26/08/2022
উদ্যোক্তা
সোশ্যাল মিডিয়ায় উদ্যোক্তা বিষয়ক একটা লেখা পড়লাম। দিল্লিতে একজন সমুচা বিক্রেতা ছিলেন। তার দোকানের সামনে একটি বড় কোম্পানির অফিস ছিল। একদিন এক ম্যানেজার ওই দোকানে সমুচা খেতে আসলেন। সমুচা খেতে খেতে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি খুব সুন্দর করে দোকানটা সাজিয়েছো, সিস্টেমগুলো ভালো, সুন্দর এডমিনিস্ট্রেশন, সুন্দর প্ল্যানিং তোমার। তুমি আমাদের মতো চাকরি করলেও তো পারো। সমুচা বিক্রি করে সময় নষ্ট করছো কেন?’ সমুচাওয়ালা হাসিমাখা মুখে বলল, ‘স্যার আমার কাজটা আপনার থেকে ভালোই মনে হয়। আজ থেকে ১০ বছর আগে আমি সমুচা বিক্রি করতাম টুকরিতে। তখন আমার আয় ছিল মাসে ১ হাজার রুপি। হয়তো তখন আপনার বেতন ছিল ১০ হাজার রুপি। আজ ১০ বছর পর আমার আয় ১ লাখ আবার কোনও কোনও মাসে ১ লাখেরও বেশি, আর আপনার এখন বেতন হয়তো এখন ১ লাখ। তাহলে আপনার থেকে আমার কাজটা বেশি ভালো না? আমার পরে এই ব্যবসা আমার ছেলে দেখবে। সে সাজানো একটা ব্যবসা পাবে, কিন্তু আপনার ছেলেমেয়ে কি আপনার মতো পজিশন পাবে? আমি শূন্য থেকে শুরু করেছি কিন্তু আমার ছেলেমেয়েরা শূন্য থেকে শুরু করবে না। চাকরিজীবীগণের ছেলেমেয়েদের শূন্য থেকেই শুরু করতে হবে। আপনি চাইলেও আপনার পজিশনে আপনার ছেলেমেয়েকে বসাতে পারবেন না। আপনি ১০ বছর আগে যে কষ্টটা করেছেন, আপনার ছেলেমেয়েদেরও একই কষ্ট করতে হবে। আমার ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ গুছিয়ে দেওয়া আমার দায়িত্ব, আর তাই আমি এই ব্যবসা করেছি, যা আপনি পারেন নাই।
আমাদের দেশে অনেকের মধ্যে একটি বিষয় নিয়ে নেতিবাচক দিক কাজ করে। নিজে নিজে কিছু করলে হয়তো অন্যের কাছে ছোট হয়ে যেতে হয়, মূল্যায়ন পাওয়া যায় না কিংবা তথাকথিত সামাজিক স্ট্যাটাস পাওয়া যায় না। বর্তমান সময়ে এই ধরনের ভাবনা ভাবার মানুষও নেহায়েত কম না। অনেকেই মনে করেন, এতদূর লেখাপড়া করে ব্যবসা করবো? মানুষ কী মনে করবে এই চিন্তায় উদ্যোক্তা হওয়ার চিন্তাও দূরে সরিয়ে রাখে।
উদ্যোক্তাদের কিংবা ব্যবসা করার কয়েকটি ইতবাচক দিক আমাদের জানা প্রয়োজন, যদিও বিষয়টি আমাদের সকলের জানা।
এক. আপনি স্বাধীনভাবে আপনার ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন। এখানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আপনাকে অন্যের মুখাপেক্ষী হতে হবে না।
দুই. চাকরি করার ক্ষেত্রে আপনি যতই পরিশ্রম করুন কিংবা আপনার পরিশ্রমের ফলে প্রতিষ্ঠান যতই লাভবান হোক না কেন, আপনি নির্দিষ্ট অংকের বেতনের বাইরে কোনও সুযোগ-সুবিধা পাবেন না। অথচ উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যত লাভ হবে, সেই সুযোগ সুবিধা দিনশেষে উদ্যোক্তাদের পকেটেই চলে যাবে। এখানে সবসময় উদ্যোক্তাদের পরিশ্রম না করলেও চলে।
তিন. একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে পারলে, সেটা শুধু উদ্যোক্তার নিজের জন্য নয়, পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও নিশ্চিত আয়ের ব্যবস্থা করবে। আর ব্যবসা যতই পুরাতন হয় এবং উদ্যোক্তা হিসেবে সেটি বর্ধিত করার সুযোগ ততই বেড়ে যায়।
চার. সকল ধরনের চাকরি (খুব ছোট মানের) কিন্তু আপনাকে আর্থিক সচ্ছলতা দেবে না। কিন্তু একজন উদ্যোক্তা যদি নিজের বুদ্ধিমত্তা খাটিয়ে ব্যবসা চালাতে পারেন, তবে ব্যবসা তাকে আর্থিক সচ্ছলতা প্রদান করবে। যে কোনও ভুলের কারণে, সকালে অফিসে গিয়ে জানা গেলো চাকরি নেই, এমনা ঘটনা উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে ঘটার সুযোগ নেই।
পাঁচ. উদ্যোক্তারা নিজেদের বহুবিধ দক্ষতার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে পারেন। এখানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পড়ে থাকা সুযোগ সুবিধার যেমন সর্বোচ্চ ব্যবহার যেমন সম্ভব, তেমনি কর্মসংস্থানেরও বিশাল সুযোগ সৃষ্টি সম্ভব। অফিসিয়াল বাধ্যবাধকতা উদ্যোক্তাদের পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মেনে চলতে হয় না। বসদের নিকট জবাবদিহি থাকে না। কিংবা সকাল বেলা অফিসে এসে চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার খবরও শুনতে হয় না। একথা সত্য, উদ্যোক্তাদের ঝুঁকির সম্মুখীন হতে হয়। লাভের পরিমাণ যেমন অপরিসীম, ঝুঁকির পরিমাণও তেমন বেশি থাকে। তবে হ্যাঁ, সঠিক সময়ে যারা কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তারা ব্যবসায়ে সাধারণত ক্ষতির সম্মুখীন হন না।
উদ্যোক্তা হতে হলে সবাইকে মিল কলকারখানা স্থাপন করতে হবে, বিষয়টা কিন্তু এমন নয়। এতটা কঠিন করে ভাবার আদৌ কোনও সুযোগ নেই। আপনি কিছু না পারেন একটা মুদি দোকান দেন, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর দেন, চালের দোকান করেন, খাবারের ব্যবসা করেন। তথ্য প্রযুক্তিখাতেও এখন অনেক সুযোগ তৈরি হয়েছে। সেসব বিষয়েও ভাবতে পারেন।
হাজার ধরনের অপশন আমাদের সামনে পড়ে আছে। প্রয়োজন শুধু যে কাজটা আপনি ভালোভাবে করতে পারবেন, সেটা ঠিকমত খুঁজে বের করে কাজটা শুরু করা। হাতের কাজ জানলে আরো ভালো হয়। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ সুবিধা পাওয়া এখন অনেক সহজ। ১৬ কোটির অধিক মানুষের বাস আমাদের এই দেশে। ভালো কোনও পণ্য কিংবা সেবা বাজারে আনতে পারলে ভোক্তার অভাব নেই। প্রয়োজন শুধু উদ্যোগ।