10/12/2020
—বলি ওকেনে কী আচে ? মদু আচে ?
মধুতে মজেছে মন। এই শীতে মধুতে মন না মজে থাকতে পারে ! এ মধু মৌমাছিদের চাকজাত নয় । এ মধু মধুবৃক্ষের।
—সে স্বাদ আর কোথায় ?
যে স্বাদই হোক না কেন, মধুবৃক্ষের রস পান করে তৃপ্ত হতে চায় মন ।
ভাইপো বলেছিল—কাকা এক ভাড় আমি ফিরিতি এনে দিবানে।
ফ্রি-টি দরকার নেই । পয়সা দিয়েই আন ভাই । গরম রুটি দিয়ে চেটে চেটে খাব । তারপর গলা জ্বলিয়ে যখন মিষ্টিটা পেটে যাবে, উফ, কি শান্তি ! রাতবিরেতে গ্যাসের ঢেকুর উঠবে, তা উঠুক, তবু মধুবৃক্ষের রস পান করে তৃপ্ত হতে চায় মন । বছরে একবারই তো মেলে খেজুর গুড় । আর তা খেয়ে যদি একটু গ্যাস গরম হয়, তা হোক ।
—কে বলল গ্যাস হবে ? জানো কি খেজুর গুড়ের গুণ ? খাবার পর প্রতিদিন যদি একটু করে গুড় খাও, তাহলে হজম ভালভাবে হয় । গুড় আমাদের হজমে সাহায্যকারী এনজাইমের শক্তিকে বাড়িয়ে দেয়। এছাড়াও আছে আরও উপকারিতা—গুড়ে প্রচুর আয়রন থাকে, শরীরে হরমোনের সমতা ফেরাতে সাহায্যকারী গুড়, শীতকালে প্রতিদিন গুড় খেলে সর্দি কাশি থেকে রেহাই মেলে।
সে উপকার-অপকার যা খুশি হোক না কেন, শীতকালে মাস্ট খেজুর গুড় । এ তো প্রকৃতির দান । অমন রুক্ষ খেজুর গাছটা এত্তো রস ঝরাতে পারে ! শীত না এলে তো জানাই হতো না মানুষের । খেজুর গাছের প্রথম দিনের রসকে বলে জিরেন রস, পরের দিন ঝরা রস, তার পরের দিন নিম-ঝরা, তারপর ওলা। ভাড় ঝুলিয়ে রস সংগ্রহ করে তাকে জাল দিতে দিতে মোটা করে ঝোলা গুড়। গাছে ভাড় ঝোলানো হয় বলেই হয়ত এই গুড়ের নাম ঝোলা গুড়। আবার ‘ঝরা’ শব্দটি থেকেও ‘ঝোলা’ শব্দটি আসতে পারে। আর ঝোলা গুড়ের কথা এলেই তো মনে পড়ে যায় সুকুমারের লাইনগুলো—
শিমুল তুলো ধুন্তে ভাল,
ঠাণ্ডা জলে নাইতে ভাল,
কিন্তু সবার চাইতে ভাল
পাউরুটি আর ঝোলা গুড়।
—আর পাউরুটি দিয়ে ঝোলা গুড় খেতে হবে না…মোটা হয়ে যাবি…সুগার হবে। একেই তো ডায়াবেটিস বাধিয়েছিস এই বয়সেই । তার সঙ্গে হাই প্রেসারের রুগী।
—আবার সেই বাজে কথা ! গুড় রক্তের সঙ্গে মেশে ধীরে ধীরে । তাই রক্তে আচমকা গ্লুকোজ কমে বা বেড়ে যেতে পারে না । শুধু কি তাই, গুড়ে পটাসিয়াম ও সোডিয়াম থাকে । যা আমাদের শরীরে অ্যাসিড এর পরিমাণকে স্বাভাবিক রাখে । রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকে । ওজন কম করা, গাঁটের ব্যথা কমানো, পেট ঠান্ডা রাখা, লিভারকে পরিষ্কার ও ভাল রাখে গুড় ।
তবে সুগারের ভয়ে গুড় খাব না, এতো হতে পারে না । তাও যে গুড় আসে বছরে একবার, প্রত্যেক শীতে নতুন করে ওঠে যে গুড় ! নলেন গুড়। হ্যাঁ তাই তো, একটা কথা তো বলাই হয়নি । খেজুর গুড় কেন ‘নলেন’ হল ? অনেকে বলেন, ‘নলেন’ মানে নতুন । বিদ্ব্যজনের মতে, ‘নলেন’ শব্দটি সংস্কৃত শব্দ। তবে ভিন্ন মতও রয়েছে। একদল বলছেন, ‘নলেন’ কথাটির জন্ম দ্রাবিড়ীয় শব্দ ‘ণরক্কু’( নরকু) থেকে। এই শব্দের অর্থ হল, কাটা বা ছেদন করা । খেজুর গাছ কেটে বা ছেঁচে পরিষ্কার করলেই খেজুর রস বেরিয়ে আসে । তাই ‘ণরক্কু’( নরকু) শব্দ থেকে জন্ম হতে পারে ‘নলেন’ শব্দটির ।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, নলেন গুড়ের আরও একটা নাম আছে, লালি গুড় । তবে সে গুড় আর কোথায় ! সে গুড়ে বালি পড়ে গিয়েছে। এক সময় বাংলার বিভিন্ন জায়গায় নলেন গুড়ের হাট বসত । এখন সে হাট আর চোখে পড়ে না । এক সময় নলেন গুড় থেকে তৈরি হতো বাংলার বাদামি চিনি। সে চিনিও এখন আর নেই। এখন নলেনের প্রলেপই শেষকথা—সে ছানার মধ্যে দিয়ে কড়া পাক বা নরম পাকের সন্দেশ-রসগোল্লাই হোক বা
নলেন গুড়ের আইসক্রিম।