27/10/2025
দেশে মেয়েকে নিয়ে ওর প্রয়োজনীয় কিছু শপিং শেষে রাস্তায় দাড়িয়ে উবার কল করার জন্য ফোনটা হাতে নিয়ে কোন পয়েন্টে পিক আপ সেট করবো তা দেখছিলাম।
হুট করে এসে এক ছিনতাইকারী আমার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেলো। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না কি হলো ঘটনাটা। এটুকু মনে আছে একটু জোরে দুই তিনবার বললাম “এই ছেলেটা আমার ফোনটা নিয়ে গেলো” এদিকে মেয়ে তার দুই হাত দিয়ে চোখ মুখ ঢেকে কাদতে কাদতে সেন্সলেস হয়ে যাওয়ার অবস্থা। এই ফোনটা পুরানো হয়েছে। অনেক গুরুত্বপূর্ন ডকুমেন্ট, কন্টাক্ট নাম্বার, ফাইল, নোট, লেনদেন ইত্যাদি অনেক কিছু এটা দিয়েই করা হয়। সেটটা জাপানের ছোটো বোনটা গিফ্ট করেছিল। সব মিলিয়ে আলাদা মায়া।
যাক, লোকটার পিছনে পিছনে কিছু লোক দৌড়ে ধরার চেষ্টা করেছিল কিন্তু ব্যস্ত রাস্তায় চোখের পলকে হাতের নাগালের বাহিরে চলে গেলো। আমার হাত পা কাপছে। অনেক লেনদেন, ব্যাক কাভারে জিপলকে জাপানের দুই দুইটা সিম, গুরুত্বপূর্ন আরও কত কি যে… আল্লাহ!
আমি আমার আল্লাহকে আপন মনে কি কি বললাম এই মুহুর্তে ঠিক মনেও নাই। কিন্তু প্রথমেই একটা পেমেন্টের কথা মনে হয়েছিল যা কি না বাসায় পৌছে ট্রান্সফার করার কথা ছিল। আল্লাহ রব্বুল ইজ্জাতের কাছে বলছি আপনি তো আমার সম্মান রাখার মালিক। আমাকে আপনি ছাড়া কে হিফাযাত করবে?
মন, মাথা সব ভারি অবস্থায় খালি সিএনজি আছে কি না দেখছিলাম। মেয়ের যে হালত ওকে নিয়ে দ্রুত বাসায় যাওয়া জরুরী হয়ে পড়েছিল। এক লোক পাশ থেকে বললেন আপনি থানায় একটা জিডি করে যান। আমি ভাবলাম আমাকে যদি আমার নাম্বার জিজ্ঞেস করে তাও তো বলতে পারবো না কারন দেশের নাম্বার আমি ঠিকভাবে দেখিওনি। জাস্ট ড্যাটা ইউজের জন্য সিম নেয়া হয়। আর দেশের পুলিস কি ফোনটা বের করতে পারবে? অসম্ভব টাইপ কাজ মনে হচ্ছিলো যদিও ফোন ট্র্যাক করা এখন খুবই সহজ। তারপরও উনারা কি আসলেই আমাকে হেল্প করবে? এসব ভাবতে ভাবতে সামনে আগাচ্ছি আর একজন মহিলা পাশ থেকে এসে বললেন সামনে এক ছিনতাইকারী ধরা পড়েছে ফোনসহ। আপনি একটু তাড়াতাড়ি যেয়ে দেখন আপনার ফোন কি না।
আমি আর মেয়ে হাটার গতি বাড়িয়ে দিলাম। বেশ কিছুক্ষন হাটার পর দেখি যে অনেকগুলো লোক মিলে একজনকে রাস্তায় ফেলে পিটাচ্ছে। আর এক অল্প বয়সী ছেলের হাতে আমার ফোনটা। আল্লাহু আকবার! কিভাবে সম্ভব!
