30/09/2026
আজ ৩০ সেপ্টেম্বর, ঠিক এই দিনে ৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে কর্ডোভায় ইন্তেকাল করেন আন্দালুসের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক আব্দুর রহমান ইবনে মুয়াবিয়া, যিনি ইতিহাসে "আব্দুর রহমান আদ-দাখিল" নামেই সর্বাধিক পরিচিত। তিনি ছিলেন উমাইয়া খলিফা হিশাম ইবনে আব্দুল মালিকের পৌত্র। মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে তিনি আন্দালুসে প্রবেশ করেন এবং তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সমগ্র আন্দালুস শাসন করেন। তাঁর সুদক্ষ রাষ্ট্রপরিচালনা, ন্যায়বিচার ও সমৃদ্ধি আন্দালুসের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচনা করেছিল।
আব্দুর রহমান ইবনে মুয়াবিয়ার তারুণ্য কেটেছে চরম ঝুঁকি ও সংকটের মধ্য দিয়ে। উমাইয়া রাজবংশের এই প্রতিভাবান কিশোর যখন তারুণ্যে পা রাখলেন, তখন মুসলিম বিশ্বে আব্বাসীয়দের বিদ্রোহ শুরু হয়। এক রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আব্বাসীয়রা উমাইয়াদের ক্ষমতাচ্যুত করে এবং উমাইয়া বংশের সকল প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে নির্বিচারে হত্যা করে। এমন পরিস্থিতিতে আব্দুর রহমান ইবনে মুয়াবিয়া ফোরাত নদীর তীরে ইরাকের একটি এলাকায় আত্মগোপন করেন। আব্বাসীয় সৈন্যরা তাঁকে খুঁজে পেলে তিনি ফোরাত নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরে অপর পাড়ে পৌঁছান। সেখান থেকে তিনি উত্তর আফ্রিকায় প্রবেশ করেন। উত্তর আফ্রিকা তখন আব্দুর রহমান ইবনে হাবিবের স্বতন্ত্র শাসনাধীন ছিল। তিনি আব্দুর রহমান ইবনে মুয়াবিয়ার আগমনকে অশুভ দৃষ্টিতে দেখলেন। এই উমাইয়া রাজপুত্র যেকোনো সময় বিদ্রোহ উসকে দিতে পারেন, একই সঙ্গে ইবনে হাবিবের নিজের আন্দালুস জয়ের স্বপ্নও ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাই আব্বাসীয়দের মতো তিনিও আব্দুর রহমান ইবনে মুয়াবিয়াকে হত্যার উদ্যোগ নিলেন।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থে উল্লেখ আছে, উমাইয়া বংশের মহাবীর, ককেশাসসহ উত্তর অঞ্চলের বিজেতা মাসলামা ইবনে আব্দুল মালিক আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, অচিরেই মুসলিম প্রাচ্যে উমাইয়া সালতানাতের পতন ঘটবে, আর জনৈক উমাইয়া তরুণ প্রাচ্য থেকে পশ্চিমের মাগরিব অঞ্চলে পালিয়ে গিয়ে উমাইয়াদের শাসনক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবেন।
আব্দুর রহমান মূলত সেই ভবিষ্যদ্বাণীর দিকেই অগ্রসর হচ্ছিলেন। তখন আন্দালুসের প্রশাসক ছিলেন ইউসুফ আল-ফিহরি। আন্দালুস তখন নানা অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহে জর্জরিত ছিল, তার ওপর ছিল খারিজিদের বিভিন্ন অপতৎপরতা। আব্দুর রহমান তাঁর একনিষ্ঠ সহচর বদরকে নিজের প্রতিনিধি করে আন্দালুসে পাঠালেন, যাতে সার্বিক পরিস্থিতি জানা যায়। বদর একে একে আন্দালুসে বসবাসরত উমাইয়া সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। প্রথম আলাপেই তাঁরা আব্দুর রহমানের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানালেন। আন্দালুসে তখন ইয়েমেনি-কায়সি দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠেছিল, তাই এই গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন আব্দুর রহমানের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। বদর প্রথমে উমাইয়াদের মাওয়ালি সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিত্রতা করলেন, তারপর কায়সিদের কাছে প্রস্তাব রাখলেন, কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করল। অতঃপর বদর ইয়েমেনিদের কাছে আব্দুর রহমানের বার্তা নিয়ে গেলেন এবং তারা এই প্রস্তাবে সাড়া দিল। এভাবে আব্দুর রহমান আন্দালুসের এক বিশাল প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সমর্থন আদায় করলেন। বদর তাঁকে আন্দালুসে আগমনের জন্য আমন্ত্রণ জানালেন।
অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত এলো। কোনো সঙ্গী ছাড়াই একাকী আব্দুর রহমান আন্দালুসের তীরে অবতরণ করলেন। বদর তাঁকে স্বাগত জানালেন, আর সঙ্গে সঙ্গে সমর্থকদের বিশাল দল তাঁকে ঘিরে সংবর্ধনা জানাতে লাগল। সবাইকে নিয়ে আব্দুর রহমান ইয়েমেনিদের মূল ঘাঁটি সেভিলে গমন করলেন এবং সেখানেই সমর্থকদের কাছ থেকে বাইয়াত গ্রহণ করলেন।
ইউসুফ আল-ফিহরি তখন উত্তর অঞ্চলে বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত ছিলেন। পরে তিনি আব্দুর রহমানের আগমনের খবর জানতে পারেন। আব্দুর রহমান তাঁকে সসম্মানে শাসনভার হস্তান্তরের প্রস্তাব দিলেন এবং আশ্বাস দিলেন যে তাঁকে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রাখা হবে। কিন্তু ইউসুফ তা প্রত্যাখ্যান করলেন। ফলে উভয়ের মধ্যে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠল। ৭৫৬ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে মাসারার প্রান্তরে ইউসুফ আল-ফিহরির সঙ্গে আব্দুর রহমানের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইউসুফের পক্ষে লড়েছিল কায়সিরা, আর আব্দুর রহমানের মূল শক্তি ছিল ইয়েমেনিরা। দুই মুসলিম বাহিনীর এই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত আব্দুর রহমান ইবনে মুয়াবিয়ার নিরঙ্কুশ বিজয়ে সমাপ্ত হয়।
প্রাচ্য থেকে বিতাড়িত আব্দুর রহমান হয়ে উঠলেন আন্দালুসের নতুন দিগন্তের মহানায়ক। আন্দালুসে তাঁর এই মহান হিজরতের কারণে তিনি "আদ-দাখিল" অর্থাৎ "প্রবেশকারী" উপাধি লাভ করেন। মাসারার যুদ্ধের পর তিনি পরাজিত বাহিনীর প্রতি সহানুভূতি দেখালেন। আব্বাসীয়দের মতো শত্রুপক্ষকে নির্বিচারে হত্যা না করে তিনি তাদের প্রতি সহনশীল আচরণ করলেন। ফলে শাসক হিসেবে তাঁর উদার মনোভাব শুরুতেই জনসাধারণকে আকৃষ্ট করল। তিনি পরাজিত নেতাদের সঙ্গে সঙ্গে উৎখাত করেননি। তিনি বলেছিলেন,
"এমন শত্রুর শিকড় উপড়ে ফেলো না, ভবিষ্যতে যার আন্তরিকতা তুমি প্রত্যাশা করো। তুলনামূলক কঠিন শত্রুর মোকাবেলায় সহায়তা লাভের জন্য তাকে টিকিয়ে রাখো।"
আব্দুর রহমানের বয়স তখন পঁচিশও পেরোয়নি, অথচ তিনি স্বাধীন আন্দালুসের আমির। দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁকে একে একে পঁচিশটিরও বেশি বড় বিদ্রোহ দমন করতে হয়, যা তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করেন। এর মধ্যে আব্বাসীয় খলিফা আল-মানসুরের প্রেরিত আল-আলা ইবনে মুগিস আল-হাযরামির অভিযান উল্লেখযোগ্য। আব্দুর রহমান তাঁকে পরাজিত করার পর খলিফা আল-মানসুর আন্দালুসের প্রতি আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করেন। খিলাফত থেকে বিচ্ছিন্ন একটি স্বাধীন রাজ্য হাতছাড়া হওয়া স্বাভাবিকভাবে যুক্তিসংগত নয়, তবু আল-মানসুর বিশ্বাস করতেন এই ভূখণ্ড আব্দুর রহমানের হাতেই সবচেয়ে নিরাপদ। উল্টো তিনি আব্দুর রহমানকে "কুরাইশের বাজপাখি" উপাধি দেন। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা প্রসিদ্ধ আছে। একদিন আবু জাফর আল-মানসুর তাঁর সভাসদদের জিজ্ঞেস করলেন, "তোমরা কি বলতে পারো, এ যুগের শাসকদের মধ্যে কুরাইশের বাজপাখি কে?"
