Searching History

Searching History ইতিহাস ও সংস্কৃতির পাঠশালা

আজ ৩০ সেপ্টেম্বর, ঠিক এই দিনে ৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে কর্ডোভায় ইন্তেকাল করেন আন্দালুসের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক আব্দুর রহমান...
30/09/2026

আজ ৩০ সেপ্টেম্বর, ঠিক এই দিনে ৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে কর্ডোভায় ইন্তেকাল করেন আন্দালুসের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক আব্দুর রহমান ইবনে মুয়াবিয়া, যিনি ইতিহাসে "আব্দুর রহমান আদ-দাখিল" নামেই সর্বাধিক পরিচিত। তিনি ছিলেন উমাইয়া খলিফা হিশাম ইবনে আব্দুল মালিকের পৌত্র। মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে তিনি আন্দালুসে প্রবেশ করেন এবং তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সমগ্র আন্দালুস শাসন করেন। তাঁর সুদক্ষ রাষ্ট্রপরিচালনা, ন্যায়বিচার ও সমৃদ্ধি আন্দালুসের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচনা করেছিল।

আব্দুর রহমান ইবনে মুয়াবিয়ার তারুণ্য কেটেছে চরম ঝুঁকি ও সংকটের মধ্য দিয়ে। উমাইয়া রাজবংশের এই প্রতিভাবান কিশোর যখন তারুণ্যে পা রাখলেন, তখন মুসলিম বিশ্বে আব্বাসীয়দের বিদ্রোহ শুরু হয়। এক রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আব্বাসীয়রা উমাইয়াদের ক্ষমতাচ্যুত করে এবং উমাইয়া বংশের সকল প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে নির্বিচারে হত্যা করে। এমন পরিস্থিতিতে আব্দুর রহমান ইবনে মুয়াবিয়া ফোরাত নদীর তীরে ইরাকের একটি এলাকায় আত্মগোপন করেন। আব্বাসীয় সৈন্যরা তাঁকে খুঁজে পেলে তিনি ফোরাত নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরে অপর পাড়ে পৌঁছান। সেখান থেকে তিনি উত্তর আফ্রিকায় প্রবেশ করেন। উত্তর আফ্রিকা তখন আব্দুর রহমান ইবনে হাবিবের স্বতন্ত্র শাসনাধীন ছিল। তিনি আব্দুর রহমান ইবনে মুয়াবিয়ার আগমনকে অশুভ দৃষ্টিতে দেখলেন। এই উমাইয়া রাজপুত্র যেকোনো সময় বিদ্রোহ উসকে দিতে পারেন, একই সঙ্গে ইবনে হাবিবের নিজের আন্দালুস জয়ের স্বপ্নও ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাই আব্বাসীয়দের মতো তিনিও আব্দুর রহমান ইবনে মুয়াবিয়াকে হত্যার উদ্যোগ নিলেন।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থে উল্লেখ আছে, উমাইয়া বংশের মহাবীর, ককেশাসসহ উত্তর অঞ্চলের বিজেতা মাসলামা ইবনে আব্দুল মালিক আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, অচিরেই মুসলিম প্রাচ্যে উমাইয়া সালতানাতের পতন ঘটবে, আর জনৈক উমাইয়া তরুণ প্রাচ্য থেকে পশ্চিমের মাগরিব অঞ্চলে পালিয়ে গিয়ে উমাইয়াদের শাসনক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবেন।

আব্দুর রহমান মূলত সেই ভবিষ্যদ্বাণীর দিকেই অগ্রসর হচ্ছিলেন। তখন আন্দালুসের প্রশাসক ছিলেন ইউসুফ আল-ফিহরি। আন্দালুস তখন নানা অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহে জর্জরিত ছিল, তার ওপর ছিল খারিজিদের বিভিন্ন অপতৎপরতা। আব্দুর রহমান তাঁর একনিষ্ঠ সহচর বদরকে নিজের প্রতিনিধি করে আন্দালুসে পাঠালেন, যাতে সার্বিক পরিস্থিতি জানা যায়। বদর একে একে আন্দালুসে বসবাসরত উমাইয়া সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। প্রথম আলাপেই তাঁরা আব্দুর রহমানের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানালেন। আন্দালুসে তখন ইয়েমেনি-কায়সি দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠেছিল, তাই এই গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন আব্দুর রহমানের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। বদর প্রথমে উমাইয়াদের মাওয়ালি সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিত্রতা করলেন, তারপর কায়সিদের কাছে প্রস্তাব রাখলেন, কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করল। অতঃপর বদর ইয়েমেনিদের কাছে আব্দুর রহমানের বার্তা নিয়ে গেলেন এবং তারা এই প্রস্তাবে সাড়া দিল। এভাবে আব্দুর রহমান আন্দালুসের এক বিশাল প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সমর্থন আদায় করলেন। বদর তাঁকে আন্দালুসে আগমনের জন্য আমন্ত্রণ জানালেন।
অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত এলো। কোনো সঙ্গী ছাড়াই একাকী আব্দুর রহমান আন্দালুসের তীরে অবতরণ করলেন। বদর তাঁকে স্বাগত জানালেন, আর সঙ্গে সঙ্গে সমর্থকদের বিশাল দল তাঁকে ঘিরে সংবর্ধনা জানাতে লাগল। সবাইকে নিয়ে আব্দুর রহমান ইয়েমেনিদের মূল ঘাঁটি সেভিলে গমন করলেন এবং সেখানেই সমর্থকদের কাছ থেকে বাইয়াত গ্রহণ করলেন।

ইউসুফ আল-ফিহরি তখন উত্তর অঞ্চলে বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত ছিলেন। পরে তিনি আব্দুর রহমানের আগমনের খবর জানতে পারেন। আব্দুর রহমান তাঁকে সসম্মানে শাসনভার হস্তান্তরের প্রস্তাব দিলেন এবং আশ্বাস দিলেন যে তাঁকে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রাখা হবে। কিন্তু ইউসুফ তা প্রত্যাখ্যান করলেন। ফলে উভয়ের মধ্যে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠল। ৭৫৬ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে মাসারার প্রান্তরে ইউসুফ আল-ফিহরির সঙ্গে আব্দুর রহমানের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইউসুফের পক্ষে লড়েছিল কায়সিরা, আর আব্দুর রহমানের মূল শক্তি ছিল ইয়েমেনিরা। দুই মুসলিম বাহিনীর এই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত আব্দুর রহমান ইবনে মুয়াবিয়ার নিরঙ্কুশ বিজয়ে সমাপ্ত হয়।

প্রাচ্য থেকে বিতাড়িত আব্দুর রহমান হয়ে উঠলেন আন্দালুসের নতুন দিগন্তের মহানায়ক। আন্দালুসে তাঁর এই মহান হিজরতের কারণে তিনি "আদ-দাখিল" অর্থাৎ "প্রবেশকারী" উপাধি লাভ করেন। মাসারার যুদ্ধের পর তিনি পরাজিত বাহিনীর প্রতি সহানুভূতি দেখালেন। আব্বাসীয়দের মতো শত্রুপক্ষকে নির্বিচারে হত্যা না করে তিনি তাদের প্রতি সহনশীল আচরণ করলেন। ফলে শাসক হিসেবে তাঁর উদার মনোভাব শুরুতেই জনসাধারণকে আকৃষ্ট করল। তিনি পরাজিত নেতাদের সঙ্গে সঙ্গে উৎখাত করেননি। তিনি বলেছিলেন,
"এমন শত্রুর শিকড় উপড়ে ফেলো না, ভবিষ্যতে যার আন্তরিকতা তুমি প্রত্যাশা করো। তুলনামূলক কঠিন শত্রুর মোকাবেলায় সহায়তা লাভের জন্য তাকে টিকিয়ে রাখো।"

