26/03/2025
ইতেকাফ
ইতিকাফ একটি আরবি শব্দ। এটি আরবি‘আকফ’ ধাতু থেকে উদ্গত।
আকফ শব্দের অর্থ, অবস্থান করা।
ইতেকাফের আভিধানিক অর্থ , কোনো স্থানে আটকে যাওয়া বা থেমে যাওয়া, অবস্থান করা আবদ্ধ হয়ে থাকা।
শরিয়তের পরিভাষায় ইতেকাফ বলা হয়,আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য একটি বিশেষ সময় এবং বিশেষ নিয়মে নিজেকে মসজিদে আবদ্ধ রাখা।
বিশেষ করে রমজানের শেষ ১০ দিন জাগতিক কাজকর্ম ও পরিবার পরিজন থেকে অনেকটা বিছিন্ন হয়ে শুধু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকে রাজি-খুশি করার নিয়তে একটি নির্দিষ্ট স্থানে ইবাদত করার উদ্দেশে অবস্থান করা।
যিনি ইতেকাফ করেন তাকে মুতাকিফ বলা হয়।
⭐কোরআন-হাদিসে ইতেকাফঃ
ইতিকাফের জন্য শর্ত হল, মসজিদ। মসজিদ ছাড়া ইতিকাফ সহীহ নয়। এই শর্ত পুরুষ-মহিলা সবার জন্য প্রযোজ্য।
ইতেকাফ শরিয়াসম্মত একটি আমল হওয়ার ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
‘আমি ইবরাহিম ও ইসমাঈলকে আদেশ দিয়েছিলাম যেন তারা আমার ঘরকে (কাবা) তাওয়াফকারীদের জন্য,ইতেকাফকারীদের জন্য ও (সর্বোপরি তার নামে) রুকু-সিজদাহকারীদের জন্য পবিত্র রাখে’ (সূরা বাকারা, আয়াত : ১২৫)।
‘আর মসজিদে যখন তোমরা ইতেকাফ অবস্থায় থাকবে তখন স্ত্রী-সম্ভোগ থেকে বিরত থেকো। সিয়ামের ব্যাপারে এগুলোই হলো আল্লাহর সীমারেখা’ (সূরা বাকারা, আয়াত : ১৮৭)।
এ আয়াতগুলোতে মসজিদে ইতিকাফ করার কথা উল্লেখিত হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অসংখ্য হাদিস ইতেকাফ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, তার মধ্য হতে কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করা হল:
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. হতে বর্ণিত।
তিনি বলেন,
أن النبي صلى الله عليه وسلم كان يعتكف العشر الأواخر من رمضان حتى توفاه الله، ثم اعتكف أزواجه من بعده
“রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রামযানের শেষ দশকে ইতিকাফ করেছেন আর তাঁর ইন্তিকালের পরে তাঁর স্ত্রীগণ ইতিকাফ করেছেন।”
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের শেষ দশ দিন ইতেকাফ করতেন। (বুখারি-২০২৫)
রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজানের শেষের দশকে ইতেকাফ করেছেন, ইন্তেকাল পর্যন্ত। এরপর তাঁর স্ত্রীগণ ইতেকাফ করেছেন। (বুখারি-২০২৬)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি রমজানে দশ দিন এতেকাফ করতেন, তবে যে বছর তিনি পরলোকগত হন, সে বছর তিনি বিশ দিন ইতেকাফে কাটান। (তিরমিযী-৮০৮)
⭐ইতেকাফের ফজিলত
ইতেকাফ আল্লাহর নৈকট্য লাভের সহজ উপায়। আল্লাহর সঙ্গে সুনিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যম।
কারণ, মানুষ যখন সংসার জগতের কর্মকাণ্ড- থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে আল্লাহর ঘরে ইবাদতের নিমিত্তে আত্মনিয়োগ করবে,তখন দয়াবান স্রষ্টা কি তার থেকে বিমুখ থাকতে পারেন?
