31/03/2012
দেশজুড়ে ডেসটিনি আতঙ্ক
প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কায় সারাদেশে ডেসটিনির লাখ লাখ গ্রাহকের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রাহকদের অনেকেই তাদের জমানো টাকা ফেরত নেয়ার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে ছোটাছুটি শুরু করেছেন। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদের টাকা ফেরত না দিয়ে তাদের নানাভাবে বুঝিয়ে আস্থা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু অধিকাংশ গ্রাহকই জীবনের সঞ্চিত অর্থ এখন আর ডেসটিনির কাছে গচ্ছিত রেখে ঝুঁকি নিতে না চাওয়ায় এ নিয়ে সারাদেশে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে ডেসটিনি কর্তৃপক্ষের দাবি, গ্রাহকের কারো টাকাই মার যাবে না। তাদের আমানতের নির্ধারিত অংশ নিয়মমাফিক গচ্ছিত রয়েছে এবং বাকি টাকা নিরাপদ ব্যবসা ও সম্পত্তি ক্রয়ে বিনিয়োগ করা হয়েছে। নির্ধারিত মেয়াদান্তে সবাই মুনাফা দেয়া হচ্ছে। আগামীতেও এর কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না। অন্যদিকে গ্রাহকদের ভাষ্য, ডেসটিনি প্রতারণার ফাঁদ না পাতলে কেন তারা শেয়ার বিক্রি ও সদস্য সংগ্রহসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম করেছে? কেন বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি ডেসটিনিকে হায় হায় কোম্পানি হিসেবে অভিহিত করেছে? প্রসঙ্গত, মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কোম্পানি ডেসটিনি গ্রাহকদের জমানো হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে উধাও হয়ে যেতে পারে বলে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত টিম আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে তারা এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, পল্লীউন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং সমবায় অধিদপ্তরকে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ করেছে। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে ডেসটিনি সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও বলেছেন, দেশে এমএলএম ব্যবসা বেড়ে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানই এখন এ ব্যবসা করছে, যা ভালো লক্ষণ না। এসব ব্যবসা আইনের আওতায় আনতে হবে। নয়তো বন্ধ করে দিতে হবে। আর ব্যবসা যদি করতেই হয় তাহলে ব্যাংক কোম্পানি আইনে করতে হবে। তবে ব্যাংক কোম্পানি আইনে এমএলএম ব্যবসা অনুমোদন করে না। এদিকে ডেসটিনির মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) ব্যবসা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতিবাচক তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশের পর এ প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য ব্যবসার বিনিয়োগকারীরাও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। গ্রাহকরা অনেকেই পত্রপত্রিকা অফিসে ফোন করে তাদের মূলধন কতটা ঝুঁকিতে আছে তা জানতে চাইছেন। পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী ও রংপুর থেকে একাধিক ব্যক্তি ফোন করে জানিয়েছেন, ট্রি প্লান্টেশনের কথা বলে গ্রাহকদের কাছ থেকে এ পর্যন্ত হাজার কোটি টাকা নেয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এই বলে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে_ 'আমাদের বৃক্ষ রোপণ করা হয়ে গেছে। ১০ বছর পর সবাই লাভসহ টাকা ফেরত পাবেন। অথচ অনেক জায়গায় জমি কেনা হয়নি, কোথাও ভুয়া জমি কিনে গ্রাহকদের সান্ত্বনা দেয়া হচ্ছে। ডেসটিনির জমি কেনা থেকে শুরু করে বনায়ন না হওয়াসহ নানা অব্যবস্থাপনা থাকলেও গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সোনালী ব্যাংক ওয়েজ আর্নাস শাখার কর্মকর্তা নূরুন নাহার জানান, ডেসটিনির এজেন্টদের প্রলোভনে পড়ে বছর দেড়েক আগে তিনি দুই লাখ টাকায় প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ক্রয় করেন। এক বছরে তাকে ৩০ হাজার টাকা মুনাফা দেয়া হয়। কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত টিম তাদের মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) ব্যবসার