13/10/2018
সহমত!
#উপলব্ধির_ডায়েরি -৪৩
Rokon Uddin Khan
গতকাল একটি ব্যতিক্রমী বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছিল। ব্যতিক্রমী এজন্য যে বিয়ের বর ও কনে উভয়ের জীবনে এটি ছিল দ্বিতীয় বিয়ে। বর ও কনে উভয়ে তাঁদের জীবনের প্রথম সংগীর সাথে বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটিয়েছিলেন যৌক্তিক কারণে। নিঃসংগ দুজন ব্যক্তি আবার সংগী খুঁজে নিয়ে নতুন করে জীবন সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। একশ'র মত মেহমানের উপস্থিতিতে মিরপুরের কমিউনিটি সেন্টারটি আনন্দে ভরে উঠেছিল। নবদম্পতি সমাজের সব জড়তা ও কুসংস্কারকে ঝেড়ে ফেলে, হারাম পথে না গিয়ে হালাল পথে নিজেদের জীবনকে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছেন বলে আনন্দে আমার মনটা ভরে উঠেছিল।
আমাদের সমাজে প্রথম বিয়ে, তালাক ও দ্বিতীয় বিয়ে এই তিনটিই মোটামুটি এখন দুঃসাধ্য কাজ এবং প্রথমটির চাইতে দ্বিতীয়টি ও দ্বিতীয়টির চাইতে তৃতীয়টি আরো দুঃসাধ্য কাজে পরিণত হয়েছে। কোনো কারণে কোনো নারী বিধবা বা স্বামী পরিত্যাক্তা হলে তাঁর দ্বিতীয় বিবাহকে এখনও আমাদের সমাজ সহজভাবে গ্রহণ করতে শেখেনি। বিধবা বা স্বামী পরিত্যাক্তা নারীকে বিয়ে দিয়ে তাদের নিঃসংগতা দূর করার উদ্যোগ তাঁর বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজনরা নেন না, উল্টো সমাজ কী বলবে এই ভয়ে অথবা সন্তান মানুষ করার দোহাই দিয়ে তাকে আজীবন নিঃসংগ থাকার উপদেশ দেয়া হয়।
নিঃসন্দেহে এটি নারীদের প্রতি জুলুম। একজন বিধবা বা স্বামী পরিত্যাক্তা নারী আমাদের সমাজে কতটা অসহায় ও নিঃসংগ তা ভুক্তভোগী নারীই একমাত্র অনুধাবন করতে পারে। ইসলাম বিধবা ও স্বামী পরিত্যাক্তা নারীর পূনরায় বিবাহকে উৎসাহিত করেছে অথচ আমরা মুসলিম হয়েও ইসলামের উল্টো বিধানকে সমাজে জারি রেখেছি। রাসুল সা. এর প্রথম বিবাহ হয়েছিল একজন বিধবা নারী হযরত খাদিজা (রা) এর সাথে। এছাড়াও হযরত আয়েশা (রা) ও হযরত মারিয়া (রা) ছাড়া রাসুল সা. এর অন্য সকল স্ত্রী ছিলেন হয় বিধবা নয়তো স্বামী পরিত্যক্তা।
সমাজের ভুল সংস্কারের অর্গল আমাদেরকেই ভাংতে হবে। শুরু করতে হবে নিজের পরিবার, আত্মীয় স্বজন থেকে। যে পুরুষদের পক্ষে সম্ভব তারা যেন বিধবা/স্বামী পরিত্যাক্তা নারীদেরকে বিয়ে করতে দ্বিধা না করেন। বিধবা/স্বামী পরিত্যাক্তা নারীদেরকে পুনরায় বিয়ে দিয়ে তাদের অসহায়ত্ব দূরা করার দায়িত্ব নিতে হবে আমাদের সবাইকে। আমাদের বুঝতে হবে বিয়ের মাধ্যমে বৈধ সামাজিক সম্পর্ক স্থাপনের সংস্কৃতি সমাজে যত সহজ হবে, সমাজ থেকে জেনা-ব্যাভিচার ততই দুর্লভ হয়ে যাবে।
শুধু বিধবা বা স্বামী পরিত্যাক্তার দ্বিতীয় বিবাহই নয়, আমাদের সমাজে প্রথম বিয়ের সামনেও তৈরি হয়েছে প্রতিবন্ধকতা। একটি ছেলে সমাজের চোখে সুপ্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত সে পাত্রীর বাবার পছন্দের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না, এদিকে দেশে চাকুরির যে বাজার তাতে সুপাত্র হয়ে উঠতে একটি ছেলেকে মোটামুটি ৩২ থেকে ৩৫ এর ঘরে পৌঁছতে হয়। ততদিন পর্যন্ত নিজেকে সংরক্ষিত রাখা কোনো যুবকের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জের বিষয় থাকে। বলাবাহুল্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যুবকেরা চ্যালেঞ্জে হেরে গিয়ে হারাম পথ বেছে নেয়। ওদিকে মেয়ের অভিভাবকগনও বিয়ে দিতে দেরি করে তাদের আদরের কন্যাদেরকে নিজের অজান্তে হারাম পথে ঠেলে দেন।
আমাদের অভিবাবকগণ রিজিকের ভয়ে বিবাহকে প্রলম্বিত করছেন যা ইসলামের আকিদা-বিশ্বাসের সাথে যায় না। আল কুরআনের সূরা বাকারার ২৬৮ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, “শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্রের ভয় দেখায় এবং অশ্লীল কর্মনীতি অবলম্বন করতে প্রলুব্ধ করে কিন্তু আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর ক্ষমা ও অনুগ্রহের আশ্বাস দেন৷ আল্লাহ বড়ই উদারহস্ত ও মহাজ্ঞানী৷” মূলত রিজিকের ভয়ে দেরিতে বিয়ে করার এই নীতি শয়তানের উস্কানি থেকে আমাদের সমাজে চালু হয়েছে।
জানি না আমাদের সমাজ এই নির্মম সত্যটি কবে উপলব্ধি করবে যে বিয়ের দরজা যেখানে বন্ধ থাকে ব্যাভিচারের দরজা সেখানে উন্মুক্ত হয়ে যায়।