আব্দুর রহমানের বয়স তখন পঁচিশও পেরোয়নি, অথচ তিনি স্বাধীন আন্দালুসের আমির। দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁকে একে একে পঁচিশটিরও বেশি বড় বিদ্রোহ দমন করতে হয়, যা তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করেন। এর মধ্যে আব্বাসীয় খলিফা আল-মানসুরের প্রেরিত আল-আলা ইবনে মুগিস আল-হাযরামির অভিযান উল্লেখযোগ্য। আব্দুর রহমান তাঁকে পরাজিত করার পর খলিফা আল-মানসুর আন্দালুসের প্রতি আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করেন। খিলাফত থেকে বিচ্ছিন্ন একটি স্বাধীন রাজ্য হাতছাড়া হওয়া স্বাভাবিকভাবে যুক্তিসংগত নয়, তবু আল-মানসুর বিশ্বাস করতেন এই ভূখণ্ড আব্দুর রহমানের হাতেই সবচেয়ে নিরাপদ। উল্টো তিনি আব্দুর রহমানকে "কুরাইশের বাজপাখি" উপাধি দেন। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা প্রসিদ্ধ আছে। একদিন আবু জাফর আল-মানসুর তাঁর সভাসদদের জিজ্ঞেস করলেন, "তোমরা কি বলতে পারো, এ যুগের শাসকদের মধ্যে কুরাইশের বাজপাখি কে?"
তাঁরা বললেন, "এই উপাধি তো কেবল আমিরুল মুমিনিনকেই মানায়।"
খলিফা বললেন, "তোমরা কিছুই বলতে পারোনি।"
"তাহলে কি হযরত মুয়াবিয়া (রা.)?"
"না।"
"তাহলে আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান?"
"তাও নয়।"
"আমিরুল মুমিনিন, তাহলে সেই ব্যক্তি কে, আপনিই বলুন।"
"কুরাইশের বাজপাখি হলেন আব্দুর রহমান ইবনে মুয়াবিয়া। তোমরা মুয়াবিয়া (রা.)-এর কথা বলছ? তাঁকে তো হযরত উমর ও উসমান (রা.) একটি বাহনে উঠিয়ে দিয়েছিলেন মাত্র, বাহনকে অনুগতও করে দিয়েছিলেন তাঁরাই। মুয়াবিয়া (রা.) শুধু সেই বাহনকে সামনে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। আর আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানের পক্ষে ছিল সুদৃঢ় বাইয়াত। তোমাদের আমিরুল মুমিনিন শুধু নিজের পরিজন ও অনুসারীদের আনুকূল্য পেয়েছে। কিন্তু আব্দুর রহমান! তাঁর জীবন শুরু হয়েছিল একাকী, সঙ্গীহীন অবস্থায়; সঙ্গী ছিল কেবল সংকল্প ও দৃঢ়তা। শুধু এটুকু সম্বল করেই তিনি আন্দালুসে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন, সীমান্ত জয় করেছেন এবং খারিজিদের দমন করেছেন।"
একথা শুনে সবাই বলে উঠল, "আল্লাহর কসম, আমিরুল মুমিনিন সত্যই বলেছেন।"

আব্দুর রহমান আদ-দাখিল আন্দালুসে স্বাধীন উমাইয়া প্রশাসনের যুগের সূচনা করেন, যা আন্দালুসের সমৃদ্ধির পথ সুগম করে। নিখুঁত নিরাপত্তাব্যবস্থা, সুদৃঢ় সামরিক বাহিনী গঠন ও জ্ঞানচর্চার কারণে এই রাষ্ট্র জান্নাতের বাগানে পরিণত হয়েছিল। এসবই সম্ভব হয়েছিল আব্দুর রহমানের প্রশাসনিক দক্ষতা ও সুকৌশলী সমরনীতির ফলে। প্রজাদের প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল। তিনি তাঁদের খোঁজখবর রাখতেন, মসজিদে ইমামতি করতেন এবং সালাতের পর সবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন।

একটি ঘটনা বর্ণিত আছে: একবার এক ব্যক্তি আমীরের দরবারে নিজের অভাবের কথা জানালেন। আমীর তাঁর প্রয়োজন মিটিয়ে দিয়ে বললেন, "কখনো কোনো বিপদে পড়লে বা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে সবার আগে ইখলাসের সঙ্গে আল্লাহর কাছে নিজের হাজত জানিয়ে দুআ করবে। এরপর একটি চিরকুটে তা লিখে অত্যন্ত গোপনে আমাকে জানাবে, যাতে আমি গোপনেই তা পূরণ করে দিতে পারি।"
আল্লাহর প্রতি আব্দুর রহমানের অগাধ বিশ্বাস ও তাকওয়াপূর্ণ ব্যক্তিত্ব তাঁর মর্যাদাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, আব্দুর রহমান আদ-দাখিলের আবির্ভাব না ঘটলে আন্দালুস থেকে ইসলামের নামনিশানাই মুছে যেত। কারণ তিনিই এই ভূখণ্ডকে একটি নিরাপদ দেশে পরিণত করেছিলেন, ফলে খ্রিস্টান বহিঃশত্রুরা আক্রমণের সাহস পায়নি।

আব্দুর রহমানের গোটা জীবনই এক রোমাঞ্চকর উপাখ্যানের মতো। উনিশ বছর তিনি দামেশকে উমাইয়াদের পতনপ্রান্তের সময়ে কাটিয়েছেন। এরপর দীর্ঘ ছয় বছর তাঁকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে। এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে হিজরত করতে গিয়ে তিনি অসামান্য ত্যাগের নজির স্থাপন করেছেন। প্রায় ৩৪ বছর শাসনকার্য পরিচালনা করে ৫৯ বছর বয়সে তিনি কর্ডোভায় ইন্তেকাল করেন এবং সেখানেই সমাহিত হন।



১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দ। উসমানীয় সুলতান সুলাইমান খাইরুদ্দিন বারবারোসাকে সাম্রাজ্যের নৌবাহিনীর সর্বোচ্চ পদ "কাপুদান-ই-দরিয়া" নি...
28/09/2026

১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দ। উসমানীয় সুলতান সুলাইমান খাইরুদ্দিন বারবারোসাকে সাম্রাজ্যের নৌবাহিনীর সর্বোচ্চ পদ "কাপুদান-ই-দরিয়া" নিয়োগ দেন। একই সময়ে তাঁকে উত্তর আফ্রিকার বেইলারবে পদেও দায়িত্ব দেওয়া হয়। সম্মান ও আস্থার নিদর্শন হিসেবে সুলতান তাঁকে উপহার দেন রত্নখচিত একটি তরবারি।

নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর খাইরুদ্দিনের সামনে ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ: উসমানীয় নৌবাহিনীকে আরও শক্তিশালী করে গড়ে তোলা। অস্ত্রাগার এবং গোল্ডেন হর্নের দায়িত্বও তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়। তিনি সময় নষ্ট করেননি। মাত্র এক বছরের মধ্যেই তাঁর তত্ত্বাবধানে ৮৪টি জাহাজ নির্মিত হয়।

এরপর শুরু হয় তাঁর নৌ-অভিযান। বহর নিয়ে তিনি ইতালির বিভিন্ন দ্বীপে অভিযান পরিচালনা করেন। কয়েকটি শহরও উসমানীয়দের নিয়ন্ত্রণে আসে।

ঐতিহাসিক হাজি খলিফার বর্ণনা অনুযায়ী, বারবারোসা ১২টি দ্বীপ জয় করেছিলেন। আরও ১৩টি দ্বীপে অভিযান পরিচালনা করে বিপুল গনিমত অর্জন করেন। এসব অভিযানে প্রায় ১৬ হাজার সৈন্য বন্দী হয় এবং মুক্তিপণ হিসেবে আদায় করা হয় চার লাখ স্বর্ণমুদ্রা।

একটির পর একটি অভিযানে ইউরোপীয় শক্তিগুলো যখন বিপর্যস্ত হতে থাকে, তখন তারা বুঝতে পারে বারবারোসাকে থামাতে হলে সম্মিলিত শক্তি নিয়েই মাঠে নামতে হবে। সিদ্ধান্ত হলো, ভূমধ্যসাগর থেকে উসমানীয় নৌবাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে।

