14/12/2025
যেটা না হলে আমরা জানতামই না!
হাদী যদি এই অবস্থায় না আসতেন, তাহলে কি আমরা কোনোদিন জানতাম তিনি কাদের সঙ্গে চলাফেরা করছিলেন? কাদের ভিড়িয়েছিলেন দলে? কাদের দ্বারা ভোট টানতে চেয়েছিলেন? জানতাম না। একদমই না। কেন জানতাম না এর দুটো কারণ আছে।
এক, এইসব বিষয় প্রচার হতো না। হাদী জনপ্রিয়, হাদী ভাইকে সবাই ভালোবাসে, ইত্যাদি আবেগী ইমেইজে ঢাকা থাকতো। তার চারপাশের লোকজনকে কেউ খুঁটিয়ে দেখতো না।
দুই, বিএনপি বেকুব। এটা কঠিন কথা, কিন্তু সত্য। বিএনপির তরুণরাও এইসব খবর রাখে না, রাখার সংস্কৃতিও নেই। কে কার সঙ্গে ঘোরে, কে কার নেটওয়ার্ক এই দরকারী ইনফরমেশন ওয়ারে বিএনপি প্রায় জিরো।
এখন আসি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়, জামাত কেন এসব জানার পরও চুপ ছিলো?
কারণ, জামাত শিবির এখন বিএনপিকে দমন করার জন্য করবেনা এমন কোনো কাজ নাই। তারা ভালো করেই জানতো হাদীর সঙ্গে কারা আছে। তারা জানতো এই লোকগুলো লীগের। কিন্তু বলেনি। জানতেও দেয়নি। কারণ বিএনপিকে চাপে রাখতে লীগের লোক দরকার হবে। লীগের গুন্ডাদের ইউজ করা যাবে ভয় দেখাতে, ন্যারেটিভ বানাতে, মাঠ গরম রাখতে, এবং ভোট পেতে।
এখানে একটা ইন্টারেস্টিং প্যাটার্ন দেখা যায়। কিছু ভিডিও ফুটেজ সামনে এসেছে। লক্ষ্য করলে দেখা যায় হাদীর অফিসে, ব্যক্তিগত জায়গায়, ওই লোকগুলোর মুখে কোনো মাস্ক নেই। কিন্তু হাদীর সঙ্গে পাবলিক স্পেসে গেলে, ক্যাম্পেইনে গেলে সবাই মাস্ক পরে।
এর মানে কী?
এর দুইটা সম্ভাব্য ব্যাখ্যা আছে। এক, হাদী নিজেই চাইতেন না লোকজন তাদের চিনে ফেলুক, তাই বাইরে গেলে মাস্ক বাধ্যতামূলক ছিলো। অথবা দুই, ওই লোকগুলো হাদী ও তার ঘনিষ্ঠদের নিরাপদ মনে করলেও, জনসমক্ষে নিজের চেহারা প্রকাশ করাকে নিরাপদ মনে করতো না। ভয়টা ছিল বাইরের লোকদের নিয়ে হাদী বা তার বলয়ের লোকদের নিয়ে না। কারণ তারাতো হাতেই আছে, চেনে।
এখন একটু স্মৃতিচারণ করুন। কিছুদিন আগে ফেসবুকে অসংখ্য জামাতি আইডি ঘোষণা দিয়েছিলো তারা 'এনিহাউ' ওসমান হাদীকে জিতিয়ে আনবে মীর্জা আব্বাসের বিপরীতে। ভালো কথা। কিন্তু এই 'এনিহাউ' শব্দটার মানে কি? এর মানে, যে কোনো পদ্ধতিতে। নীতি নৈতিকতা বাদ দিয়ে। এভরিথিং ইজ ফেয়ার।
এরপর দেখা গেলো প্রতিটি জামাতি আইডি থেকে হাদীর প্রশংসা। আবেগী লেখা। "বন্ধুকে ফোন দিলাম, টাকা পাঠাবে, চাচাকে ফোন দিলাম, কাঁদলো, দোয়া করতেছে”। এইসব আবেগী ন্যারেটিভে ফেসবুক ভরে গেলো। হাদীকে বানানো হলো ট্রাম্প কার্ড। একজন অতিমানব, ত্রুটিহীন, সহজ-সরল, সবার ভালোবাসার নেতা। পিতারা চাইতে শুরু করলো তাদের সন্তানেরা যেনো হাদীর মত হয়।
এখন প্রশ্ন, মীর্জা আব্বাসের মতো একজন হেভিওয়েট বিএনপি নেতাকে হারাতে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি কোনটা? উত্তরটা সবাই জানে। লীগকে ব্যবহার করা। প্রয়োজনে লীগ পুনর্বাসন। প্রয়োজনে লীগকে বন্ধু বানানো। প্রয়োজনে লীগের খুনী জেলখাটা গুন্ডা ছেলেদের দলে ঢোকানো। উদ্দেশ্য একটাই, মীর্জা আব্বাসকে হারানো। এটাই ছিল সেই এনিহাউ।
