14/01/2026
**এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী ও কোংদের ভণ্ডামি**
একজন আমাকে ইনবক্সে এনায়েতুল্লাহ আব্বাসীর একটা ক্লিপ পাঠায়, আমার গণভোট সংক্রান্ত ভিডিওটির পর। এবং বলে—কোনো মুসলমানের গণভোটে হ্যাঁ দেওয়া উচিত হবে না।
এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী খুব কনফিডেন্সের সাথে ডাহা মিথ্যা প্রচার করছে। তার দাবি—হ্যাঁ-তে ভোট দিলে বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকবে না। এছাড়া রাষ্ট্রের মূলনীতিতে 'আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস' পুনর্বহাল হবে না।
একই ধরনের প্রচার ওই ঘরানার অনেক আলেম-নামধারীকেও করতে দেখা যাচ্ছে। এছাড়া বিএনপির অনেক সমর্থককেও একই ধরনের প্রচার করতে দেখা যাচ্ছে। এনায়েতুল্লাহ আব্বাসীর হয়তো এটা জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, নইলে তিনি কোনো গ্রুপের এজেন্ডা বাস্তবায়নে নেমেছেন।
এবার আসি—এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী অ্যান্ড কোংদের দাবি কতটুকু সত্য, তা দেখার চেষ্টা করি।
গণভোটে হ্যাঁ বা না ভোট দেওয়া যার যার ইচ্ছা। কিন্তু অবাক করা বিষয় হচ্ছে—গণতন্ত্র ও নির্বাচনকে হারাম মনে করেন এমন কয়েকজন আলেম-ওলামাও না ভোটের প্রচার চালাচ্ছেন। না ভোটের প্রচার যে কেউ করতে পারে, এটা ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু মুশকিল হলো—এর জন্য ডাহা মিথ্যা কথা বলা হচ্ছে।
যেমন বলা হচ্ছে—জুলাই সনদে বিসমিল্লাহ এবং আল্লাহর ওপর আস্থার বিষয়টি নেই। সুতরাং এই গণভোটে হ্যাঁ পাস করলে, সনদ কার্যকরের মাধ্যমে সংবিধান থেকে বিসমিল্লাহ বাদ যাবে। মূলনীতিতে আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস পুনর্বহাল হবে না। এলজিবিটিকিউকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
এগুলো শুনে অনেকে যুক্তি দেখিয়ে বলছেন—না ভোট দেবেন। কারণ, সনদে বিসমিল্লাহ, ‘আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’ এবং রাষ্ট্রধর্ম নেই। সনদে যেহেতু নেই, তার মানে গণভোটে হ্যাঁ পাস করলে এগুলো থাকবে না।
কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে—ধর্মের নামে এই ডাহা মিথ্যা প্রচার করা হচ্ছে। প্রকৃত সত্য হলো, সনদে শুধু সংবিধানের সেই ৪৮টি অনুচ্ছেদ রয়েছে, যেগুলোর সংস্কার হবে। বাকি ১০৫টি অনুচ্ছেদ আগের মতোই থাকবে, কোনো পরিবর্তন হবে না। তাই সেগুলো সনদে রাখা হয়নি। বিসমিল্লাহতে কোনো পরিবর্তন আসবে না, তাই তা সনদে নেই। থাকার কোনো কারণও নেই।
১) বরং সংবিধান সংস্কার কমিশন ৯১টি দেশের সংবিধান পর্যালোচনা করে জানিয়েছিল—৭১টি দেশের সংবিধান আল্লাহর নামে, ঈশ্বরের নামে, সৃষ্টিকর্তার নামে শুরু হয়েছে। তাই বিসমিল্লাহ এবং পরম করুণাময়ের নামে সংবিধানের শুরু করা বৈষম্যমূলক নয়। (রিফর্ম ডট গভ ওয়েবসাইটে এর বিস্তারিত পাবেন)
২) পর্যালোচনা অনুযায়ী ৩৮টি দেশের সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম বা ধর্মীয় মূল্যবোধের কথা বলা হয়েছে। তাই রাষ্ট্রধর্ম বাদ দেওয়ার কোনো সুপারিশ সংস্কার কমিশনের ছিল না।
৩) রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে ফরমানবলে সংবিধানের ৮ অনুচ্ছেদে মূলনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে ‘আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’ সংযোজন করেন। ১৯৭৯ সালে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এর বৈধতা দেওয়া হয়। ২০১১ সাল পর্যন্ত তা ছিল। ২০১১ সালে শেখ হাসিনার সরকার ৮ অনুচ্ছেদ থেকে ‘আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’ বাদ দেয়।
সংবিধান সংস্কার কমিশন গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম প্রতিবেদনে মূলনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের তিন লক্ষ্য—সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার—নতুন করে যুক্ত করার সুপারিশ করে। আর ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে বহুত্ববাদ যুক্ত করার প্রস্তাব দেয়। তবে বিএনপি, জামায়াতসহ ২৯টি রাজনৈতিক দল বহুত্ববাদে আপত্তি জানায়।
ফলে জুনে শুরু হওয়া দ্বিতীয় দফার সংলাপে বহুত্ববাদ বাদ যায়। তখন কমিশন প্রস্তাব করে—ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে মূলনীতিতে ‘ধর্মীয় সম্প্রীতি ও স্বাধীনতা’ যুক্ত হবে। এতে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ ২৪টি দল একমত হয়। বামপন্থি ছয়টি দল বাহাত্তরের সংবিধানের চার মূলনীতি অর্থাৎ বর্তমানে থাকা মূলনীতি বহাল রাখার দাবি জানিয়ে নোট অব ডিসেন্ট দেয়।
বিএনপি, জামায়াতসহ ১১টি দল প্রস্তাব করে—মূলনীতিতে ‘আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’ও পুনর্বহাল করতে হবে। তখন আলোচনা হয়—প্রস্তাবকারী কোনো দল বা জোট যদি বিষয়টি ইশতেহারে রাখে এবং নির্বাচনে জয়ী হয়, তাহলে তা আগামী সংসদে বাস্তবায়ন করতে পারে। (সনদের পৃষ্ঠা ৫, প্রস্তাব ৭)
এখন প্রশ্ন হলো—না ভোট দিলে কি সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’ ফিরে আসবে? উত্তর হলো—না। বরং হ্যাঁ ভোট না দিয়ে যদি না ভোট জয়ী হয়, তাহলে ‘আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’ ফিরে আসবে না। কারণ ২০১১ সালে হাসিনা সরকার এটি বাদ দিয়েছিল। তাই না ভোট জয়ী হলে আমরা আবার হাসিনার সংবিধানে ফিরে যাবো, যেখানে ‘আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’ নেই।
সোজা করে বললে—হ্যাঁ ভোট জয়ী হলেই সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’ মূলনীতিতে আবার ফিরে আসার পথ তৈরি হবে। যারা সংসদে যাবে, তারা এটার বাস্তবায়ন করবে।
আর না ভোট জয়ী হলে আগের মতোই থাকবে, আর ওই সংবিধানে শহীদ জিয়ার সংযোজন ‘আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’ থাকবে না।
আমার মাথায় ধরে না—বিএনপির গণ্ডুরা, মূর্খরা কি না জেনেই আলবাল বকে সোশ্যাল মিডিয়ায়?
আর প্রশ্ন হলো—তাহলে আব্বাসী অ্যান্ড কোংরা কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে?
-লিখাটি Rajib Ahamod ভাই থেকে অনুপ্রাণিত .