পোপ তৃতীয় পল এর আহ্বানে গঠিত হলো হলি লীগ। ইউরোপের বিভিন্ন শক্তি একত্র হয়ে তৈরি করল সে সময়ের অন্যতম বৃহৎ নৌবহর। এতে যোগ দেয়—
১. রিপাবলিক অব ভেনিস
২. ডাচি অব মান্তুয়া
৩. স্প্যানিশ এম্পায়ার
৪. পর্তুগিজ এম্পায়ার
৫. রিপাবলিক অব জেনোয়া
৬. অর্ডার অব সেন্ট জন

ইউরোপীয়দের এই প্রস্তুতির খবর খুব দ্রুতই খাইরুদ্দিনের কাছে পৌঁছে যায়। তিনিও তাঁর বাহিনীকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে শুরু করেন।

২৮ সেপ্টেম্বর, ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দ। গ্রিসের প্রিভেজা উপকূলে মুখোমুখি হয় দুই নৌবাহিনী। সামনে বিশাল ইউরোপীয় বহর। তাদের হাতে ছিল প্রায় ৩০২টি জাহাজ এবং প্রায় ৬০ হাজার সৈন্য। বিপরীতে উসমানীয় বাহিনীর জাহাজের সংখ্যা ছিল ১২২টি, সৈন্য প্রায় ১২ হাজার।সংখ্যার বিচারে ব্যবধান ছিল বিশাল।

ইউরোপীয় বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন আন্দ্রেয়া ডোরিয়া। উসমানীয় নৌবাহিনীর নেতৃত্বে খাইরুদ্দিন পাশা। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সাইয়িদ আলি রেইস, তুর্গুত রেইস ও সিনান রেইস।

যুদ্ধ শুরুর আগেই হিসাবটা যেন পরিষ্কার ছিল, এটি ছিল অসম এক সংঘর্ষ। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ইউরোপীয় বাহিনীর সামনে উসমানীয়রা কতক্ষণ টিকে থাকতে পারবেন, সেটিই ছিল প্রশ্ন। কিন্তু খাইরুদ্দিন বারবারোসা সংখ্যার হিসাবকে যুদ্ধের একমাত্র মাপকাঠি হতে দিলেন না।

তিনি তাঁর বহরকে চারটি ভাগে বিভক্ত করলেন। প্রথম তিনটি বহরকে সাজালেন বক্রাকারে। যুদ্ধ শুরু হতেই সেই তিন বহর অদ্ভুত এক কৌশলে ইউরোপীয় বাহিনীর দিকে এগিয়ে গেল। আন্দ্রেয়া ডোরিয়া বুঝতে পারলেন, অপেক্ষাকৃত ছোট উসমানীয় বহর তাঁর বিশাল নৌবাহিনীকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করছে। এত কমসংখ্যক জাহাজ নিয়ে এমন আক্রমণাত্মক কৌশল তাঁর কাছে ছিল অপ্রত্যাশিত।

ডোরিয়া তাঁর বহর সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু সমুদ্রের বাতাস স্থির থাকায় সেই চেষ্টা কাঙ্ক্ষিত ফল দিল না। এর মধ্যেই উসমানীয় জাহাজ থেকে শুরু হলো গোলাবর্ষণ। ইউরোপীয় বাহিনীও পাল্টা আক্রমণ চালায়। তবে প্রথম আঘাতেই খাইরুদ্দিনের কৌশল তাদের মধ্যে চাপ ও অস্থিরতা তৈরি করতে সক্ষম হয়।

এরপর সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে পুরো সমুদ্রজুড়ে। কামানের পর কামান গর্জে উঠতে থাকে। বারুদের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় চারপাশ। শাহাদাতের রক্ত আর উসমানীয় সৈন্যদের তাকবীরে ভারী হয়ে ওঠে সমুদ্রের বাতাস। লড়াই যত এগোয়, উসমানীয় বাহিনী ততই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে থাকে। সংখ্যায় অনেক বেশি হয়েও ইউরোপীয় বাহিনীর মধ্যে দেখা দেয় ভাঙন।

প্রায় সাত ঘণ্টার লড়াইয়ের পর পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয় বিশাল ইউরোপীয় নৌবহর। আন্দ্রেয়া ডোরিয়া যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

যুদ্ধের হিসাবও ছিল উসমানীয়দের পক্ষে। ইউরোপীয়দের ১৩টি জাহাজ ধ্বংস হয় এবং ৩৬টি জাহাজ উসমানীয়রা দখল করে। প্রায় ৩ হাজার ইউরোপীয় সৈন্য বন্দী হয়। অন্যদিকে উসমানীয় বাহিনীর প্রায় ৪০০ সৈন্য নিহত ও ৮০০ জন আহত হন। বর্ণিত হিসাব অনুযায়ী, উসমানীয়দের কোনো জাহাজ হারাতে হয়নি।

প্রিভেজার এই বিজয়ের সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে মুসলিম বিশ্বে। দূর-দূরান্তের নগরগুলোতে পৌঁছে যায় বিজয়ের খবর। মক্কা, মদিনা, আল-কুদস, সমরকন্দ, দামেশক, কায়রো ও বোম্বাইয়ের মসজিদগুলোতেও এই বিজয়ের সংবাদ আলোচিত হতে থাকে।

এই যুদ্ধ ভূমধ্যসাগরে উসমানীয় নৌ-প্রভাবকে আরও সুদৃঢ় করে। পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে অঞ্চলটির নৌ-রাজনীতিতে উসমানীয়রা গুরুত্বপূর্ণ কর্তৃত্ব ধরে রাখে। বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশের জাহাজকেও ভূমধ্যসাগরে চলাচলের ক্ষেত্রে উসমানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কর বা শুল্কের সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়।

প্রিভেজার এই সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন খাইরুদ্দিন বারবারোসা। সংখ্যায় পিছিয়ে থেকেও কৌশল, নৌবহরের বিন্যাস এবং আক্রমণের সময় নির্বাচন, সবকিছুকে কাজে লাগিয়ে তিনি ইউরোপীয় জোটের বিশাল নৌবহরকে পরাস্ত করেন।

এই কারণেই ইউরোপীয় নৌ-ইতিহাসে বারবারোসার নাম হয়ে ওঠে এক গুরুত্বপূর্ণ ও ভীতিপ্রদ প্রতিপক্ষের প্রতীক।বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁর পতাকার শীর্ষে ছিল সূরা আস-সাফের ১৩ নম্বর আয়াত। তার নিচে ছিল চারটি তারকা, যেগুলোতে চার খলিফার নাম লেখা থাকত। মাঝখানে ছিল দুই ধারবিশিষ্ট একটি তরবারি—জুলফিকারের প্রতীক। আর নিচে ছিল ছয় প্রান্তবিশিষ্ট একটি তারকা, যেটিকে কিছু ঐতিহ্যে হযরত সুলাইমান (আ.)-এর সিলমোহরের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হতো।

প্রিভেজার যুদ্ধ তাই শুধু একটি নৌযুদ্ধের বিবরণ নয়; এটি ভূমধ্যসাগরের নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে ষোড়শ শতকের শক্তির লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—যেখানে খাইরুদ্দিন বারবারোসার নৌ-কৌশল উসমানি ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নেয়।



"একজন মানুষের অন্তর যদি রোগাক্রান্ত না হয়, তাহলে সে কোনদিন, কোন অবস্থাতেই আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় পাবে না।"— ইমাম ই...
26/09/2026

"একজন মানুষের অন্তর যদি রোগাক্রান্ত না হয়, তাহলে সে কোনদিন, কোন অবস্থাতেই আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় পাবে না।"
— ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহি.

