18/02/2023
নিশীথের মহাযাত্রা
গভীর রাত। পৃথিবী ঘুমন্ত। গাছের পাতাও নড়ছে না। ঝিঁঝি পোকার ডাক বন্ধ হয়েছে বহু আগে৷ ধুলিবালিরাও স্থান করে ঘুমিয়েছে। সব ঘর আলোহীন৷ দরজায় খিল লাগানো। একটা ঘর এখনো জেগে। পাশে মিটিমিটি আলো জ্বলছে। ঘরের নাম কাবাঘর। এই ঘর ঘুমায় না। চির জাগ্রত। কাবাঘরের পশ্চিমে আরেকটি ঘর। ওটা উম্মে হানির। উম্মে হানির রসুলুল্লাহর দুধবোন। চাচা আবু তালিবের কন্যা। তার ঘরে নবীজি ঘুমুচ্ছেন। ঘুমুচ্ছেন কি ঘুমিয়ে ঘুমকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন কে জানে! সামনে ব্যস্ত পথ। বহুদূর যেতে হবে। একটু বিশ্রাম...
চিলের মতো ছোঁ মেরে জিবরাইলের আগমন৷ এসে পড়লেন দ্বন্দ্বে। নবীজি ঘুমুচ্ছেন। নিয়ে যাবার নির্দেশ আল্লাহর। কোথায় নিয়ে যাবার সেটা পরে বলছি। আগে জিবরাইলের কাণ্ডটা একটু দেখি৷ আস্তে আস্তে পায়ের গোড়ায় গেলেন। বসে চুমু খেতে লাগলেন তালুতে।
মেরাজ-রাজ জাগলেন। “ও, আপনি এসেছেন?”
—জি, আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ তায়ালা আপনাকে সালাম পাঠিয়েছেন। সালামুন আলাইকুম। অনুমতি পেলে আরজ করতাম!
—বলুন, দ্রুত বলুন।
—জি, আজ আর খবর না। আমন্ত্রণ পাঠিয়েছেন। আপনাকে যেতে হবে।
—সে কী, কোথায়?
—ভূলোক দ্যুলোক গোলোক ভেদিয়া, আরো উপরে, আরো বহুদূর। কত উপরে, কত দূরে জানা নেই।
—ঠিক আছে, ঠিক আছে। খোদা তায়ালার দাওয়াত। চলুন, দেরি করা ঠিক হবে না।
বুরাক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথাবার্তা শুনছিল। বুরাক স্বর্গীয় জীব। গাধার চেয়ে উঁচু, খচ্চরের চেয়ে খাটো। চেহারা মানুষের মতো৷ উটের মতো পা। পিঠের কেশগুচ্ছ পশমি ঘোড়ার মতো। তার বহুদিনের স্বপ্ন পূরণ হতে চলল। একটু পর নবীজিকে নিয়ে উড়াল দেবে। বেহেশতে আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষণা এসেছিল—শেষনবীকে মেরাজে আনতে বুরাকদের মধ্য থেকে একটাকে বাছাই করা হবে৷ মোটাতাজা বুরাকগুলো খুশিতে তিড়িং বিড়িং লাফাচ্ছিল৷ এই মিয়া বসে বসে কান্দে। চোখে দাগ ফেলে। খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেয়। শুকনা থেকে আরো শুকনা হয়। স্বাস্থ্য ভাঙে। দুর্বল থেকেও দুর্বলতর হয় দিনদিন।
জিবরিল এসে জিজ্ঞেস করেন, কিরে কান্দস ক্যান?
—কাঁদি কি আর স্বাদে? সবাই দেখুন কত মোটাতাজা। আমি তো স্বাস্থ্যহীন, রোগা-পাতলা। শরীরে শক্তি নাই। আমাকে তো নেয়া হবে না। রাহমাতুল্লিল আলামিনকে দেখার বড়ো ইচ্ছে। তাঁর উসিলায় যে আমি বুরাকের জন্ম। তাঁর সামান্য খেদমত যদি করতে পারতাম! আহহহ! সে আশা আর পূর্ণ হলো না। জনমের স্বাদ অপূর্ণই রয়ে গেল!
