04/05/2026
রাতের নিস্তব্ধতা গ্রাস করছে শহরটাকে। বাজারের প্রায় সব দোকানই বন্ধ হয়ে গেছে, শুধু রাশেদের দোকানের ঝাঁপ অর্ধেক নামানো। দোকানের এক কোণে মলিন মুখে বসে আছে সে। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ, চোখ দুটো ভিজে আসছে বারবার। কিছুক্ষণ আগেই এক পাওনাদার এসে জনসমক্ষে তাকে অনেক কড়া কথা শুনিয়ে গেছে।
রাশেদ বুঝতে পারছে না ভুলটা ঠিক কোথায়। সে তো ব্যবসায় পর্যাপ্ত সময় দিচ্ছে, পরিশ্রমের একটুও কমতি রাখছে না। তার পণ্যগুলোও একদম খাঁটি ও নির্ভেজাল। তবুও কেন জানি গত কয়েক মাস ধরে তার ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে। হুট করেই যেন বেচা-বিক্রি বন্ধ হয়ে গেছে। কিছুদিন আগে ধার করে মাল তুলেছিল, কিন্তু বিক্রি না থাকায় টাকা পরিশোধ করতে পারছে না। আজ সেই অপমানের বোঝা নিয়ে সে ভাবছে—হয়তো দোকানটা বন্ধই করে দিতে হবে।
এমন সময় তার চোখ পড়ল পাশের দোকানদার মুহাম্মাদ ভাইয়ের দিকে। মুহাম্মাদ ভাই রাত দশটার মধ্যেই দোকান বন্ধ করে হাসিমুখে বাড়ি চলে যান, অথচ তাঁর দোকানে মাশাআল্লহ সারা দিন ক্রেতাদের ভিড় লেগেই থাকে। অন্যদিকে রাশেদ মধ্যরাত অবধি দোকান খোলা রেখেও কাঙ্ক্ষিত বিক্রি পাচ্ছে না।
হঠাৎ রাশেদের কাঁধে একটি উষ্ণ হাতের স্পর্শ। পেছনে ফিরতেই দেখল মুহাম্মাদ ভাই দাঁড়িয়ে আছেন। মুখে সেই চিরচেনা প্রশান্তির হাসি।"
"আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লহি ওয়া বারকাতুহ। রাশেদ ভাই, খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে?"
রাশেদ লম্বা শ্বাস ছেড়ে উত্তর দিল, "ওয়া আলাইকুমুস সালাম। ভালো নেই ভাই। ব্যবসায় চরম মন্দা যাচ্ছে, কোনো বিক্রি নেই। এত পরিশ্রম করছি, তাও কেন এমন হচ্ছে ভাই!"
মুহাম্মাদ ভাই মুচকি হেসে বললেন, "ভাই, সমস্যাটা আপনার পরিশ্রমে নয়, সমস্যাটা হয়তো আল্লাহর সাথে সম্পর্কের জায়গায়। আমরা যখন রিজিকদাতাকে ভুলে কেবল উপকরণের পেছনে ছুটি, তখন বরকত উঠে যায়।"
তিনি গভীর মমতায় রাশেদকে বলতে থাকলেন, "দেখুন ভাই, বিপদ-আপদ সবই আল্লাহ তাআলার পরীক্ষা। আল্লাহ কাউকে নেয়ামত দিয়ে পরীক্ষা করেন, আবার কারো কাছ থেকে নিয়ে পরীক্ষা করেন। আপনি আমার প্রশ্নের উত্তরে বললেন 'ভালো নেই'। অথচ মুমিনের উচিত যেকোনো অবস্থায় বলা— 'আলহামদুলিল্লাহ আলা কুল্লি হাল' (সব অবস্থায় আল্লাহর প্রশংসা)। কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ কষ্টের সময়ও এই দোয়াটি পড়তেন (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৮০৩)। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে আল্লাহ নেয়ামত বাড়িয়ে দেন (সূরা ইব্রাহিম: ০৭)। আপনি শুরুতেই অভিযোগ করে বরকতের দুয়ার আটকে দিলেন না তো ভাই?"
রাশেদ লজ্জিত হয়ে মাথা নিচু করল। মুহাম্মাদ ভাই জানতে চাইলেন, "আচ্ছা ভাই, আপনি কি মাগরিবের পরে সূরা ওয়াক্বিয়াহ তিলাওয়াত করেন? সকাল-সন্ধ্যার আমলগুলো করেন?"
