30/07/2026
রিয়াদ শহর আলোয় ঝলমল করছে। আকাশচুম্বী কাঁচের ইমারত, বিলাসবহুল মার্সিডিজ আর রোলস রয়েসের আনাগোনা, আর রাজপ্রাসাদগুলোর চোখ-ধাঁধানো জাঁকজমক দেখে কে বলবে, এই শহরের মাটির নিচেই লুকিয়ে আছে এক প্রাচীন, অভিশপ্ত ভবিষ্যদ্বাণী! এই শহরের নিয়ন আলোর নিচে যখন রাজকীয় ভোজসভা চলে, তখন সেখান থেকে কয়েকশো মাইল দূরে ইয়েমেনের শিশুরা অনাহারে ধুঁকে ধুঁকে মরে। সিরিয়া বা শামের আকাশে বোমারু বিমানের গর্জনে ধসে পড়ে হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতা।
কিন্তু রিয়াদ শান্ত। রিয়াদ সুরক্ষিত। পশ্চিমা পরাশক্তির অদৃশ্য ছাতায় ঢাকা এই নজদের মাটি আজ পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্যনিয়ন্তা। কিন্তু এই জাঁকজমকের আড়ালে, ক্ষমতার এই দাম্ভিক মঞ্চের পেছনে লুকিয়ে আছে এমন এক সত্য, যা ১৪০০ বছর আগে উচ্চারিত হয়েছিল। সেই সত্য আজ যখন ভূ-রাজনীতির আতশকাঁচ দিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়, তখন যেকোনো বিবেকবান মানুষের মেরুদণ্ড বেয়ে এক শীতল স্রোত নেমে যায়।
সময়টা আজ থেকে প্রায় চৌদ্দ শতাব্দীরও বেশি আগের। মদিনার এক শান্ত প্রাঙ্গণ। সাহাবীরা গোল হয়ে বসে আছেন তাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর চারপাশে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) হঠাৎ দুই হাত তুলে পরম করুণাময়ের দরবারে দোয়া করতে শুরু করলেন...
"হে আল্লাহ! আমাদের শামে (সিরিয়া ও তৎসংলগ্ন অঞ্চল) বরকত দান করুন। হে আল্লাহ! আমাদের ইয়েমেনে বরকত দান করুন।"
উপস্থিত সাহাবীদের মধ্যে যারা নজদ বা বর্তমান রিয়াদ ও এর আশপাশের এলাকার মানুষ ছিলেন, তারা উৎসুক হয়ে বলে উঠলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের নজদেও বরকতের দোয়া করুন।"
কিন্তু নবী করীম (সা.) তাদের কথায় কোনো সাড়া দিলেন না। তিনি পুনরায় একই দোয়া করল...
"হে আল্লাহ! আমাদের শামে বরকত দান করুন। হে আল্লাহ! আমাদের ইয়েমেনে বরকত দান করুন।"
নজদবাসীরা আবারও মিনতি করে বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের নজদেও?"
তখন তৃতীয় বা চতুর্থবারে নবী করীম (সা.) এমন এক কথা বললেন, যা আজকের দিনের ভূ-রাজনীতির সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে ভয়ংকর সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি বললেন...
