে আসল ভাইরাসের মিলটা হলো, আসল ভাইরাস যেমন সুযোগ পেলেই কাউকে আক্রমণ করে বসে, ছোঁয়াচে, তেমন কম্পিউটার ভাইরাসও সুযোগ পেলেই এক কম্পিউটার থেকে আরেক কম্পিউটারে হানা দিয়ে বসে। আমাদের অধিকাংশ প্রোগ্রাম বাচ্চা পয়দা করে না, মানে এক প্রোগ্রাম থেকে নিজের কপি তৈরি হয় না। কিন্তু ভাইরাস প্রোগ্রামটি নিজের কপি তৈরী করে, এবং নানা জায়গায় কপি ছড়িয়ে দেয়।
কম্পিউটার ভাইরাসের শুরুটা গবেষণাগারে মজা করতে গিয়ে হলেও খুব বেশি করে ছড়িয়ে পড়া প্রথম কম্পিউটার ভাইরাস ছিলো পাকিস্তানের দুই ভাইয়ের তৈরী করা। ব্রেইন নামের এই কম্পিউটার ভাইরাসের কাজ ছিলো তখন বহুল ব্যবহৃত ফ্লপি ডিস্কে ঢুকে পড়া। ব্রেইন ভাইরাসে আক্রান্ত কোনো কম্পিউটারে নতুন ফ্লপি ডিস্ক ঢোকালেই সেই ডিস্কের শুরুর দিকের বুট সেক্টরে এই ভাইরাস নিজের কপি ঢুকিয়ে দিতো। পরে সেই আক্রান্ত ফ্লপি ডিস্ক অন্য কম্পিউটারে নিলে সেখানে ছড়িয়ে যেত এটা, মানে ফ্লপি ঢোকালে কম্পিউটার যখন সেটা থেকে বুট করতো বা চালু হতো, তখন আসল অপারেটিং সিস্টেমের বদলে প্রথমে সেই ভাইরাসের প্রোগ্রামটা মেমরিতে লোড হয়ে যেত। ব্যাস, এই কম্পিউটারও আক্রান্ত।
এখন তো আর কেউ ফ্লপি ডিস্ক ব্যবহার করে না, কিন্তু ফ্ল্যাশ ড্রাইভ করে, সেটার মাধ্যমে এখন ভাইরাস ছড়ায়। অথবা ভাইরাসে ভরা কোনো সাইটে ঢুকলে আপনার অজান্তেই সেখান থেকে ভাইরাস আপনার কম্পিউটারে ঢুকতে পারে, অথবা ভাইরাসে ভরা কোনো ইমেইল এটাচমেন্ট স্ক্যান না করেই খুলেছেন তো গেছেন আপনি!
প্রায় সব ভাইরাস একইভাবেই কাজ করে। এদের কাজ হলো দুইটা, নিজের কপি বানিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফাইলে ঢুকিয়ে দেয়া, এবং একবার ঢুকে পড়ার পরে সেই কম্পিউটারে কিছু একটা করা। নানা প্রোগ্রাম ফাইল বা এপ্লিকেশনের যে কোড থাকে, ভাইরাসের কাজ হলো তার মধ্যে নিজের কোড ঢুকিয়ে দেয়া, যাতে করে সেই প্রোগ্রাম চালালে ভাইরাসের কোডটাও চলে। ধরেন আপনি ভাইরাসাক্রান্ত কোনো কম্পিউটারে ওয়ার্ড বা এরকম কোনো প্রোগ্রাম চালালেন। মেমরির মধ্যে তো ভাইরাস ওঁত পেতে থাকে, তার কাজ হলো কী কী প্রোগ্রাম চলছে বা চালানো হচ্ছে, তার উপরে খেয়াল রাখা। অপারেটিং সিস্টেমটাকেও কব্জা করে রাখে, এবং তাকে দিয়ে ফাইলের ফুল এক্সেস নিয়ে নেয়। একবার নতুন কারো খোঁজ পেলেই হলো, ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই ফাইলের ভিতরে নিজের কুচক্রি কোডটা কপি করে দেয়। অথবা কম্পিউটারে নতুন কোনো ফ্ল্যাশ ড্রাইভ বা এরকম কিছু লাগানো হচ্ছে কি না, খেয়াল রাখে, নতুন কিছু আসলেই স্ক্যান করে সেখানে থাকা সব প্রোগ্রামে নিজের কোডটুকু ঢুকিয়ে দেয়। এক বালতি দুধে এক ফোঁটা গো-চনা পড়লে যেমন সেই দুধ হয় বরবাদ, ভাইরাসের কোড কোথাও ঢুকলেও একই অবস্থা।
ভাইরাসের বদমায়েসির আরো কিছু তরিকা হলো তাকে সরানোর যাবতীয় উপায় বন্ধ করে রাখা। মেমরিতে ভাইরাস প্রোগ্রাম চলছে দেখে সেটাকে বন্ধ করতে চান? ভাইরাস চাঁদু তো অপারেটিং সিস্টেমের সবকিছুকেই “সিস্টেম” করে রেখেছে, যদি দেখে আপনি তাকে ডিলিট করে দিচ্ছেন, সাথে সাথে আবার নতুন করে চালু করে ফেলে নিজেকে। ফলে এই নচ্ছাড় ভাইরাসকে তাড়ানো খুব কঠিন কাজ হয়ে পড়ে।
