23/07/2020
খাসী ও বলদ দিয়ে কুরবানি করা কি জায়েয ?...................
ফতওয়া নং ১১৫৩
গ্রহণের তারিখঃ ১৭/০৭/২০ ইং
প্রদানের তারিখঃ ২২/০৭/২০ ইং
মাননীয় মুফতী সাহেব।
স্বল্পপেন্নাই জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম মাদরাসা ও এতীমখানা।
গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।
বিষয়ঃ খাসী ও বলদ দিয়ে কুরবানি করা প্রসঙ্গে।
জনাব! আমি মসজিদে বিগত জুমার বয়ানে কুরবানির মাসায়েল নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। আলোচনার একাংশ ছিল, কোন কোন পশু দ্বারা কুরবানি দেওয়া জায়েয আর কোন কোন পশু দ্বারা কুরবানি করা নাজায়েয। আলোচনার একপর্যায়ে আমি বললাম, খাসী ও বলদ দ্বারাও কুরবানি করা জায়েয আছে। পরে এক মুসল্লি এসে নেট থেকে একটি লেখা দেখিয়ে বলল, হুজুর! ত্রুটিমুক্ত পশু দ্বারা কুরবানি করার কথা এসেছে। খাসী ও বলদ এগুলো তো ত্রুটিমুক্ত নয়। তো এগুলো দ্বারা কুরবানি করা সহীহ হয় কীভাবে? হযরত মুফতী সাহেবের নিকট সঠিক বিষয়টি কুরআন-সুন্নাহর আলোকে জানানোর জন্য অনুরোধ করছি।
নিবেদকঃ
হাফেজ মাওঃ লুকমান হুসাইন।
গৌরীপুর দক্ষিণ বাজার তাকওয়া মহল্লা, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম।
উত্তরঃ খাসী-পাঁঠা এবং বলদ-ষাঁড়-এগুলোর প্রত্যেকটা দিয়ে কুরাবানি করা জায়েয আছে। পাঁঠা ও ষাঁড় দ্বারা কুরবানি জায়েয হওয়ার দলিল। পবিত্র হাদীছের মধ্যে এসেছেঃ
عن أبي سعيد الخدري قال ضحى رسول الله صلى الله عليه وسلم بكبش أقرن فحيل يأكل في سواد ويمشي في سواد وينظر في سواد
অর্থঃ হযরত আবুসাঈদ খুদরী র. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিংবিশিষ্ট এমন একটি পাঁঠা ছাগল দ্বারা কুরবানি করেছেন যেটি কালোতে খায় তথা তার মুখ কালো, কালোতে হাঁটে তথা তার চার হাত-পা কালো এবং কালোতে দেখে তথা তার চোখ কালো। (সুনানুত তিরমিযি, হাদীছ নং ১৪৯৬, অনুচ্ছেদঃ যে পশু দ্বারা কুরবানি দেওয়া মুস্তাহাব; সুনানু ইবনে মাজা, হাদীছ নং ৩১২৮। ইমাম তিরমিযি উক্ত হাদীছকে “হাসান সহীহ” বলেছেন। শায়খ আলবানী র.ও হাদীছটিকে সহীহ বলেছেন।
খাসী ও বলদ দ্বারা কুরবানি জায়েয হওয়ার দলিল। পবিত্র হাদীছের মধ্যে এসেছেঃ
عن جابرِ بن عبد الله، قال: ذبحَ النبيُّ -صلَّى الله عليه وسلم- يومَ الذبحِ كبشَين أقرنَين أملحَين مُوجَئَيْنِ،
অর্থঃ হযরত জাবের ইবনু আব্দিল্লাহ র. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানির দিন শিংবিশিষ্ট সাদাকালো রঙয়ের খাসীকরা দু’টি ছাগল জবাই করেছেন। (সুনানু আবীদাঊদ, হাদীছ নং ২৭৯৭, অনুচ্ছেদঃ যে পশু দ্বারা কুরবানি দেওয়া মুস্তাহাব; আলমুস্তাদরাক লিলহাকিম, হাদীছ নং ৭৫৪৭, অনুচ্ছেদঃ কুরবানি; আসসুনানুল কুবরা লিলবাইহাকী, হাদীছ নং ১৮৫৫। এই হাদীছটি উল্লেখ করার পর তার বর্ণনাসূত্রের মান সম্পর্কে ইমাম নূরুদ্দীন আল হাইছামী রহ. লিখেছেনঃ
وإسناده حسن তথা তার বর্ণনাসুত্রটি সুন্দর। দেখুনঃ মাজমাউয যাওয়ায়েদ ৪/২২, অনুচ্ছেদঃ রাসুলের কুরবানি। শায়খ আলবানী র. হাদীছটি উল্লেখ করার পর তার বর্ণনাসূত্রের মান সম্পর্কে লিখেছেনঃ
قلت : وإسناده حسن ، رجاله ثقات رجال مسلم غير ابن عقيل وفيه كلام لا ينزل به حديثه عن رتبة الحسن ،