তিনি তো ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন,
‘বান্দা আমার দিকে একহাত অগ্রসর হলে আমি তার দিকে দুইহাত অগ্রসর হই। আমার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলে আমি তার দিকে দৌড়ে যাই।’
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রয়েছে, ‘কেউ যখন আল্লাহর ঘর মসজিদে অবস্থান নেয় তখন আল্লাহ তায়ালা এত বেশি আনন্দিত হন যেমন বিদেশ-বিভুঁই থেকে কেউ বাড়িতে এলে আপনজনরা আনন্দিত হয়ে থাকে (তারগিব-তারহিব : ৩২২)।
অন্য হাদিসে এসেছে,যে ব্যক্তি আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একদিন ইতেকাফ করবে আল্লাহ তায়ালা তার এবং জাহান্নামের মাঝে তিন খন্দক দূরত্ব সৃষ্টি করে দিবেন। অর্থাৎ আসমান ও জমিনের দূরত্ব থেকে অধিক দূরত্ব সৃষ্টি করে দিবেন। (শোয়াবুল ঈমান,হাদিস: ৩৯৬৫) ।
আলী বিন হোসাইন (রা.) নিজ পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
‘যে ব্যক্তি রমজানে ১০ দিন ইতিকাফ করে,তা দুই হজ ও দুই ওমরার সমান’ (বায়হাকি)।
ইতিকাফের প্রকারভেদ
সুন্নাত ইতিকাফ: রমজানের শেষ দশকের ইতিকাফ। অর্থাৎ ২০ রমজানের সূর্য ডোবার আগ মুহূর্ত থেকে শাওয়াল মাসের চাঁদ ওঠা পর্যন্ত মসজিদে ইতিকাফ করা।
ওয়াজিব ইতিকাফ: নজর বা মানতের ইতিকাফ ওয়াজিব। যেমন কেউ বলল যে, আমার অমুক কাজ সমাধান হলে আমি এতদিন ইতিকাফ করব অথবা কোনো কাজের শর্ত উল্লেখ না করেই বলল, আমি একদিন অবশ্যই ইতিকাফ করব। যতদিন শর্ত করা হবে ততদিন ইতিকাফ করা ওয়াজিব।
ওয়াজিব ইতিকাফের জন্য রোজা রাখা শর্ত।
সুন্নাত ইতিকাফ ভঙ্গ করলে তা পালন করা ওয়াজিব হয়ে যায়।
[ তাবলীগ জামাতের বুজুর্গদের মত অনুসারে নফল ইতিকাফ: সাধারণভাবে যেকোনো সময় ইতিকাফ করাকে নফল ইতেকাফ বলে। এর জন্য কোনো দিন কিংবা সময়ের পরিমাপ নেই। অল্প সময়ের জন্যও ইতিকাফ করা যেতে পারে। এ জন্য মসজিদে প্রবেশের পূর্বে ইতিকাফের নিয়ত করে প্রবেশ করা ভালো।]
⭐ইতিকাফে করণীয়
ইতিকাফ অবস্থায় করণীয় হচ্ছে-
১. বেশি বেশি আল্লাহর জিকির-আজকার করা,
২. নফল নামাজ আদায় করা,
৩. কোরআন তেলাওয়াত করা,
৪. দ্বীনি ওয়াজ-নসিহত শোনা ও
৫. ধর্মীয় গ্রন্থাবলী পাঠ করা।
⭐ইতিকাফে বর্জনীয়
ইতিকাফ অবস্থায় যেসব কাজ বর্জনীয়-
১. ইতিকাফ অবস্থায় বিনা ওজরে মসজিদের বাইরে যাওয়া,
২. দুনিয়াবি আলোচনায় মগ্ন হওয়া,
৩. কোনো জিনিস বেচাকেনা করা,
৪. ব্যবসা-বাণিজ্যের হিসাব-নিকাশ করা,
৫. ওজরবশত বাইরে গিয়ে প্রয়োজনাতিরিক্ত বিলম্ব করা ও
৬. স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করা। এসব কাজ করলে ইতিকাফ ভঙ্গ হয়ে যায়।
ইতিকাফ দীর্ঘ সময় ধরে করা উত্তম,বিশেষত মাহে রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ অবস্থায় থাকায় ‘লাইলাতুল কদর’ বা হাজার মাসের শ্রেষ্ঠতম ভাগ্যের রজনী লাভের সৌভাগ্য হতে পারে।
নারীদের জন্য তার ঘরকে মসজিদ বলা ঠিক নয়।
কারণ, মসজিদে ঋতুবতি মহিলাদের দীর্ঘ সময় অবস্থান করা নিষেধ।
ঘর যদি মসজিদ হত তাহলে সে ঘরে মহিলাদের অবস্থান করা বৈধ হত না।
অনুরূপভাবে ঐ ঘর বিক্রয় করাও বৈধ হত না।
বি: দ্র:
মসজিদের মধ্যে মহিলাদের যদি নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকে এবং তার ইতিকাফের কারণে যদি সন্তান প্রতিপালন, ঘর-সংসারের নিরাপত্তা এবং তার উপর অর্পিত অপরিহার্য কবর্ত্য পালনে ব্যাঘাত না ঘরে তবে স্বামী বা অভিভাবকের অনুমতি স্বাপেক্ষে ইতিকাফ করা বৈধ হবে।
অন্যথায়, তার জন্য ইতিকাফ না করে বরং নিজ দায়িত্ব যাথাযথভাবে পালন, সংসার দেখা-শোনা, স্বামীর সেবা ইত্যাদিতেই অগণিত কল্যাণ নিহীত রয়েছে।
তিনি কাজের ফাঁকে যথাসাধ্য দুয়া, তাসবীহ, কুরআন তিলাওয়াত, নফল সালাত ইত্যাদির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করবেন। আল্লাহই তাওফীক দাতা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের পবিত্র মাহে রমজানে মসজিদে ইতিকাফ করার মাধ্যমে গুনাহের পাপরাশি থেকে বেঁচে থেকে অশেষ নেকি লাভের মোক্ষম সুযোগ দান করুন ।
📌[এতেকাফ বিষয়ে ভুল ধারণা হচ্ছে❌
গ্রাম বা মহল্লাবাসীর পক্ষে এক বা একাধিক ব্যক্তি ইতিকাফ করলে সবার পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যাবে। গ্রামের পক্ষ থেকে কোন ব্যক্তি যদি এতেকাফ না করে গ্রামের সবাই গুনাহগার হবে । নারীরা নিজের ঘরে এতেকাফ করবে ]
বেদাতী হুজুরের ধর্মীয় গোঁড়ামী