বিভিন্ন অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার যে প্রতিবেদন দাখিল করেছে তা জেনে তিনি এ প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। নূরুন নাহার বলেন, তিনি তার বিনিয়োগকৃত মূলধন ফেরত নেয়ার জন্য দু'দিন ধরে ডেসটিনির বিভিন্ন পর্যায়ে ধরনা দিচ্ছেন। কিন্তু এর কোনো সুরাহা করতে পারেননি। প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তার শেয়ারে বিনিয়োগকৃত অর্থ এখনই ফেরত পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে তিনি শেয়ার বিক্রির সিদ্ধান্ত নিলে এ ব্যাপারে লিখিত আবেদন করতে পারেন। আগামীতে কেউ শেয়ার কিনতে চাইলে তার কাছে ওই শেয়ার হস্তান্তর করে টাকা ফেরত দেয়া হবে। তবে এ প্রক্রিয়া কতদিনের মধ্যে শেষ করা যাবে এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্টভাবে তারা কিছু জানাতে পারেননি। মতিঝিলের মুক্তা অ্যাডভার্টাইজিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম মামুন জানান, এমএলএম ব্যবসায় তার বড় ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে। তার মাধ্যমে তার আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজনদের অনেকে এ ব্যবসায় জড়িত হয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত দলের প্রতিবেদন পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর ওইসব গ্রাহকরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে তার কাছে ছুটে এসেছেন। তারা সবাই তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত চাইছেন। কিন্তু ডেসটিনি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত পওয়া যাচ্ছে না। মামুন জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর তার মতো হাজার হাজার গ্রাহক ডেসটিনির সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে ভিড় জমিয়েছেন। তাদের অনেকেই লভ্যাংশ বাদ দিয়ে শুধুমাত্র বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত চাইছেন। কেউ কেউ বিনিয়োগকৃত অর্থেরও একাংশ ছেড়ে দিয়ে হলেও ব্যবসা গুটিয়ে নিতে চাচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ডেসটিনির সদস্য সংগ্রহপ্রক্রিয়া আইন করে বন্ধ করে দেয়ার সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি কর্তৃক এমএলএম (মাল্টি লেভেল মার্কেটিং) পদ্ধতিতে সদস্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া আইন করে বন্ধ করে দেয়া জরুরি। শুধু তাই নয়, ডেসিটিনি শেয়ার ক্রয়ের ফলে সদস্যদের অসীম দায়দায়িত্ব সম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত করার জন্য সমবায় অধিদপ্তর কর্তৃক প্রচারণা চালানো আবশ্যক। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি কর্তৃক ডেসটিনি গ্রুপভুক্ত অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পে তহবিল স্থানান্তরের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ডেসটিনি মাল্টিপারপাসে দীর্ঘ মেয়াদে ও বিশাল অঙ্কের টাকা না রাখারও পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা পরিদর্শন ও ভিজিলেন্স বিভাগের উপ-পরিচালক মো. জহির হোসেন ও রণজিৎ কুমার রায় ৬ ফেব্রুয়ারি ডেসিটিনি গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড কাকরাইলের অফিসে তদন্তকাজ পরিচালনা করেন। তারা তিনটি অভিযোগ সামনে রেখে তদন্ত করেন। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে_ বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রচলিত নীতিমালা অমান্য করে ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি প্রকাশ্যে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটি চড়া সুদে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে প্রতি মাসে কমপক্ষে ২০-২৫ কোটি টাকা মুনাফা করছে। দ্বিতীয়ত সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা ৩৮ লাখ এজেন্টের মাধ্যমে মোটা অংকের কমিশন দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি তার ব্যবসার পরিধি বাড়াচ্ছে। তৃতীয় অভিযোগ_ প্রতিষ্ঠানটি শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত এই তিন অভিযোগের তদন্তকাজ পরিচালনা করে বেশকিছু সত্যতা পাওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে ডেসটিনির বিষয়ে ১৪ সতর্কবার্তা দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেসটিনি মাল্টিপারপাসের অনুমোদিত ও পরিশোধিত মূলধনের সবর্ে্বাচ্চ যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ করা বাঞ্ছনীয়। ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির বিনিয়োগের খাত সুনির্দিষ্ট করা আবশ্যক যাতে জনসাধারণের কাছ থেকে সংগৃহীত আমানতের মাধ্যমে উন্মুক্তভাবে যেকোনো ধরনের ব্যবসায়ী উদ্যোগ গ্রহণ করতে না পারে। 'সমাজের কোনো শ্রেণীভুক্ত জনসাধারণ ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির টার্গেট গ্রুপ হবে তা সমবায় অধিদপ্তরের মাধ্যমে সুস্পষ্টকরণ হওয়া আবশ্যক যাতে তাদের প্রতিষ্ঠান সমাজের সব শ্রেণী ও পেশার লোককে উচ্চ মুনাফা ও কমিশনের প্রলোভন দেখিয়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে আমানত সংগ্রহ করতে না পারে। এই সোসাইটির আমানত সংগ্রহের পদ্ধতি ব্যাংকের মতো হওয়ায় সমবায় অধিদপ্তর কর্তৃক তাদের মতামত সংগ্রহের ধরন ও সর্বোচ্চ সীমাও সুনির্দিষ্ট হওয়া আবশ্যক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে ডেসটিনির অতিরিক্ত অর্থের ব্যাপারেও মতামত দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির উদ্বৃত্ত অর্থ (যা সদস্যদের মধ্যে ঋণ আকারে বিতরণ করা হচ্ছে না) সমবায় আইন, ২০০১-এর ধারা ৩৩ (ক) ও ধারা ৩৪ (৩) (ক)-এর বিধান অনুযায়ী সরকার কর্তৃক ইস্যুকৃত সঞ্চয়পত্র ও অনুরূপ সিকিউরিটিতে বিনিয়োগের জন্য নির্দেশনা প্রদান করা যেতে পারে। ডেসটিনি সম্পর্কে সতর্ক থাকার জন্য জনগণের মধ্যে প্রচারণা চালানোর জন্যও সুপারিশ করা হয় তদন্ত প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে, উচ্চ সুদের আশায় সাধারণ জনগণ ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটিকে তফসিলি ব্যাংক বা বাংলাদেশ ব্যাংকের সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের মতো নিরাপদ ভেবে যাতে বৃহৎ ও দীর্ঘমেয়াদি আমানত তাদের কাছে গচ্ছিত না রাখে সে জন্য প্রিন্ট ও ইলেক্ট্র্রনিক মিডিয়াসহ সব জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ব্যাপক প্রচার প্রচারণার উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক। সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের কমিশনের বিনিময়ে ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির 'ডিস্ট্রিবিউটর'(অ্যাজেন্ট) হিসেবে দেখিয়ে সাধারণ জনগণকে আমানত হিসেব খোলার জন্য যাতে প্রলুব্ধ করতে না পারে সে বিষয়ে সমবায় অধিদপ্তর চিন্তাভাবনা করতে পারে বলে মন্তব্য করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে, ডেসটিনিতে রক্ষিত আমানতের পরিসর বৃদ্ধি পাওয়ায় এ ক্ষেত্রে আমানতের সুদের ওপর কর আরোপের বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক কার্যবিবরণী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট (সিএ) ফার্ম কর্তৃক নিরীক্ষার বাধ্যবাধকতা থাকা জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন বলে মত প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে ডেসটিনির যাবতীয় কর্মকা- খতিয়ে দেখার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ে কমিটি গঠনেরও সুপারিশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, 'ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড সমবায় আইন, ২০০১-এর অজুহাতে যেন ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ব্যত্যয় (লঙ্ঘন) ঘটিয়ে অবৈধ ব্যাংকিং অর্থাৎ আমানত গ্রহণ ও শেয়ার মূলধন বৃদ্ধি করতে না পারে সে জন্য অচিরেই অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সমবায় অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ে কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এই কমিটি ডেসটিনির মাল্টিপারপাসের কার্যক্রম খতিয়ে দেখে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। ডেসটিনির বর্তমান প্রতারণামূলক ও অভিনব এমএলএম কার্যক্রম, উচ্চ হারে ও অযৌক্তিকভাবে মূলধন বৃদ্ধি এবং সংগৃহীত