26/05/2017
Upendra Sarobar, San 1341 Bengali Year ,
Nagarpur, Tangail.
উপেন্দ্র সরোবর, সন ১৩৪১ বাংলা, নাগরপুর, টাংগাইল।
প্রাচীনত্বে নাগরপুর ও নামকরনের ইতিহাস এবং এই উপজেলার ঐতিহ্য ...........
বিশেষ কিছু ব্যতিক্রম ব্যতিরেকে সাধারণভাবে দেশের বিভিন্ন জায়গার নামকরণ বিশেষত প্রাচীনত্বের দিক থেকে এর সঠিক যুক্তি স্বীকৃত কোন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ পাওয়া যায় না। সেদিক থেকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে লোক বা জনশ্রুতির উপর নির্ভর করতে হয়। নাগরপুরের নামকরণ নিয়েও একাধিক লোক কাহিনী বা জনশ্রুতি প্রচলিত। প্রমত্তা যমুনা ধলেশ্বরী বেষ্টিত একটি ব’দ্বীপ বিশেষ জনপদ এই নাগরপুর। জনশ্রুতি এই - সুলতান মাহমুদশাহর আমলে নাগরপুরের মামুদনগর ছিল তাঁর রাজধানী। এখানে বিশাল এক নৌ ঘাটি ছিল তাঁর। শোনা যায় বিদেশী আক্রমনের হাত থেকে এই অঞ্চলকে রক্ষা করার জন্যেই সম্রাট মাহমুদ শাহ এই নৌ ঘাটিটি নির্মাণ করেছিলেন। মামুদনগরে এখনো শেরশাহ-র জঙ্গল, মতিবিবির বাগ এবং ১০১টি পুকুরের অস্তিত্ব আঁচ করা যায়। কথিত আছে এক রাতেই কিনা এই পুকুরগুলো খনন করা হয়েছিল। এক সময় বর্তমান চৌহালীর পূর্বাংশ , নাগরপুর, দৌলতপুরের অংশ বিশেষ সহ পুরো এলাকা ছিল নদী এলাকা। কালের বিবর্তনে এই এলাকা চর এলাকায় রূপ নেয়। চরাঞ্চল হলেও জনপদ সৃষ্টির পূর্বে এখানে প্রচুর বনজঙ্গল ছিল। জঙ্গলে বিভিন্ন প্রজাতির বিষধর সাপ থাকত। সাপগুলো বিভিন্ন নাগ-নাগিনী নামে পরিচিত ছিল। বিষাক্ত সাপের ভয়ে ভীত থাকত সবাই। মানুষ একা চলতে সাহস করত না। সব সময়ই দলবদ্ধভাবে চলাচল করত। এ সময় ভারতে পুরী থেকে ‘‘নাগর মিয়া’’ নামে এক বৃদ্ধ এই এলাকায় আসেন। শোনা যায় তিনি ছিলেন অবিবাহিত। সাপ বা শরীসৃপ জাতীয় প্রাণী নিয়েই তিনি জীবন যাপন করতে ভালবাসতেন। এই ভালবাসাবাসির সূত্র ধরেই পুরী থেকে একে একে তাঁর অনেক অনুসারীরা আসতে থাকল এবং এক সময় এ অঞ্চল মানুষের জন্যে ভয় থেকে অভয়ের অঞ্চল হয়ে উঠল। আর এভাবেই নাগরে -নাগরে পূর্ণ হয়ে এলাকার নাম হলো নাগরপুর। অবশ্য এর একাধিক ভিন্ন মতও দেখা যায়।
প্রাচীন লৌহজং নদীর তীরে অবস্থিত নাগরপুর মূলতঃ নদী তীরবর্তী এলাকা হওয়ার কারনেই নাগরপুরে গড়ে উঠে বিভিন্ন ধরণের ব্যবসা কেন্দ্র। ব-দ্বীপ সদৃশ নাগরপুরের পূর্বে ধলেশ্বরী এবং পশ্চিম পাশ দিয়ে বয়ে গেছে যমুনা। যমুনা নদী দিয়ে সরাসরি কলকাতার সাথে এলাকার দৈনন্দিন যোগাযোগ ছিল।
সলিমাবাদের বিনানইর হাট খুবই বিখ্যাত ছিল। ইংরেজ আমল শেষ এবং পাকিস্তান আমলের একটি বড় সময়কাল পর্যন্ত এই ঘাট থেকেই তৎকালীন বৃটিশ রাজাধানী কলকাতার সাথে মেইল স্টিমারসহ মাল এবং যাত্রীবাহী স্টিমার সার্ভিস চালু ছিল। ফলে নাগরপুরের সাথে রাজধানী কলকাতার একটি বানিজ্যিক এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে উঠে। আর এরই সূত্র ধরে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিক মোঘল আমলের সূচনা লগ্নে নাগরপুরে চৌধুরী বংশের আর্বিভাব ঘটে। সুবিদ্ধা খা-ই এই চৌধুরী বংশের পূর্ব পুরুষ বলে জানা যায়।
