26/08/2022
গা শিওরে ওঠার মত ঘটনা।
সতর্কতামূলক_পোস্ট
ঢাকা- চট্টগ্রাম হাইওয়েতে যারা চলাচল করেন বা করবেন সতর্ক থাকবেন।
গত ২১.০৮.২০২২ তারিখে আমি ফেনী থেকে ঢাকার উদ্দ্যেশে আমার ব্যাক্তিগত বাইক নিয়ে বিকালের দিকে রওনা দেই ।
আনুমানিক সন্ধ্যা ৭.২০ এর পর আমি কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এবং চান্দিনা পার হওয়ার পর আমি আমার বাইকের লুকিং গ্লাসে খেয়াল করি আমার পিছনে ৩ টা বাইক আছে। বেশ কিছুক্ষন খেয়াল করলাম এরা আমাকে ওভারটেক করছে না। সন্দেহ হওয়াতে আমি আমার বাইকের স্পীড স্লো করেও দেখলাম এরা ওভারটেক করছে না।
আমার সন্দেহের মাত্রা আরো বেড়ে যাওয়ায় আমি আশেপাশে কোনো বাজার বা জনসমাবেশ আছে এরকম দোকান এর আশায়, দেখতে দেখতে বাইক চালাতে লাগলাম।
কিছু না পেয়ে আমি একটা বাস এর পিছনে পিছনে থেকে এমন ভাবে বাইক চালাচ্ছিলাম যাতে আমি নিরাপদ আশ্রয় পাওয়ার আগে এরা আমাকে ওভারটেক করতে না পারে।
কিছুদুর এভাবে যাওয়ার পর বাসটি জোরে টান দেয় আমি আবার একা হয়ে যাই, আর আমার বাইকের সিসি কম থাকায় আসলে খুব বেশি স্পীড ও তুলতে পারছিলাম না যে বাসটার পিছনে পিছনে থাকবো।
বাসটা যাওয়ার ১ মিনিট পর খেয়াল করলাম ৩ টা বাইক থেকে ১ বাইক আমাকে ওভার টেক করে সামনে আমার চোখের দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যায়।
আমার ধারনা এই ১ম বাইক টাও একই দলের সদস্য, সে সামনে গিয়ে কোথাও ব্যাক আপ হয়ে ছিলো, যাতে এরা আমাকে আটকানোর সময় আমি যদি বাউলি দিয়ে সামনে টান দেই, এই ১ম বাইকটা আমাকে আটকাতে পারে
এই প্রথম ৩ টা বাইকের একটা দেখতে পেলাম, যেটা ছিলো R15, আরোহী ছিলো ১ জন।
যাইহোক পিছনের বাকি ২ বাইক সেই আগের মত আমার পিছনেই থাকলো।
প্রথম বাইক টা আমাকে ওভারটেক করার ঠিক ৫ মিনিট পরে পিছন থেকে আরেকটা বাইক আমাকে ওভারটেক করে আমার সামনে গেলো, এটাও R15 ছিলো। আরোহী ছিলো ২ জন।
আমার মধ্যে তখন ভয় ঢুকে গেলো এবং বুঝতে পারলাম এরা ডাকাত/ ছিনতাইকারী দলের সদস্য। কিন্তু সন্দেহ হলেও, আমি আসলে নিরুপায় ছিলাম। কারন এরা এমন জায়গা থেকে আমাকে ফলো করা শুরু করেছে এর পরে তেমন একটা লোকালয়, মানুষজন নাই।
যাইহোক এর কিছুক্ষন পরে আমাকে পিছনের বাইক টা চাপ দিয়ে দিয়ে বামে নিয়ে যাচ্ছে, আর সামনের বাইকটা আস্তে আস্তে স্লো করে আমাকেও স্লো করাচ্ছে।
কিছুক্ষন পরে সামনের বাইক টা থেকে আমাকে বলছে এই দাড়া এটা বলে তারা তাদের বাইক টাকে রাস্তায় ক্রস করে দাঁড়িয়ে পড়লো। লুকিং গ্লাসে দেখলাম পিছনের বাইক ও দাঁড়িয়ে গেলো রাস্তায় ক্রস করে।
সামনের বাইকের পিছনে বসা পিলিয়ন দেখলাম ছুরি বের করে পিছনের বাইকের ছেলেটাকে বলছে এই বাইক এটা ধর।
