29/07/2026
নিজ প্রয়োজনে জানুন, যে কোন প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন।
#টার্ন_ওভার_ট্যাক্স যেন এক গলার কাটা
রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য সরকার যেন হায়েনার মতো হন্যে হয়ে উঠেছে। এর ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে করদাতার সংখ্যা এবং কর আদায়—উভয়ের ওপরই।
ধৈর্য থাকলে চলুন, অংক কষি।
ধরা যাক, একজন উদ্যোক্তা মাত্র ৫ লাখ টাকা মূলধন নিয়ে চালের ব্যবসা শুরু করেছেন। ব্যবসার মূলধনটি সারা বছর ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ব্যবহার করে তিনি বছরে মোট ১ কোটি ২০ লাখ টাকার চাল বিক্রি করেন।
তিনি প্রতি কেজি চাল ৭৫ টাকা দরে ক্রয় করে ৮০ টাকা দরে বিক্রি করেন।
তাঁর ব্যবসায়িক খরচগুলো হলো—
* পরিবহন খরচ: প্রতি কেজি চালের জন্য ১ টাকা;
* দোকান ভাড়া: মাসে ৫,০০০ টাকা;
* কর্মচারীর বেতন: মাসে ৮,০০০ টাকা;
* বিদ্যুৎ বিল: মাসে ১,০০০ টাকা;
* অন্যান্য খরচ: মাসে ২,০০০ টাকা।
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৩(৬) অনুযায়ী, সাধারণ ক্ষেত্রে গ্রস প্রাপ্তির ওপর ১% টার্নওভার ট্যাক্স প্রযোজ্য।
প্রশ্ন হলো—
১. উক্ত ব্যবসায়ীর বার্ষিক মোট স্থূল লাভ কত?
২. সকল ব্যবসায়িক খরচ বাদ দেওয়ার পর তাঁর প্রকৃত নিট লাভ কত?
৩. ১% হারে তাঁর টার্নওভার ট্যাক্স কত হবে?
৪. টার্নওভার ট্যাক্স না থাকলে, প্রকৃত নিট লাভের ওপর তাঁর স্বাভাবিক আয়কর কত হতো?
চলুন, অংক কষি
বছরে মোট বিক্রয় = ১,২০,০০,০০০ টাকা
প্রতি কেজি বিক্রয়মূল্য = ৮০ টাকা
মোট বিক্রিত চাল: ১,২০,০০,০০০ ÷ ৮০ = ১,৫০,০০০ কেজি
অর্থাৎ, বছরে তিনি মোট ১ লাখ ৫০ হাজার কেজি চাল বিক্রি করেছেন।
১. বার্ষিক মোট স্থূল লাভ:
প্রতি কেজিতে—
* ক্রয়মূল্য = ৭৫ টাকা
* বিক্রয়মূল্য = ৮০ টাকা
* স্থূল লাভ = ৫ টাকা
সুতরাং, ১,৫০,০০০ × ৫ = ৭,৫০,০০০ টাকা
২. ব্যবসায়িক খরচ বাদ দেওয়ার পর প্রকৃত নিট লাভ:
বার্ষিক ব্যবসায়িক খরচ—
* পরিবহন: ১,৫০,০০০ × ১ = ১,৫০,০০০ টাকা
* দোকান ভাড়া: ৫,০০০ × ১২ = ৬০,০০০ টাকা
* কর্মচারীর বেতন: ৮,০০০ × ১২ = ৯৬,০০০ টাকা
* বিদ্যুৎ বিল: ১,০০০ × ১২ = ১২,০০০ টাকা
* অন্যান্য খরচ: ২,০০০ × ১২ = ২৪,০০০ টাকা
মোট খরচ = ৩,৪২,০০০ টাকা।
অতএব, ৭,৫০,০০০ − ৩,৪২,০০০ = ৪,০৮,০০০ টাকা।
৩. ১% টার্নওভার ট্যাক্স: ১,২০,০০,০০০ × ১% = ১,২০,০০০ টাকা।
৪. টার্নওভার ট্যাক্স না থাকলে স্বাভাবিক আয়কর:
ধরা যাক, ৪ লাখ ৮ হাজার টাকা তাঁর একমাত্র করযোগ্য আয়।
সাধারণ ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করমুক্ত সীমা ধরে—
করযোগ্য আয়: ৪,০৮,০০০ − ৩,৭৫,০০০ = ৩৩,০০০ টাকা
প্রথম ধাপের ১০% হারে: ৩৩,০০০ × ১০% = ৩,৩০০ টাকা।
অর্থাৎ, হিসাব অনুযায়ী স্বাভাবিক আয়কর দাঁড়ায় ৩,৩০০ টাকা।
তবে প্রযোজ্য ন্যূনতম কর ৫,০০০ টাকা হওয়ায় কার্যত স্বাভাবিক আয়কর হবে ৫,০০০ টাকা।
এক নজরে—
বার্ষিক মোট স্থূল লাভ = ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
প্রকৃত নিট লাভ = ৪ লাখ ৮ হাজার টাকা।
টার্নওভার ট্যাক্স = ১ লাখ ২০ হাজার টাকা।
ন্যূনতম স্বাভাবিক করদায় = ৫,০০০ টাকা।
তাহলে পার্থক্যটা কোথায়?
একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মাত্র ৫ লাখ টাকা মূলধন দিয়ে ব্যবসা শুরু করে সারা বছর মূলধন ঘুরিয়ে মোট ১ কোটি ২০ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করলেন।
কিন্তু তাঁর প্রকৃত নিট লাভ হলো মাত্র ৪ লাখ ৮ হাজার টাকা।
তাঁর স্বাভাবিক করদায় যেখানে ৫,০০০ টাকা, সেখানে শুধু টার্নওভারের ভিত্তিতে তাঁকে দিতে হচ্ছে—১ লাখ ২০ হাজার টাকা।
অর্থাৎ, টার্নওভার ট্যাক্স স্বাভাবিক ন্যূনতম করের ২৪ গুণ।
অংক শেষ, চলুন আসল কথায়—
ব্যবসার মোট বিক্রয় এবং প্রকৃত লাভ—এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
একজন ব্যবসায়ী হয়তো কোটি কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করছেন, কিন্তু তাঁর লাভের মার্জিন হতে পারে অত্যন্ত সামান্য। পণ্য ক্রয়, পরিবহন, দোকান ভাড়া, কর্মচারীর বেতন, বিদ্যুৎ বিল এবং অন্যান্য খরচ বাদ দেওয়ার পর তাঁর হাতে হয়তো সামান্য পরিমাণ অর্থই অবশিষ্ট থাকে।
এই সামান্য আয় দিয়েই তাঁকে নিজের ও পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করতে হয়। ফলে, টার্নওভারের ওপর আরোপিত বড় অঙ্কের করের বোঝা বহন করার সক্ষমতা তাঁর নাও থাকতে পারে।
করব্যবস্থার একটি মৌলিক নীতি হলো—করদাতার সক্ষমতা অনুযায়ী কর আরোপ করা।
কিন্তু টার্নওভারভিত্তিক কর ব্যবস্থায় প্রশ্ন উঠতেই পারে—যার বিক্রয় বেশি, কিন্তু লাভ কম, তার ওপর কি শুধু বিক্রয়ের ভিত্তিতে তুলনামূলকভাবে বেশি করের বোঝা চাপানো ন্যায়সংগত?
রাজস্ব বাড়ানো অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু রাজস্বের স্থায়ী ভিত্তি হলো—ব্যবসা, বিনিয়োগ এবং উদ্যোক্তা।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যদি টিকে থাকতে না পারেন, নতুন উদ্যোক্তা যদি ব্যবসায় আসতে ভয় পান এবং বিদ্যমান ব্যবসায়ীরা যদি ব্যবসা ছোট করে ফেলেন বা করব্যবস্থার বাইরে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে স্বল্পমেয়াদে রাজস্ব বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে রাজস্বের ভিত্তি সংকুচিত হতে পারে।
ব্যবসা বাঁচলে রাজস্ব বাড়বে।
উদ্যোক্তা বাঁচলে করদাতা বাড়বে।
তাই সরকারের প্রতি বিনীত অনুরোধ—এই বিধানটি বাস্তবতার আলোকে পুনর্বিবেচনা করা হোক। টার্নওভার ও প্রকৃত লাভের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য একটি ন্যায়সংগত, বাস্তবসম্মত ও সক্ষমতাভিত্তিক করব্যবস্থা প্রণয়ন করা হোক।
#টার্নওভারট্যাক্স #আয়কর