আজ ২৬শে সেপ্টেম্বর, ঠিক এই দিনে ১৩২৮ সালে দামেস্কের কারাগারে ইন্তেকাল করেন ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব শাইখুল ইসলাম ইমাম তাকিউদ্দীন আহমাদ ইবনে তাইমিয়া আল-হাররানী। তুরস্কের হররানে জন্ম নেয়া এই মহান ব্যক্তি একাধারে একজন ফকিহ, মুহাদ্দিস, ধর্মতত্ত্ববিদ, আইনজ্ঞ, রাজনীতিবিদ ও মুজাহিদ ফি সাবিলিল্লাহ ছিলেন। মোঙ্গল আগ্রাসনের অস্থির সময়ে পরিবারসহ দামেস্কে হিজরত করেন, যেখানে তাঁর জ্ঞানচর্চার মূল ভিত্তি গড়ে ওঠে।

কিশোর বয়স থেকেই ইবনে তাইমিয়া তুখোড় মেধার অধিকারী ছিলেন। অল্প বয়সেই কুরআন মুখস্থ করেন এবং হাদিস ও ফিকহশাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। তাঁর পিতাও যুগের বিশিষ্ট আলেমদের কাছে তিনি ইলম অর্জন করেছেন। অল্প বয়সেই তিনি ফতোয়া প্রদান ও দরস দেওয়া শুরু করেন। সারা জীবনে তিনি পাঁচশ'র অধিক কিতাব রচনা করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে আল-আকীদাহ আল-ওয়াসিতিয়্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ, এবং পরবর্তীতে সংকলিত মাজমুউল ফাতাওয়ার মতো বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার। তাঁর সমসাময়িক কাল থেকে আজ পর্যন্ত গোটা মুসলিম বিশ্বে তাঁর ইলমী প্রভাব বিদ্যমান।

যুদ্ধের ময়দানেও ইবনে তাইমিয়া ছিলেন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। এককালের অপ্রতিরোধ্য জালিমগোষ্ঠী মোঙ্গলদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তিনি সাহসী ভূমিকা রাখেন। তিনি তাদের বিরুদ্ধে জি হ|দের ফতোয়া ঘোষণা করেন। তিনি নিজে সরাসরি সুলতানের দরবারে গিয়ে মুসলিম বাহিনীকে যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেন এবং সম্মুখসারিতে উপস্থিত থেকে নেতৃত্ব দেন। তাঁর এই ফতোয়া ও প্রচেষ্টার প্রভাবে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক শাকহাবের যুদ্ধ (১৩০৩), যেখানে মুসলমানরা মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্তমূলক বিজয় লাভ করে।

সত্য কথা বলা ও বিদআতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে তাঁকে বহুবার কারাবরণ করতে হয়েছে। কিন্তু কারাগারও তাঁর কলমকে থামাতে পারেনি; বরং সেখানে বসেই তিনি ইসলামের জন্য অবিরত লিখে গেছেন এবং তাঁর বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারের বড় অংশ কারারুদ্ধ জীবনেই গড়ে তুলেছিলেন। অন্যদিকে মুক্ত অবস্থায় তিনি ময়দানে দাওয়াতি কাজ, লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা ও নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন। জীবনের শেষ দিকে দামেস্কের দুর্গ-কারাগারে তাঁর কাছ থেকে কলম-কাগজও কেড়ে নেওয়া হয়, এমন অবস্থায় ১৩২৮ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর তিনি ইন্তিকাল করেন।



মোহসীনউদ্দীন দুদু মিয়া: তিনি‌ ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত সমাজ সংস্কারক ও ফরায়েজী আন্দোলনের প্রবক্তা হাজী শরীয়তউল্লাহর ...
25/09/2026

মোহসীনউদ্দীন দুদু মিয়া: তিনি‌ ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত সমাজ সংস্কারক ও ফরায়েজী আন্দোলনের প্রবক্তা হাজী শরীয়তউল্লাহর একমাত্র পুত্র । ১৮১৯ সালে মাদারীপুরে জন্ম নেওয়া এই মহান পুরুষ ১৮৪০ সালে পিতার ওফাতের পর ফরায়েজী আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ নেন।

সে সময় বাংলার নিপীড়িত কৃষকসমাজ একদিকে হিন্দু জমিদার, অন্যদিকে ইউরোপীয় নীলকরদের দ্বিমুখী শোষণে জর্জরিত ছিল। দুদু মিয়া নিরস্ত্র নিপীড়িত কৃষকদের সংগঠিত করে জমিদার ও নীলকরদের ভাড়াটে লাঠিয়াল বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, এবং তাদের শক্তিমত্তা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দেন। ফলে ১৮৩৮ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ দুই দশক ফরায়েজী অধ্যুষিত এলাকায় শান্তি বজায় ছিল।

দুদু মিয়ার সবচেয়ে বিপ্লবী ঘোষণা ছিল যে, জমি থেকে অন্যায় ভাবে খাজনা আদায় আল্লাহর আইনের পরিপন্থী। জমির হক একমাত্র কৃষকের। শ্রমের ওপরই যে জমির প্রকৃত মালিকানা নিহিত, এই মতবাদ সেকালের বাংলায় ছিল এক যুগান্তকারী চিন্তা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নিপীড়িত কৃষকরা তাঁর এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাঁর পতাকাতলে সমবেত হয়। একইসাথে তিনি গ্রামীণ সমাজে নিজস্ব বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে ফরায়েজী খলিফার অনুমতি ছাড়া সরকারি আদালতে যাওয়া নিষিদ্ধ করেন। এটি ছিল এক ধরনের সমান্তরাল সামাজিক শাসনব্যবস্থা, যা জনগণকে ঐক্যবদ্ধ ও স্বনির্ভর করে তোলে।

১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের পর তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয়, ১৮৬১ সালে মুক্তি পান এবং ১৮৬২ সালের ২৪/২৫ সেপ্টেম্বর তিনি ইন্তেকাল করেন।



"মৃত্যুর ফয়সালা জমিনে নয়; বরং তা আসমান হতে আসে"– আবুল আ'লা মওদুদীআজ ২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৯ সালের আজকের এই দিনে ইন্তেকাল ক...
22/09/2026

"মৃত্যুর ফয়সালা জমিনে নয়; বরং তা আসমান হতে আসে"
– আবুল আ'লা মওদুদী

আজ ২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৯ সালের আজকের এই দিনে ইন্তেকাল করেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ, দার্শনিক ও মুজাদ্দিদ সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী। তিনি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা এবং তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক সংস্কারক ও ব্যক্তিত্ব।

মাওলানা মওদূদী হিজরী ১৩২১ সালের ৩রা রজব মোতাবেক ১৯০৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ ভারতের হায়দ্রাবাদ রাজ্যের আওরঙ্গাবাদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সাইয়েদ আহমদ হাসান মওদূদী ছিলেন সেখানকার প্রসিদ্ধ একজন আইনজীবী।

অত্যন্ত কম বয়স থেকেই লেখালেখি শুরু করেছিলেন মওদূদী। দর্শন, ফিকহ, ইতিহাস, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, শিক্ষানীতি ও ধর্মতত্ত্বসহ অত্যন্ত বিস্তৃত পরিসরে লেখালেখি করেছেন মওদূদী। তাঁর ইসলামী দর্শনভিত্তিক সাহিত্য ও তাফসীর বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত ও সমাদৃত হয়ে আসছে। তিনি ইসলামী পুনর্জাগরণবাদের একজন প্রবল সমর্থক হিসেবে আবির্ভূত হন, তবে তাঁর এই তত্ত্ব পাশ্চাত্যায়নের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না; বরং তিনি পাশ্চাত্যবাদীয় ধারণার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।

নিজের এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য ১৯৪১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন জামায়াতে ইসলামী, যার লক্ষ্য ছিল সমাজ ও রাষ্ট্রে ব্যাপক সংস্কার সাধন। প্রতিষ্ঠার এত বছর পরও জামায়াতে ইসলামীর আন্দোলন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সক্রিয় রয়েছে।



