12/05/2024
সমাজের মানুষরূপী অমানুষগুলো
গতকাল ঢাকা ময়মনসিংহ রোডের ভালুকাতে, একটা মারাত্মক এক্সিডেন্ট ঘটেছে। বাবা স্পটেই মারা গিয়েছেন, মা আর ৭/৮ মাস বয়সী ছোট বাচ্চাকে ময়মনসিংহ মেডেকেলে ভর্তি করা হয়েছিল। গতকাল রাতেই বাচ্চাটার মা মারা গিয়েছে। ছোট অবুজ এতিম বাচ্চাটা এসবের কিছুই জানে না। ময়মনসিংহ মেডিকেলের ২৬ নাম্বার ওয়ার্ডে, এই অবুঝ এতিম বাচ্চার কান্নায়, পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। সবাই চেষ্টা করছে ফেসুবকে পোষ্ট শেয়ার করে, বাচ্চাটার ফ্যামিলির খোঁজ নেয়ার, শেষ খবর পর্যন্ত এখনো বাচ্চার ফ্যামিলির খোঁজ পাওয়া গিয়েছে।
অত্যন্ত লজ্জার বিষয় হচ্ছে যখন এক্সিডেন্ট হয়, তখন কিছু মানুষরূপী অমানুষ উদ্ধারের নাম করে, তাদের মোবাইল, টাকাপয়সা, স্বর্ণালংকার সব লুট করে নিয়ে, রাস্তায় ফেলে যায়। পরে রাস্তায় টহলরত পুলিশে ভাইদের সহায়তায়, তাদের উদ্ধার করে মেডিকেলে পাঠানো হয়। তাদের মোবাইলটা অন্তত যদি পাওয়া যেত তবে বাচ্চাটীকে অন্তত দ্রুত পরিবারের কাছে পৌঁছে দেয়া যেত। আমার আজকের লেখার বিষয়, এই মানুষরূপী অমানুষ লুটেরাদের নিয়ে। আমরা জাতি হিসাবে কতটা নিকৃষ্ট অবস্থায় পৌঁছেছি, সেটা হয়ত আমরা জানি না। সমাজে আমরা যারা নিজেদের ভাল মানুষ হিসাবে দাবী করি, আমরা আসলে মূলত সুযোগের অভাবে ভাল। সুযোগ পেলেই আমাদের আসলরূপ বের হয়ে আসে। এই এক জীবনে মানুষের কত নিকৃষ্টরূপ যে দেখেছি, সেটা বলে শেষ করা সম্ভব নয়। আজ থেকে প্রায় ১২ বছর আগে, আমার এক কলিগ তাদের গ্রামের নিকৃষ্ট লুটেরা মানুষদের গল্প বলেছিল, আজকে সেই গল্পটা হঠাৎ মনে পড়ে গেল। গল্পটা আপনাদের সাথে শেয়ার করতে পারি।
সেই কলিগের গ্রামটা হচ্ছে লুটেরাদের গ্রাম, এটা ওপেন সিক্রেট ছিল এবং সবাই ব্যাপারটা জানত। সেই গ্রামের প্রায় সবাই, লুটপাটের সাথে জড়িত ছিল। ব্যাপারটা খুলে বলি, সেই গ্রামের মধ্য দিয়ে, জেলার প্রধান সড়ক চলে গিয়েছে। রাস্তাটা দুর্ঘটনাপ্রবন, এখানে প্রায়ই সময় দুর্ঘটনা ঘটত। নদীর উপর একটা ব্রিজ আছে, ব্রিজটা অনেক উচু, আর ব্রিজের গোড়ার দুই পাশে মাটি সরে গিয়ে গর্তের সৃষ্টি হয়েছিল। বেশিরভাগ দুর্ঘটনা এখানেই ঘটত। কোন দুর্ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই, গ্রামের শত শত মানুষ বের হয়ে আসত। তারা উদ্ধারের নাম করে, বাসের যাত্রীদের সর্বস্ব লুটপাট করে নিত। কোন ট্রাক উল্টে গেলে ট্রাকের সব মালামাল লুটে নিত। বলা যায় এটা তাদের উপরি ব্যাবসা ছিল। তারা সব সময় কান খাড়া রাখত, কখন এক্সিডেন্ট ঘটে। দীর্ঘদিন এক্সিডেন্ট না হলে তারা মন খারাপ করত। এটা নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র অনুশোচনা ছিল না। গ্রামের প্রায় সবাই পশুতে পরিণত হয়েছিল। এই গ্রামে যে ভাল মানুষ ছিল না এমন না, তবে তাদের সংখ্যা খুবই কম ছিল। তারা কিছুই করতে পারে না আফসোস করত।
