06/01/2026
আজকাল বুকের ভেতর এক ধরনের ভারী কষ্ট জমে থাকে। মনে হয়, হজ আর উমরাহ—যে ইবাদতগুলো মানুষের জীবন উল্টে দেওয়ার কথা ছিল—সেগুলো ধীরে ধীরে ফ্যাশন আর ট্রেন্ডে পরিণত হচ্ছে।
আল্লাহর ঘরে যাওয়ার ডাকটা যেন আর কান্নার ডাক নয়, বরং ক্যামেরা অন করার সিগন্যাল।
আজকাল মনে হয় হজ ও উমরাহ ইবাদত কম, ফ্যাশন ও ট্রেন্ড বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে ইবাদত হওয়ার কথা ছিল আত্মশুদ্ধির সর্বোচ্চ মাধ্যম, গুনাহ মাফের সুযোগ, আল্লাহর সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়ার এক পবিত্র যাত্রা—সেটাই আজ অনেকের কাছে যেন স্ট্যাটাস সিম্বল, সামাজিক মর্যাদার প্রদর্শনী আর সোশ্যাল মিডিয়ার কনটেন্ট।
কাবা শরিফ—যেখানে দাঁড়িয়ে নবী-রাসূলরা কেঁদেছেন, সাহাবিরা বুক ফাটিয়ে তাওবা করেছেন, যেখানে মানুষের অহংকার গলে যায়—সেই পবিত্র জায়গাটার সামনেই আজ অনেকের চোখ থাকে মোবাইল স্ক্রিনে।
অথচ কাবা শরিফের সামনে দাঁড়িয়ে চোখ ভেজার কথা ছিল তাওয়াফে, অথচ এখন চোখ থাকে ক্যামেরার লেন্সে। ইহরাম পরা মানে ছিল দুনিয়ার সব ভেদাভেদ ভুলে আল্লাহর সামনে এক সমান বান্দা হওয়া, কিন্তু এখন ইহরাম পরাও যেন একটা প্রদর্শনী। কে কোন হোটেলে থাকছে, কে কতবার উমরাহ করেছে, কে বিজনেস ক্লাসে গেছে—এই সব আলোচনায় আসল প্রশ্নটা হারিয়ে যাচ্ছে: এই ইবাদত কি আমাদের ভেতরটা বদলাচ্ছে?
ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, আল্লাহ আমাদের চেহারা দেখেন না, পোশাক দেখেন না, সম্পদ বা জনপ্রিয়তা দেখেন না। আল্লাহ দেখেন আমাদের অন্তর আর আমাদের নিয়ত। কিন্তু আজকের বাস্তবতা হলো—অনেক মানুষ হজ বা উমরাহ পালন করছে ঠিকই, কিন্তু পরবর্তী জীবনে সেই ইবাদতের কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। নামাজ আগের মতোই অবহেলিত, হারাম-হালালের ব্যাপারে উদাসীনতা আগের মতোই, মানুষের হক নষ্ট করা, মিথ্যা বলা, অহংকার, হিংসা—সব আগের জায়গাতেই রয়ে গেছে।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে—হজ বা উমরাহ কি শুধু একটি সফর ছিল, নাকি আল্লাহর দিকে ফিরে আসার একটি অঙ্গীকার?
যদি ইবাদত শেষে জীবন বদলায় না, চরিত্র বদলায় না, চিন্তাভাবনায় কোনো পরিবর্তন না আসে—তাহলে আমাদের নিজের কাছেই প্রশ্ন করা উচিত, আমরা কি ইবাদতের আসল উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছি?