দুর্গম পথের মাঝে দাঁড়িয়ে এক যুবক, হাতে তার চলার সঙ্গী—গ্রিক বন্দুক। তাক করলেন রক্তপিপাসু সিংহটির কপাল বরাবর এবং গুলি ছ...
16/09/2026

দুর্গম পথের মাঝে দাঁড়িয়ে এক যুবক, হাতে তার চলার সঙ্গী—গ্রিক বন্দুক। তাক করলেন রক্তপিপাসু সিংহটির কপাল বরাবর এবং গুলি ছুড়লেন। এই সিংহটি প্রায়শই সুদানগামী কাফেলায় আক্রমণ করত। ফলে কয়েক দিন ধরেই মুসাফিররা চরম আতঙ্কে ভুগছিলেন। কিন্তু যুবকের সাহসিকতায় তাঁরা হতবাক হয়ে গেলেন। মুসাফিরদের কৌতূহলের জবাবে যুবক শান্ত কণ্ঠে বললেন:

"আর তুমি যখন নিক্ষেপ করেছিলে, তা তো তুমি নিক্ষেপ করোনি; বরং আল্লাহই নিক্ষেপ করেছিলেন।" [সূরা আল-আনফাল: ১৭]

সেই যুবকটি আর কেউ নন, তিনিই লিবিয়ার সিপাহসালার, 'মরুর সিংহ' খ্যাত বীর যোদ্ধা শায়খ ওমর আল-মুখতার। ১৯৩১ সালের আজকের এই দিনে (১৬ই সেপ্টেম্বর) তিনি ইতালীয় ফ্যাসিস্টদের হাতে ফাঁসির কাষ্ঠে শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর গোটা জীবন কেটেছে সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে; বাতিলের সঙ্গে তিনি বিন্দুমাত্র আপস করেননি।

লিবিয়ার জাবালে আখদারে জন্ম নেওয়া এই যোদ্ধা ছিলেন এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান। ছোটবেলা থেকেই মাদ্রাসায় পড়াশোনার পাশাপাশি যুগশ্রেষ্ঠ আলেমদের সান্নিধ্যে থেকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। তাঁর উস্তাদ ছিলেন ইমাম মুহাম্মদ আল-মাহদী সানুসি (রহি.)। তাঁর সোহবতেই ওমর মুখতার হয়ে ওঠেন একাধারে একজন যোগ্য 'দাঈ ইলাল্লাহ' এবং দ্বীনের এক নিষ্ঠাবান সৈনিক। তিনি সব সময় তাওহীদের দাওয়াত দিতেন।

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ফরাসি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ওমর মুখতার বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। আল্লাহর রাস্তায় এই আপসহীন লড়াইয়ের মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন এবং তাঁর নাম খিলাফত মহলেও ছড়িয়ে পড়ে। ফলে অঞ্চলের বিভিন্ন গোত্র তাঁর পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে।

১৯১১ সালে শুরু হয় লিবিয়া ও ইতালির মধ্যকার যুদ্ধ। এ সময় ওমর মুখতার তাঁর অধীনস্থ গোত্রগুলোকে জি হা দের আহ্বান জানান। ইতালীয় আগ্রাসনের শুরুর দিকেই তাঁর মাত্র হাজার খানেক যোদ্ধার কাছে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত বিশাল ইতালীয় বাহিনী ধরাশায়ী হয়। ধীরে ধীরে 'ওমর মুখতার' নামটি ইতালীয়দের কাছে এক আতঙ্কের সমার্থক হয়ে ওঠে। তারা ভয়ে রাতে ঠিকমতো ঘুমাতেও পারত না। অথচ তারা ছিল বিশ্বমানের আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত এবং সুপ্রশিক্ষিত বাহিনী; আর ওমরের যোদ্ধারা বাহিনী ছিল সংখ্যায় অত্যন্ত নগণ্য এবং তাঁদের কাছে ছিল পুরনো আমলের সাধারণ কিছু অস্ত্র।

ওমর মুখতারকে পথ থেকে সরাতে ইতালীয়রা নানা সময় লোভনীয় প্রস্তাব পাঠায়। ইতালী সরকার তাঁকে শ্রেষ্ঠ নাগরিকত্বের সম্মান প্রদান, সুখে জীবনযাপনের সুযোগ এবং মোটা অঙ্কের ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এ সংক্রান্ত সব চুক্তি গোপন রাখা হবে। কিন্তু ওমর ছিলেন আপসহীন এক ব্যক্তিত্ব। এসব লোভনীয় প্রস্তাব এক বাক্যে নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেছিলেন:
"তোমরা ভালো করে শুনে নাও! আমি কোনো খাবারের লোকমা নই যে ইচ্ছা করলেই সহজে গিলে ফেলবে। যদি কেউ আমার ঈমান-আকিদা পরিবর্তন করতে চায়, তবে আল্লাহ তাকে ব্যর্থ করে দেবেন। যারা ইতালিকে চিনতে পারেনি তারা মূর্খ, কিন্তু আমি মূর্খ নই। এটা ভেবো না যে আমি রক্তের প্রতিশোধ না নিয়েই শান্তির আলোচনায় যাব। আমি পানাহ চাই সেই কালো দিন থেকে, যেদিন আমি ইতালীয়দের বাহনে পরিণত হব। আমি যদি কোনোদিন এই লড়াই থেকে সরে আসি, তবে বারকার অধিবাসীরা যেন অস্ত্র সমর্পণের ক্ষেত্রে আমার আনুগত্য না করে।"

ইতালীয়দের বিরুদ্ধে যোদ্ধাদের লড়াই অবিরাম চলতে থাকে। এর মাঝে বেশ কয়েকটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যাতে উভয় পক্ষই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। একপর্যায়ে সানুসি আন্দোলনের অনেক নেতা লড়াই থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ওমর মুখতার এই সিদ্ধান্ত দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলেন: "এই লড়াই থেকে আমি এক পা-ও পিছু হটব না, জাবালে আখদার ছেড়ে কোথাও যাব না। হয় বিজয় অর্জন করব, না হয় শাহাদাত বরণ করব—এর বাইরে তৃতীয় কোনো পথ নেই। তোমাদের ওপর কোনো জবরদস্তি নেই; যার ইচ্ছা চলে যেতে পারো, আর যার ইচ্ছা থাকতে পারো।" যোদ্ধারা ওমরের সাথেই থেকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেন।

১৯৩০ সালের দিকে ওমর মুখতার বার্ধক্যে উপনীত হন। দীর্ঘ যুদ্ধের শত আঘাতে তাঁর শরীর ছিল ক্ষতবিক্ষত; তিনি ঠিকমতো হাঁটতেও পারতেন না। অথচ লড়াইয়ের ময়দানে তরুণদের চেয়েও শ্রেষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছিলেন। সব সময় চলাফেরায় সতর্কতা অবলম্বন করলেও আল্লাহর ফয়সালায় জীবনের শেষ সফরে তিনি মাত্র ৪০ জন যোদ্ধা নিয়ে বের হয়েছিলেন।

ঠিক এই সময়েই অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে তিনি ইতালীয় সৈনিকদের হাতে গ্রেপ্তার হন। তাঁর গ্রেপ্তারের খবর শুনে জালিম শাসকমহলে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। অনেকের বিশ্বাসই হচ্ছিল না, যে মানুষটি টানা ২০ বছর ধরে সাহসিকতার সাথে ইতালীয়দের পরাস্ত করে এসেছেন, তিনি আজ তাঁদের হাতে বন্দি! জেনারেল গ্রাজিয়ানি কৌতূহলবশত বন্দি ওমর মুখতারকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "আপনি আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেন কেন?"
ওমর মুখতার সংক্ষেপে জবাব দিয়েছিলেন, "কারণ আমার দ্বীন আমাকে এর আদেশ দেয়।"

