23/05/2026
হিমু এবং তার অলৌকিক স্যান্ডেল
মেসবাড়ির ভাঙা জানালার পাশে বসে আকাশ দেখার একটা অন্যরকম আনন্দ আছে। এই আনন্দের কথা কোনো বইপুস্তকে লেখা থাকে না, কারণ যারা বড় বড় বই লেখেন তারা সাধারণত সচ্ছল মানুষ হন, তাদের ঘরের জানালায় দামি থাই অ্যালুমিনিয়ামের গ্লাস থাকে। সেই কাচ ভেদ করে আকাশটাকে কৃত্রিম দেখায়। মেসের জানালাগুলো অন্যরকম। এগুলো সাধারণত ভাঙা হয়, কদাচিৎ সেখানে গ্রিল থাকে না, আর যদি লোহার শিক থাকেও—তাতে এত পরিমাণ ঝুল, ধুলোবালি এবং মাকড়সার জাল জমে থাকে যে, বাইরের আকাশটাকে মনে হয় একটা বিশাল এবং অতি প্রাচীন ছেঁড়া মশারি। সেই মশারির ফুটো দিয়ে যখন চাঁদের আলো এসে ঘরের মেঝেতে পড়ে, তখন মনে হয় পৃথিবীটা আসলে কোনো বাস্তব জায়গা নয়, একটা মস্ত বড় থিয়েটার হল। আমরা সবাই সেখানে বিনা টিকিটের দর্শক।
আজ আকাশে মস্ত বড় একটা চাঁদ উঠেছে। একে ঠিক ঝকঝকে জোছনা বলা যাবে না। চৈত্র মাসের আকাশ, বাতাসে প্রচুর ধুলো উড়ছে, আর কিছু ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ চাঁদের গায়ে লেপ্টে আছে। ফলে আলোটা কেমন যেন ঘোলাটে, ঈষৎ হলুদ। ঠিক যেন একটা বাসি সেদ্ধ ডিমের কুসুম। এই ঘোলাটে আলোতেই একটা অলৌকিক কাণ্ড ঘটে গেল। আমার ঘরের দরজার ঠিক সামনে, যেখানে সাধারণত মেসের ছোকরা চাকরটা সকালবেলা নোংরা পানির বালতি রেখে যায়, সেখানে এক জোড়া স্যান্ডেল এসে পড়ে রইল।
আমি ঘরের মেঝেতে পাটি বিছিয়ে শুয়েছিলাম। স্যান্ডেল জোড়ার দিকে তাকিয়ে আমার চোখ আটকে গেল। স্যান্ডেল জোড়া সাধারণ নয়। প্লাস্টিকের স্যান্ডেল, রঙটা এককালে হয়তো আকাশী নীল ছিল, এখন রোদে পুড়ে, পিচঢালা রাস্তার উত্তাপ সহ্য করে এবং ঢাকার বিখ্যাত ধুলোবালি মেখে এমন একটা বিচিত্র রঙ ধারণ করেছে যাকে ইংরেজিতে হয়তো বলা যেত 'ইনডিগো ব্লু', কিন্তু বাংলায় বললে তার জুতসই নাম হবে 'উদাসীন নীল'। স্যান্ডেলটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এর কোনো ফিতে নেই। সাধারণত স্যান্ডেলের দুই পাশে দুটি এবং সামনে একটি ফুটো থাকে যেখানে প্লাস্টিকের ফিতে গোঁজা থাকে। এই স্যান্ডেলের গা মসৃণ, কোনো ফুটো নেই, অথচ দেখলেই বোঝা যায় এটি কোনো কারখানায় তৈরি জুতো নয়, সাধারণ চটি স্যান্ডেল। ফিতে ছাড়া স্যান্ডেল মানুষ কীভাবে পায়ে দেয়, তা এক বিরাট এবং জটিল রহস্য।