আমার হাতে ফোনটা ফিরে পেয়ে মুসাফিরের জঙ্গলে উট হারিয়ে ফেলার সেই ঘটনার কথা মনে পড়লো। সুবহানআল্লাহ! কি যে সেই অনুভূতি!
পরে পুলিস স্ট্যাশানে যেয়ে ডিটেলস ইনফো দিয়ে চোরটাকে কিছু উপদেশ দিয়ে চলে আসার পথে মেয়ে বলছে চোরকে যেন আর না পেটায় বা না শাস্তি দেয় সেই রিকুয়েস্ট করে আসতে। আমি হতভম্ব হয়ে কন্যার দিকে তাকালাম, এই মেয়ে দুনিয়াতে কিভাবে জীবন কাটাবে আমার ধারনা নাই।
যা-ই হোক, পুলিস স্ট্যাশান থেকে পুলিসের টীম গার্ড দিয়ে আমাদেরকে রাস্তা পাড় করিয়ে গাড়িতে উঠিয়ে দেয়া হলো। খুব রেসপেক্টের সাথে সবাই সহযোগিতা করলেন। বোরকা নিকাব পরা মানুষজন দেখলে নাকি সবাই অবহেলা করে কিন্তু সেখানের দৃশ্যপট বেশ ভিন্ন দেখলাম। পুরোটাই আল্লাহর রহমত আসলে। রাস্তা পাড় হওয়ার সময় পাশ থেকে কয়েকজন বলাবলি করতে লাগলেন উনার টাকা হকের টাকা, হালাল টাকা তাই নিতে পারে নাই। এভাবে এত তাড়াতাড়ি ফোন ফিরে পাওয়া এই দেশে অসম্ভব একটা ব্যাপার ইত্যাদি ইত্যাদি। ছিনতাইকারী আসলে দৌড়াতে দৌড়াতে অনেক দূরে চলে গিয়েছিল। হাটার পথ প্রায় ৫ মিনিটের উপর। বেখায়ালি হয়ে সে যেয়ে এক লোকের সাথে কপালে বারি খায় আর সেই লোক রাগ করে তাকে আটকে ফেলে। হাতের ভিতর হাত ঢুকিয়ে কিভাবে নাকি আটকালো। পরে যখন হাতে ফোন আর পালানোর মানসিকতা দেখলেন তাতে করে আশেপাশের লোকজনকে চিৎকার করে ডেকে জড়ো করলেন। লিল্লাহিল হামদ! পুরোটাই আল্লাহ তাআ’লার কারিশমা।
ঘটনাটায় আমার মনে যে কথা সবচেয়ে বেশি আসলো তা ছিল মেয়ের সাদাকাহ করার ব্যাপারটা। সে দেশে আসলে রাস্তার প্রতিটা ডিজ্যাবল পার্সনকে খুব সামান্য হলেও সাদাকাহ করবেই। মা শা আল্লাহ তার কোনো চাহিদা নাই কিন্তু প্রতিটা অসহায় মানুষ সামনে আসলেই সে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে, চোখের ভাষায় স্পষ্টতই বোঝা যায়, “অল্প হলেও কিছু দাও প্লিজ…” হাটার পথে ওর এই ছোট ছোট সাদাকাহ, হিফাযাতে আযকার যিকিরের কারনে হিফাযাতে নিয়োজিত মালাইকাগন রব্বুল আরশিল আযিমের হুকুমে সেদিন এতো বড় বিপদ থেকে আমাদেরকে উদ্ধার করলেন। জান মাল সবটুকু পরিপূর্ন নিরাপদে রাখলেন আমার মালিক।
এখানে ঘটনাটা শেয়ার করেছি মূলত দান সাদাকাহ আর আযকার যিকরের ফদল বুঝাতে। সেদিন কত কি হতে পারতো! কিন্তু আল্লাহ আল-হাফিয আমার সবটুকুই আগলে রাখলেন। আলহামদুলিল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ!!
লেখা : সংগৃহীত
সবার লেসন এর জন্যই নেয়া।
পিক : স্যাম্পল ( আমার নিজের মোবাইল)