১৯৩১ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর বারকার পুরনো পার্লামেন্টে ওমর মুখতারের নামকাওয়াস্তে বিচারকার্য শুরু হয়। এই বিচারের রায় আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাঁকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। পরদিন ১৬ই সেপ্টেম্বর সকালে বেনগাজীর সালুক এলাকার এক উন্মুক্ত মাঠে ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়। ওমর মুখতার অত্যন্ত হাস্যোজ্জ্বল মুখে ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে যান, যেন এই মুহূর্তটির জন্যই তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুত ছিলেন! ইতালীয়রা মাথার ওপর দিয়ে হেলিকপ্টার চক্কর দেওয়াচ্ছিল, যাতে ওমর মুখতার জনতার উদ্দেশ্যে কিছু বললেও কেউ শুনতে না পায়।

যখন তাঁর গলায় ফাঁসির দড়ি পরানো হচ্ছিল, তখন তিনি প্রশান্ত মনে পবিত্র কুরআনের আয়াত তিলওয়াত করছিলেন:
"হে প্রশান্ত আত্মা! তুমি তোমার রবের কাছে ফিরে এসো সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। অতঃপর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হও, আর প্রবেশ করো আমার জান্নাতে।" [সূরা আল-ফাজর: ২৭-৩০]



ইবনে আসির বর্ণনা করেন, "যে রাতে ইমাদুদ্দিন জেঙ্গি শাহাদাত বরণ করলেন, সেই রাতেই এক নেককার ব্যক্তি তাঁকে স্বপ্নে দেখেন। স্...
14/09/2026

ইবনে আসির বর্ণনা করেন, "যে রাতে ইমাদুদ্দিন জেঙ্গি শাহাদাত বরণ করলেন, সেই রাতেই এক নেককার ব্যক্তি তাঁকে স্বপ্নে দেখেন। স্বপ্নে তিনি জিজ্ঞেস করেন, আল্লাহ আপনার সাথে কেমন আচরণ করেছেন? তিনি উত্তর দেন, এডেসা বিজয়ের কারণে আল্লাহ আমাকে মাফ করে দিয়েছেন।"

আজ ১৪ই সেপ্টেম্বর, ঠিক এই দিনে ১১৪৬ সনে গুপ্তঘাতকের ছুরিকাঘাতে শাহাদাতবরণ করেন ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম বীর সিপাহসালার মালিকুল মানসুর ইমাদুদ্দিন বিন আকসুঙ্কুর জেঙ্গি। ক্রুসেডার দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ইতিহাসে তিনি এক অনন্য ভূমিকা রেখে গেছেন।

১০৯৯ সালে ব|য়তুল মুক|দ্দাস দখলের সময় ক্রুসেডাররা মুসলিমদের ওপর নারকীয় গণ*হ*ত্যা চালিয়েছিল; সেই আতঙ্ক তখন গোটা শাম অঞ্চলজুড়ে বিরাজ করছিল। এই আতঙ্ক দূর করে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন মসুলের আমীর শারফুদ্দৌলা মওদূদ। বছরের পর বছর তিনি একাই ক্রুসেডারদের প্রতিরোধ করে গেছেন। তাঁরই একজন সহযোদ্ধা ছিলেন তরুণ ইমাদুদ্দিন জেঙ্গি, যাঁর পিতা আকসুনকুর আল-হাজিবও একজন সেলজুক শাসক ছিলেন এবং যাঁর শৈশব কেটেছিল মসুলের শাসক কারবুকার তত্ত্বাবধানে। মওদূদের শাহাদাতের পর সেলজুক সুলতান ইমাদুদ্দিনকে মসুলের শাসনভার অর্পণ করেন, পরে ১১২৮ সালে তিনি আলেপ্পোরও শাসনকর্তা নিযুক্ত হন।

ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই ইমাদুদ্দিন পূর্ণদমে ক্রুসেডার দমনে নেমে পড়েন। প্রথম ক্রুসেডে বিধ্বস্ত মুসলিম বিশ্বের চিত্র তাঁর হাত ধরে ধীরে ধীরে পাল্টাতে থাকে। একে একে হামা, আসারিব, কিন্নাসরীন ও আলেপ্পো তাঁর করায়ত্ত হয়। ১১৪৪ সালে তিনি ক্রুসেডারদের অন্যতম শক্ত ঘাঁটি এডেসা দুর্গ জয় করেন, এমন এক বিজয় যা আমীর শারফুদ্দৌলা বহুবার চেষ্টা করেও অর্জন করতে পারেননি; প্রতিবারই খ্রিস্টানদের সুরক্ষিত প্রতিরক্ষার সামনে তাঁকে পিছু হটতে হয়েছিল। ইতিহাসবিদরা ইমাদুদ্দিনের এই এডেসা বিজয়কে "ফাতহুল ফুতুহ" বা "বিজয়ের বিজয়" নামে আখ্যায়িত করেন, কারণ এই এক বিজয়ই ইউরোপে গোটা খ্রিস্টান জগতকে নাড়িয়ে দিয়েছিল এবং এর প্রতিক্রিয়াতেই পরবর্তীতে দ্বিতীয় ক্রুসেড শুরু হয়। এডেসা বিজয়ের পর মুসলিমদের জন্য আরও বিজয়ের দুয়ার খুলে যেতে থাকে।

এই বিজয়ের পর ইমাদুদ্দিন আর মাত্র দুই বছর জীবিত ছিলেন। ১১৪৬ সালের সেপ্টেম্বরে কালাত জাবার দুর্গ অবরোধকালে এক রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় নিজেরই এক ফ্রাংক ক্রীতদাসের ছুরিকাঘাতে তিনি শাহাদাতের পেয়ালা পান করেন।

ইমাদুদ্দিন শাহাদাত বরণ করলেও লড়াইয়ের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য রেখে যান তাঁরই সুযোগ্য পুত্র মাহমুদকে, ইতিহাস যাঁকে চেনে "নুরুদ্দিন জেঙ্গি" নামে। নুরুদ্দিন পিতার রেখে যাওয়া আমানতকে বহুগুণ বর্ধিত করে ব|য়তুল মুক|দ্দাসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যান, আর তাঁরই যোগ্য উত্তরসূরি সালাহউদ্দিন আইয়ুবী ১১৮৭ সালে অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত পবিত্র বিজয় অর্জন করেন।



ইমাম আল বুখারী: হাদীসশাস্ত্রের সুউজ্জ্বল বাতিঘরআজ ১লা সেপ্টেম্বর, ঠিক এই দিনে ৮৭০ খ্রিস্টাব্দে সমরকন্দে ইন্তেকাল করেন ইম...
01/09/2026

ইমাম আল বুখারী: হাদীসশাস্ত্রের সুউজ্জ্বল বাতিঘর

আজ ১লা সেপ্টেম্বর, ঠিক এই দিনে ৮৭০ খ্রিস্টাব্দে সমরকন্দে ইন্তেকাল করেন ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ। তাঁর পুরো নাম ইমাম হাফেয আবু আব্দুল্লাহ্ মুহাম্মাদ বিন ইসমাঈল বিন ইবরাহীম বিন মুগীরা বিন বারদিযবাহ আল-জু'ফী আল-বুখারী। তাঁকে বলা হত "আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদীস"।

আব্বাসীয় আমলে বুখারায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। শৈশবেই পিতাকে হারান, এরপর মায়ের তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন। দশ বছর বয়সে জ্ঞানচর্চার প্রতি প্রবল আগ্রহ জাগে তাঁর মনে। অল্প বয়সেই তিনি পবিত্র কুরআন হিফয করেন, আর ষোলো বছর বয়সে হাদীসের প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলোর পাঠ সমাপ্ত করেন।

আঠারো বছর বয়সে হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে তিনি মক্কায় গমন করেন। সেখানে অবস্থানকালেই তিনি হাদীসচর্চা শুরু করেন, এরপর জ্ঞানার্জনের জন্য বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেন এবং এক হাজারেরও অধিক মুহাদ্দিসের কাছ থেকে হাদীস সংগ্রহ করেন। রাত জেগে অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন তিনি, আর তাঁর স্মরণশক্তি ছিল অসাধারণ প্রখর। বলা হয়, সনদসহ প্রায় ছয় লক্ষ হাদীসের হাফেয ছিলেন তিনি।

