28/04/2020
এইচএসসির পর কী, কোথায়, কেন পড়বে? (পার্ট-১)
এবারের এইচএসসি পরীক্ষা কবে হবে বলা যাচ্ছে না।সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্ধ হতে পারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।।
এইচএসসির পর কী পড়বে, কোথায় পড়বে—এই সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব একটা সহজ নয় বর্তমানে। দেশে ১৫১টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৫০টির বেশি বিষয় রয়েছে। কেবল কম্পিউটারবিজ্ঞান–সংক্রান্ত বিষয় রয়েছে কমপক্ষে ১০টি। কম্পিউটারবিজ্ঞান, কম্পিউটার কৌশল, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার ও কমিউনিকেশন, কম্পিউটার ও ইলেকট্রিক্যাল, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাদি। এগুলোর সূক্ষ্ম পার্থক্যই–বা ছেলেমেয়েরা কেমনে জানবে? কাজেই ওরা ইলেকট্রিক্যাল না কম্পিউটার, সিভিল না মেকানিক্যাল, অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি না কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং—এসব নিয়ে দ্বিধায় থাকে ভর্তি হওয়ার আগের দিন পর্যন্ত।
তার ওপর আছে কোথায় পড়বে? ঢাবির সিএসইতে পড়বে নাকি বুয়েটে ইইই, বিইউপির বিবিএ নাকি কুয়েটে সিএসই, নর্থ সাউথে ইকোনমিকস নাকি রুয়েটে একটা কিছু? শাহজালালে স্থাপত্য নাকি চুয়েটে? বুয়েটে কেমিক্যাল নাকি বুটেক্সে টেক্সটাইল কেমিক্যাল? হোম ইকোনমিকস কলেজের রিসোর্স ইউটিলাইজেশন অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপের সঙ্গে ড্যাফোডিলের ইনোভেশন অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপেরই–বা পার্থক্য কী?
কেমন করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত? কোন কোন বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া উচিত? ঘরের কাছের বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে অনার্স ভালো না ঢাকায় এসে মেসে থেকে পড়া ভালো? এ প্রশ্নগুলোর জবাব খোঁজার আগে আমি বরং আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথা একটু বলে নিই।
আজ থেকে ৩৫ বছর আগে আমি এইচএসসি পাস করি। আমাদের ইন্টারের পুরো সময়ে আমাদের পাড়ার এক সিনিয়র, বাদল ভাই (প্রকৌশলী, বর্তমানে অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী) দেখা হলেই বলতেন, ফিজিকস-কেমিস্ট্রি-ম্যাথ। সে সময় বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় কেবল এই তিন বিষয়ে পরীক্ষা হতো। বাংলা বা ইংরেজির কিছু থাকত না। আর বাদল ভাইয়ের কাছে মেধাবী শিক্ষার্থীর অর্থই হলো বুয়েটে চান্স পাওয়া! তিনি আমাকে সে সময় গণিত বা ফিজিকসের বিভিন্ন বিষয় দেখিয়ে দিতেন। তাঁর কারণে আর একটু হলে আমি এইচএসসিতে এই তিন বিষয়ে লেটার মার্কসহ ফেল করে যেতাম, কারণ আমার বাংলা ও ইংরেজির প্রস্তুতি ছিল কোনো রকম। প্রায় দুই বছর, পুরো এইচএসসির সময় আমি বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষাকে সামনে রেখে পড়াশোনা করেছি। এ জন্য এইচএসসির সাজেশন খুঁজিনি। আমার কানের কাছে বাজত বাদল ভাইয়ের আপ্তবাক্য ‘বুয়েট ভর্তি পরীক্ষার কোনো সাজেশন নেই’।
এসব বলার অর্থ হলো এইচএসসি পড়ার সময়েই বাদল ভাইয়ের কারণে আমার মনোজগৎ বুয়েটে পড়ার জন্য তৈরি হয়ে যায়। আমাদের সময় বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষার ফরমেই নিজের পছন্দের বিভাগের নাম লিখতে হতো। ফরম নিতে এসে এসে শুনলাম, সবার পছন্দ হলো ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। মানে সেটা হল ফার্স্ট চয়েজ। কিন্তু তখন জানতাম না ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ব্যাপারটা কী? সেটাই বা কেন সবার প্রথম পছন্দের। ফরম পূরণ করার আগে আমার পুরকৌশলী চাচার পরামর্শ নিতে গেলে তিনি বলেছিলেন, ‘ইলেকট্রিক্যাল পড়ে তো চাকরি পাবে না। ইঞ্জিনিয়ারিং হলো সিভিল। অনেক চাকরি।’ কিন্তু আমি স্রোতের বাইরে থাকতে রাজি হইনি। কাজেই ইলেকট্রিক্যালই প্রথম পছন্দ দিয়ে সেটাই পড়েছি শেষ পর্যন্ত বুয়েটে।
মেডিকেল অবশ্য কলেজ পছন্দটা কঠিন ছিল না। কারণ, হাতে গোনা কয়েকটা মেডিকেলের মধ্যে ঢাকারটা সবার আগের ও বনেদি। এরপর বাড়ির কাছের চট্টগ্রাম মেডিকেল এভাবে দেওয়া যেত।
ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর বা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ই ছিল আমার বন্ধুদের বুয়েট-মেডিকেলের বাইরের অপশন।
আমাদের মধ্যে যাদের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে শখ, তারা অ্যাপ্লাইড ইলেকট্রনিকসকে এগিয়ে রাখতাম দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর জন্য।
আমাদের কমার্স বন্ধুদের জন্য অপশন বেশি ছিল না। মার্কেটিং, ফিন্যান্স অ্যাকাউন্টিং—এই তিন বিষয়ের যেকোনো একটিতে অনার্স। আইবিএতে তখন আন্ডারগ্র্যাড ছিল না। কাজেই অপশন নেই। আর তিন অনার্সের বাজার কমবেশি একই রকম। যেকোনো একটা পড়লেই হবে।
কলা বিভাগের অনার্সের মধ্যে তখন অনেক অপশন নেই। ইংরেজি বরাবরের মতো এগিয়ে। এরপর অর্থনীতি, লোকপ্রশাসন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন এবং অন্যান্য বিভাগ। আমাদের সময় ভর্তি পরীক্ষা আজকের মতো এত প্রতিযোগিতামূলক ছিল না। আমরা মোটামুটি জানতাম, আমাদের পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়তে পারব। আরও সুযোগ ছিল। পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয় বা বিষয় না পেলে পরের বছর আবারও ভর্তি পরীক্ষা দেওয়া যেত।
কিন্তু এখন?
যা করতে হবে একবারেই। সব সিদ্ধান্ত নিয়েই ভর্তি হতে হয়। আর এখনকার ছেলেমেয়েদের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভাগ নির্বাচনের পুরোটা হয় পরের মুখে ঝাল খেয়ে!
তাই নিজে জানুন, নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দিন।।
©মূল লেখা- মুনির হাসান,
প্রথম আলোর যুব কার্যক্রমের প্রধান।
®সংস্কার- ফয়সাল, জাবি