09/10/2024
জননী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ও উপন্যাস। এটি লেখকের প্রথম উপন্যাস যা কোনো পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি, গ্রন্থাকারেই প্রথম মুদ্রিত হয়।
জননী একজন মায়ের জীবনকথা। সূচনা থেকে পূর্ণতা পর্যন্ত। কাহিনীর শুরুতে আমরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় এক জননীর সাথে পরিচিত হই, তার নাম শ্যামা। তাকে আমাদের অসহায় মনে হয়, কারণ তার স্বামীটিকে ভরসা করার মত লোক মনে হয় না, যার মাথার নাট-বল্টু ঢিলা।
অনেক উত্থান-পতন পেরিয়ে শ্যামা তার সন্তানদের জীবন গড়ে, স্বামীকে মমতা দিয়ে ধরে রাখে।
শ্যামা নিজেই বলে, সে আছে বলেই এই সংসার টিকে আছে, না থাকলে ভেসে যেত। "আমার জন্যই সংসারটা টিকে আছে" কথাটা প্রায় সব বাঙালি গৃহিণীকেই বলতে শোনা যায়। তবে কথাটা সর্বক্ষেত্রে চাপাবাজি নয়, অনেকের ক্ষেত্রেই সঠিক (মিলেনিয়ালদের ক্ষেত্রে আমার মন্তব্য প্রযোজ্য নয়, একুশ শতকে বাঙালি পরিবারে নারী-পুরুষের ভূমিকায় অনেক পরিবর্তন এসেছে)। যত ত্যাগ শিকার করে শ্যামার মত গৃহিণীরা একটা পরিবার আগলে রাখেন, সেটা বিস্ময়কর। তাই শ্যামার জীবনকাহিনী বিংশ শতাব্দীর সকল ত্যাগী বাঙালি জননীর জীবনকাহিনীর প্রতীক, "জননী" বাংলার মায়েদের কিংবদন্তীর কথা।
উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শ্যামার উপরেই ফোকাস রেখেছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। শ্যামার স্বামী, সন্তান, অন্যান্য আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীদেরকে তিনি দেখিয়েছেন শ্যামার দৃষ্টিকোণ থেকে। পরিস্থিতির সাথে সঙ্গতি রেখে শ্যামা চরিত্রের কত রকমের দিক আমরা পাঠক হিসেবে আবিষ্কার করি। মমতাময়ী মা, রক্ষাকারী গৃহিনী, ত্যাগী স্ত্রী, কখনও অকৃতজ্ঞ, কখনও স্বার্থপর নারী, কখনও কর্কশ, কখনও কোমলহৃদয়, কখনও কুসংস্কারগ্রস্ত, কখনও ঈর্ষাকাতর,..., শ্যামা চরিত্রের কত রকমের শেড মানিক ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর লেখনীতে। মানুষের জটিল সাইকোলজি, যখন-তখন পালটে যাওয়া মেজাজ সবকিছু নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি।
"জননী"কে একটা লাইফ সাইজ রিয়ালিস্টিক পেইন্টিংয়ের সাথে তুলনা করা যায়, যেখানে শ্যামাকে কেন্দ্রভাগে রেখে বাকিরাও যথাযথ গুরুত্ব নিয়ে অবস্থান করছে। তবে রিয়েলিস্টিক পেইন্টিং অনেক শিল্পীই করতে পারেন, কিন্তু উপন্যাসে বাস্তবতা ধরে রেখে এমন মহান জীবনকাহিনী রচনা করতে পারেন কয়জন? মানিক পারেন, তিনি বিস্ময়কর।
‘জগতে কারও স্নেহে যে কারও দাবি জন্মে না এটা সে জানিত না।’ কী নির্মম সত্য। আর কত কম কথায় বলে ফেলা! ‘মানুষের জীবনে অভাবের পূরণ আছে ক্ষতির পূরণ নাই’ এই কথাটা কি ভয়ানক। সত্যি তো, একবার ক্ষতি হলে কিছু দিয়েই কি তা ফেরানো সম্ভব? না তো!
শ্যামার মতো অস্নেহে, অপরিচর্যায় সারাজীবন খেটে যাওয়া কতজনকে আমরা জানি? নেহাত কম মানুষ নয়। কিন্তু তাদেরও যে গল্প আছে, তাদেরও যে কথা আছে সেটা কী ভেবেছি? হয়তো। তবে খুব কম সময়ের জন্য। মা শুধু মা বলে তার কোনো ত্রুটিকে তুচ্ছ জ্ঞান না করার বিষয়টি আমার কাছে জননীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে হলো। যদিও উপন্যাসের নাম জননী, একজন মানুষ হিসেবে শ্যামার সবটাই যেভাবে দেখতে পাই, সে-ই সবচে��়ে অসাধারণ।
আপাতত আর কিছু বলার নেই। এতদিন পড়িনি বলে এখন ভালো লাগছে, এমন অদ্ভুত সুন্দর ট্রেজার তোলা ছিল!
