29/04/2025
মানবিক করিডর-এর নামে দেশবিক্রি
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মানবিক করিডর (Humanitarian Corridor) শব্দটি মানবাধিকারের নামে ব্যবহৃত হলেও এর আড়ালে অনেক সময় রাষ্ট্রীয় স্বার্থ হুমকির মুখে পড়ে। বিশেষ করে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে যখন মানবিক করিডর প্রদানের প্রস্তাব উঠে আসে, তখন এ বিষয়ে জাতীয় নিরাপত্তা, ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য এবং স্বার্থ রক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবা প্রয়োজন।
মানবিক করিডর কী?
মানবিক করিডর হলো একটি সুরক্ষিত ও নির্ধারিত পথ, যা যুদ্ধ বা সংকটপীড়িত অঞ্চলে আটকে পড়া নাগরিকদের খাদ্য, ওষুধ ও আশ্রয় নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত হয়। এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অধীনে পরিচালিত হয়, কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ অনেক সময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ এবং বাংলাদেশের বিপদ
বাংলাদেশ ২০১৭ সাল থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা প্রায় ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মহল থেকে কিছু প্রস্তাব এসেছে—যাতে কক্সবাজার বা টেকনাফ থেকে মিয়ানমার সীমান্ত পর্যন্ত একটি "মানবিক করিডর" তৈরি করে রোহিঙ্গাদের সরবরাহ বা চলাচলের ব্যবস্থা করা যায়। প্রথম শুনতে মানবিক মনে হলেও, এতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে।
সম্ভাব্য বিপদসমূহ:
1. আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের সুযোগ: করিডর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব জাতিসংঘ বা বহির্বিশ্বের হাতে গেলে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নীতিতে অন্য দেশের প্রভাব বাড়বে।
2. স্থায়ী শরণার্থী সমস্যা: করিডর স্থায়ীভাবে চালু হলে, রোহিঙ্গারা স্বদেশে না ফিরে বরং বাংলাদেশেই থেকে যাবে—যার ফলে ভবিষ্যতে তারা বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দাবি করতে পারে।
3. সন্ত্রাসবাদ ও চোরাচালানের ঝুঁকি: সীমান্তে করিডর খুলে দিলে অস্ত্র, মাদক ও মানবপাচার বেড়ে যেতে পারে।
4. চীন-ভারত-মিয়ানমার ভূ-রাজনীতি: এ করিডরের মাধ্যমে অন্য রাষ্ট্র নিজেদের প্রভাব বিস্তারে আগ্রহ দেখাতে পারে, যা বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করবে।
বিশ্বের অন্যান্য উদাহরণ
1. সিরিয়া: সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে মানবিক করিডরের নামে তুরস্ক ও রাশিয়া সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে, যা এক সময় সেই অঞ্চলের স্থায়ী নিয়ন্ত্রণে রূপ নেয়।
2. ইথিওপিয়া (টাইগ্রে সংকট): টাইগ্রে অঞ্চলে করিডর খোলার পর সেখানে জাতিসংঘ ও ইরিত্রিয়া সম্পৃক্ত হয়, যার ফলে রাজনৈতিক ও সামরিক জটিলতা বেড়ে যায়।
3. গাজা-ইসরায়েল: মানবিক করিডরের নামে সেখানে বহুবার ইসরায়েল সামরিক অভিযান চালিয়েছে, যার ফলে মানবাধিকার রক্ষা নয়, বরং অধিক দমন নেমে আসে।
করণীয়
বাংলাদেশকে এ বিষয়ে কৌশলগতভাবে সতর্ক থাকতে হবে। করিডর বিষয়টি যতই মানবিক শোনাক না কেন, এটি যদি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় তবে তা সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপের নামান্তর হতে পারে। আন্তর্জাতিক সহানুভূতি এবং সাহায্য গ্রহণ করা উচিত, তবে তা যেন দেশের নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থের বিপরীতে না যায়।
মানবিক করিডরের পেছনে আসল উদ্দেশ্য যদি মানবাধিকার রক্ষা নয় বরং রাজনৈতিক বা কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ হয়, তবে তা মানবিকতার নামে দেশবিক্রির সামিল। বাংলাদেশকে এ বিষয়ে অন্ধ আবেগ নয়, বরং বিচক্ষণতা ও কূটনৈতিক দৃঢ়তা দিয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।