ঠিক ওই মুহুর্তে এদের এগ্রেসিভ লুক, আচার-আচরন, বেশভূষা দেখে মনে হচ্ছিলো এরা আমার বাইক+ যা আছে সব নিয়ে যাবে তো অবশ্যই। আমি স্বেচ্ছায় সব দিয়ে দেয়ার পরেও এরা আমাকে ইনজুরড় করবে। ( যৌক্তিক অযৌক্তিক যাই হোক, আমার স্ট্রং ফিলিংস ছিলো সাথে থাকা জিনিস দিয়ে দেয়ার পরও এরা আমাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করবে)
এই চিন্তার পর আমি প্রথমে লুকিং গ্লাসে দেখলাম আমার পিছনে কোনো বড় গাড়ি বা কিছু আছে কিনা। দেখলাম যে ডাকাত দলের বাইক টা ছাড়া আর কিছু নাই, এরপর জানিনা কিভাবে আমার বাইক দাঁড় না করিয়ে ইন্সট্যান্ট পিছনের ব্রেক চেপে রানিং অবস্থায় আমার বাইক ঘুরিয়ে উলটা পথে মানে রঙ সাইডে বাইকের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে টান দেই।
কিভাবে ঘুরিয়েছি আমার আসলে স্পষ্ট মনেও নাই, আমি শিওর আমার সুস্থ মস্তিষ্কে এটা আবার করতে দিলে পারবো না।
উল্টোপথে জোরে টান দেয়ার সময় দেখলাম পিছনের বাইক ও R15 ছিলো, আরোহী একজন।
লুকিং গ্লাসে দেখলাম এরা প্রথমে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গিয়েছিলো, কারন এরা সম্ভবত ধারনা করেছিলো আমি সর্বোচ্চ বাউলি দিয়ে সামনে চলে যাওয়ার চেষ্টা করবো।
আমার ধারনা ছিলো এরা আমাকে আর উল্টা পথে চেজ করবে না, কিন্তু এরা আমাকে বাইক ঘুরিয়ে চেজ করা শুরু করে দিলো।
এই প্রথম আমি সত্যিকারের ভয় পেয়েছিলাম+প্যানিকড হয়ে গিয়েছিলাম।
কারন এদের যে বাইক এরা আমাকে খুব সহজেই ধরে ফেলবে। আর ধরার পর প্রথম কাজ হবে আমাকে ইচ্ছা মতো মারা।
আমার মধ্যে তখন ডেস্পারেশন এসে গেলো। আমি আমার বাইকের সর্বোচ্চ স্পীড ৮০-৮৫ তে উল্টা পথে রিস্ক নিয়ে চালাতে লাগলাম।
কয়েক মিনিট পরেই দেখি এরা আমার ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস নেয়া শুরু করেছে আর আমাকে ওভারটেক করে আটকানোর চেষ্টা করতেসে।
আমি সামনে দেখতে পেলাম বাস ট্রাকের বিশাল একটা লাইন আমার দিকে আসতেছে। আমি কিছুটা রিস্ক নিয়ে এমনভাবে চালাতে লাগলাম যে এরা যদি আমাকে ওভারটেকের চেষ্টা করে বাসের নীচে পড়বে।
এভাবে আমি কিছু সময় পাই এদের পিছনে রাখার।
কিছুক্ষন পর দেখতে পাই একটা লাইট জ্বলছে রাস্তার পাশে, মসজিদ টাইপের কিছু একটা, কিন্তু লোকজন দেখতে পাচ্ছি না ।কিন্তু এরপরে আবার ধুধু অন্ধকার।
আমি তখন সিদ্ধান্ত নিলাম রাস্তা পার হয়ে ঐ মসজিদের দিকে যাবো, যদি ২-১ জন লোক পাওয়া যায় এই আশায়। কারন এটা পার হলে আমি দৃষ্টিসীমার মধ্যে আর কোনো আলো দেখতে পাচ্ছিলাম না। সুতরাং এটাই আমার শেষ আশা।
আমি তখন আমি রিস্ক নিয়ে রানিং অবস্থায় রাস্তা পার হয়ে সেই মসজিদের দিকে চলে গেলাম। এর ১ মিনিটের মধ্যে পিছনের দুই বাইক ও এসে আমাকে ঘিরে ধরলো।
দুই বাইকের একটারো নাম্বার প্লেট নাই, খুব সমজেই বোঝা যাচ্ছে এগুলা কারো থেকে চুরি বা ছিন্তাই করা অথবা বর্ডার ক্রস বাইক।
কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমতে, সেই মসজিদ (পরে জানতে পারি ওটা একটা মাজার ছিলো, নাম হাড়িখোলা মাজার) এর একজন খাদেম দৌড়ে এলো। পাশাপাশি এক লোকাল রিক্সা চালক সহ আরো একজন লোকাল লোক সেখানে ইন্সট্যান্ট জমে গেলো।
পরবর্তীতে মাজারের ঐ খাদেমের কারনে + আস্তে আস্তে লোকসমাবেশ বাড়ার কারনে এরা সুবিধা করতে না পেরে চলে যায় আবার।
আমি এরপর ৯৯৯ এ ফোন দিয়ে ঘটনার বিস্তারিত বলি এবং জানাই আমি ঢাকা বা ফেনী যেকোনো অভিমুখেই যাওয়া নিরাপদ ফিল করছিনা।
পরে ৯৯৯ এর মাধ্যমে ইলিয়টগঞ্জের হাইওয়ে থানা থেকে একটা গাড়ি এসে তাদের এরিয়ার শেষ সীমানা পর্যন্ত পৌছে দেয়।
এরপর আমার এক এ এস পি ফ্রেন্ড ফোন করে দাউদকান্দি থানার টহল গাড়ি দিয়ে দাউদকান্দি টোল প্লাজা পর্যন্ত পৌছে দেয়। তখন প্রায় রাত ১০.৩০।
বাকী পথ আমি ঘোরের মধ্যে এক টানে ঢাকা চলে আসি কোনো ঝামেলা ছাড়াই।
উল্লেখ্য, আমি এই ঢাকা-ফেনী রুটে গত দুই বছরে মিনিমাম ১০/১২ বার বাইক নিয়ে আসা-যাওয়া করেছি। এই রুটে ডাকাতির কথা অনেক শুনেছি, কিন্তু এবারের আগে কখনো মুখোমুখি হই নি।
আমি চাই না এমন বাজে অভিজ্ঞতা আর কারও হোক। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি এবার এক্সট্রিমলি লাকি ছিলাম, বেশ কিছু সিচুয়েশন আমার ফেভারে ছিলো-
যেমন-
- আমি সঠিক সময়ে সিদ্বান্ত নিয়ে বাইক ঘুরিয়ে উলটো পথে গিয়েছি।
- বাসে-ট্রাকের একটা লম্বা লাইন আসার কারনে এরা আমাকে উল্টা পথে ওভারটেক করতে পারে নি।
- হায়াত ছিলো তাই উলটাপথে ৮০+ স্পিডে চালিয়েও ১০০+ স্পিডে আমার দিকে ধেয়ে আসা বাসের নীচে পরি নি।
- উল্টাপথে অল্প দূরত্বের মধ্যেই একটা মাজার পেয়েছি, দুরত্ব যদি বেশি হতো আসলে এরা আমাকে অনেক আগেই আবার আটকে ফেলতো। আবার লোড শেডিং থাকলে কিন্তু এটাও চোখেও পড়তো না।
- মাজারের খাদেম খুব দ্রুত আমার দিকে এগিয়ে না আসলে এরা আমাকে ধরে মেরে ছিনতাইকারী বা অন্য একটা কেস সাজিয়ে ফেলতো।
উপরের সবগুলো বিষয়ের একটাও যদি মিসিং থাকতো, আমার সাথে কি হতো অনুমান করা খুব একটা কষ্টের না। আমাকে আল্লাহ আসলে নিজ হাতে ২য় জীবন দান করেছে।
আপনারা যারা এই রুট ব্যবহার করে রাতে ট্যুরে যেতে চান, প্লিজ দ্বিতীয়বার ভেবে দেখবেন। চেষ্টা করবেন বড় গ্রুপ হয়ে লেন মেইন্টেইন করে একসাথে যেতে। সবচেয়ে ভালো হয় সন্ধ্যা ছয়টার পর এই পথ এভয়েড করে দিনের আলোতে রাইড করলে।
গতকাল থেকে আমার ট্রমাটিক একটা ফিল হয়ে আছে আর মনে হচ্ছে এভাবে কি আসলে বেঁচে থাকা যায়? এটা কি কোনো জীবন, ভয়ের মধ্যে বসবাস করা?
নিজের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা BikeBD গ্রুপে শেয়ার করেছেন Sydul Alam Khan.