শৈশবের একটি ঘটনা তাঁর অসাধারণ মেধার সাক্ষ্য বহন করে। তখন তাঁর বয়স মাত্র দশ। যুগের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ইমাম দাখিলীর পাঠদানকালে তিনি একটি হাদীস এই সনদে উপস্থাপন করেন —

سفيان عن أبي الزبير عن إبراهيم

অর্থাৎ, "সুফিয়ান বর্ণনা করেন আবুয্ যুবাইর হতে, আর আবুয্ যুবাইর বর্ণনা করেন ইবরাহীম হতে।" কিশোর বুখারী প্রতিবাদ করে বলেন, আবুয্ যুবাইর ইবরাহীম হতে এই হাদীস বর্ণনা করেননি। মুহাদ্দিস দাখিলী তাঁকে ধমক দিলেও তিনি দৃঢ়চিত্তে ও বিনয়ের সাথে বলেন, সনদটি হবে أبو الزبير عن إبراهيم নয়, বরং زبير بن عدي عن إبراهيم — অনুগ্রহ করে মূল কিতাব মিলিয়ে দেখুন। বারবার অনুরোধের ফলে উস্তাদের মনে সংশয় জাগে, তিনি কিতাব মিলিয়ে দেখে স্বীকার করেন যে বালকের কথাই সঠিক। এরপর মুহাদ্দিস দাখিলী তাঁর জন্য প্রাণ খুলে দুআ করেন।

হাদীস সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ইমাম বুখারী কঠোর পরিশ্রম করে বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন। খোরাসানের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও তিনি গিয়েছেন মক্কা, মদীনা, ইরাক, হিজায, সিরিয়া, মিশরসহ আরও বহু শহরে, যেখানে যুগের বিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণ বসবাস করতেন।

তাঁর কাছ থেকে অসংখ্য মুহাদ্দিস সহীহ হাদীস বর্ণনা করেছেন। খতীব বাগদাদী তাঁর অন্যতম রাবী ফিরাবরির বরাত দিয়ে বলেন, প্রায় সত্তর হাজার মানুষ ফিরাবরির সাথে ইমাম বুখারী থেকে সরাসরি সহীহ বুখারী পাঠ করেছেন, তাদের মধ্যে ফিরাবরি ছাড়া তখন আর কেউ জীবিত ছিলেন না। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন ইমাম মুসলিম, ইমাম তিরমিযী ও ইমাম নাসাঈ। আর যাঁদের কাছে তিনি হাদীস শুনেছেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল ও ইসহাক বিন রাহওয়াইসহ আরও অনেকে। আটবার বাগদাদে গমন করেছেন তিনি, আর প্রতিবারই ইমাম আহমাদ বিন হাম্বালের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। প্রতিটি সাক্ষাতেই ইমাম আহমাদ তাঁকে খোরাসান ছেড়ে বাগদাদে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য উৎসাহিত করতেন।

সহীহুল বুখারী রচনায় তিনি অসামান্য সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। গ্রন্থে কেবল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত সহীহ হাদীসগুলোই স্থান পেয়েছে। কোনো হাদীসকে সহীহ সাব্যস্ত করে গ্রন্থভুক্ত করার জন্য তিনি স্পষ্ট কোনো শর্ত উল্লেখ না করলেও, আলেমগণ তাঁর কর্মপদ্ধতি বিশ্লেষণ করে নিম্নলিখিত শর্তগুলো নির্ণয় করেছেন —

রাবী তাঁর উপরের রাবীর সমসাময়িক হতে হবে এবং উভয়ের মধ্যে সাক্ষাৎ প্রমাণিত হতে হবে; অর্থাৎ সাক্ষাৎ ও হাদীস শ্রবণ উভয়ই প্রমাণিত হওয়া আবশ্যক। এই শর্তে তিনি অন্য মুহাদ্দিসদের থেকে ভিন্নমত পোষণ করেছেন — ইমাম মুসলিমের মতে শুধু সাক্ষাতের সম্ভাবনা থাকলেই যথেষ্ট, নির্দিষ্ট কোনো হাদীস শ্রবণ প্রমাণিত হওয়া জরুরি নয়। এছাড়া রাবীকে নির্ভরযোগ্য হতে হবে; মানুষের সাথে কথাবার্তা ও লেনদেনে ন্যায়পরায়ণ ও সত্যবাদী হতে হবে; পূর্ণ স্মরণশক্তির অধিকারী হতে হবে; আর হাদীসের সনদ মুত্তাসিল হতে হবে, অর্থাৎ মাঝখান থেকে কোনো রাবী বাদ পড়বে না।

এই শর্তগুলো পূরণ হলেই তিনি কোনো হাদীস তাঁর গ্রন্থে লিখে ফেলতেন না। বরং প্রতিটি হাদীস লেখার আগে গোসল করে দুই রাকআত নামায পড়তেন এবং ইস্তেখারা করতেন। অন্তরে সামান্যতম সংশয় জাগলে, শর্ত পূরণ সত্ত্বেও সেই হাদীস তিনি সহীহ বুখারীতে অন্তর্ভুক্ত করতেন না। মসজিদে নববীতে বসে এভাবেই তিনি গ্রন্থ রচনা শুরু করেন এবং একটানা ষোলো বছর দিনরাত পরিশ্রম করে তা সম্পন্ন করেন।

সহীহ বুখারী ছাড়াও তিনি রচনা করেছেন আরও বেশ কিছু মূল্যবান গ্রন্থ — আল আদাবুল মুফরাদ (যার বাংলা অনুবাদ রয়েছে), তারীখুল কাবীর (হাদীসের রাবীদের জীবনী নিয়ে), তারীখুস সাগীর (রাসূলুল্লাহ ও সাহাবীসহ বিভিন্ন রাবীর জীবনী নিয়ে), খালকু আফআলিল ইবাদ (মুতাযিলাদের একটি ভ্রান্ত মতবাদের খণ্ডনে), রাফউল ইয়াদাইন ফিস্ সালাত, জুযউল কিরাআত খালফাল ইমাম, কিতাবুয্ যুআফাইস্ সাগীর, কিতাবুল কুনা, আত্-তাওয়ারীখ ওয়াল আনসাব, কিতাবুত তাওহীদ, এবং আখবারুস্ সিফাত — এছাড়াও রয়েছে আরও অনেক গ্রন্থ।

আলেমগণ ইমাম বুখারী সম্পর্কে যা বলেছেন: ইমাম আবু নুআইম আহমাদ বিন হাম্মাদ বলেন, ইমাম বুখারী এই উম্মতের ফকীহ। ইমাম তিরমিযী বলেন, হাদীসের ইল্লত, ইতিহাস ও সনদ সম্পর্কে ইরাক ও খোরাসানের ভূমিতে বুখারীর চেয়ে অধিক জ্ঞানী তিনি আর কাউকে দেখেননি। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল বলেন, খোরাসানের ভূমিতে ইমাম বুখারীর মতো আর কেউ জন্মগ্রহণ করেননি।

শেষ বয়সে বিভিন্ন ফিতনার আশঙ্কায় ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন ইমাম বুখারী। তাহাজ্জুদের নামাযে তিনি আল্লাহর কাছে আবেদন জানান — "হে আল্লাহ্! এই সুবিশাল পৃথিবী আমার জন্য সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে, অতএব তুমি আমাকে তোমার নিকট তুলে নাও।" এর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সমরকন্দের খরতঙ্গ জনপদে বাষট্টি বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।

তথ্যসূত্র:
১) আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া
২) আল ওয়াফী ফিল ওয়াফিয়াত



ইসলামী বিপ্লবের অগ্রপথিক:শহী•দ সাইয়েদ কুতুব ইব্রাহিম হুসাইন রাহি.আজ ২৯শে আগস্ট ঠিক এই দিনে ১৯৬৬ সালে তিনি তৎকালীন মিসরী...
29/08/2026

ইসলামী বিপ্লবের অগ্রপথিক:
শহী•দ সাইয়েদ কুতুব ইব্রাহিম হুসাইন রাহি.

