12/02/2015
ভাইয়া...
"তমা দেখে যাও ,দেখে যাও
কে এসেছে ..."
স্বামীর ডাকে রান্না ঘরের হাতের
কাজ ফেলে ঘরে ছুটে এলেন
তমা সুলতানা ।
ঘরে ঢুকে অতিথিকে দেখে
আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল
তমা ।"আরে ভাইয়া তুমি ?কখন
আসলে "
"এই তো এলাম ,আমাকে দেখেই
তো জামাই তোকে ডাকল "
"আসছো ,খুব ভাল হয়েছে ।
তবে একবার ফোন
করে আসলে কি এমন ক্ষতি হত ?"
"তাহলে হয়ত আমার বোনটির
মুখে হঠাৎ এই
হাসিটা দেখতে পেতাম
না ।।।সূর্যের বাজারে একটা কাজ
ছিল ।
তাই এসেছিলাম ।তাই ভাবলাম
বোনটাকে একটু দেখেই যাই..."
"অনেক ভাল হয়েছে তুমি এসেছো ।
তা ভাবী আর অথৈ কেমন আছে ?"
"এই তো ভালই আছে...তোরা কেমন
আছিস.."
"ভালই ।আচ্ছা ভাইয়া কলে চল । হাত
মুখ ধুয়ে আসো আমি চা বানাচ্ছি "
"আরে ধুরর ,হাত
পা ধোঁয়া লাগবে না ।
চা দিলে দে ,দুই চুমুক
খেয়ে চলে যাই..."
"বললেই হল নাকি ! দুপুরে ভাত
না খেয়ে এখান
থেকে কোথাও যেতে পারবে না ।
ভাইয়া তুমি এখনও এইরকম অপরিষ্কারই
আছো !আগে না এই জন্য মা এর
কাছে প্রতিদিন মার হজম করতা ?"
সাব্বির সাহেব ,তমা সুলতানার
একমাত্র ভাই ।তমার চেয়ে ছ বছরের
বড় ।।
ছোটকালে এমন কোন দিন নেই
যেদিন তারা ঝগড়া করত না ।।সব কিছু
নিয়েই ঝগড়া বাধতো তাদের ।
একদিন সন্ধ্যাবেলা পাশের বাড়ীর
রমিজ চাচার আমবাগান
থেকে কাঁচা আম চুরি করল দুজন ।
তেতুল দিয়ে ,চিনি দিয়ে কাঁচা আম
ভর্তাও করল ।।।কিন্তু ভাগ করার
সময় দুই ভাই বোনের
মধ্যে বাঁধলো আম্রকাননের প্রথম
যুদ্ধ..
দুজনই চায় সমান ভাগে ভাগ
করতে কিন্তু মনে মনে চায় এক
কণা হলেও বেশি পেতে ।ভাই
বোনের
মধ্যে বেশি কম ব্যাপার না ।ব্যাপার
হচ্ছে যে বেশি নিতে পারল সেই
অলিখিত যুদ্ধে জিতে গেল ।কিন্তু
কেউ কাওকে ছাড় দিতে নারাজ...
বহুত বাক বিতন্ডার পর কলাপাতায়
দুজন দু ভাগে সমান ভাবে ভাগে ভাগ
করলো ।কিন্তু
তমা বলে উঠলো ,"না না হবে না ভাইয়া তোমার
ভাগে রস বেশি ,আমার কম ।।"
চুরামি করে ধরা খেয়ে গেল সাব্বির
।
কিন্তু সেও দমে যাওয়ার পাত্র নয় ।
একটু হলেও তার বেশি নেয়া চাই ।
তাই
রস দিতে চেয়ে ইচ্ছাপূর্বক
খোঁচা মেরে তমার হাত থেকে একটু
ভর্তা ফেলিয়ে দিল ।আর তমাও
রাগের
বশে হাতে থাকা কাঁচি নিক্ষেপ
করলো সাব্বিরের কপাল বরাবর ।
ফলাফল তিনটা সেলাই...।।।
তমা যখন সবে মাত্র ক্লাস
এইটে তখনই তার বাবা মারা যায় ।আর
তাদের পরিবারে তার
বাবা ছাড়া উপার্জনক্ষম কেউ ছিল
না ।বাবার মৃত্যুর পর ভাই ই মানুষ
করেছে তাকে ।এস এস সি পাশ
করেছে তার ভাই এর টাকায় ।
তমারা থাকতো জেলা শহরের
পাশের
কোন উপজেলায় ।
অনেকটা গ্রামাঞ্চলই বলা চলে ।আর
গ্রামাঞ্চলে এস এস সি পাশ
করা মেয়ে মানে অনেক
বয়স্কা একজন মহিলা ।তাই
আশেপাশের মানুষের কথাতেই একদিন
ভাই তার জন্য এক সম্মন্ধ নিয়ে এল
।ছেলেও ভাল ,তাই অল্পকিছু দিনের
মধ্যেই বিয়ে হয়ে গেল তমার ।
স্বামী যখন উঠিয়ে আনে তখন
মাকে জড়িয়ে ধরে যতটা না কেঁদেছিল
তার চেয়ে বেশী কেঁদেছিল
ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরে ।।।
গ্রামে অলিখিত একটা নিয়ম ছিল ,
ভাই যখন বোনের বাড়ি যাবে তখন
বোন তার পালিত কোন
একটা মুরগী জবাই করে খাওয়াবে ।।
দিন বদলেছে ,মানুষ
বদলেছে ,যাতায়াত সহজ হলেও ভাই
বোনের ভালবাসা কখনও বদলে না ।।।
এখন নিজের মুরগি জবাই
করে দেয়া লাগে না কারণ এখন
প্রতিটি গ্রামেই আছে বাজার ।
আছে মুরগীর ফার্ম...