"সেখানে (নজদে) ভূমিকম্প ও ফিতনা (বিপর্যয়) হবে এবং সেখান থেকেই শয়তানের শিং উদিত হবে।" (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)
১৪০০ বছর আগের এই কথাটি আজ আর কেবল ধর্মীয় গ্রন্থের পাতায় বন্দি নেই। আজকের মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকালে, নজদের বর্তমান অধিপতিদের কার্যকলাপ দেখলে, এই 'শয়তানের শিং' আর 'ফিতনা' যেন আক্ষরিক অর্থেই বাস্তব রূপ নিয়ে আমাদের চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে।
নজদ কী? ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক বিচারে ‘নজদ’ হলো বর্তমান সৌদি আরবের মধ্যবর্তী উচ্চভূমি, যার মূল কেন্দ্র হলো বর্তমান রাজধানী রিয়াদ ও এর আশপাশের এলাকা।
এই নজদ থেকেই বিংশ শতাব্দীর শুরুতে উঠে এসেছিলেন বর্তমান সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা...আব্দুল আজিজ ইবনে সৌদ। তিনি কোনো সাধারণ পথ ধরে ক্ষমতায় আসেননি। তার উত্থানের পেছনে লুকিয়ে আছে এক রক্তক্ষয়ী ইতিহাস এবং পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ বা তৎকালীন 'নাসারা'দের সাথে এক ভয়ংকর, গোপন আঁতাত।
যখন অটোমান বা উসমানীয় সাম্রাজ্য পুরো মুসলিম বিশ্বকে এক ছাতার নিচে ধরে রাখার শেষ চেষ্টা করছিল, তখন এই নজদের শাসকরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সাথে হাত মেলায়। ব্রিটিশ গুপ্তচর 'লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া'-র মদদে এবং ব্রিটিশ পাউন্ড ও অস্ত্রের সাহায্যে তারা অটোমানদের পিঠে ছুরি মারে। তারা মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতীক অটোমানদের পতন ঘটিয়ে আরবের বুকে নিজেদের রাজত্ব কায়েম করে।
এরপর আসে ১৯৪৫ সাল। সুয়েজ খালের গ্রেট বিটার লেকে নোঙর করে থাকা মার্কিন যুদ্ধজাহাজ 'ইউএসএস কুইন্সি'-তে অনুষ্ঠিত হয় এক ঐতিহাসিক ও অন্ধকার বৈঠক। একদিকে নজদ থেকে উঠে আসা সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আব্দুল আজিজ ইবনে সৌদ, আর অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট।
সেখানে স্বাক্ষরিত হয় সেই অলিখিত চুক্তি..."তোমরা আমাদের তেলের নিশ্চয়তা দেবে, আর আমরা তোমাদের গদির নিরাপত্তা দেব।"
সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত, নজদ বা রিয়াদ পরিচালিত হয় এই চুক্তির ভিত্তিতেই। তারা নিজেদের গদি বাঁচাতে, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পশ্চিমা পরাশক্তি বা নাসারাদের স্বার্থরক্ষার সবচেয়ে বড় হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। আজ পুরো সৌদি আরব পরিচালিত হয় ওই নজদ বা রিয়াদ থেকেই, আর রিয়াদ পরিচালিত হয় ওয়াশিংটনের ইশারায়।
ভূ-রাজনৈতিক এই ষড়যন্ত্রের পাশাপাশি একটি অদ্ভুত, চাঞ্চল্যকর এবং রূপক চিত্র আজ বিশ্লেষকদের ভাবিয়ে তুলেছে।
হাদিসে বলা হয়েছিল, "নজদ থেকে শয়তানের শিং উদিত হবে।" অনেকে এই 'শিং'-কে রূপক অর্থে ফিতনা বা দুর্যোগ হিসেবে দেখেন। কিন্তু আপনি যদি ইন্টারনেটে যান, গুগলে গিয়ে "1st Saudi Leader" বা প্রথম দিকের সৌদি শাসকদের ছবি লিখে সার্চ দেন, তবে আপনার চোখের সামনে এমন এক চিত্র ফুটে উঠবে, যা আপনার শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত নামিয়ে দেবে।
প্রথম দিকের নজদি বা সৌদি শাসকদের মাথায় থাকা ঐতিহ্যবাহী পাগড়ি বা টুপি (ইকাল)-এর দিকে খেয়াল করুন। তাদের ইকাল বা পাগড়ি বাঁধার ধরনটা ছিল একেবারেই অন্যরকম। পাগড়ির ওপরের দিকে দুটি অংশ এমনভাবে প্যাঁচিয়ে উঁচিয়ে রাখা হতো, যার ডিজাইন দেখতে হুবহু দুটি শিং-এর মতোই লাগে!