আমি উঠে বসলাম। খাটিয়া থেকে নেমে স্যান্ডেল জোড়া হাতে তুলে নিলাম। প্লাস্টিকটা বেশ ঠান্ডা, যেন ফ্রিজ থেকে এইমাত্র বের করা হয়েছে। অথচ চৈত্র মাসের এই গুমোট গরমে মেসের ছাদটা ফুটন্ত কড়াইয়ের মতো তেতে আছে। স্যান্ডেল জোড়া হাতে নিতেই এক ধরনের অদ্ভুত গন্ধ বের হতে লাগল। গন্ধটা চেনা চেনা, আবার অচেনাও। ঠিক যেন বহু বছর আগে কোনো এক বৃষ্টির দিনে ভেজা মাটির ওপর শিউলি ফুল ঝরে পড়লে যে গন্ধ হয়, সেই রকম।
আমি যখন স্যান্ডেলের রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করছি, ঠিক তখনই নিচ থেকে মেসের ম্যানেজার বশরি মিয়া চিৎকার শুরু করলেন। বশরি মিয়ার গলার আওয়াজ অত্যন্ত কর্কশ, তার ওপর তিনি নোয়াখালীর টানে কথা বলেন। যখন তিনি উত্তেজিত হন, তখন তার কথা বোঝা সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
"হিমু ভাই! ও হিমু ভাই! আপনার এক খালা আইছে। লগে বিশাল এক গাড়ি। গাড়ি থেইকা এমন সুগন্ধি বাইর হইতাছে যে মেসের পোলাপাইন সব পড়ালেখা ছাইড়া বারান্দায় আইসা খাড়াইছে। নিচে নামেন জলদি!"
আমি স্যান্ডেল জোড়া ডান বগলে চেপে ধরে ধীরপায়ে নিচে নেমে এলাম। বশরি মিয়ার সুগন্ধির জ্ঞান অবশ্য খুব প্রখর নয়। তিনি গায়ে সস্তা 'নিলুফার' আতর মাখেন এবং ভাবেন পৃথিবীর সব দামি সেন্টেরই গন্ধ একরকম। মেসের সদর দরজার সামনে একটা কুচকুচে কালো রঙের নিশাত গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির ইঞ্জিন চালু, মৃদু একটা গরগর শব্দ হচ্ছে। মাজেদা খালা গাড়ি থেকে নামেননি। পেছনের সিটের জানালার কাচ অর্ধেক নামিয়ে তীব্র চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। খালার চোখের দৃষ্টিতে এক ধরনের জাদুকরী ক্ষমতা আছে, তিনি যখন রাগ করে তাকান, তখন মনে হয় চোখের মণি দুটো ছোট ছোট কামানের গোলা, এখনই 'দুড়ুম' করে আওয়াজ করে ছুটে আসবে।
খালার পাশে বসে আছেন খালুজান। খালুজানের মুখ চৈত্র মাসের দুপুরের মতো থমথমে। তিনি তার কোলের ওপর একটা খবরের কাগজ বিছিয়ে রেখেছেন, কিন্তু তার চশমাটা নাকের ডগায় নেমে এসেছে। মনে হচ্ছে তাকে জোর করে ধরে এনে ফাঁসির কাঠে বসানো হয়েছে, আর জল্লাদ একটু পরেই দড়ি টানবে।
আমাকে দেখা মাত্রই মাজেদা খালা গম্ভীর গলায় বললেন, "হিমু, তুই নাকি আবার মানুষের হাত দেখে ভবিষ্যৎ বলা শুরু করেছিস? বশরি মিয়া বলল তুই নাকি গতকাল কার একটা হাত দেখে বলেছিস তার তিন দিনের মধ্যে লটারি লাগবে?"
আমি বিনীতভাবে হাসলাম। বললাম, "জি না খালা। বশর মিয়া বানিয়ে বলেছে। হাত দেখার বিদ্যা আমার জানা নেই। হাত দেখে ভাগ্য বলাটা হলো ফাঁকিবাজি। আমি আসলে মানুষের পা দেখি।" বাকি অংশ পড়তে আমার ব্লগ এ যেতে পারেন
https://e-truefinder.blogspot.com/2026/05/blog-post_23.html