—চল তবে, তোকেই নিয়ে যাই। আল্লাহ তোকে নির্বাচন করেছেন—এই বলে বুরাকের পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন। মুহূর্তে সে সবার চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তার ঔজ্জ্বল্য গ্রহগুলোর মাঝে সূর্যের মতো হয়। অন্যরা যেন নজরেই আসে না।
—মহামান্য জিবরাইল, একটি প্রশ্ন ছিল। আল্লাহ তায়ালা কী দেখে আমাকে পছন্দ করলেন? আমি তো সবার চেয়ে দুর্বল ছিলাম।
—প্রেম। তোর প্রেম তোরে জিতিয়ে দিয়েছেরে পাগলা। এই প্রেমের জোর কত জানিস? কণ্ঠহীন তোতলা কৃষ্ণকায় বেলালের আজান না-হলে সকাল হবে না। আবু বকরের সামান্য ছাই ওমরের অর্ধেক সম্পদকে হারিয়ে দেবে। তামাম সাহাবিদের ছাপিয়ে দূরদেশের ওয়াইস করনি জুব্বা পেয়ে বসবে। সবি এই প্রেমের খেলা। প্রেমের জোরের সামনে সব জোর মেকিরে পাগলা, সব জোর মেকি। সব শক্তি বৃথা।
নবীজি বুরাকে চড়ে বসলেন। জিবরিল লাগাম ধরলেন। বুরাক চললো প্রথম কিবলা বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে। পিছে পিছে মিকাইল, ইসরাফিল। সাথে আরো সত্তর হাজার ফেরেশতা। জুলুস চলছে জুলুস।
বায়তুল মুকাদ্দাসে এসে বুরাক থামলো। সেখানে বিশাল জমায়েত। নবীগণ উপস্থিত। নবীজি গণসংবর্ধনায় সিক্ত হলেন৷ সবাই কাতারে দাঁড়ালেন। নামাজ হবে। নবীদের নামাজ। পৃথিবীতে এই প্রথম একসাথে। একই জামাআতে সব নবী উপস্থিত। সবাই তো নবী, ইমাম কে হবেন? ফিকহের ফতোয়া কী বলে? উপস্থিতির মাঝে যিনি সবার শ্রেষ্ঠ, তিনিই ইমাম। এখানে কে শ্রেষ্ঠ? বাবা আদম আছেন। তাঁকে সফিউল্লাহ বলা হয়েছে। বাবা ইবরাহিম আছেন। তাঁকে খলিলুল্লাহ বলা হয়েছে। নবী মুসা আছেন। তাঁকে কালিমুল্লাহ বলা হয়েছে। নবী ইসা আছেন। তাঁকে বলা হয়েছে রুহুল্লাহ। এভাবে সমস্ত নবী-রসুল। একেকজনের একেক শান। মর্যাদায় স্বতন্ত্র। জিবরিল বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ, আপনি যান। কেননা আপনি রাসুলুল্লাহ! ইমামুল আম্বিয়া। নবীদেরও নবী। অন্যান্য নবীরা স্বতন্ত্র মর্যাদায় উন্নীত। কিন্তু সব নবীদের সব মর্যাদা আপনার মাঝে পুঞ্জিভূত। নয়, এমন নয়, এইটুকু নয়। বরং সব নবী—যে যা পেয়েছে, যতটুক পেয়েছে; সব আপনার কাছ থেকেই পেয়েছে। হ্যাঁ, আপনি আজ অদ্বিতীয়। এখানটাই আপনার মতো দ্বিতীয় কেউ নাই। আপনিই আজকের ইমাম। সবাই আপনার পেছনেই ইকতিদা করবে। আল্লাহু আকবর!
“খলকছে আউলিয়া, আউলিয়া ছে রুসুল
আও রসুলু ছে আ’লা হামারা নবি।”
আউলিয়ারা সৃষ্টিসেরা, তাঁদের সেরা রসুলগণ
রসুলগণের মাঝে মোদের দয়াল নবী শ্রেষ্ঠজন।
২.