তমা মুরগীর মাংস আর পোলাও
রেঁধে নিজ হাতে ভাই এর
পাতে রানটা তুলে দিল ।
"আরে আরে আর কত দিচ্ছিস ,এত
খেতে পারবো না তো... "
"না ,আরেকটু ভাত নেও ।আর
একটা মাংস দেই ?"
"আরে না না... "
ভাইকে পেট
পুড়িয়ে খাওয়ালো তমা সুলতানা ।
ভাই যখন বিদায় নিবে তখন ভাই এর
সাথে সাথে বাড়ির রাস্তার
মাথা পর্যন্ত আসল ।তমার
মুখে হাসি ,চোখে জল...বিদায়
যে এমনই ।প্রিয়জনের বিদায় বেলায়
আমাদের
ঠোঁটে থাকে শুকনো হাসি আর
চোখে অশ্রু ।যে হাসির জন্য চোখের
অশ্রু আরও হৃদয়বিদারক হয়ে পড়ে...
ভাই চলে যাওয়ার পর স্বামীর
সাথে এক পশলা ঝগড়াও হয়ে গেল
তমার ।বিষয় এক পট পোলাও এর চাল...
আশিক [তমার স্বামী] এর বন্ধু আসার
কথা আগামীকাল ।ঘরে একটু পোলাও
এর চালই ছিল ।কিন্তু তমা তার
ভাইকেই রেঁধে দিয়েছি ।এ নিয়েই
ঝগড়া ।কিন্তু তমা ভেবেছিল কাল
সকালে কারও ঘর থেকে ধার
করে পোলাও এর চাল
আনবে তবে আশিক তা ভাবে নি ।।।
আসলে আমাদের সবার
ভাবনাটা যদি এক হত
তবে পৃথিবীতে কোন
অশান্তি থাকতো না...
পরদিন ভোর বেলা মুরগিকে খাবার
দিচ্ছে তমা ।এমন সময় ভাবীর ফোন...
~তমা তুই
তাড়াতাড়ি হাসপাতালে চলে আয়..
~কেন ভাবী কি হয়ছে ?
~তোর ভাই...
~থামলে কেন ভাবি কি হয়েছে বল ।
ভাইয়ার কি হয়েছে ?
~ স্ট্রোক করছে...
~কিহ্ !আমি আসছি ভাবী ,আসছি...
আশিক পাশেই দাঁড়ানো ছিল ।
তমা ফোনটা রাখার পর বলল...
~কি হয়েছে...
~ভাইজান স্ট্রোক
করেছে (কান্নাজড়িত কন্ঠে...)
আমি যাচ্ছি এখনই...
~যাচ্ছো মানে ??সকালে আমার
খেতে হবে না নাকি ?অন্তত
দুটা রুটি বানিয়ে রেখে যাও...
কথাটা শুনে তমা স্তব্ধ হয়ে গেল ।এত
নিষ্ঠুর কি কেউ হতে পারে !!তার ভাই
মৃত্যু পথযাত্রী আর সে...
অবশেষে কাঁদতে কাঁদতেই
অতি কষ্টে তিনটা রুটি বানিয়ে মনে মনে এই
সমাজ সংসারকে এক
কোটি একটা ধিক্কার
জানিয়ে হাসপাতালের
উদ্দেশ্যে রওনা দিল সে...
হাসপাতালের
১৭নং কেবিনে পৌছাতেই
তমা শুনতে পেল ভাবীর
গগনবিদারী আহাজারি ,মার করুণ
স্বরের কান্না......তমার সামনে শুয়ে আছে তার ভাই ।
এত সম্মানীয় ,ভালবাসার ভাই ।।।চোখ
বুজে চিরশান্তিতে ঘুমোচ্ছে...
"ভাইয়াআআআআ...."
তারপর তমা সুলতানাও
চুপ ,নীরব ,নিস্তব্ধ.....
_ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _
ভাই বোনের
ভালবাসা হচ্ছে পৃথিবীর
সবচাইতে খাঁটি ভালবাসা ।কারণ
বাবা মার সাথে আত্মীক
সম্পর্কটা ততটা গাঢ় হয়
না ততটা ,যতটা না হয় ভাই এর
সাথে বোনের...
কিন্তু বোনের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর
বোনেরা ভালবাসাটা ঠিকভাবে প্রকাশ
করতে পারে না সমাজের আশিক
নামক নিষ্ঠুর স্বামীদের জন্য ,স্বামীর
পরিবারের জন্য ।ভাই বোনের
ভালবাসার
মাঝে বাধা হয়ে দাড়ায় এরা ।কিন্তু
এ ভালবাসা মানে না কোন
বাধা ,মানে না কোন জীবন মৃত্যুর
বেড়াজাল...