04/05/2026
“সিংহের মত এক দিন বাঁচা শেয়ালের মত একশ বছর বাঁচার চেয়ে শ্রেয়”— টিপু সুলতান
আজ ৪মে ঠিক এই দিনে, ১৭৯৯ সালে চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধে বীরের মতো যুদ্ধ করতে করতেই শাহাদাত বরণ করেন টিপু সুলতান। ইতিহাসে “মহীশূরের বাঘ” নামে পরিচিত এই মহান শাসক শুধু একজন যোদ্ধাই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এক দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক, সংস্কারক এবং উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের এক অনন্য প্রতীক।
টিপু সুলতানের প্রকৃত নাম ছিল ফতেহ আলী খান। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৭৫০ সালে দক্ষিণ ভারতের মহীশূর রাজ্যে। তাঁর পিতা হায়দার আলী ছিলেন মহীশূরের শক্তিশালী শাসক এবং একজন দক্ষ সামরিক নেতা। শৈশব থেকেই টিপু সুলতান যুদ্ধকৌশল, প্রশাসন ও কূটনীতির শিক্ষা লাভ করেন। পিতার সান্নিধ্যে থেকে তিনি অল্প বয়সেই যুদ্ধক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন এবং দ্রুতই নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন। ১৭৮২ সালে হায়দার আলীর মৃত্যুর পর তিনি মহীশূরের সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং শাসনভার গ্রহণ করেন।
শাসক হিসেবে টিপু সুলতান ছিলেন অত্যন্ত দৃঢ়চেতা ও প্রগতিশীল। তিনি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্রমবর্ধমান আধিপত্যকে ভারতের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখতেন এবং তাদের বিরুদ্ধে নিরলস সংগ্রাম চালিয়ে যান। তাঁর শাসনামলে মহীশূর একটি শক্তিশালী ও সংগঠিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তিনি প্রশাসনিক সংস্কার, রাজস্বব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে বিশেষ মনোযোগ দেন।
টিপু সুলতানের অন্যতম বড় অবদান ছিল সামরিক প্রযুক্তিতে নবতর উদ্ভাবন। তিনি লোহার নলযুক্ত রকেট অস্ত্রের উন্নত ব্যবহার করেন, যা সে সময়ের জন্য ছিল অত্যন্ত আধুনিক। এই রকেট প্রযুক্তি ব্রিটিশদের বিস্মিত করে এবং পরবর্তীতে তারা এই প্রযুক্তি অনুসরণ করে ইউরোপে নতুন ধরনের রকেট উদ্ভাবন করে। যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর কৌশল, সাহসিকতা এবং নেতৃত্বগুণ তাকে ব্রিটিশদের অন্যতম ভয়ংকর প্রতিপক্ষে পরিণত করে।
তাঁর জীবনের সঙ্গে “বাঘ” প্রতীকটি বিশেষভাবে জড়িত। কথিত আছে, একবার শিকারের সময় তিনি খালি হাতে একটি বাঘের সঙ্গে লড়াই করে তাকে হত্যা করেন, এরপর থেকেই তিনি “শের-ই মহীশুর" তথা মহীশূরের বাঘ উপাধিতে ভূষিত হন। তাঁর সিংহাসন, রাজকীয় পোশাক, অস্ত্র এবং সামরিক পতাকায় বাঘের প্রতীক ব্যবহৃত হতো, যা তাঁর সাহস ও শক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও টিপু সুলতান ছিলেন সক্রিয়। তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী জোট গঠনের উদ্দেশ্যে ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট-এর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। যদিও সেই জোট বাস্তবায়িত হয়নি, তবুও এটি তাঁর দূরদর্শিতা ও কৌশলগত চিন্তাভাবনার প্রমাণ বহন করে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেও তিনি উল্লেখযোগ্য সংস্কার সাধন করেন। তিনি রাষ্ট্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, নতুন ক্যালেন্ডার প্রবর্তন, রেশম শিল্পের উন্নয়ন এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাঁর শাসনামলে মহীশূর অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়।
টিপু সুলতান নিজেকে মুসলিম বিশ্বের একজন গুরুত্বপূর্ণ শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন এবং সে সময়ে উসমানীয় খলিফা ৩য় সেলিমের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেন। এই প্রচেষ্টার মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সমর্থন ও বৈধতা অর্জন করা।
তিনি ওসমানীয় দরবারে দূত পাঠান এবং চিঠির মাধ্যমে নিজের সালতানাতকে স্বীকৃতি দেওয়ার অনুরোধ করেন। পাশাপাশি তিনি আশা করেছিলেন যে, খলিফার সমর্থন পেলে ভারতের মুসলিমদের মধ্যে তাঁর প্রভাব আরও বাড়বে এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে একটি বৃহত্তর মুসলিম ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
ঐতিহাসিকভাবে জানা যায়, উসমানীয় সুলতান টিপুর প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং তাকে সম্মানজনকভাবে গ্রহণ করেন। তবে বাস্তবিক সামরিক সহায়তা বা জোট গঠন তেমন কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি, কারণ সে সময় উসমানীয় সাম্রাজ্য নিজেই ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সঙ্গে নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল।
১৭৯৯ সালে শ্রীরঙ্গপত্তনম-এ সংঘটিত যুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার ফলে মহীশূরের পতন ঘটে। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত টিপু সুলতান যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করেন এবং বীরের মতো শহীদ হন। তাঁর এই শাহাদাত তাঁকে ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।