এই কারণেই “চান্দাব্বাস” শব্দে ফেসবুক সয়লাব করা হলো। মীর্জা আব্বাসকে উপস্থাপন করা হলো ভয়ংকর গডফাদার হিসেবে। এই ক্যারেক্টার এসাসিনেশনের কাজটা কারা করলো? দেখলেই বোঝা যায়। এটা ছিলো হাদীকে জিতিয়ে আনার প্রাইমারি স্টেপ।
এসবের মধ্যে হত্যাকারী একদিন অস্ত্র হাতে ডাকাতি টাকা লুট মামলায় জেলে যায়। পত্রিকার এক কোনায় আসে খবরটি। কিন্তু ক্রিমিনালের রাজনৈতিক পরিচয় গোপন রাখা হয়৷ কোথাও লেখা হয়না র্যাব যাকে ধরেছে সে সাবেক ছাত্রলীগ। একই মিডিয়া কিন্তু দুই প্রতিবেশীর কোন্দলে একটা মুরগী ধরে নিয়ে গেলেও বলে " যুবদল নেতা মুরগী চুরি করেছেন।"
আর জামাতীরা লীগের এসব চাঁদাবাজিকে প্রচার করেছে বিএনপির চাঁদাবাজি হিসেবে।
আর সেকেন্ড স্টেপ ছিলো লীগ ভিড়ানো। লীগের কুকুর পেলেও দলে নেওয়া। এবং এভাবেই তারা বিএনপির এই হেভিওয়েট প্রার্থীকে হারিয়ে বিএনপিকে একহাত দেখে নিতে চেয়েছিলো। হাদীর পকেটে বান্ডিল গুঁজে দেয়া, হাদিয়ার নামে টাকা পাঠানো, এসবের উদ্দেশ্য হাদীকে ভালোবাসা দেখানো না। উদ্দেশ্য ছিলো এক এবং একমাত্র বিএনপিকে রুখে দেয়া।
তৃতীয় স্টেপ ঘটেছে হামলার ঠিক পরপর। সমন্বিতভাবে মীর্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে জামাতের সবচেয়ে বড় দুই পদধারী এবং তাদের আইডি থেকে সরাসরি স্ট্যাটাস দেয়া উনাকে ইঙ্গিত করে। যেটি ছিলো অভাবনীয়! তদন্ত ছাড়া, পুলিশ বা আইনশৃংখলা বাহিনীর বিবৃতি ছাড়া, তড়িঘড়ি করে মীর্জা আব্বাসের মত বর্ষীয়ান ও গুরুত্বপূর্ণ ঝানু নেতাকে দায়ী করে স্ট্যাটাস!
এখন কল্পনা করুন উল্টো দৃশ্যটা। ধরুন, বিএনপির কোনো তরুণ নেতা গুলিবিদ্ধ হয়েছে। সে লীগের বিরুদ্ধে ভোকাল ছিলো। পরে দেখা গেলো, খুনীরা তার সঙ্গে চা খেয়েছে, আড্ডা দিয়েছে, ছবি-ভিডিও আছে।
কি হতো?
“আলহামদুলিল্লাহ” দিয়ে ফেসবুক ভেসে যেত। বলা হতো বিএনপি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে মারা খাইছে। লীগ পুনর্বাসন করতে গিয়ে ফল পাইছে। উচিত কাজ হইছে। বলছিলাম না লীগ ফিরলে বিএনপির ঘাড়ে করেই ফিরবে?
কিন্তু হাদীর বেলায় উল্টোটা ঘটলো। ভয়ংকর লীগের সঙ্গে ওঠাবসা করলেও সেটার চিত্রায়ণ হলো "হাদী ভাই কত সহজ-সরল! জানতোই না কিছু! সব মানুষকে হৃদয়ে ধারণ করে!” হাদী লীগ ভিড়ালে সেটা উদারতা। আর বিএনপি নাকি লীগ পূনর্বাসন করে, দলে ভিড়ায়!
শেষ পর্যন্ত উদ্দেশ্য একটাই, বিএনপিকে জিততে দেওয়া যাবে না। বিশেষ করে মীর্জা আব্বাসের মতো হেভিওয়েট কাউকে। বিএনপির জন্য তিনি এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। প্রয়োজনে লীগের সঙ্গে মিলবো, লীগের সাহায্য নেবো মীর্জা আব্বাসকে ঠেকাতে। এইটাই প্ল্যান ছিলো না?
কিন্তু মানুষ প্ল্যান করে এক, আর হয় আরেক। সব একদম প্রকাশ হয়ে পড়লো! আল্লাহ কারে যে সেইভ করলেন এই ঘটনায়, কে যে ক্ষতিগ্রস্ত হলো, কার প্ল্যান ভন্ডুল হলো, সব আল্লাহ জানেন। কারণ মানুষের শয়তানি প্ল্যান খাইয়া দেওয়ার জন্য উপরে তিনি একজন আছেন। যিনি সব পরিকল্পনাবিদের চাইতে বড় পরিকল্পনাবিদ।
তিনি যা ঠিক করে রেখেছেন, তার সঙ্গে যুদ্ধ করে জেতার মতো যোদ্ধা এই দুনিয়াতে নাই। আখিরাতেও নাই। হাদির সুস্থতা কামনা করি। এবং আমরা সত্যিকার ঘটনা জানি না৷ মানুষের মন জানিনা। আমরা কেবল ধারণা করে সূত্র মিলিয়ে বিশ্লেষণ করতে পারি।