25/09/2026
সিজদা ও কদমবুসির মধ্যে পার্থক্য কী?
সিজদা আরবি শব্দ। এর অর্থ—মস্তক অবনত করা, মাথা নত করা, মাটিতে কপাল স্পর্শ করা, আনুগত্য স্বীকার করা, হুকুম পালন করা ইত্যাদি।
সিজদা প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ এরশাদ করেন—
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَئِكَةِ اسْجُدُوا لِأَدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ أَبَى وَاسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ
উচ্চারণ:
ওয়া ইয কুলনা লিলমালাইকাতিস জুদূ লিআদামা ফাসাজাদূ ইল্লা ইবলীসা, আবা ওয়াসতাকবারা, ওয়া কানা মিনাল কাফিরীন।
অর্থ:
“আর আমি যখন ফেরেশতাদের বললাম আদম (আ.)-কে সিজদা করতে, তখন ইবলিস ছাড়া সবাই সিজদা করল। সে আদেশ অমান্য করল এবং অহংকার করল। ফলে সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।”
(সূরা আল-বাকারা: আয়াত ৩৪)
অন্যদিকে, কদমবুসি ফারসি শব্দ। এর অর্থ পদচুম্বন বা পায়ে চুম্বন করা।
হযরত জারির (রা.) হতে বর্ণিত—
لَمَّا قَدِمْنَا الْمَدِينَةَ فَجَعَلْنَا نَتَبَادَرُ مِنْ رَوَاحِلِنَا فَنُقَبِّلُ يَدَ رَسُولِ اللَّهِ وَرِجْلَهُ
উচ্চারণ:
লাম্মা ক্বাদিমনাল মাদীনাতা ফাজা‘আলনা নাতাবাদারু মিন রাওয়াহিলিনা ফানুক্বাব্বিলু ইয়াদা রাসূলিল্লাহি (সাঃ) ওয়া রিজলাহ্।
অর্থ:
“আমরা যখন মদীনায় এলাম, তখন দ্রুত নিজেদের বাহন থেকে নেমে পড়লাম। অতঃপর আমরা আল্লাহর রাসুল (সাঃ)-এর হাত মোবারক ও কদম মোবারক চুম্বন করলাম।”
(আবু দাউদ শরীফের সূত্রে মিশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা- ৪০২)
কদমবুসি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও ভক্তি প্রদর্শনের জন্য করা হয়। পক্ষান্তরে সিজদার উদ্দেশ্য ইবাদত করা।
সিজদার চারটি শর্ত:
১. নিয়ত করা
২. ওজু করা
৩. কেবলামুখী হওয়া
৪. অষ্টাঙ্গ মাটিতে স্পর্শ করে সিজদা করা (দু’পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলী,
দু’ হাঁটু, দু’ হাত এবং নাক ও কপাল—এই আটটি অঙ্গ জমিনে স্পর্শ করতে হবে)
এ চারটি শর্ত পালন না করলে সিজদা হবে না।
---
সিজদার প্রকারভেদ:
১. সিজদায়ে তাবুদি (ইবাদতের সিজদা)
এটি কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য। চারটি শর্ত পূরণ করে ইবাদতের উদ্দেশ্যে এটি করা হয়।
২. সিজদায়ে তাহিয়্যাহ বা তাজিমি সিজদা
এটি আল্লাহর বিশেষ বান্দা, প্রিয় নবী-রাসুল, অলি-আল্লাহ, মাতা-পিতা, শিক্ষক ও গুরুজনদের সম্মান প্রদর্শনের জন্য করা হয়ে থাকে।
তাজিমি সিজদা কি নাজায়েজ?
না, এটি নাজায়েজ নয়।
প্রমাণ:
১. আল্লাহ বলেন:
"যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম আদমকে সিজদা করতে, তখন ইবলিস ব্যতীত সবাই সিজদা করল।"
২. কুরআনে প্রমাণিত:
হযরত ইউসুফ (আ.)-কে তাঁর পিতা হযরত ইয়াকুব (আ.), তাঁর মা ও ভাইয়েরা তাজিমি সিজদা করেছিলেন।
প্রকৃতপক্ষে, সিজদা করা হয় কেবলমাত্র মহান আল্লাহকে।
অন্যদিকে কদমবুসি করা হয় আল্লাহর বান্দাকে, এবং এর জন্য কোনো নির্দিষ্ট শর্ত নেই। যে কোনো সময় পিতামাতা, শিক্ষক বা পীর-মুর্শিদকে কদমবুসি করা উত্তম ও ফজিলতপূর্ণ। এর উদ্দেশ্য শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও ভক্তি প্রকাশ করা।
কিন্তু সমাজে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, “কদমবুসি করতে গেলে মাথা নিচু করতে হয়, আর আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও সামনে মাথা নত করাই শিরক।”
এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল।
দৈনন্দিন জীবনে আমাদের অনেক কাজের জন্য মাথা নিচু করতে হয়, যা কখনোই শিরক নয়। যেমন—
কৃষক যখন ফসল রোপণ করে
জুতা পরার সময় ফিতা বাঁধে
হাত থেকে কিছু পড়ে গেলে তা তুলতে যায়
এমনকি খাবার খাওয়ার সময়ও মাথা নিচু করতে হয়
তাহলে এগুলো কি শিরক? নিশ্চয়ই নয়!
---
সুপ্রিয় জ্ঞানী সূধীবৃন্দ ভাই ও বোনেরা
আসুন আলোচনার এ পর্যায়ে আজকের বিষয় বস্তু সম্পর্কিত একটি
সূফী গজলটি অবলোকন করি-
সেজদা করা সহজ নয় রে, সেজদা করা সহজ নয়—
মাথা নত করলেই সেজদা নয় রে,
মাথা নত করলেই সেজদা নয়।
তবে কদমবুসি করতে হলে, মাথা নত করতে হয়।
(যদি) নূর কদমে সেজদা দিতে চাও, তবে নিয়ম জেনে লও
নিয়ত করে ওজু করে কেবলামুখী হও।
অষ্টাঙ্গ মাটিতে লাগাও, সঠিক সিজদা যারে কয়।
বাবা আদমকে সেজদা দিতে কয়, আবেদ যিনি রয়
আদেশ অমান্য করিয়া ইবলিস শয়তান হয়।
হুকুমে তাজিমে সিজদা ফেরেশতারা দুইবার দেয়।
"ওয়া নাফাখতু ফিহি মিন রুহী" ফুকে দিয়েছেন রুহি
আদমের ভিতরে হলো আল্লাহ আরোহী।
যুগের ইমাম প্রতিনিধি যার ভিতরে আল্লাহ রয়।
অলি-আল্লাহর মাজার রওজা স্থান, করো শ্রদ্ধার সম্মান
কদমবুসি জিয়ারতের আছেরে বিধান।
তথ্য জেনে কয় জসিম খান, চুম্বন দেই মোর্শিদের পায়।
(সংগৃহীত)