নামাজ শেষ। শেষ হলো কুশল বিনিময়। শুভকামনা জানিয়ে যে যার মতো বিদায় হলেন। মেরাজ শুরু। মিরাজ মানে ঊর্ধ্বভ্রমণ। বুরাক উড়াল দিলো। তার দ্রুতি কত? সে যতটুকু দেখতে পায়, এক লাফে ততটুকুই যায়। আলোর চেয়েও দ্রুত। এই দ্রুতির সামনে রকেট-মকেট তুচ্ছ। আসমানবাসীদের খুশি আজ কে দেখে! চাঁদ-তারারা নাচনে বুড়ি। ফেরেশতারা দিলো ঢোলের বাড়ি। সে তালে গান ধরেছে—
“দেখো আজ আরশে আসেন মোদের নবী কামলিওয়ালা
হের সেই খুশিতে চাঁদ-সুরুজ আজ হলো দ্বিগুণ আলা।” —নজরুল
বুরাকের থামাথামি নেই। একনাগাড়ে উড়ে চলেছে। নবীজিকে পিঠে নেয়ার পর তার শক্তি আরো কতটা বেড়েছে কে জানে! উড়ছে তো উড়ছেই। সবকিছু ছাপিয়ে। একে একে পেছনে পড়ছে চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি। পেরিয়ে যাচ্ছে শত শত আলোকবর্ষ। আসমানের দূরত্ব কত খোদা-মালুম।
যেতে যেতে প্রথম আসমানে পৌঁছলেন। সেখানে আদম আলাইহিস সালাম উপস্থিত। নবীজিকে নতুনভাবে অভ্যর্থনা জানালেন। সৃষ্টির আদি নবীকে দুনিয়ার আদি নবীর অভ্যর্থনা! সে অভ্যর্থনা কীরূপ, তার ভাষা-ভাবশৈলী কেমন জানা নেই! দীর্ঘ মোলাকাত শেষে বাবা আদম বিদায় জানালেন। গেলেন দ্বিতীয় আসমানে। সেখানে যাকারিয়া ও ইয়াহিয়া আলাইহিমুস সালাম। তারাও একইভাবে বিদায় জানালেন৷ এভাবে তৃতীয় আসমানে ইউসুফ, চতুর্থ আসমানে ইসা, পঞ্চম আসমানে হারুন এবং ষষ্ঠ আসমানে মুসা আলাইহিমুস সালাম—এর সাথে দেখা। পরস্পর সংক্ষিপ্ত আলোচনা৷
চলে গেলেন সপ্তম আসমানে। সেখানে সৈয়দেনা ইবরাহিম আলাইহিস সালাম। বায়তুল মামুরের দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছেন। বায়তুল মামুর একটি মসজিদ। কাবা বরাবর সোজা উপরে। সপ্তম আসমানে অবস্থিত। দৈনিক সত্তর হাজার ফেরেশতা নামাজ পড়েন৷ নামাজ কেবল দুনিয়াতে না; আসমানেও চলে। এখানে একবার যারা পড়েন, কিয়ামত পর্যন্ত দ্বিতীয়বার তাদের সুযোগ হবে না। তবে ফেরেশতার সংখ্যা কত?! সে যাই হোক, নবীজির আগমনে ইবরাহিম আ. হুড়মুড়িয়ে উঠে স্বাগত জানালেন। নবীজির ইমামতিতে আরো দুরাকাত নামাজ হলো। এবারের মোক্তাদি ফেরেশতা আর রুহ জগতের সংখ্যাতীত রুহ।
পরের সফর জান্নাতে। নবীজি ধীরপদে এগোচ্ছেন আর জান্নাতিদের আরাম-আয়েশের নমুনা দেখছেন। ছোটো ছোটো মুক্তার পাথর, মাটি মেশকের মতো সুগন্ধি। সেখানে চারটি নদী। পানি, দুধ, মধু ও শরাবের। শরাব বলতে বেহেশতি শরাব। দুনিয়াবি শরাব ভেবে মাতাল হবার কারণ নাই। পানি, দুধ, মধুর নহরগুলোও বেহেশতি। কত সুন্দর, কত সুস্বাদু, কত নির্মল—বর্ণনার অযোগ্য। নাম অজানা বহু ফলফলাদি। দুনিয়ার বুকের যাদের কোনো অস্তিত্ব নেই। তারপর একে একে সিদ্দিকে আকবর, ওমর ফারুক, মা খাদিজার জন্য তৈরি অট্টালিকা, বেলাল রা.—এর পায়ের আওয়াজ। সবটা দেখলেন, শুনলেন, পর্যবেক্ষণ করলেন। কীভাবে সম্ভব—সে প্রশ্ন নিশ্চয় আজকের দিনে আর জাগার কথা নয়। বিজ্ঞানীদের একটি দল বেশ জোরেশোরে দাবি জানিয়েছেন টাইম-ট্রাভেল সম্ভব। টাইম-ট্রাভেল তো বুঝি? ভবিষ্যতে চলে যাওয়া। নবীজি মেরাজ-রাতে ভবিষ্যতেই চলে গিয়েছেন। সেভাবেই দেখছেন—জান্নাতিরা কীভাবে জান্নাতে সুখলাভ করছেন আর জাহান্নামিরা সেখানে কীরূপ দুর্দশায় আছে।
জান্নাত-জাহান্নামে ঘোরাঘুরি হলো বেশ। গন্তব্য সিদরাতুল মুনতাহা। এটি একটি বড়ই গাছ। বড়ইগুলো মক্কার উহুদ পাহাড়ের সমান। পাতাগুলো হাতির কানসদৃশ। পাতায় পাতায় পাখিসদৃশ ফেরেশতাদের উড়াউড়ি-ঘোরাঘুরি। আছে সবুজ রঙের আলাদা পাখি। হাদিসের ভাষ্যে এ-সব শহিদদের রুহ। সেখান থেকে উৎপত্তি হয়েছে চারটি নদীর। তার দুটি দুনিয়াতে। অপর দুটি বেহেশতে গিয়ে থেমেছে। ফেরেশতাদের জানামতে এটিই সৃষ্টির শেষসীমা। এরপরে ফেরেশতাদের যাওয়ার অনুমতি নেই। তাই তারা এটাও জানে না—এর পরে কী আছে!