ইসলাম কখনো বলেনি যে, যারা পাপী তারা হজ করতে পারবে না। বরং ইসলাম বলে—হজ মানুষের পাপ মোচনের সুযোগ। কিন্তু ইসলাম এটাও বলে যে, হজের পর মানুষ আগের মতো থাকতে পারে না। হজ হলো নতুন করে শুরু করার নাম। যদি সেই নতুন শুরুটাই না হয়, তাহলে সমস্যাটা ইবাদতে নয়, সমস্যাটা আমাদের নিয়তে।
আজকাল অনেকেই ধর্মীয় ইবাদতকে বিচার করে বাহ্যিকতায়। কে কত বড় আলেম, কে কত দামী পোশাক পরে, কে কত সুন্দর করে কোরআন তেলাওয়াত করে—এসব দেখে আমরা মুগ্ধ হই। কিন্তু কে কতটা সত্যবাদী, কে কতটা আমানতদার, কে কতটা ন্যায়পরায়ণ, কে মানুষের কষ্টে পাশে দাঁড়ায়—এই গুণগুলো আর আলোচনায় আসে না। অথচ এগুলোই ইসলামের মূল শিক্ষা।
হজ ও উমরাহ যদি কেবল লোক দেখানোর জন্য হয়, তাহলে সেটা আর ইবাদত থাকে না—তা হয়ে যায় এক ধরনের পারফরম্যান্স। আর যেখানে পারফরম্যান্স শুরু হয়, সেখানে আল্লাহর সন্তুষ্টি হারিয়ে যায়। মানুষ খুশি হয়, কিন্তু আল্লাহ খুশি হন না। আর একজন মুমিনের জীবনে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো—মানুষের বাহবা পেয়ে আল্লাহর অসন্তুষ্টি অর্জন করা।
এ কথাগুলো কাউকে ছোট করার জন্য নয়, কাউকে বিচার করার জন্যও নয়। এটা আসলে আমাদের সবার জন্য এক ধরনের আত্মসমালোচনা। আমি, আপনি, আমরা সবাই—আমরা কেন ইবাদত করছি? আল্লাহর জন্য, নাকি মানুষ দেখানোর জন্য? যদি আল্লাহর জন্য করি, তাহলে লোক না দেখলেও সমস্যা নেই। আর যদি মানুষ দেখানোর জন্য করি, তাহলে কাবার সামনে দাঁড়িয়েও অন্তর ফাঁকা থেকেই যাবে।
আজকের সমাজে এমন একটা ধারণা তৈরি হয়েছে—ধর্ম মানেই বাহ্যিকতা। কিন্তু ইসলাম বাহ্যিকতার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। ইসলাম হলো চরিত্র, ইসলাম হলো নৈতিকতা, ইসলাম হলো দায়িত্ববোধ, ইসলাম হলো আল্লাহভীতি। হজ বা উমরাহ সেই চরিত্র গঠনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম—শর্ত হলো, আমরা সেটাকে ঠিকভাবে গ্রহণ করি।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো—যারা ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা সম্পর্কে খুব কম জানে, তারাও আজ হজ বা উমরাহ করছে। এটা খারাপ নয়, বরং আল্লাহ যাকে ডাকেন, তাকেই ডাকেন। কিন্তু সমস্যা তখনই হয়, যখন সেই ডাকে সাড়া দেওয়ার পরও মানুষ নিজের জীবন বদলাতে চায় না। তখন ইবাদত শুধু স্মৃতি হয়ে থাকে, পরিবর্তনের মাধ্যম হয়ে ওঠে না।
শেষ পর্যন্ত সত্যিটা খুব সহজ—
হজ ও উমরাহ আমাদের প্রোফাইল ছবি বদলানোর জন্য নয়, আমাদের চরিত্র বদলানোর জন্য।
যদি চরিত্র না বদলায়, তাহলে আমাদের আবার ভাবতে হবে—আমরা কি সত্যিই আল্লাহর পথে হাঁটছি, নাকি শুধু সমাজের ট্রেন্ড অনুসরণ করছি?
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় কী জানেন?
ইবাদত যখন লোক দেখানোর জন্য হয়, তখন মানুষ বাহবা দেয়—কিন্তু আল্লাহ নীরব থাকেন।
আর আল্লাহর নীরবতা মানেই সবচেয়ে বড় ক্ষতি।
এই কথাগুলো কাউকে ছোট করার জন্য নয়। আমিও এই সমাজেরই অংশ। আমাকেও এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়।
আমি কেন ইবাদত করি?
আমি আল্লাহকে খুশি করতে চাই, নাকি মানুষকে দেখাতে চাই আমি কতটা ধার্মিক?
কারণ সত্যিটা খুব কঠিন—
মানুষের চোখে ধার্মিক হওয়া সহজ, কিন্তু আল্লাহর কাছে কবুল হওয়া খুব কঠিন।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে খাঁটি নিয়ত, বিশুদ্ধ অন্তর এবং কবুলযোগ্য ইবাদতের তাওফিক দিন।
আমিন।