01/06/2017
কীর্তিমান বাংলাদেশী ড. ফজলুর রহমান খান
শিকাগো, আমেরিকার তৃতীয় বৃহত্তম শহর। ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী এই নগর, স্থাপনাশিল্পের এক সূতিকাগার। শিকাগো শহরের সর্বোচ্চ ভবনের নাম ‘উইলিস টাওয়ার’। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ছিল বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন ছিল যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোয় অবস্থিত ১১০তলা ভবন উইলিস টাওয়ার। ১৯৭৪ সালে নির্মিত এ টাওয়ারটির সাথে জড়িয়ে আছে এক বাংলাদেশী কীর্তিমানের নাম। বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার তথা পৃথিবীর গগনস্পর্শী স্থাপনা শিল্পের পথিকৃৎ ড. ফজলুর রহমান খান।
১৯২৯ সালের ৩ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন ড. ফজলুর রহমান খান। ১৯৪৪ সালে আরমানিটোলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে কলকাতার বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন। ফাইনাল পরীক্ষা চলাকালে পঞ্চাশের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে তিনি ঢাকায় ফিরে এলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাকি পরীক্ষা সমাপ্ত করেন। সরকারের বৃত্তি নিয়ে ১৯৫২ সালে পাড়ি জমান শিকাগো শহরে। ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় অ্যাট আরবানা শ্যাম্পেইন থেকে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং তত্ত্বীয় ও ফলিত মেকানিক্সে যুগ্ম এমএস করার পর ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জনের পরপরই তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক পদে যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে তিনি শিকাগো শহরের স্কিডমোর, ওউইং ও মেরিল নামের প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। ১৯৫৬ সালে আবার দেশে ফিরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ব পদে যোগদান করেন। পরে আমেরিকার স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান স্কিডমোরের আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র গিয়ে এ কোম্পানির শিকাগো অফিসের পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। পাশাপাশি তিনি আমেরিকার ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির স্থাপত্য বিভাগে অধ্যাপক পদে অধিষ্ঠিত হন। সেখানে পরে তিনি প্রফেসর এমিরিটাস হয়েছিলেন।
১৯৫৯ সালে ভালোবেসে বিয়ে করেন এক অস্ট্রো-আমেরিকান নারী, লিজেলোটকে। তাদের একমাত্র সন্তান ইয়াসমিন সাবিনা খান, পেশায় স্থপতি। ১৯৮২ সালে মাত্র ৫৩ বছর বয়সে মারা যান ফজলুর খান। তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন শিকাগো শহরেই। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে।
বাংলাদেশের বিশিষ্ট স্থপতি ও পুরকৌশলী ফজলুর রহমান খানের জন্মদিন ৩ এপ্রিল উপলক্ষে চলতি বছর তার সম্মানে ‘ডুডল’ প্রকাশ করেছে সার্চ ইঞ্জিন গুগল। বিশ্বে উঁচু ও বড় মাপের বিল্ডিংয়ের নকশার ক্ষেত্রে পথিকৃৎ এই কিংবদন্তি ১৯২৯ সালে ৩ এপ্রিল মাদারীপুরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। মাত্র ৫২ বছর বয়সে ১৯৮২ সালে ২৬ মার্চ জেদ্দায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর তার দেহ আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং শিকাগোতে তাকে সমাহিত করা হয়। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রবাসে থেকেও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেন তিনি। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯৯ সালে তাকে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (মরণোত্তর) প্রদান করা হয়।
সম্মাননা
ড. এফ আর খান নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, লি হাই বিশ্ববিদ্যালয় ও সুইস ফেডারেল টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৯৯ সালে তাকে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (মরণোত্তর) প্রদান করা হয়। ফজলুর রহমান খানকে নিয়ে গুগল তার ৮৮তম জন্মদিনে ডুডল প্রকাশ করে।
গবেষণা
এফ আর খান মুসলিম স্থাপত্য বিষয়ের ওপর নানা ধরনের গবেষণা করেছেন। ড. খান টিউব ইন টিউব নামে স্থাপত্য শিল্পের এক নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন, যার মাধ্যমে অতি উচ্চ (কমপক্ষে একশত তলা) ভবন স্বল্প খরচে নির্মাণ সম্ভব। গগনচুম্বী ভবনের ওপর সাত খণ্ডে প্রকাশিত একটি বই তিনি সম্পাদনা করেন। এই বইটি এখনো স্থাপত্য শিল্পের পথিকৃত।
শিকাগোর সিয়ার্স টাওয়ার
এক বিশেষ স্ট্রাকচারাল পদ্ধতির উদ্ভাবন ও ব্যবহারের মধ্য দিয়ে তৎকালীন বিশ্বের সর্বোচ্চ বিল্ডিং শিকাগোর সিয়ার্স টাওয়ারের নির্মাতা হিসেবে তিনি বিশ্বখ্যাতি অর্জন করেন কয়েক বছর আগে কায়রোতে মুসলিম বিশ্বকে উদ্দেশ করে দেয়া ভাষণে মর্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা উল্লেখ করেছিলেন, একজন আমেরিকান মুসলমানই নির্মাণ করেছেন আমাদের দেশের সর্বোচ্চ টাওয়ারটি। সে ভাষণে ওবামা যে মুসলমানকে ইঙ্গিত করেছিলেন তিনিই আমাদের কিংবদন্তি, প্রত্যেক বাঙালির গর্ব ড. এফ আর খান। শিকাগোর সিয়ার্স টাওয়ার তার অনন্য কীর্তি। তিনি ১৯৭২ সালে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং নিউজ রেকর্ড’-এ ম্যান অব দি ইয়ার নির্বাচিত হন। পাঁচবার (৬৫, ৬৮, ৭০, ৭১, ৭৯ সালে) স্থাপত্য শিল্পে সবচেয়ে বেশি অবদানকারী ব্যক্তিত্ব হিসেবে অভিহিত হওয়ার গৌরব লাভ করেন। ড. খান ১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালে আমেরিকার ‘নিউজ উইক’ ম্যাগাজিন শিল্প ও স্থাপত্যের ওপর প্রচ্ছদ কাহিনীতে তাকে মার্কিন স্থাপত্যের শীর্ষে অবস্থানকারী ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করে। তার অন্যান্য অবদানের মধ্যে রয়েছে শিকাগোর জন হ্যানকক সেন্টার, জেদ্দা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের হজ টার্মিনাল এবং মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য মডেল প্রণয়ন।
১৯৯৮ সালে ড. ফজলুর রহমান খানের সম্মানে শিকাগো শহরের সিয়ার্স টাওয়ারের পাদদেশে অবস্থিত জ্যাকসন সড়ক পশ্চিম পার্শ্ব এবং ফ্রাঙ্কলিন সড়কের দক্ষিণ পার্শ্বের সংযোগস্থলটির নামকরণ করা হয় ফজলুর আর খান নামে।
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/223172
শিকাগো, আমেরিকার তৃতীয় বৃহত্তম শহর। ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী এই নগর, স্থাপনাশিল্পের এক সূতিকাগার। শিকাগো শহরের সর্বোচ্চ ভবনের নাম ‘উইলিস টাওয়ার’। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ছিল বিশ্বের সর্বোচ্চ...