বুরাকের দায়িত্ব এখানে শেষ। দায়িত্ব শেষ জিবরাইলেরও। তিনি আর যেতে পারবেন না৷ এক কদম বাড়বেন তো, সত্তর হাজার নুরের পাখা জ্বলে ছারখার হবে।‘ ই’রাজ’ শুরু হবে। রফরফ এসে উপস্থিত। রফরফ একটি নুরি গালিচা। কালারটা সবুজ। মাদানি রঙ! আলিফ লায়লার গালিচায় ভেসে বেড়ানোর ধারণা সম্ভবত এখান থেকে। নবীজি সাওয়ার হলেন। রফরফ এগিয়ে চলছে। নুরের জিবরাইল যেতে অপারগ। নবীজি এগোচ্ছেন স্বাচ্ছন্দ্যে। ওয়াহ! কিয়া বাত! একে একে সত্তর হাজার নুরানি পর্দা অতিক্রম করলেন। একেক পর্দার ঘনত্ব দুনিয়ার পাঁচশো বছরের পথ।
সে-পথ পাড়ি দেওয়া শেষ। পৌঁছে গেলেন আরশে। আরশের পাশে লাওহে মাহফুজ। সেখানে কুরআন মহামর্যাদায় সংরক্ষিত। একটি লেখায় নবীজির চোখ আটকে যায়—
“আমার রহমত আমার গজবের উপর প্রাধান্য বিস্তার করে আছে।” সুবহানাল্লাহ!
আরশের প্রতি নবীজির প্রশ্ন: “আমি সমগ্র জাহানের রহমত, তোমার প্রতি সেটা কীরূপ?” আরশের সদর্প উত্তর: সৃষ্টির পর আল্লাহ তাআলা আমার চৌকাঠে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ লিখে দিলেন। আমি থরথর করে কাঁপছিলাম। এই বুঝি টুকরে টুকরো হয়ে যাবো। অতঃপর তার পাশে লিখে দিলেন, “মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ”। কম্পন থেমে গেল। আমি শান্তি অনুভব করলাম। স্থির হলাম। এরচে’ বড়ো রহমত আর কী হতে পারে!
“আসমানো হি পর সব নবি রাহগেয়ে
আরশে আজম পে পৌঁছা হামারা নবি।”
৩.