খুব ভালো লাগা কথা : “মানুষের আশা এমন ভঙ্গুর নয় যে একবার ঘা খাইলে চিরদিনের জন্য ভাঙিয়া পড়িবে। তবু আশাতেই আশঙ্কা বাড়ে।”
"......সুবর্ণকে শ্যামা যেন বুকের মধ্যে লুকাইয়া রাখিয়া একটা দিনের প্রতীক্ষা করিতে লাগিল, কোথায় গেল ক্ষুদ্র বিদ্বেষ, তুচ্ছ শত্রুতা! সুব��্ণের জীবন লইয়া শ্যামা যেন বাঁচিয়া রহিল। তারপর এক চৈত্র নিশায় এ বাড়ির যে ঘরে শ্যামা একদিন বিধানকে প্রসব করিয়াছিল সে ঘরে সুবর্ণ অচৈতন্য হইয়া গেল, ঘরে রহিল কাঠ কয়লা পুড়িবার গন্ধ, দেয়ালে রহিল শায়িত মানুষের ছায়া, জানালার অল্প একটু ফাঁক দিয়া আকাশের কয়েকটা তারা দেখা গেল আর শ্যামার কোলে স্পন্দিত হতে লাগিল জীবন।"
জন্ম কি শুধুই সন্তানের হয়, নাকি প্রতিটা সন্তানের জন্মের সাথে সাথে জন্ম নেন একজন-দুজন, তিনজন বা আরো বেশি মা? মাতৃত্ব কী শুধুই সন্তানের জন্মের সাথেই জন্ম নেয়, নাকি একটা ক্ষীণ সন্দেহ, ছোটো একটা আশাই জন্ম দেয় মাতৃত্বের? জননী শব্দটা এমনিতেই ভারী। কিন্তু এর ভার কী জননীর অর্থের চেয়েও বেশি?
এই গল্পটা শ্যামার। সন্তানহীন বিপত্নীক শীতলের দ্বিতীয় স্ত্রী শ্যামা। সে নিজেও সন্তানহীন ছিল বিয়ের পরের সাত বছর। তারপর এক সন্তান সে পেল। কিন্তু সেই সন্তান মাত্র বারো দিনের ভ্রমণ শেষে পৃথিবীকে ছেড়ে গেল। এরপর আবারো অপেক্ষা। সেই অপেক্ষার পালা ঘুচিয়ে একদিন এলো বিধান, আর তার পরে আরো কয়েকজন। বধূ শ্যামার তখন জননী শ্যামা।
গল্পটা শেষ হয়নি এখানেও। ফুল ফোটানোতেই কী গাছের কাজ শেষ? সেই ফুল একদিন ফলে পরিণত হবে, তবেই না গাছ তার দায়িত্ব শেষ করে নতুন প্রাণের আহ্বানে স্বীয় সন্তানকে মাটির হাতে সমর্পণ করে? গল্পটাও এগিয়ে গেছে। সন্তানদের বড় করা, তাদের পূর্ণ করার লক্ষ্যে শ্যামার লড়াইয়ের গল্প এটা।
মানিকের লেখনী নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। মানিক যে শুধু নামেই না, কাজেও মানিক ছিলেন তার আরেক প্রমাণ এই বই। মানিকের অন্যান্য লেখার মতই অসাধারণ মনোবিশ্লেষণ আর বাস্তবতা এই লেখাতেও উপস্থিত। এর আগে শওকত ওসমানের জননী পড়েও মুগ্ধ হয়েছিলাম। কিন্তু গ্রামীণ পটভূমিকায় লেখা সেই উপন্যাসকে কিছুতেই নিজের অভিজ্ঞতা ফিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারছিলাম না। শহুরে পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাস আমার দৈনন্দিন ছোটোখাটো সব অভিজ্ঞতাকেও ধরতে পেরেছে। ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে আমার ভালো লাগার মাত্রাটা এই কারণেই বেড়েছে বহুগুণে।
সব মিলিয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে ভালো বই, ভালো লাগার মত বই। পড়ে ফেলতে পারেন।
নোট :
