27/05/2026
সম্পদ বিদেশে কিন্তু রিটার্নে দেখান নি?
আয়কর আইন ২০২৩ এর ধারা ২১ অনুযায়ী, কোনো নিবাসী বাংলাদেশি করদাতার আয়কর রিটার্নে যদি অপ্রদর্শিত বিদেশস্থ সম্পত্তির সন্ধান পাওয়া যায়, তবে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর কর অননুগত্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই বিধানের মূল কথা হলো, বিদেশে থাকা কোনো সম্পদ বা অর্থ নিজের অবস্থানের কারণে অবৈধ হয়ে যায় না; কিন্তু সেই সম্পত্তি যদি রিটার্নে দেখানো না হয়, বা করদাতা তার উৎস, প্রকৃতি, অধিগ্রহণের কারণ, এবং বৈধতার পক্ষে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারেন, তাহলে কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে। এখানে “অপ্রদর্শিত” বলতে বোঝায় এমন সম্পদ, যা করদাতার আয়কর দাখিলে বা সম্পদ বিবরণীতে প্রকাশ করা হয়নি। ফলে বিদেশে থাকা ব্যাংক ব্যালেন্স, নগদ অর্থ, শেয়ার, ফ্ল্যাট, জমি, ট্রাস্ট, বা অন্য কোনো মূল্যবান সম্পদ যদি রিটার্নে না দেখানো হয়, তবে তা এই বিধানের আওতায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। এই ধারা অনুযায়ী, করদাতা যদি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হন, তাহলে Deputy Commissioner of Taxes (DCT) বা উপ কর কমিশনার ওই বিদেশস্থ সম্পত্তির Fair Market Value এর সমান জরিমানা আরোপ করতে পারেন। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জরিমানার পরিমাণ নির্ধারিত হয় সম্পত্তির বাজারমূল্যের সমান ভিত্তিতে। অর্থাৎ, যদি বিদেশস্থ সম্পত্তির বাজারমূল্য ৫০ লাখ টাকা হয়, তবে জরিমানাও ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তাই এটি “অতিরিক্ত কোনো আলাদা অর্থ” নয়; বরং অপ্রদর্শিত সম্পদের মূল্য যত, জরিমানার দায়ও তত। এই কারণেই বিদেশস্থ সম্পত্তি বা বিদেশে রক্ষিত অর্থ করদাতার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়, কারণ ছোট একটি disclosure lapse ও বড় অঙ্কের আর্থিক দায় তৈরি করতে পারে। এই জরিমানা আরোপের আগে করদাতাকে যুক্তিসংগত শুনানির সুযোগ দিতে হবে। অর্থাৎ কর্তৃপক্ষ একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না; করদাতাকে ব্যাখ্যা দেওয়ার, নথি উপস্থাপন করার, এবং নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার সুযোগ দিতে হবে। তবে শুনানির পরও যদি ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য না হয়, তাহলে জরিমানা আরোপের ক্ষমতা কার্যকর হয়। এ ছাড়া উপযুক্ত কারণে কর্তৃপক্ষ বিদেশস্থ সম্পত্তি সম্পর্কে দেশে বা বিদেশে তদন্তও করতে পারে। বাস্তবে এর মানে হলো, করদাতার প্রদত্ত তথ্যের সঙ্গে ব্যাংক রেকর্ড, রেমিট্যান্স ট্রেইল, আয়ের উৎস, এবং সম্পদের মালিকানা নথির মিল খুঁজে দেখা হবে। যদি সেই নথি না মেলে, তাহলে করদাতার বক্তব্য দুর্বল হয়ে যায়। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই বিধান অন্য কোনো আইনের অধীন সম্ভাব্য দায়কে বাতিল করে না। অর্থাৎ, একই ঘটনায় কর ফাঁকি, অঘোষিত আয়, অপ্রদর্শিত সম্পদ, মানি লন্ডারিং, বা অন্য আর্থিক অপরাধের প্রশ্নও উঠতে পারে। ফলে ধারা ২১ শুধু একটি কর জরিমানার বিধান নয়; এটি আন্তর্জাতিক সম্পদ ধারণ, বিদেশে অর্থ স্থানান্তর, এবং করদাতার disclosure compliance এর ওপর একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণমূলক বিধান। তাই বিদেশে কোনো সম্পদ বা অর্থ রাখা নিজে নিজে অপরাধ নয়; কিন্তু সেই সম্পদের উৎস যদি বৈধভাবে ব্যাখ্যা না করা যায়, আয়কর রিটার্নে প্রকাশ না করা হয়, বা বৈধ ব্যাংকিং ও রেমিট্যান্স চ্যানেলের প্রমাণ না থাকে, তাহলে তা গুরুতর কর ঝুঁকি তৈরি করে। অর্থাৎ, বিদেশে টাকা বা সম্পদ থাকলেই সমস্যা নেই। সমস্যা হয় তখন, যখন করদাতা দেখাতে পারেন না এটি কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে অর্জিত হয়েছে, কীভাবে বিদেশে গেছে, এবং কেন রিটার্নে দেখানো হয়নি। এই চারটি বিষয়ের মধ্যে যেকোনো একটিতে দুর্বলতা থাকলে, সম্পত্তিকে অপ্রদর্শিত বিদেশস্থ সম্পত্তি হিসেবে ধরে Fair Market Value এর সমান জরিমানার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই source of fund, banking trail, remittance trail, ownership proof, এবং return disclosure এই পাঁচটি বিষয় সবসময় ঠিক রাখতে হয়।
“গোপন সম্পদ দ্বিগুণ দায় - একবার জরিমানা, একবার মূল্য”