আরশের সাথে কথাবার্তা শেষ। যাত্রা এবার লা-মকানে। লা-মকান মানে মকানহীন। যেখানে জায়গা বলতে কিছু নেই। স্থান, কাল, পাত্রের ঊর্ধ্বে। নবীজি সবকিছুর উপরে। কত উপরে একবার রিমাইন্ড করা যাক। পৃথিবী থেকেই শুরু করি। চাঁদ, গ্রহ-উপগ্রহ, বিলিয়ন-ট্রিলিয়ন নক্ষত্র, অগুনতি ছায়াপথ, প্রথম থেকে সপ্তম আসমান। আসমানগুলোর একেকটার দূরত্ব কত? প্রথম থেকে দ্বিতীয় আসমান যতদূর, দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় আসমানের দূরত্ব তার ডাবল। এভাবে ক্রমান্বয়ে একটার ডাবল দূরত্বে আরেকটা। এভাবে সপ্ত-আসমান। এরপর বায়তুল মামুর, জান্নাত-জাহান্নাম। জান্নাত-জাহান্নামের বিশালত্ব? আল্লাহ মালুম। তারপর সিদরাতুল মুনতাহা। সিদরাতুল মুনতাহার পর আরশে আজিম। এসবের মাঝে আরো কত কী বিদ্যমান সর্বজ্ঞ খোদা আর দেখে আসা নবীই ভালো জানেন। আরশে আজিমের পর লা-মকান। নবীজি এখন সেখানে। সবকিছুর উপরে। সমগ্র সৃষ্টিজগৎ ছাপিয়ে। ঐ লাইনগুলো আরেকবার মনে করি—
“বল,
মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি
ভূলোক দ্যুলোক গোলোক ভেদিয়া
খোদার আসন আরশ ছেদিয়া
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর।”
আহমদ রেজা খান রহ. আরেকভাবে বলেছেন—
“তুরে মুসা, চরখে ইসা, কিয়া মসা-ভি দানা হো
সব জেহেতকে দায়েরে মে, শশ জেহেত সু তুম ওয়ারা হো”
মুসা কালিমুল্লাহর মিরাজ তুর পাহাড়ে, (কেবল কথার মাধ্যমে।) ইসা পৌঁছেছে আসমান তক। এভাবে সমস্ত নবী-রসুল। তাদের বিশেষ বিশেষ মর্যাদা দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তাদের সমহিমায় ভাস্বর করেছেন। তবে সবার জন্য নির্দিষ্ট বাউন্ডারি আছে৷ সবার মর্যাদার সীমা আছে। কিন্তু হে হাবিব, আপনি বাউন্ডারি মুক্ত। আপনার জন্য কোনো সীমা নেই৷ কিঁউ কি—
“সব মঁকা মে, তুম লা-মঁকা মে, তন হে তুম জানে সাফা হো।”
—সবাই স্থানে সীমাবদ্ধ, আপনি সীমানা ছাড়িয়ে অসীম লা-মকানে। সবাই যেখানে দেহে আচ্ছাদিত, আপনি সেখানে নবরূপে হাকিকি সুরতে অধিষ্ঠিত। ”
লা-মকানের সবটা খোদায়ী নুরে আচ্ছাদিত। নবীজি হাকিকি সুরতে। সে সুরত কীরূপ? আল্লাহ এবং নবীজিই ভালো জানেন। নবীজি পৌঁছে গেলেন আল্লাহ তায়ালার নিকট থেকেও নিকটে। সে নৈকট্য কীরূপ। “ক্বাবা ক্বাওসাইনি আও আদনা।” তীর আর ধনুকের দূরত্ব। নয়, তারচেয়েও অধিক। প্রশ্ন করি—তীর আর ধনুকে কি দূরত্ব থাকে?
“খোদাকে আজমত কিয়া হ্যায়? মুহাম্মদ মুস্তফা জানে
মকামে মুস্তফা কিয়া হ্যায়? মুহাম্মদকা খোদা জানে।”
কসম খোদার! আমরা জানি না। সে মকাম কোথায়, কীরূপ—আমাদের অজানা। সে জট হাশরেই খুলবে। যখন তিনি মকামে মাহমুদে অধিষ্ঠিত হবেন।
বন্ধু বন্ধুর দাওয়াতে গেলে হাদিয়া নেন। আল্লাহর দাওয়াতে নবীজি আল্লাহর সান্নিধ্যে। নবীজি কী নিয়ে গেলেন? চির-পবিত্র চির-সুন্দর জবানের চির-সত্যকণ্ঠের চির-মোহনীয় সুর—
“আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ওয়াস সালাওয়াতু ওয়াতত্বয়্যিবাত—না জবান, না অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, না ধন সম্পদ, বরং যা যা আছে—সবটা আপনার প্রশংসায় উপহার সরূপ পেশ করলাম। কুরআনের প্রথম শব্দযুগলও ঐ কথাই বলে—“আলহামদুলিল্লাহ—সমগ্র প্রশংসা আল্লাহরই!
উপহার পেয়ে খোদ খোদা তৃপ্ত। রিয়াকশন কী এলো? আল্লাহ কী বললেন?
“আস্সালামু আলাইকা আইয়ুহান নাবিয়্যু ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারকাতুহু—ওহে প্রেমময় নবী, আপনার প্রতি সালাম, আপনার প্রতি রহমত, আপনার প্রতি বরকত!” এ প্রকাশকে কী বলবো? কত সুন্দর! কত মোহনীয়! এভাবে? নাহ, সবচে’ সুন্দর, সর্বোৎকৃষ্ট, সবচে মোহনীয়! লা-মকানের সে আওয়াজ সেদিন সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছে গিয়েছিল। ফেরেশতারা এ অভূতপূর্ব সংলাপ শুনে সমস্বরে সাক্ষ্য দিলো—
“আশহাদু আল-লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু।”
এবার নবীজির চাওয়ার পালা। নবীজি চায়বেন। সরাসরি নেবেন। দেবেন আল্লাহ। আল্লাহ তায়ালা জানতে চান—হাবিব, আপনি কী চান?