অর্থঃ তার বর্ণনাসুত্রটি সুন্দর। এর বর্ণনাকারীগণের মধ্যে ইবনু উকায়ল রহ. ছাড়া বাকিরা ইমাম মুসলিমের বর্ণনাকারীদের ন্যায় নির্ভরযোগ্য, তবে ইবনে উকায়লের হাদীছ হাসান থেকে নিম্নমানের নয়। দেখুনঃ ইরওয়াউল গলীল ৪/৩৮৮, অনুচ্ছেদঃ কুরবানি।)
প্রশ্ন হতে পারে, কুরবানির ক্ষেত্রে রাসূলের আদর্শ হলো, নিখুঁত পশু দ্বারা কুরবানি করা। খাসী ও বলদ তো নিখুঁত নয়, কেননা এগুলোর একটি অঙ্গ নেই।
এই প্রশ্নের জবাব হলো, নিঃসন্দেহে কুরবানির পশু নিখুঁত ও মোটাতাজা হওয়া উত্তম। তবে খুঁত ও নিখুঁত নির্ণয়ের মাপকাঠি বিবেকবুদ্ধি নয়; বরং এর মাপকাঠি হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরামের আমল। উপরোক্ত বর্ণনা দু’টিতে আমরা দেখতে পেয়েছি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমনিভাবে পাঠা দ্বারা কুরবানি করেছেন, তেমনিভাবে খাসী দ্বারাও কুরবানি করেছেন। রাসূলের উপরোক্ত আমলের মাধ্যমে বুঝা যায়, খাসী এবং বলদ হওয়াকে ইসলাম কুরবানির পশুর জন্য খুঁত হিসেবে গণ্য করে না। যদি খাসী হওয়া খুঁত হত তাহলে কস্মিনকালেও নবীজী খাসীকৃত ছাগল দ্বারা কুরবানি করতেন না।
সুস্থ বিবেক বুদ্ধির বিচারেও এটা খুঁত নয়। কেননা খুঁত বলা হয় ওইটা যার কারণে পশুর মূল্য ও মান কমে যায়। আর যার কারণে পশুর মূল্য ও মান বৃদ্ধি পায় তাকে খুঁত বলে না; বরং তা হলো কামালিয়্যাত বা পূর্ণতা। খাসী করার কারণে ছাগলের মান ও মূল্য কমে না; বরং আরো বৃদ্ধি পায়। সহীহ বুখারীর ভাষ্যকার হাফেজ ইবনু হাজার আলআসক্বালানী (রহঃ) ফাতহুল বারী ৩/১২, অনুচ্ছেদঃ “শিংবিশিষ্ট ছাগল দ্বারা নবীজীর কুরবানি”-এর মধ্যে লিখেছেনঃ
وقد كرهه بعض أهل العلم لنقص العضو لكن ليس هذا عيبا لان الخصاء يفيد اللحم طيبا وينفي عنه الزهومة وسوء الرائحة
অর্থঃ ‘খাসী’ করার কারণে কেউ কেউ এটাকে খুঁতযুক্ত পশু বলে অপসন্দ করেছেন। কিন্তু মূলতঃ এটি কোন খুঁত নয়; বরং এর ফলে গোশত রুচিকর হয়, দুর্গন্ধ দূরীভূত হয় ও সুস্বাদু হয়।’
তা ছাড়া ইসলামের সোনালী যুগ থেকে নিয়ে অদ্যাবদি মুসিলিম সমাজ কুরবানির পশুর ব্যাপারে খাসী হওয়াকে খুঁত হিসেবে গণ্য করে নাই। তাই তো মুসলিম মিল্লাতের নির্ভরযোগ্য সকল উলামায়ে কেরাম বলেছেন, ছাগল দ্বারা কু্রবানি করলে খাসী দ্বারা কুরবানি করা উত্তম। দেখুনঃ ফাতহুল কাদীর ৮/৪৯৮, মাজমাউল আনহুর ৪/২২৪, ইলাউস সুনান ১৭/৪৫৩।
বাংলাদেশের আহলে হাদীছরাও খাসী দ্বারা কুরবানি করাকে উত্তম লিখেছে। দেখুন তাদের ওয়েবসাইট “আহলে হাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ”-এর কুরবানির মাসায়েলের আলোচনায়।
পরিশেষে একটি নিবেদন, বর্তমান ইন্টারনেট হলো একটি উন্মুক্ত প্রচার মাধ্যম। এখানে ভালো-মন্দ এবং শুদ্ধ ও অশুদ্ধ মিশ্রিত সব ধরনের বক্তব্য ও ভিডিও পাওয়া যায়। জ্ঞানের ঝুলি ভরার জন্য নেট থেকে ধর্মীয় বিষয়াদি দেখতে মানা নেই, তবে আমল করতে হলে অবশ্যই নিকটস্থ বিজ্ঞ কোন আলেমকে জিজ্ঞেস করে আমল করতে হবে। নচেৎ নেক সূরতে কষ্টার্যিত আমল ধ্বংস হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন বাজারে খাঁটী ও ভেজাল সবই পাওয়া যায়। বিজ্ঞ ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস না করে অন্ধের মত যদি কেনা হয় তাহলে খাঁটীর নামে ভেজাল নিয়ে আসার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। (আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বাধিক জ্ঞাত)