আমানত ও মূলধন সুকৌশলে অন্যান্য কোম্পানিতে সরিয়ে নেয়া ইত্যাদি অনিয়মের বিষয় আইনি কাঠামোর মধ্যে এনে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা জরুরি বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে মত প্রকাশ করা হয়েছে। তদন্ত টিমের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ডেসটিনির মোট সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ২৩ কোটি ৯৯ লাখ ২৫ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এ সম্পদ ২০১০ সালের ৩০ জুন বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৫৭০ কোটি ৬১ লাখ ১৬ হাজার ৬৫২ টাকা এবং ২০১১ সালের ৩১ ডিসেম্বর এটি আরো বেড়ে হয় ৩ হাজার ১৮২ কোটি ৭১ লাখ ২২ হাজার ৮৩৬ টাকা। তিন বছরের ব্যবধানে মোট সম্পদ বেড়েছে ৩ হাজার ১৫৮ কোটি ৭১ লাখ ৯৭ হাজার ৮৯৩ টাকা। শতকরা হিসেবে সম্পদ বৃদ্ধির হার হচ্ছে ১৩ হাজার ১৬৫ দশমিক ৪৪ ভাগ। একইভাবে আমানতের স্থিতি ৫ কোটি ৫২ লাখ ১৮ হাজার টাকা থেকে তিন বছরে বেড়ে হয়েছে ৬৫১ কোটি ৯৪ লাখ ৬৩ হাজার ৬৪৯ টাকা। তিন বছরে আমানত বেড়েছে ৬৩৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। শতকরা হিসাবে বৃদ্ধির হার সাড়ে তিন হাজার ভাগ। শুধু তাই নয়, কোম্পানিটির শেয়ার মূলধনও তিন বছরের ব্যবধানে পাঁচ কোটি ৫২ লাখ ১৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে এক হাজার ৩৫৫ কোটি ৬৬ লাখ ২৬ হাজার টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে এ বৃদ্ধির হারকে 'অস্বাভাবিক' হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রচারিত লিফলেট অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি চলতি আমানত, সঞ্চয়ী আমানত, স্থায়ী আমানত, সাড়ে পাঁচ বছরে দ্বিগুণ আমানত প্রকল্প, মাসিক মুনাফাভিত্তিক আমানত প্রকল্প, শেয়ার মূলধন (যা সঞ্চয় আমানতেরই নামান্তর মাত্র) ইত্যাদি প্রকল্পের মাধ্যমে সাধারণ জনগণের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করে থাকে। প্রতিষ্ঠানটির বেশিরভাগ আমানত প্রকল্প তফসিলি ব্যাংকগুলোর আমানত প্রকল্পের প্রায় অনুরূপ। ২০১১ সালের ৩০ জুন সময় পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির মোট আমানতে স্থিতি ছিল ৫২২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৪৯২ কোটি ৯৩ লাখ টাকাই ছিল দীর্ঘমেয়াদি আমানত। যার সুদের হার ১৬ শতাংশ। আমানত প্রকল্পগুলো উচ্চ সুদযুক্ত, করমুক্ত ও কমিশনযুক্ত হওয়ায় বহুসংখ্যক প্রশিক্ষিত মাঠকর্মী বা কমিশন এজেন্টের সুদক্ষ বিপণন ব্যবস্থায় তা শহরের আনাচে-কানাচে এবং প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হচ্ছে। ডেসটিনি উচ্চ সুদ ও মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে কমিশন এজেন্ট ব্যবহারের মাধ্যমে জনসাধারণের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করছে। প্রতিষ্ঠানটির সংগৃহীত প্রায় এক হাজার ৪০০ কোটি টাকার শেয়ার মূলধনও প্রকৃতপক্ষে আমানতেরই নামান্তর। ২০০৯-১০ অর্থবছরে ডেসটিনির সঞ্চয়ী ও স্থায়ী আমানতের ওপর সুদের হার ছিল যথাক্রমে ৯ ও ১৬ শতাংশ। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করের আওতায় না থাকার কারণে এ সুদের হার অস্বাভাবিক বলে প্রতীয়মান হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ২০১০ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বিবরণী অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের তাৎক্ষণিকভাবে ফেরতযোগ্য আমানতের পরিমাণ ছিল ২২২ কোটি ১৮ লাখ ৫৫ হাজার ২৮৮ টাকা। কিন্তু এর বিপরীতে যে পরিমাণ তারল্য সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল, দেখা গেছে সেই পরিমাণ তারল্য প্রতিষ্ঠানটির নেই। সমবায় সমিতি বিধিমালা অনুযায়ী ডেসটিনিরি তারল্য ঘাটতি ছিল ৪৭ কোটি ৭৩ লাখ ১১ হাজার টাকা। তাই সমবায় সমিতির অধিদপ্তরের অডিট পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী তারল্য সঙ্কটের কারণে যেকোনো সময় আমানতের টাকা ফেরত প্রদানের ক্ষেত্রে বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে এবং আমানতকারীদের মধ্যে আস্থাহীনতারও সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।