—ওগো আল্লাহ, রাব্বুল আলামিন! আমাকে বানিয়েছেন “রাহমাতুল-লিল-আলামিন”। কী চাইতে পারি? গোনাহগার উম্মত রেখে এসেছি দুনিয়ায়। আমার উসিলায় তাদের ক্ষমা করে দিন।
—নিজের উসিলা দিয়েছেন। না-করি কী করে? ৭০ হাজার ক্ষমা করলাম। আর কী চান?
নবীজি আর কী চাইবেন? দুনিয়ার সুখ? আসতাগফিরুল্লাহ! বেহেশতের বাদশাহি? সেটা তো অলরেডি পেয়ে বসে আছেন? ইতোমধ্যেই তিনি সমগ্র জাহানের রহমত! আর কী চাইবেন? একই জিনিস বারবার চাইলে ক্ষতি কী? দেনে ওয়ালা তো উপবিষ্ট। উম্মতের তো অভাব নাই। ৭০ হাজারে কী হবে? একই চাওয়া আবারও।
—উম্মতদের ক্ষমা করে দিন।
—আচ্ছা আরো ৭০ হাজার দিলাম। আর কী চান?
—উম্মতদের ক্ষমা করে দিন!
আল্লাহ তায়ালা ৭০ হাজার করে দিয়ে যাচ্ছেন, নবীজি চেয়ে চলেছেন৷ এভাবে ৭০০ বার চাইলেন। আল্লাহ তায়ালা ৭০০ বার-ই দোয়া মঞ্জুর করলেন। ৭০১ বারে গিয়ে নবীজিকে থামালেন। এবার থামুন। আর চাইয়েন না। এখানে সব দিয়ে দিলে হাশরটা কার শান দেখাতে সাজাবো? বাকিটা হাশর-মাঠে দেয়া হবে। ফেরেশতা, আম্বিয়া, আউলিয়াসহ পুরো হাশরবাসীদের সামনে। আপনি চাইতে থাকবেন, আমি দিতে থাকবো। এত এত এত দেব যে, আপনি সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন। সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিক।
এভাবে সংলাপ চলতে থাকে। কত কালাম হয়েছিল? কী কী কথা হয়েছিল? কুরআন কী বলে?
“ফা-আওহা ইলা আবদিহি মা আওহা—যা গোপনে বলার প্রিয়তমকে তা গোপনে জানিয়ে দিলেন।”
কাসাসুল আম্বিয়ার ভাষ্যমতে কালামের সংখ্যা ৯০ হাজার। ৩০ হাজার আমরা জেনেছি হাদিসের মাধ্যমে। আর ৩০ হাজার তাঁর আয়ত্তাধীন। যাঁকে যাঁকে ইচ্ছা—জানিয়েছেন। নবীজির ইন্তেকাল-পরবর্তী সাহাবি, তাবেয়ি, গাউছ, কুতুব, আবদাল, আওলিয়াদের অনেক কাজ, কথা কুরআন হাদিসে সরাসরি পাওয়া যায় না। মিলে না। আমরা দ্বন্দ্বে পড়ি। এসব দ্বন্দ্ব বোধয় এখানে শেষ হলো। ঐ ত্রিশ হাজার কথা নবীজি খাশমহলে বিতরণ করেছেন। সেখান থেকে কিছু কিছু প্রকাশ হয়ে গেছে। এজন্যে তাঁরা যা বলে গেছেন, তা মনগড়া বা খামখেয়ালি বলা ধৃষ্টতা। চরম ধৃষ্টতা। সাবধান হোন! আল্লাহর অলিদের ব্যাপারে সাবধান হোন! তাদের কথা-কাজ বুঝে না-আসলে চুপ থাকুন। এটা আপনার জ্ঞানের দুর্বলতা। বোধশক্তির সীমাবদ্ধতা। আপনি দুর্বল। প্রচুর দুর্বল। খুব কম জানা লোক। সবজান্তার মতো বিহিভ বন্ধ করুন।
৬০ হাজারের হিসাব শেষ। বাকি ৩০ হাজার। এসব অপ্রকাশিত। রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে রাহমাতুল-লিল-আলামিনের উপর আমানত। হাদিসে পাকের অমীয় সুধা জানান দেয়—
“ওমিরতু বিকিতমা-নিন বা’দ্বিহা—অনেকগুলো বিষয় গোপন রাখার বন্দোবস্ত হয়েছে।” আল্লাহ এবং রসুল ছাড়া তৃতীয় কেউ জানে না। আশেক-মাশুকের মহা আয়োজন সমাপ্তি। এবার ফেরার পালা। ইন্নাল্লাহা ওয়া মালা-ইকাতাহু ইয়ুসাল্লু-না আলান নাবী...