• السنن الكبرى للبيهقي: 1855- عَنْ عَائِشَةَ ، أَوْ عَن أَبِي هُرَيْرَةَ ، قَالَ : كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا ضَحَّى اشْتَرَى كَبْشَيْنِ سَمِينَيْنِ أَقْرَنَيْنِ أَمْلَحَيْنِ مَوْجُوئَيْنِ فَيَذْبَحُ أَحَدَهُمَا عَنْ أُمَّتِهِ مَنْ شَهِدَ بِالتَّوْحِيدِ وَشَهِدَ لَهُ بِالْبَلاغِ وَيَذْبَحُ الآخَرَ عَنْ مُحَمَّدٍ وَآلِ مُحَمَّدٍ، وكذا رواه الحاكم برقم: 7547 –(كتاب الأضاحي)
• نيل الأوطار للشوكاني 5/175: باب مالا يضحى به لعيبه وما يكره ويستحب قوله " فحيل " فيه أن النبي صلى الله عليه وآله وسلم ضحى بالفحيل كما ضحى بالخصي :
• فتح القدير: (كتاب الضحايا): (وَالْخَصِيِّ) لِأَنَّ لَحْمَهَا أَطْيَبُ وَقَدْ صَحَّ «أَنَّ النَّبِيَّ - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - ضَحَّى بِكَبْشَيْنِ أَمْلَحَيْنِ مَوْجُوءَيْنِ»
• ارواء الغليل: 4/388: : أخبرني عبد الرحمن بن جابر بن عبد الله قال : حدثني ابي : (أن رسول الله (ص) اتي بكبشين أملحين عظيمين أقرنين موجوئين ، فأضجع احدهما ، وقال : بسم الله ، والله أكبر ، اللهم عن محمد وأمته ، من شهد لك بالتوحيد ، وشهد لي بالبلاغ) . أخرجه الطحاوي وأبو يعلى في (مسنده) ، (105 / 2) والبيهقي (9 / 268) . قلت : وإسناده حسن ، رجاله ثقات رجال مسلم غير ابن عقيل وفيه كلام لا ينزل به حديثه عن رتبة الحسن ، وقد قال الهيثمي (4 / 22) : (رواه أبو يعلى وإسناده حسن)
• نيل الأوطار 8/319-320: باب التضحية بالخصي
1 - عن أبي رافع قال ( ضحى رسول اللّه صلى اللّه عليه وآله وسلم بكبشين أملحين موجوأين خصيين ) .
2 - وعن عائشة قالت ( ضحى رسول اللّه صلى اللّه عليه وآله وسلم بكبشين سمينين عظيمين أملحين أقرنين موجوأين ) . رواهما أحمد . حديث أبي رافع أخرجه أيضا الحاكم قال في مجمع الزوائد وإسناده حسن
• فتح الباري 3/12: (قَوْلُهُ بَابُ أُضْحِيَّةِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِكَبْشَيْنِ أَقْرَنَيْنِ) برقم: 5553 - وأخرج أبو داود من وجه آخر عن جابر ذبح النبي صلى الله عليه وسلم كبشين أقرنين أملحين موجوأين قال الخطابي الموجود يعني بضم الجيم وبالهمز منزوع الانثيين والوجاء الخصاء وفيه جواز الخصي في الضحية وقد كرهه بعض أهل العلم لنقص العضو لكن ليس هذا عيبا لان الخصاء يفيد اللحم طيبا وينفي عنه الزهومة وسوء الرائحة
• شرح سنن أبي داود لابن رسلان باب ما يُسْتَحَبُّ مِنَ الضَّحايا:(مكتبة شاملة) والدليل على جواز الأضحية بالخصي أن الخصاء إذهاب غير مستطاب (6) وبذهابه يطيب اللحم ويكثر ويسمن. قال الشعبي: ما زاد في لحمه وشحمه أكثر مما ذهب منه. وبهذا. قال العلماء: لا نعلم فيه خلافًا.
উত্তর লিখেছেন।
মুহাম্মাদ আব্দুল হান্নান।
প্রধান মুফতী,
স্বল্প পেন্নাই মাদরাসা, গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।