আজ ২৯শে আগস্ট ঠিক এই দিনে ১৯৬৬ সালে তিনি তৎকালীন মিসরীয় সরকার কর্তৃক মৃত্যুদন্ড কার্যকরের মাধ্যমে শা•হাদাত বরণ করেন। তাঁকে ইসলামি পুনর্জাগরণের অগ্রপথিক ও বৈশ্বিক ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলনের একজন তাত্ত্বিক রাহবার মনে করা হয়। বিশ্বব্যাপী ইসলামি আন্দোলন ও রাজনীতির বিশ্লেষণে সাইয়্যেদ কুতুবের নাম এখনও সমৃদ্ধ।

ঊনিশ শতকের (১৯০৬ সালে) শুরুর দিকে জন্ম নেয়া সাইয়েদ কুতুব একজন কুরআনের হাফেজ ছিলেন। উচ্চতর পড়াশোনা করেন কায়রো দারুল উলুম ও আমেরিকার একটি ইউনিভার্সিটিতে। আমেরিকা থাকাকালীন তিনি পাশ্চাত্যের ভোগবাদী ও বস্তুবাদী শিক্ষার অসারতা ও নীচুতা অনুধাবন করেন। তখন তার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে একমাত্র ইসলামই সত্যিকার অর্থে মানবসমাজকে কল্যাণের পথে নিয়ে যেতে পারে। এই অনুপ্রেরণা থেকেই তিনি পরে কলম ধরেন এবং ইসলামি রাজনীতিতে সক্রিয় হন।

তিনি হাসান আল বান্নার প্রতিষ্ঠিত মুসলিম ব্রাদার হুডে যোগ দেয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক কার্যকলাপ শুরু করেন। তখন সংগঠনটি রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রবল চাপের মুখে ছিল। তবুও তার নিযুক্তির পর সংগঠনটিতে অভাবনীয় পরিবর্তন আসে। ওই সময় মিসরের মানুষ দলে দলে তাতে যোগ দিতে শুরু করে। তাদের বিশ্বাস– তাঁর কারণেই আবার এই সংগঠন বিপ্লবী রূপ ফিরে পায়। যার ফলে একসময় তিনি ব্রাদার হুডের একনিষ্ঠ ও নিষ্ঠাবান রাহবার হয়ে ওঠেন। সাইয়েদ কুতুব একজন উঁচুমানের সাহিত্যিক হওয়ায় একসময় ব্রাদার হুড-পরিচালিত সাময়িকীর সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ পান। দায়িত্ব পাওয়ার ছয় মাস পরেই ব্রিটেনের সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার সমালোচনা করায় মিসর সরকার জামাল আবদুন নাসের পত্রিকাটি বন্ধ করে দেন। তখন তাকেসহ হাজার হাজার ব্রাদার হুড সমর্থককে গ্ৰেফতার করা হয় এবং তাকে ১৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়।

কারাবন্দি জীবনে তিনি সীমাহীন জুলুম নির্যাতনের শিকার হন। জেলে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই জেল কর্মচারীরা তাকে মারপিট করতে শুরু করে এবং দু’ঘণ্টা পর্যন্ত এ নির্যাতন চলতে থাকে। তারপর একটি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর তার ওপর লেলিয়ে দেয়া হয়। কুকুর তার পা কামড়ে ধরে জেলের আঙ্গিনায় টেনে নিয়ে বেড়ায়। এ প্রাথমিক ‘অভ্যর্থনা’ জানানোর পর একটানা সাত ঘণ্টা তাকে জেরা করা হয়। তার স্বাস্থ্য এসব নির্যাতন সহ্য করার আর যোগ্য ছিল না। কিন্তু তার সুদৃঢ় ঈমানের বলে পাষাণ থেকে উচ্চারিত হতে থাকে : আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ। এক বছর কারাভোগের পর নাসের সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেয়া হয় যে, তিনি সংবাদপত্রের মাধ্যমে ক্ষমার আবেদন করলে তাকে মুক্তি দেয়া যেতে পারে। মর্দে মুমিন এ প্রস্তাবের যে জবাব দিয়েছিলেন, তা ইতিহাসের পাতায় অম্লান হয়ে থাকবে। তিনি বলেন : ‘আমি এ প্রস্তাব শুনে অত্যন্ত আশ্চর্যান্বিত হচ্ছি যে, মজলুমকে জালিমের নিকট ক্ষমার আবেদন জানাতে বলা হচ্ছে। আল্লাহর কসম! যদি ক্ষমা প্রার্থনার কয়েকটি শব্দ আমাকে ফাঁসি থেকেও রেহাই দিতে পারে, তবু আমি এরূপ শব্দ উচ্চারণ করতে রাজি নই। আমি আল্লাহর দরবারে এমন অবস্থায় হাজির হতে চাই যে, আমি তাঁর প্রতি এবং তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট।’ পরবর্তীকালে তাকে যতবার ক্ষমা প্রার্থনার পরামর্শ দেয়া হয়েছে ততবারই তিনি একই কথা বলেছেন : ‘যদি আমাকে যথার্থই অপরাধের জন্য কারারুদ্ধ করা হয়ে থাকে, তাহলে আমি এতে সন্তুষ্ট আছি। আর যদি বাতিল শক্তি আমাকে অন্যায়ভাবে বন্দি করে থাকে, তাহলে আমি কিছুতেই বাতিলের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করব না।’

অবশেষে দীর্ঘ ১০ বছর কারাভোগের পর তিনি ইরাকের প্রেসিডেন্টের সুপারিশে মুক্তি লাভ করেন। এরপর আট মাসের মাথায় সরকার পতনের চক্রান্তে জড়িত থাকার মামলা দিয়ে তাকে আবার গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬৫ সালের ২১ আগস্ট সামরিক ট্রাইবুনালের পক্ষ থেকে তাকে ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়। কার্যকর করা হয় এর আট দিন পর, ২৯ আগস্ট ভোরে।

মৃত্যুদণ্ডের আগে সাইয়েদ কুতুবকে কালিমা পড়াতে একজন সরকারি মৌলভিকে জেলখানায় পাঠানো হয়। তিনি এই মৌলভিকে লক্ষ্য করে বলেন- 'তোমার কালিমা তোমার রুটি যোগায় আর আমার কালিমা আমাকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলায়।' তার কারাগারের দিনকাল সম্বন্ধে ঐতিহাসিক ইউসুফ আজম লিখেছেন- ‘সাইয়েদ কুতুবের ওপর বর্ণনাতীত নির্যাতন চালানো হয়। আগুনে শরীর ঝলসে দেয়া হয়। পুলিশের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর লেলিয়ে দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থান রক্তাক্ত করা হয়। মাথার ওপর কখনো টগবগে গরম পানি ঢালা হয়। পরক্ষণে আবার খুবই শীতল পানি ঢেলে শরীর বরফের মতো ঠান্ডা করা হয়। পুলিশ লাথি, ঘুষি মেরে একদিক থেকে অন্য দিকে নিয়ে যেত।’

যেদিন তাকে ফাঁসি দেয়া হয়, সেদিন মিসরের পথে পথে তার রচিত তাফসির 'ফি যিলালিল কুরআন'- এর প্রায় ৬৪ হাজার ভলিয়ম পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণা করা হয়- যার কাছে সাইয়েদ কুতুব- এর গ্রন্থ পাওয়া যাবে তাকে দশ বছর জেল হাজতে হবে।
ধারণা করা হয়- তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার প্রধান একটি কারণ হলো এই বই রচনা।



#سيدقطب

Address

Dhaka

Telephone

+8801975445039

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Searching History posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Searching History:

Shortcuts

Share