৪.
মেরাজ-রাজ ফেরার পথে। আসতে আসতে ষষ্ঠ আসমান। মুসা আলাইহিস সালামের সাথে ফের সাক্ষাৎ। নবী মুসা চমকিত! ও, আপনি এসে গেছেন? বহু কথা হয়েছে নিশ্চয়? স্পেশাল উপহার পেয়েছেন অনেক। আপনি তো উম্মত-পাগলা। তাদের জন্য কী আনলেন? রব-তায়ালা কী দিলেন?
—পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ৷
—পঞ্চাশ ওয়াকতঅঅঅঅ!?
তুর পাহাড়ে একবার বেহুশ হয়ে পড়ে গিয়েছিলেন খোদার নুরের ঝলক সহ্য করতে না-পেরে। আবার যেন পড়ে পড়ে অবস্থা! “পারবে না, পারবে না। এ বড় কঠিন হয়ে যাবে। আপনি আবার যান। কিছু মওকুফ হয় কি-না দেখুন।” মুসা নবীর কথায় যুক্তি আছে৷ পাঁচ ওয়াক্তে যা অবস্থা, পঞ্চাশ ওয়াক্ত হলে...
যাইহোক, নবীজি আবার গেলেন। কোথায়? ঐ যে, লা-মকান। খোদার সান্নিধ্যে। ইয়া রাব্বি, বেশি হয়ে গেছে। উম্মতের কষ্ট হবে, পেরে উঠবে না। কমিয়ে দিন।
—আপনি মাহবুব! কথা ফেলা যায়? পাঁচ ওয়াক্ত কমালাম।
নবীজি ফের ষষ্ঠ আসমানে। মুসা নবির প্রশ্ন: ঘটনা কী বলুন। বন্দোবস্ত কী হলো?
—পাঁচ ওয়াক্ত কমেছে।
—মাত্র পাঁচ ওয়াক্তঅঅ? হবে না, হবে না। আপনার উম্মতেরা পারবে না। আবার যান।
নবীজি আবার হাজির। ইয়া রাব্বি, অন্যান্য নবির উম্মত এক, দুই ওয়াক্ত ঠিকঠাক পড়ে নাই। আমার উম্মত শেষ জামানার। আকৃতি ছোটো। গড়নে দুর্বল। অত পারবে না। আরো কমিয়ে দিন।
—ঠিক আছে৷ আরো পাঁচ ওয়াক্ত মাফ।
আবার ষষ্ঠ আসমান। মুসা নবীর আবদারের শেষ নাই। আবার যান! এই ‘আবার যান’টা মোট নয়বার চলল। পাঁচ ওয়াক্ত করে কমতে কমতে মোটে পাঁচ ওয়াক্ত থাকলো। সাথে আল্লাহর ঘোষণা এলো—পাঁচ ওয়াক্তের ঠিকঠাক পড়লে পঞ্চাশ ওয়াক্তের সাওয়াব দিয়ে দেয়া হবে। আজীবন মেয়াদের দারুণ প্যাকেজ—“একে দশ, পাঁচ দশে পঞ্চাশ!”
একটা প্রশ্ন করি? ষষ্ঠ আসমান থেকে নবীজি কতবার লা-মকান ফেরত গেলেন? এক, দুই, তিন, চার... নয়। হ্যাঁ, নয় বার। এবার আমাকে হিসাব দিন—ঐ রাতে মাওলার দিদারে নবীজি কতবার গেলেন? মাওলার সাথে সর্বমোট কতবার দিদার হলো? ঐ সফরে মেরাজ কতবার হলো?