প্রথম দিককার ভাইরাসেরা কেবল মজা করার জন্য লেখা হলেও এখনকার ভাইরাস অতি বদ, তারা ফাইল পত্র ডিলিট করে, এমনকি কম্পিউটারের যন্ত্রপাতিও নষ্ট করে দেয়। আর কেবল ব্যক্তি পর্যায়ে না, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আধুনিক ইলেকট্রনিক যুদ্ধাস্ত্র হিসাবেও এখন কম্পিউটার ভাইরাস ব্যবহৃত হচ্ছে, কোনো দেশের বিদ্যুত সরবরাহ থেকে শুরু করে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত যেকোনো সিস্টেমকে নষ্ট করে দিতে হলে ভাইরাস বানিয়ে সেটা করার পাঁয়তারা চলছে, কয়েকটা এরকম ঘটনা ঘটেছেও। কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ হলো সাম্প্রতিক কালের রানসমওয়ার নামের ভাইরাস, যার কাজ হলো কোনো কম্পিউটারে একবার ঢুকে পড়ার পরে সেই ভাইরাসের কাজ হলো কম্পিউটারের ছবি ডকুমেন্ট সহ যাবতীয় দরকারি ফাইলকে এনক্রিপ্ট করে দুর্বোধ্য করে ফেলা, তার পরের কাজ হলো আপনার কাছে মুক্তিপণ চাওয়া, ভাইরাস নির্মাতাদের ভালো টাকা পয়সা দিলেই কেবল ফাইলগুলা ফেরত পাবেন (মানে ফাইল ডিক্রিপ্ট করার উপায় বাতলে দিবে), আর সপ্তাহখানেকের মধ্যে টাকা না দিলে চিরতরে হারাবেন আপনার শখের সব সেলফি, বা অন্য দরকারি ফাইল।
~~ বাঁচতে হলে? জানতে হবে! ~~
তো এই ভাইরাসকে ঠেকানো যায় কী ভাবে? বাস্তব জীবনের টিকার মতো এন্টিভাইরাস সফটওয়ারও ঠিক সেই কাজটা করে। এন্টি ভাইরাসের কাজ হলো প্রথমে ভাইরাস আছে কি না তা বের করা। সেজন্য ভাইরাসের চেহারা-সুরত কী রকম তার একটা ডেটাবেইজ বা ডিকশনারি এন্টিভাইরাস কোম্পানি দেয়। এন্টি ভাইরাস কোনো কম্পিউটারকে স্ক্যান করার সময়ে এই চেহারার বদখত কোনো ভাইরাস বা কোনো এপ্লিকেশন প্রোগ্রামের ভিতরে এরকম কোনো দুর্মতি কোড আছে কি না, তা খতিয়ে দেখে। কাজটা সময় সাপেক্ষ, তাই ভাইরাস স্ক্যানে অনেক সময় লাগে। এরকম কাউকে পেলেই সেই কোডটাকে এন্টি ভাইরাস সেখান থেকে সরিয়ে ফেলে, অথবা তা না পারলে ফাইলটাকে ডিলিট করে বা আক্রান্ত ফাইলের খোঁয়াড়ে করে বন্দি। অল্প সময় পরে পরেই এই চেহারাসুরতের ফাইলটা বা ভাইরাস ডিকশনারি/ডেফিনিশন আপডেট করে রাখা লাগে, কারণ নিত্য নতুন ভাইরাস তো বেরুচ্ছে। কিন্তু ভাইরাস নির্মাতারাও চালাক কম না, তারা বের করে রেখেছে পলিমর্ফিক বা বহুরূপী ভাইরাস টেকনলজি, এই ভাইরাসগুলা নিজের চেহারা প্রতিদিন পাল্টাতে থাকে, ফলে আগের চেহারা জানলে তাকে ধরা যায় না। ভাইরাসের বিরুদ্ধে এন্টিভাইরাসের লড়াই তাই চলছে তো চলছেই!!
একসময় ভাইরাস লিখতো কিশোর বয়সী প্রোগ্রামারেরা, মজা করার জন্যই। কিন্তু এখন আসল অপরাধীরা মাঠে নেমেছে, তারা পয়সা কামানো কিংবা অন্য দেশে আক্রমণের জন্য বানাচ্ছে কম্পিউটার ভাইরাস। আর এন্টিভাইরাসের ব্যবসাও এখন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের।
শেষ করি অন্তত একটা নিশ্চয়তা দিয়ে। শুরুতে বলা সেই গল্পের বিজ্ঞ বড়ভাইয়ের মতো ভয় পাবার কিছু নাই, কম্পিউটার ভাইরাসে আক্রান্ত কম্পিউটার ধরলে আপনার নাকে মুখে ভাইরাস ঢুকে যাবে না, অথবা ধুলাবালি থেকেও আপনার কম্পিউটারে ভাইরাস ঢুকবেনা। সেসব গাল গল্পের দিন অনেক আগেই শেষ।