27/07/2026
এই লেখাটা স্কিপ করার আগে ৩০ সেকেন্ড দাঁড়ান।
আপনার বাসার যে মানুষটা সারাদিন বলে "পেটটা ক্লিয়ার হয় না, শরীরটা আর চলে না" - কালকে হয়তো তার জন্যই এই লেখাটা দরকার হবে।
চেম্বারে গত সপ্তাহে দুইটা মানুষ আসছিল, দুই মেরুর মানুষ।
প্রথম জন, রিমা আপা। বয়স ৩২, একটা প্রাইভেট স্কুলে পড়ান। দেখতে একদম গোছানো মানুষ। বসেই বললেন,
"ভাইয়া, আমি কি অলস হয়ে গেছি?"
আমি বললাম, কেন আপা?
"আমার সকালে টয়লেটে ৪০ মিনিট লাগে। পেট ক্লিয়ারই হয় না। ইসবগুল, কলা, পেঁপে, গ্লিসারিন সাপোজিটরি - সব ট্রাই করা শেষ। ২ বছর ধরে খালি গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খাই। তার উপর গত ৮ মাসে ৫ কেজি ওজন বাড়ছে। আমি তো ভাতই কম খাই। জামাই বলে আমি নাকি নাটক করি।"
কথা বলতে বলতে খেয়াল করলাম, এই গরমেও আপার গায়ে একটা চাদর। বললাম, আপনার শীত লাগে?
আপা চমকে গেলেন। "আপনি কেমনে বুঝলেন? অফিসে সবাই এসি ছেড়ে কাঁপে না, আর আমি বলি ফ্যানটা কমায় দেন। রাতে জামাই ফুল স্পিডে ফ্যান দেয়, আমি কম্বল টানি। এই নিয়া রোজ ঝগড়া।"
দ্বিতীয় জন, শারমিন। বয়স ২৮, নতুন মা। বাচ্চার বয়স ১১ মাস।
ওর সমস্যা অন্য জায়গায়। ও এসেছে চুল নিয়ে। "আপা, গোসলের পর ফ্লোর দেখলে কান্না আসে। সামনের চুল একদম পাতলা হয়ে গেছে। স্কিন দেখেন, কেমন খসখসে হয়ে গেছে। লোশন দিলে ২ ঘন্টা পর আবার সাদা হয়ে টান ধরে।"
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ লাগে?
ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, "কিসের ফ্রেশ ভাইয়া। মনে হয় সারারাত ট্রাক চালাইছি। বাচ্চাটাকে কোলে নিতেও এনার্জি পাই না। আর পিরিয়ডটা... ২৮ দিনের সাইকেল এখন ৪০ দিনেও হয় না।"
দুইটা মানুষ, দুইটা বয়স, দুইটা আলাদা কমপ্লেইন। একজনের পেট, আরেকজনের চুল।
কিন্তু আমি যখন ওদের দুইজনের রিপোর্ট হাতে নিলাম, আমার হাতটা কেঁপে উঠছিল।
কারণ ভিলেন একজনই।
ওর নাম হাইপোথাইরয়েডিজম।
আমাদের গলার সামনে প্রজাপতির মতো ছোট্ট একটা গ্ল্যান্ড থাকে, নাম থাইরয়েড। ওর কাজ হলো আমাদের শরীরের স্পিড ঠিক করা। ও হরমোন বানায়, যেটা ঠিক করে শরীর কত জোরে চলবে, কত ক্যালরি পুড়বে, কত হিট বানাবে।
যখন ও অলস হয়ে যায়, হরমোন কম বানায়, তখন পুরা বডি স্লো-মোশনে চলে যায়। একদম পুরান ব্যাটারির মোবাইলের মতো।
তাহলে বুঝেন, পেট কেন ক্লিয়ার হয় না?
নাড়িভুঁড়িও তো স্লো হয়ে গেছে। খাবার আস্তে আগায়, ভেতরের পানি বেশি শুষে নেয়, তাই শক্ত ইটের মতো কষা হয়। আপনি যতই ইসবগুল খান, ভেতরের মেশিনই তো স্লো।
এই রোগটা আমাদের মা-বোনদের মধ্যে কেন এত বেশি?