এটি কি কেবলই একটি কাকতালীয় বিষয়? নাকি ১৪০০ বছর আগে দেওয়া সেই সতর্কবার্তার এক আক্ষরিক, চাক্ষুষ প্রতিফলন? যারা ধর্মের মোড়কে ক্ষমতা দখল করেছিল, তাদের নিজেদের অজান্তেই তাদের মাথার মুকুট কি সেই 'শয়তানের শিং'-এর রূপ ধারণ করেছিল? এই প্রশ্নটি আজ আধুনিক গবেষকদের ভাবিয়ে তুলেছে।
আজকের মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকান। হিসাবটা মেলাতে খুব একটা কষ্ট হবে না।
নবী করীম (সা.) দোয়া করেছিলেন শাম (বর্তমান সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও লেবানন অঞ্চল) এবং ইয়েমেনের জন্য। আজ সেই শাম এবং ইয়েমেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়ের শিকার।
ফিলিস্তিনের গাজায় যখন হাজার হাজার শিশু বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হচ্ছে, লেবাননে যখন ফসফরাস বোমা পড়ছে, তখন রিয়াদ বা নজদের শাসকরা কী করছেন? তারা কি সেই মজলুমদের পাশে দাঁড়িয়েছেন? না। তারা ব্যস্ত 'ভিশন ২০৩০' নিয়ে, তারা ব্যস্ত মরুভূমির বুকে বিলাসবহুল 'নিওম' সিটি বানাতে, তারা ব্যস্ত পশ্চিমা তারকাদের এনে কনসার্ট করতে।
ইয়েমেনে, যে দেশের জন্য স্বয়ং রাসূল (সা.) বরকতের দোয়া করেছিলেন, সেই ইয়েমেনের ওপর গত এক দশক ধরে বোমাবর্ষণ করেছে কারা? এই নজদের শাসকরাই! পশ্চিমাদের অস্ত্র কিনে তারা ইয়েমেনের নিরীহ শিশুদের ওপর বোমা ফেলেছে। শামে যখন রক্তের বন্যা বইছে, তখন নজদ থেকে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার গোপন দরকষাকষি চলছে।
হাদিসের সেই 'ফিতনা' বা দুর্যোগ আজ আর কোনো তত্ত্বকথায় সীমাবদ্ধ নেই। নজদের মাটি থেকে আজ এমন সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, যা পুরো মুসলিম বিশ্বকে বিভক্তি, যুদ্ধ আর ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তারা নাসারাদের সাথে হাত মিলিয়ে নিজেদের গদি ঠিক রাখছে, আর অন্যদিকে ফিলিস্তিন বা ইয়েমেনের মতো বরকতময় ভূমিগুলোকে পরিণত করছে জ্বলন্ত শ্মশানে।
রাত গড়িয়ে ভোর হচ্ছে। রিয়াদের আল-ইয়ামামাহ রাজপ্রাসাদের সুউচ্চ জানালা দিয়ে মরুভূমির ভোরের আলো এসে পড়ছে।
প্রাসাদের ভেতরের একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত, নিশ্ছিদ্র কক্ষে বসে আছেন নজদের বর্তমান শাসকরা। তাদের সামনে রাখা আছে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথে করা গোপন চুক্তির ফাইলগুলো। তারা হয়তো ভাবছেন, তাদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার, তাদের তেল, আর তাদের পশ্চিমা মিত্ররা তাদের চিরকাল এই সিংহাসনে টিকিয়ে রাখবে।
কিন্তু তারা জানে না, ইতিহাসের পাতায় কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়।
বাইরে তখন মরুভূমির বাতাস বইছে। এই বাতাস হয়তো ১৪০০ বছর আগের মদিনার সেই শান্ত বিকেলের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। যে ফিতনার কথা বলা হয়েছিল, তা আজ পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে গ্রাস করেছে। শয়তানের শিং হয়তো আজ আর পাগড়িতে নেই, তা আজ লুকিয়ে আছে তাদের প্রতিটি চুক্তিতে, প্রতিটি বোমায়, প্রতিটি নীরবতায়।
বিশ্ব রাজনীতির দাবার বোর্ডে আজ এক অদ্ভুত খেলা চলছে। একদিকে রক্তে ভেজা শাম আর ইয়েমেন, অন্যদিকে অহংকারে মত্ত নজদ আর তাদের পশ্চিমা মিত্ররা।
কিন্তু এই রাজনৈতিক থ্রিলারের শেষ পাতাটা এখনো লেখা হয়নি। যখন শামের মাটি থেকে শেষ প্রতিরোধটুকু জেগে উঠবে, যখন ইয়েমেনের ক্ষুধার্ত শিশুরা আকাশের দিকে হাত তুলবে, তখন কি নজদের এই কাঁচের তৈরি রাজপ্রাসাদগুলো টিকতে পারবে? নাকি হাদিসের সেই ভূমিকম্প কেবল মাটি কাঁপাবে না, কাঁপিয়ে দেবে তাদের সিংহাসনের ভিতকেও?
পৃথিবী আজ খাদের একেবারে কিনারায় দাঁড়িয়ে টলমল করছে।
ফিতনার এই মেঘ একদিন বৃষ্টি হয়ে ঝরবে, আর সেই বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যাবে সমস্ত দম্ভ আর অহংকার।
নজদের এই বিলাসবহুল প্রাসাদগুলোতে হয়তো আজ অট্টহাসি বাজছে, কিন্তু ইতিহাসের অমোঘ বিচার শুরু হতে আর বেশি দেরি নেই!
মহাপ্রলয় আসন্ন!