রাশেদ ম্লান মুখে উত্তর দিল, "আসলে ব্যবসায় সময় দিতে গিয়ে এগুলোতে সময় দেওয়া হয় না ভাই। তবে আলহামদুলিল্লাহ, আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি।"
মুহাম্মাদ ভাই তখন বললেন, "ভাই, রিযিকের মালিক আল্লাহ তাআলা। আমরা দুনিয়াতে এসেছি তাঁর ইবাদতের জন্য। আমাদের উচিত সব কাজের আগে নিজের রবকে স্মরণ করা, এরপর বাকি সময় দুনিয়াবি কাজ। আল্লাহ যদি আপনার প্রতি সন্তুষ্ট না হন, তবে আপনি হাজার পরিশ্রম করলেও সেই উপার্জনে 'বারাকাহ' পাবেন না।"
তিনি রাশেদকে একটি রুটিন বাতলে দিলেন–
ঘুম থেকে উঠবেন ফজরের সময়। নামাজ শেষ করে সকালের মাসনুন আমল ও সূরা ইয়াসীন পাঠ করবেন। সূর্যোদয় পর্যন্ত জেগে থাকা সুন্নাহ। সালাফে সালেহীনরা ফজরের পর ঘুমানোকে মাকরুহ মনে করতেন। নবীজী ﷺ স্বয়ং দোয়া করেছেন— "হে আল্লাহ! আপনি আমার উম্মতকে ভোরের বরকত দান করুন" (সুনানে আবু দাউদ: ২৬০৬)। এই দোয়ার বরকতে সাহাবী সাখর আল-গামিদী (রা.) ভোরে ব্যবসা শুরু করে অনেক সম্পদের অধিকারী হয়েছিলেন।
উলামায়ে কেরামগন এই পরামর্শ দেন যে, ফজরের নামাজ পড়ে না ঘুমিয়ে সূর্য উদয় পর্যন্ত সময় কুরআন তিলাওয়াত, যিকির আযকার ইত্যাদিতে লিপ্ত থাকার চেষ্টা করা।
সুযোগ পেলে বিশেষ প্রয়োজন বশত ইশরাক পরে ঘুমানো।
লেনদেনের ক্ষেত্রে পণ্যের কোনো ত্রুটি থাকলে তা প্রকাশ করে দেবেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "ক্রেতা ও বিক্রেতা যদি সত্য বলে ও পণ্যের ত্রুটি বর্ণনা করে, তবে তাদের কেনাবেচায় বরকত হবে; আর যদি মিথ্যা বলে ও দোষ গোপন করে, তবে বরকত বিনষ্ট হয়ে যাবে" (সহিহ বুখারি: ২০৭৯)।
মুহাম্মাদ ভাই বললেন, "দোকানে কাজের ফাঁকে ফাঁকে
৩/৫ /৭ বার করে এই আয়াতগুলো পাঠ করবেন–
• রিজিক ও বরকতের আয়াত: (সূরা তালাক: ২-৩, সূরা নিসা: ৩২, সূরা হুদ: ৮৮, সূরা রাদ: ২৬)।
• শুকরিয়া ও প্রশান্তির আয়াত: (সূরা নামল: ১৯, সূরা কাহাফ: ৩৯, সূরা দুহা: ৫, ৮)।"
তিনি আরও যোগ করলেন, "মাগরিবের পর অবশ্যই সূরা ওয়াক্বিয়াহ তিলাওয়াত করবেন। নবীজী ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সূরা ওয়াক্বিয়াহ পড়বে, সে কখনও অভাব-অনটনে পড়বে না (শুআবুল ঈমান: ২৪৯৯)।"
মুহাম্মাদ ভাই বিদায় নেওয়ার আগে শেষ কথাটি বললেন, "রাত দশটায় দোকান বন্ধ করে দ্রুত ঘুমানোর চেষ্টা করবেন এবং ভোরে উঠবেন। আল্লাহকে সময় দিন, আল্লাহ আপনার কাজে বরকত বাড়িয়ে দেবেন।"
মুহাম্মাদ ভাইয়ের কথাগুলো রাশেদের হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধল। সেই রাত থেকেই সে নিজেকে বদলে ফেলল। রাত দশটায় দোকান বন্ধ করা, ফজর পড়ে তিলাওয়াত ও যিকির করা এবং সততার সাথে ব্যবসা পরিচালনা করা—এটাই তার নিত্যদিনের আমল হয়ে গেল।
কয়েক সপ্তাহ পর... রাশেদের দোকানে এখন আর আগের মতো হাহাকার নেই। পাওনাদারের টাকা সে সম্মানের সাথে শোধ করে দিয়েছে। তার অন্তরে এখন অপার প্রশান্তি। সে এখন বুঝেছে— রিজিক কেবল পরিশ্রমের অংকে নয়, রিজিক হলো আল্লাহর দেওয়া 'বারাকাহ'-র মধ্যে। যখন সে দুনিয়াকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পেছনে রেখেছে, আল্লাহ দুনিয়াকে তার পায়ের নিচে এনে দিয়েছেন।
শিক্ষা: রিজিকদাতার সাথে সম্পর্ক মজবুত করুন, বরকত আপনার দরজায় কড়া নাড়বে ইনশাআল্লহ।
গল্প-"বরকতের চাবিকাঠি"
লিখা-আমাতুল্লাহ ফারজানা।
দীপ্তিময়ী টিম
#দীপ্তিময়ী #আমাতুল্লাহফারজানা #বরকতেরচাবিকাঠি