তাঁরা বললেন, "এই উপাধি তো কেবল আমিরুল মুমিনিনকেই মানায়।"
খলিফা বললেন, "তোমরা কিছুই বলতে পারোনি।"
"তাহলে কি হযরত মুয়াবিয়া (রা.)?"
"না।"
"তাহলে আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান?"
"তাও নয়।"
"আমিরুল মুমিনিন, তাহলে সেই ব্যক্তি কে, আপনিই বলুন।"
"কুরাইশের বাজপাখি হলেন আব্দুর রহমান ইবনে মুয়াবিয়া। তোমরা মুয়াবিয়া (রা.)-এর কথা বলছ? তাঁকে তো হযরত উমর ও উসমান (রা.) একটি বাহনে উঠিয়ে দিয়েছিলেন মাত্র, বাহনকে অনুগতও করে দিয়েছিলেন তাঁরাই। মুয়াবিয়া (রা.) শুধু সেই বাহনকে সামনে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। আর আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানের পক্ষে ছিল সুদৃঢ় বাইয়াত। তোমাদের আমিরুল মুমিনিন শুধু নিজের পরিজন ও অনুসারীদের আনুকূল্য পেয়েছে। কিন্তু আব্দুর রহমান! তাঁর জীবন শুরু হয়েছিল একাকী, সঙ্গীহীন অবস্থায়; সঙ্গী ছিল কেবল সংকল্প ও দৃঢ়তা। শুধু এটুকু সম্বল করেই তিনি আন্দালুসে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন, সীমান্ত জয় করেছেন এবং খারিজিদের দমন করেছেন।"
একথা শুনে সবাই বলে উঠল, "আল্লাহর কসম, আমিরুল মুমিনিন সত্যই বলেছেন।"
আব্দুর রহমান আদ-দাখিল আন্দালুসে স্বাধীন উমাইয়া প্রশাসনের যুগের সূচনা করেন, যা আন্দালুসের সমৃদ্ধির পথ সুগম করে। নিখুঁত নিরাপত্তাব্যবস্থা, সুদৃঢ় সামরিক বাহিনী গঠন ও জ্ঞানচর্চার কারণে এই রাষ্ট্র জান্নাতের বাগানে পরিণত হয়েছিল। এসবই সম্ভব হয়েছিল আব্দুর রহমানের প্রশাসনিক দক্ষতা ও সুকৌশলী সমরনীতির ফলে। প্রজাদের প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল। তিনি তাঁদের খোঁজখবর রাখতেন, মসজিদে ইমামতি করতেন এবং সালাতের পর সবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন।
একটি ঘটনা বর্ণিত আছে: একবার এক ব্যক্তি আমীরের দরবারে নিজের অভাবের কথা জানালেন। আমীর তাঁর প্রয়োজন মিটিয়ে দিয়ে বললেন, "কখনো কোনো বিপদে পড়লে বা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে সবার আগে ইখলাসের সঙ্গে আল্লাহর কাছে নিজের হাজত জানিয়ে দুআ করবে। এরপর একটি চিরকুটে তা লিখে অত্যন্ত গোপনে আমাকে জানাবে, যাতে আমি গোপনেই তা পূরণ করে দিতে পারি।"
আল্লাহর প্রতি আব্দুর রহমানের অগাধ বিশ্বাস ও তাকওয়াপূর্ণ ব্যক্তিত্ব তাঁর মর্যাদাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, আব্দুর রহমান আদ-দাখিলের আবির্ভাব না ঘটলে আন্দালুস থেকে ইসলামের নামনিশানাই মুছে যেত। কারণ তিনিই এই ভূখণ্ডকে একটি নিরাপদ দেশে পরিণত করেছিলেন, ফলে খ্রিস্টান বহিঃশত্রুরা আক্রমণের সাহস পায়নি।
আব্দুর রহমানের গোটা জীবনই এক রোমাঞ্চকর উপাখ্যানের মতো। উনিশ বছর তিনি দামেশকে উমাইয়াদের পতনপ্রান্তের সময়ে কাটিয়েছেন। এরপর দীর্ঘ ছয় বছর তাঁকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে। এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে হিজরত করতে গিয়ে তিনি অসামান্য ত্যাগের নজির স্থাপন করেছেন। প্রায় ৩৪ বছর শাসনকার্য পরিচালনা করে ৫৯ বছর বয়সে তিনি কর্ডোভায় ইন্তেকাল করেন এবং সেখানেই সমাহিত হন।