মানিক বন্দোপাধ্যায়ের একদম শুরুর দিকের উপন্যাস এটি। পরের দিকে মানিক তাঁর উদ্ভাবিত নিজস্ব স্টাইলে মানুষের মনের দূরতম অন্দরমহলে গভীর সার্চলাইট ফেলে পর্যবেক্ষণ করতেন, কিংবা প্রচলিত বাংলা উপন্যাসের গঠন থেকে সরে এসে নিজের লেখাতে নিরীক্ষা আর নতুনত্ব নিয়ে আসতেন ; কিন্তু এই উপন্যাসে সেই ট্রেডমার্ক মানিক কিছুটা অনুপস্থিত। তবু একটা দিক দিয়ে এই উপন্যাস আমাকে ভাবিয়েছে, তা হলো মানিকের তীব্র তীক্ষ্ণ রিয়েলিজম।
জননী মানেই তো নিঃস্বার্থ, দরদী, ভালোবাসার অপার আশ্রয়— পৃথিবীর সব মা যেমন হয়ে থাকেন— সাহিত্যে! মানিক এইসব চিরাচরিত রোমান্টিসিজমকে নি��ের সাহিত্যজীবনের শুরু থেকেই এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। 'জননী' উপন্যাসের শ্যামা নামের মুখ্য চরিত্রটি দোষে-গুণে, ক্রোধে-কান্নায়, লাজে-ভয়ে, স্বার্থপরতায়-স্বার্থহীনতায়, আহ্লাদে এবং অভিসম্পাতে, বুদ্ধি এবং নির্বুদ্ধিতায়, চালাকি এবং চতুরতায়, শোকে এবং সাবধানতায়— সব দিক দিয়ে একজন রক্তমাংসের জ্যান্ত মানুষ। নিছক সস্তা বাঙালি সেন্টিমেন্টের ধার ধারেননি মানিক। জীবনের শুরুতেই ঘোষণা করেছেন : আমি এসে গেছি পাঠক, আপনি মানসিকভাবে প্রস্তুত তো?
আধুনিক "ফুলের ঘায়ে মূর্ছা যাওয়া" পাঠকদের কাছে ত্রিশের দশকে রচিত এই উপন্যাসের অনেক কিছুই আপত্তিকর মনে হবে। রমণীর অচ্ছেদ্য পতিপ্রেম (তা হোক-না সেই পতিদেব একজন মার্কামারা অপদার্থ এবং শারীরিক অত্যাচারকারী), কিংবা ভাগ্যের হাতে মেয়েদের অসহায় আত্মসমর্পণ, কিংবা সংস্কারে আচ্ছন্ন মানুষের হৃদয়— এইসব দেখে অনেকে ভয়ানক অপমানিত বোধ করতে পারেন। কিন্তু সমাজ তো তখন এমনই ছিল (এখনও যেন কতো শুধরেছে!)। লেখকের কাজ "আদর্শ সমাজ"-এর রূপরেখা ফুটিয়ে তোলা নয়, সমাজে ঠিক যেমনটা দেখা যায় তেমনটা পাঠকের সামনে তুলে ধরা— উপন্যাসটি পড়ার সময় এটা ভুলে গেলে চলবে না। আমি মাঝেমাঝে ভুলে গিয়ে ভীষণ অপমানিত বোধ করছিলুম, তারপর আবার নিজেকে বোঝাচ্ছিলুম, চিল ব্রো, এটাই তো স্বাভাবিক চিত্র।
বহু বছর আগে পড়েছিলাম এই উপন্যাসটা। সেই অল্প বয়েসে কী যে বুঝেছিলাম কিছুই মনে নেই। এবার আবার পড়তে গিয়ে মানিক বন্দোপাধ্যায়ের অসামান্য চরিত্র-বিশ্লেষণ দেখে অবাক হলাম। কেমন অন্ধকার গোপন গহীন ফাঁকফোকরে পোকামাকড়ের সূক্ষ্ম নড়াচড়াও খুঁটিয়ে দেখবার নজর ছিল তাঁর! মানুষের মনের পোকামাকড়।
স্বতই বিমর্ষ হয়ে ভদ্রসাধারণ
চেয়ে দ্যাখে তবু সেই বিষাদের চেয়ে
আরও বেশি কালো-কালো ছায়া
লঙ্গরখানার অন্ন খেয়ে
মধ্যবিত্ত মানুষের বেদনার নিরাশার হিসাব ডিঙিয়ে
নর্দমার থেকে শূন্য ওভারব্রিজে উঠে
নর্দমায় নেমে—
ফুটপাথ থেকে দূর নিরুত্তর ফুটপাথে গিয়ে
নক্ষত্রের জ্যোৎস্নায় ঘুমাতে বা মরে যেতে জানে।
এরা সব এই পথে
ওরা সব ওই পথে— তবু
মধ্যবিত্তমদির জগতে
আমরা বেদনাহীন— অন্তহীন বেদনার পথে।
িল্পী
৯ অক্টোবর ২০২৪