সেই বছর রোজার ঈদের দিনে রাতে ঘটা, একটা দুর্ঘটনার গল্প সে আমার সাথে শেয়ার করেছিল, সেই কথা মনে হলে, এখনো আমার খারাপ হয়। সেই বছর রোজার ঈদে ঢাকার একটা লোকাল বাস ভাড়া করে, গার্মেন্টসের কিছু কর্মী ঈদ করতে বাড়ী আসছিল। এরা সাধারণত ঈদ ঢাকাতেই করে, বড়লোকদের দান খয়রাত, জাকাতদের টাকা, শাড়ি লুঙ্গি কালেক্ট করত। নিজের জমানো টাকা দিয়ে বাড়ীর সবার জন্য কেনাকাটা করত। এর পরে, ঈদের দিন কোন একটা বাস রিজার্ভ করে, সবাই একসাথে বাড়ী আসত। মাঝে রাতে সেই লোকাল রিজার্ভ বাসটা ব্রিজের উপর উঠছিল, ড্রাইভার যেহেতু এলাকার না, তাই রাস্তাঘাট না চেনার কারনে সে বিপদ টের পায়নি। রাতের অন্ধকারে সে বাসটা কন্ট্রোল করতে পারেনি, বাসের একটা চাকা গর্তে পড়ে যায়। সাথে সাথে বাসটা কয়েকবার উল্টে গিয়ে খাদে পড়ে গিয়েছিল। এই মারাত্মক দুর্ঘটনায়, স্পটেই কয়েকজন মারা গিয়েছিল। বাসের প্রায় সবাই কমবেশি মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিল। বেশিরভাগ ছিল নারী আর শিশু।
যথারীতি গ্রামের মানুষরূপী অমানুষগুলো দৌড়ে এসে লুটাপাট করতে থাকে। যাত্রীদের সবার ঈদের মালামালগুলো ছিনিয়ে নিচ্ছিল। এমনকি নারীদের কান ছিড়ে, কানের দুলগুলো নিয়ে নিয়েছিল। বাসের এক নারীর কোমরের থেকে নিচের অংশ পুরা থেতলে গিয়েছিল, তার বেশিক্ষণ বাঁচার কথা না, এর পরেও সে তার ব্যাগটা আগলে রেখেছিল। এক গ্রামবাসী সেই ব্যাগ টানাটানি শুরু করলে, মহিলাটি কাতর কণ্ঠে বলে, ভাই এখানে আমার পরিবার আর বাচ্চাদের সব কেনাকাটা আছে, এটা নিয়েন না, দোহাই লাগে। তখন সেই পাষাণ গ্রামবাসী বলে, তুইত কিছুক্ষণের মধ্যে মারা যাবি, এসব মালামাল দিয়ে কি করবি, আমারে দিয়ে দে, বলেই সে টান দিয়ে সেই ব্যাগটা ছিনিয়ে নিয়েছিল। সেই মৃত্যুপথযাত্রী নারীর আহাজারি, সেই লোকের মন গলাতে পারেনি।
গ্রামের এক বয়স্ক লোক ঘুমিয়েছিল, ফলে আসতে দেরি করে ফেলে। যে যতক্ষণে বাসের কাছে পৌঁছেছে, ততক্ষণে লুটপাট শেষ। কি আর করার, হঠাৎ সে দেখল, একটা তিন সিটের চেয়ার ভেঙ্গে পড়ে আছে। সেই সেই তিন সিটের চেয়ার মাথায় করে বাড়িতে নিয়ে এসেছিল। সিটে তখনো রক্তের দাগ লেগেছিল। শিতের দিনে সে উঠানে, তিন সিটের চেয়ারে বসে রোদ পোহাত। বছরের অন্য সময় বারান্দায় ইটের উপর তিন সিটের চেয়ার বসান থাকত। সে চেয়ারের গদিতে বসে, আয়েশ করে চা পান করত, মাঝে মাঝে সে সেই চেয়ারে ঘুমাত। এভাবে সে অনেক দিন সে সেই তিন সিটের চেয়ার ইউজ করেছিল। মানুষের মধ্যে পরিবর্তন এত সহজে আসে না। জানি না সেই লুটেরাদের গ্রামের মানুষগুলো, এখনো সেই অমানুষ হিসাবেই রয়ে গিয়েছে কিনা।
এই ধরনের অসংখ্য মানুষরূপী অমানুষগুলো আমাদের সমাজে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তারা দেখতে আমাদের মতই। কিন্তু বিপদের সময় তাদের ভয়ংকর রূপ বের হয়ে আসে। একটা উদাহরণ দিতে পারি, বেশ কয়েক বছর আগে, আমার শ্বশুরবাড়ির এলাকায় একবার ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছিল। ষ্টেশনের এক চায়ের দোকানদার যাকে ভাল লোক হিসাবে জানতাম, যার দোকানে আমিও অনেকবার চা খেয়েছি। সে এক্সিডেন্ট হওয়া ট্রেনের বগি থেকে, মাত্র ২৩ টা দামী মোবাইল হাতিয়ে নিয়েছিল। পরে আস্তে আস্তে সব সেট সে বিক্রি করে। এসব মানুষরূপী অমানুষগুলো উপর আল্লাহর লানৎ। আমার দৃঢ় বিশ্বাস তারা দুনিয়াতেই তাদের পাপের ফল পাবে, আর পরকালের ভয়ংকর কঠিন শাস্তিত তাদের জন্য অপেক্ষা করছেই। আল্লাহ্ আমাদের সবাইকে বুঝ দান করুন।
vai