25/08/2026
চলুন বন্ধুরা, জেনে নেওয়া যাক—পতিত স্বৈরাচার সরকার ভারতের সঙ্গে করা বাংলাদেশ–ভারত ট্রানজিট/ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তির বিস্তারিত।
বাংলাদেশের বন্দর, নদী ও স্থলপথ ব্যবহারের সুযোগ দিতে আওয়ামী লীগ আমলে ভারতের সঙ্গে বন্দরকেন্দ্রিক তিনটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করা হয়। এসব চুক্তির মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর, অভ্যন্তরীণ নৌরুট ও স্থলপথ ব্যবহারের নামে চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দর একরকম ভারতের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশের আয়, সুবিধা, নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত হয়েছে—তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে।
আওয়ামী লীগ আমলে করা চুক্তিগুলো হলো—Agreement on the Use of Chattogram and Mongla Ports for Movement of Goods to and from India (ACMP), Coastal Shipping Agreement (CSA) এবং Protocol on Inland Water Transport and Trade (PIWTT)। এর মধ্যে PIWTT ছিল পুরোনো চুক্তির নবায়ন, আর অন্য দুটি ছিল নতুন চুক্তি।
CSA-এর আওতায় বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, মোংলা, পায়রা ও পানগাঁও বন্দর ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়। ACMP-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের নৌসীমা, বন্দর ও স্থলপথ ব্যবহার করে ভারতের এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে পণ্য পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। আর PIWTT-এর আওতায় ভারতের জাহাজ চলাচলের নির্ধারিত নৌরুটের নাব্যতা রক্ষার দায়িত্বও বাংলাদেশের ওপর পড়ে। চুক্তিতে পাঁচ বছর পরপর স্বয়ংক্রিয় নবায়নের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
২০১৫ সালের ৬ জুন বাংলাদেশ ও ভারত চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। ২০১৮ সালের ২৫ অক্টোবর ACMP স্বাক্ষরের মাধ্যমে ভারতের জন্য আনুষ্ঠানিক আন্তঃসরকারি কাঠামো তৈরি হয়। ২০১৯ সালের ৫ অক্টোবর কাস্টমস, পণ্য, যানবাহন, জাহাজ, রুট, নিরাপত্তা ও নথিপত্রসহ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার বিস্তারিত নির্ধারণ করা হয়। ২০২০ সালে কলকাতা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে আগরতলায় প্রথম পরীক্ষামূলক কনটেইনার চালান পাঠানো হয়।
তিন চুক্তিতে পৃথক রুট নির্ধারণ করা হলেও সমন্বিতভাবে এগুলো ভারতকে বাংলাদেশের নৌ ও স্থলপথে ব্যাপক প্রবেশাধিকার দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বন্দর ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো ভারতের ব্যবহারের আওতায় এলেও বাংলাদেশ ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পণ্য পরিবহন বা তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্যে সমপর্যায়ের সুবিধা পায় না।
চুক্তির বিভিন্ন ধারায় ভারতীয় জাহাজের ক্ষেত্রে জাতীয় বিধি অনুযায়ী বন্দর চার্জ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আবার পরিবহনকৃত পণ্যের নিয়মিত ফিজিক্যাল কাস্টমস পরিদর্শনের বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে। Article 5 অনুযায়ী চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ভারতীয় পণ্যকে বাংলাদেশি আমদানি-রপ্তানি পণ্যের মতো সুবিধা এবং অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যবস্থা করবে। একই সময়ে ভারতীয় ও অন্য বিদেশি পতাকাবাহী জাহাজ থাকলে ভারতীয় জাহাজকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বার্থিং দেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ রয়েছে। Article 8 অনুযায়ী নির্ধারিত কাস্টমস, প্রশাসনিক, পরিচালন মাশুল ও অন্যান্য চার্জ ছাড়া অতিরিক্ত কর আরোপের সুযোগ সীমিত।
চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত এম শাজাহান দাবি করেছেন, চুক্তি তৈরির সময় সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত চুক্তি সম্পন্ন করার চাপ ছিল এবং ভারতের চাহিদা অনুযায়ী চুক্তি হওয়ায় বাংলাদেশের স্বার্থে দরকষাকষির সুযোগ কম ছিল। তার আরও দাবি, একটি Non-Disclosure Obligation-এর ধারায় নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি তৈরি হলে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে কনটেইনারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুযোগের বিষয়ও ছিল—যা একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
ভারতের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ নৌপথে বাণিজ্যের মূল চুক্তি প্রথম হয় ১৯৭২ সালের ১ নভেম্বর। ২০১৫ সালের ৬ জুন এতে নতুন ধারা-উপধারা যুক্ত করে পাঁচ বছর পরপর স্বয়ংক্রিয় নবায়নের শর্ত রাখা হয়। এর ফলে ২০২০ ও ২০২৫ সালে নতুন করে আলোচনা ছাড়াই চুক্তি নবায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
PIWTT-এর বিভিন্ন ধারায় প্রত্যেক দেশকে নিজ নিজ এলাকার নদীপথ জাহাজ চলাচলের উপযোগী রাখার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারতের ট্রানজিটের প্রয়োজনীয় নৌরুট রক্ষণাবেক্ষণ ও নাব্যতা নিশ্চিত করার ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশকে এককালীন ১০ কোটি টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও বাকি ব্যয় বাংলাদেশকে বহন করতে হয় বলে সমালোচনা রয়েছে। সিরাজগঞ্জ, দাইকাওয়া ও শেরপুর–জগন্নাথগঞ্জ রুটসহ নির্দিষ্ট রুট ভারতীয় ট্রানজিট ট্রাফিকের জন্য রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ট্রানজিটের ক্ষেত্রে কাস্টমস ডকুমেন্টেশন ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা কমানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সব মিলিয়ে চুক্তিগুলো ভারতকে বাংলাদেশের নৌপথ ও স্থলপথ—দুই ব্যবস্থাই ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে। ভারত সহজেই বাংলাদেশের সড়কপথ ব্যবহার করে সেভেন সিস্টার্সে কার্গো নিতে পারবে। কিন্তু বাংলাদেশ ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে কার্গো পাঠাতে চাইলে ভারতের সঙ্গে আলাদা সমঝোতার প্রয়োজন হতে পারে। ফলে সমান বাণিজ্যিক সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
সমালোচকদের মতে, এসব চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ভারতীয় পণ্য পরিবহনে বন্দর সুবিধা, অগ্রাধিকার এবং কাস্টমস ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভারতীয় পণ্যবাহী ট্রাক ও জাহাজের ওপর বাংলাদেশের কাস্টমস ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এসব চুক্তি জাতীয় সংসদে পর্যাপ্ত আলোচনার জন্য উপস্থাপন করা হয়েছিল কি না এবং জনগণের সামনে এর পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত মূল্যায়ন কতটা করা হয়েছিল।
হাসিনা সরকারের পতনের পরও চুক্তিগুলো বহাল রয়েছে এবং এর একটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়নের ব্যবস্থাও রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা বর্তমান সরকার এখন পর্যন্ত এগুলো বাতিল বা ব্যাপকভাবে পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেয়নি বলে সমালোচনা রয়েছে। ভারতও এসব চুক্তির আলোকে কার্যক্রম পুনরায় জোরদার করার চেষ্টা করছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরীর মতে, শেখ হাসিনা আমলে করা এসব বিতর্কিত চুক্তি নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তার প্রত্যাশা—নির্বাচিত সরকার চুক্তিগুলো সংসদে উপস্থাপন করে আলোচনা করবে এবং জনগণের মতামত ও জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে প্রয়োজনীয় পুনর্মূল্যায়ন করবে।
প্রশ্ন একটাই—ভারত যদি বাংলাদেশের বন্দর, নদী ও স্থলপথ ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা পায়, তাহলে এর বিনিময়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, নিরাপত্তাগত ও কৌশলগত লাভ কতটা?
এই হিসাব জনগণের সামনে প্রকাশ করা এবং জাতীয় স্বার্থে চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা এখন সময়ের দাবি।
#বাংলাদেশ #জাতীয়স্বার্থ #বাংলাদেশভারতসম্পর্ক #ট্রানজিট #ট্রান্সশিপমেন্ট #চট্টগ্রামবন্দর #মোংলাবন্দর #পানগাঁও #পায়রাবন্দর #সার্বভৌমত্ব #পররাষ্ট্রনীতি #সংসদ #জনস্বার্থ