মোঘল আমলের শেষ তথা বৃটিশ আমলের একটা সময় পর্যন্ত এদেশের সামগ্রিক শিক্ষার গুণগত মান তেমন ভাল ছিল না। বলা চলে শিক্ষার ক্ষেত্রে এলাকার মানুষ একেবারেই অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। এমনই এক তমসাচ্ছন্ন অবস্থায় ক্ষণজন্মা পুরুষ কিশোরী চন্দ্র প্রামানিক সর্বপ্রথম সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দে কে,সি, গরীব পাঠশালা নামে একটি পাঠশালা স্থাপন করেন। এটিই নাগরপুরে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সর্বপ্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এরপর ১৮৭৯ সালে গয়হাটা উদয়তারা মাইনর স্কুল, ১৮৮৫ খ্রিঃ প্রতিষ্ঠিত হয় আড়রা কুমেদ মাইনর স্কুল এবং ১৮৯০খ্রিঃ প্রতিষ্ঠিত হয় কেদারপুর মাইনর স্কুল। শিক্ষার পথিকৃত কিশোরী চন্দ্র প্রামানিক প্রাথমিক শিক্ষা পাশাপাশি উচ্চ শিক্ষার প্রবল বাসনা নিয়ে নাগরপুরে শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিদের কাছে উদাত্ত আহবান জানান। তারই আহবানে সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসেন শিক্ষানুরাগী দুই মহাপ্রাণ - যাদব লাল চৌধুরী এবং হরিলাল চৌধুরী। এই ত্রিরত্ন মিলে ১৯০০খ্রিঃ ১ফেব্রুয়ারী প্রতিষ্ঠা করেন ‘‘নাগরপুর হাই ইংলিশ স্কুল’’। বাঁশ আর ছন দিয়ে গড়া অত্র এলাকার একমাত্র হাইস্কুলটি একসময় যখন আর্থিক সংকটে পরে তার এক পর্যায়ে ইতোমধ্যে আধুনিক শিক্ষা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত নাগরপুর চৌধুরী বংশের প্রাণ পুরুষ রায় বাহাদুর সতীশ চন্দ্র চৌধুরী এবং তার শ্রদ্ধেয় কাকা জগদীন্দ্র মোহন চৌধুরী মিলে তাঁর প্রপিতামহের নামে বিদ্যালয়টির নামকরণ করেন ‘‘যদুনাথ হাই ইংলিশ স্কুল’’।
এভাবেই চৌধুরী পরিবারের বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব তাঁদের জমিদারী এবং নিয়মিত ব্যবসা বানিজ্যের পাশাপাশি এলাকার বৃহত্তর সাধারণ জনগোষ্ঠীর জন্য গড়ে তোলেন পুন্ডরীকাক্ষ দাতব্য চিকিৎসালয়, সুপেয় পানি পান করার জন্যে খনন করেন নৈসর্গিক সৌন্দর্যমন্ডিত সুবিশাল ‘‘দীঘি উপেন্দ্র সরোবর’’, ‘‘উমা সন্দুরীর বাগান’’, প্রতিষ্ঠা করেন উপ-মহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফুটবল ক্লাব- ইষ্ট বেঙ্গঁল ক্লাব। বর্তমান হাসপাতাল মাঠে (যদুনাথ ময়দান) যাদের ফুটবল ক্রীড়া নৈপুন্যে মুগ্ধ হতেন এলাকার ক্রীড়ামদি মানুষ।
এভাবেই নাগরপুরে চৌধুরী পরিবারের আধুনিক চিন্তা, জীবন দর্শন এবং মননের পাশাপাশি পাকুটিয়া জমিদার বাড়ী সহ জীবন জীবিকার প্রয়োজনে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব কর্তৃক গড়ে উঠে বিভিন্ন স্থাপনা যা পরবর্তীকালে জনস্বার্থে ব্যবহারের পাশাপাশি দর্শনীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবেও নন্দিত। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ্য চৌধুরীবাড়ীর বিভিন্ন স্থাপত্য, যাদব বাবুর বাড়ীর সিংহদ্বার, পাকুটিয়া জমিদারদের সুদৃশ্য নান্দনিক অট্টালিকা, গয়হাটার মঠ, সলিমাবাদের জামে মসজিদ, সুদাম পাড়া জামে মসজিদ , রাথুরা শাহ পীরের মাজার, ভয়াল একাত্তরের বিশেষ স্মৃতি স্মারক বনগ্রামের গণকবর। সহবতপুর ইউনিয়নের সন্তান সন্তুতি হারা নিঃস্ব এক অভাগা পিতার শোকগাঁথা স্মারক, একান্তরের সারাংপুর ট্রজেডি, নাগরপুর কেন্দ্রীয় মসজিদ, কেন্দ্রীয় মহা-শ্মশান, সরকারী কলেজ, যদুনাথ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, নয়ানখান মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়- এছাড়াও ছিলেন বিভিন্ন সময় বিশিষ্ট মানব দরদী সামাজিক ও রাজনৈতিক সাহিত্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। ইতিহাস সত্য যে, ধুবড়িয়া ইউনিয়ন সদরে বাংলা সাহিত্যে ‘‘মনসা মঙ্গল’’ কাব্যের কবি রায় বিনোদ এর আদিবাস ছিল।