এবার আল্লাহকে একটা প্রশ্ন করি। কাল্পনিক প্রশ্ন আর কী। ওহে মাওলা, পাক পরওয়ারদিগার! আপনি চাইলে একবারে পয়তাল্লিশ রাকাত কমাতে পারতেন। কিংবা প্রথমেই পাঁচ রাকাত দিতে পারতেন। নবী মুস্তফা যে আবার ফেরত যাবেন, নবী মুসা যে বারবার পাঠাবেন—সে তো আপনার অজানা নয়। আপনি যে আলিমুল গায়ব। অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সবটা সমানভাবে জানেন। জানেন কী, সবটা তো আপনারই অধীন। তো, এই আজব খেলা কেন? এর রহস্য কী? কেন বারবার তাঁকে আসা-যাওয়ার মধ্যে রাখলেন?
—আহা! প্রিয়তমের ফিরে ফিরে তাকানোর মর্ম কে বুঝে? যাওয়ার পথে বারবার এসে আলিঙ্গনের স্বাদ কে জানে? কেউ বুঝে না। কেউ-ই জানে না। কেউ নারে পাগলা, কেউ না। ঐ দুজনই বুঝে। প্রেমী আর প্রেমাস্পদই জানে এর মজা কী, এর হাকিকত কী। বাকিরা বুঝে না। অত গভীরে তাদের চোখ যায় না। মেকি ভাবে, মেকি। থাক, কথা বাড়িয়ে লাভ নাই৷ এও সে প্রেমের খেলা। কজনেই বা মর্ম বুঝে? কজনেই বা ধরতে জানে?
প্রশ্ন এবার মুসা নবীর কাছে। ওগো কালিমুল্লাহ, আপনার কী দরকার ছিল? আখেরি নবীর উম্মতের কষ্টে আপনার কী আসে যায়? নবীকে এভাবে বারবার পাঠিয়ে আমাদের কষ্ট লাগব করে আপনার লাভটা কী?
—আছেরে পাগলা; বিশাল লাভ আছে।
—সেটা কেমন? ঐ যে, তুর পাহাড়। খোদার নুরে জ্বলে সুরমায় রূপান্তরিত। ওটাতে উঠে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতাম। “রাব্বি আরিনি—প্রভু দেখা দাও।” প্রভুর জবাব আসতো—“লান তারানি—দেখা সম্ভব না।” এভাবে বহুকাল চলেছে। বহু কেঁদেছি। একদিন ফরিয়াদ কবুল হলো। খোদার সত্তর হাজার নুরারি পর্দার ভেতর থেকে একটুখানে ঝলকানি আমার উপর পড়েছিল। বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিলাম। উঠে দেখি উহুদ জ্বলে সুরমা হয়ে গেছে। বিশেষ কৃপায় দেহ টিকে গেছে। দেখার সৌভাগ্য আর হয়নি। দেখার আগেই বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিলাম।
—তাতে কী? ওটা তো পুরান গল্প। এটার সাথে সম্পর্ক কী?
—আছে আছে, বলছি। সেই যে নুরের ঝলক। দুনিয়া থেকে দেখিনাই। কিন্তু আজ? আজ দেখে ফেলেছিরে পাগলা, দেখে ফেলেছি। রহমাতুল্লিল আলামিন যখন খোদার দরবার থেকে এসেছে, তার সর্বাঙ্গে খোদার নুরের চমক খেলা করছিল। তোরা দেখিসনি, কীভাবে সূর্যের আলোয় চন্দ্র আলোকিত হয়ে স্নিগ্ধ আলো ছড়ায়? ঠিক ঐরকম। আমার উহুদের ব্যথা আজ উপশমিত। কেননা আমি নবী মুস্তফার মাধ্যমে খোদার তাজাল্লি দেখে ফেলেছি। তাই সুযোগ মিস করিনি। যতবার সম্ভব হয়েছে। তাঁকে খোদার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। নবী মুস্তফা খোদার দিদারে ধন্য। আমিও তাঁর মাধ্যমে খোদার নুরি ঝলকে ধন্য।
মসনবি খুলুন। মাওলানা রুমি কী বলেছেন? “নবী-মুস্তফা খোদা দেখার আয়না-স্বরূপ!” সুবহানাল্লাহ!
আহমদ রেজার কালাম শুনি—
“কিছ কো দেখা ইয়া মুসা ছে পুঁচে কুয়ি,
আঁখ ওয়ালো কি হিম্মত পে লাখো সালাম।”
সেদিন মুসা আলাইহিস সালাম কাকে দেখেছিলেন, কেউ তাঁকে তা জিজ্ঞেস করো। দিব্যদৃষ্টি-সম্পন্ন সত্তার প্রতি লক্ষ সালাম।
মুহাম্মদ সৈয়দুল হক
#প্রশংসিত