১. অটো-ইমিউন গন্ডগোল: আমাদের শরীরের পুলিশই ভুল করে নিজের থাইরয়েড গ্ল্যান্ডকে শত্রু ভেবে আক্রমণ করে বসে। এটাই মেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে কমন কারণ। আপনি কিছুই করেন নাই, শরীর নিজেই নিজের ক্ষতি করছে।
২. আয়োডিনের ঝামেলা: আয়োডিন দিয়ে থাইরয়েড হরমোন বানায়। আমাদের দেশে অনেকে মনে করে আয়োডিন মানে খালি লবণ। কিন্তু অতিরিক্ত আয়োডিনযুক্ত লবণ, বা একদম আয়োডিন ছাড়া খাবার - দুইটাই গন্ডগোল বাঁধায়।
৩. প্রেগন্যান্সির পর হরমোনের ধাক্কা: বাচ্চা হওয়ার পর অনেক মায়ের হরমোন এলোমেলো হয়ে যায়। শারমিনের মতো অনেকেই ভাবে "বাচ্চা সামলাতে গিয়ে ধকল যাচ্ছে", কিন্তু ভেতরে থাইরয়েড বসে গেছে।
এই লক্ষণগুলাকে আমরা পাত্তাই দেই না। ভাবি বয়স হইছে, সংসারের চাপ, শ্যাম্পু ভালো না।
আজকের পর থেকে এই ৭ টা লক্ষণকে আর অবহেলা কইরেন না ভাই:
কষা, যেটা কোনো ওষুধে পার্মানেন্ট ভালো হয় না
এসি রুমেও শীত লাগে, হাত-পা সবসময় ঠান্ডা
কম খেয়েও ওজন বাড়তেছে, ডায়েট-জিমে কাজ হচ্ছে না
সারাদিন ঘুম ঘুম ভাব, সকালে উঠে মনে হয় ঘুমানই নাই
চুল পাতলা হয়ে যাওয়া, স্কিন খসখসে রুক্ষ হয়ে যাওয়া
পিরিয়ড উল্টাপাল্টা, ২৮ দিনের সাইকেল ৪০ দিনে চলে যাওয়া
কোনো কারণ ছাড়াই মন খারাপ, খিটখিটে লাগা
রিমা আপা আর শারমিনের মধ্যে ৩ টা করে মিলে গেছিল।
ভয় পাইয়েন না ভাই... সুখবর হচ্ছে...
এটা কোনো মরণব্যাধি না। এটার চিকিৎসা পানির মতো সহজ। একটা ছোট্ট টেস্ট আর সকালে খালি পেটে একটা ছোট্ট ট্যাবলেট, ব্যাস। শরীর আবার আগের মতো চঞ্চল হয়ে যায়।
রিমা আপা ১ মাস পর আসছিলেন হাসতে হাসতে। "ভাইয়া, এখন টয়লেট ৫ মিনিটে ক্লিয়ার। কম্বল ছাড়া ঘুমাই। জামাই বলতেছে, আমার পুরান বউ ফেরত আসছে।"
তাই যদি আপনারও এই লিস্টের ৩-৪ টা মিলে যায়, ৩ টা কাজ করেন:
১. একটা TSH টেস্ট করায় ফেলেন: ৫০০-৬০০ টাকার একটা টেস্ট। সকালে খালি পেটে করতে হয়। রিপোর্ট নরমাল আসলে টেনশন ফ্রি। আর সমস্যা থাকলে শুরুতেই ধরা পড়বে। নিজে নিজে ওষুধ শুরু কইরেন না।
২. ওষুধের নিয়মটা মানেন: থাইরয়েডের ওষুধ, মানে Thyroxine, সকালে খালি পেটে খেতে হয়। খাওয়ার ১ ঘন্টা পর নাস্তা করবেন। ক্যালসিয়াম বা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের সাথে একসাথে খাবেন না, ৪ ঘন্টা গ্যাপ রাখবেন। এটা WHO গাইডলাইন অনুযায়ী সবচেয়ে কার্যকর নিয়ম।
৩. নিজেকে দোষ দিয়েন না: এটা আপনার অলসতা না, আপনার খাওয়ার দোষ না। এটা হরমোনের সমস্যা। তাই নিজেকে "আমি মোটা হয়ে যাচ্ছি, আমি অকর্মা" বলে গালি না দিয়ে ডাক্তারের সাথে খোলামেলা কথা বলেন।
এই পোস্টটা সেভ করে রাখেন। আপনার টাইমলাইনে রেখে দেন। হয়তো আপনার বোন, আপনার ভাবি, আপনার কলিগ এই ৭ টা লক্ষণ নিয়ে বছরের পর বছর ঘুরতেছে আর ভাবতেছে "আমার গ্যাস্ট্রিক"।
আপনার একটা শেয়ারে যদি একটা মানুষও টেস্টটা করায়, তার ২ বছরের কষ্ট ১ মাসে শেষ হয়ে যাবে।
বুকে হাত দিয়ে বলেন তো...
গত ৬ মাসে আপনার কি এই লিস্টের ৩ টা লক্ষণ একসাথে হচ্ছে? সত্যি করে কমেন্টে লিখেন - "হ্যাঁ, আমার ৩ টা মিলছে" বা "না, আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি"।
#থাইরয়েড #হাইপোথাইরয়েডিজম #স্বাস্থ্য_সচেতনতা
কালেক্টেড